রাজনৈতিক গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এক দশক ধরে রাজনৈতিক দলগুলো সুরতহাল করছেন। তত্ত্ব তালাশের দিক দিয়ে তার কাজগুলো অগ্রগণ্য। ইতিমধ্যে জাসদ, বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং সর্বহারা পার্টি নিয়ে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক দলের সলুক সন্ধানে তার এবারের কাজ জামায়াতে ইসলামী।এদেশে এখন যে কয়টি রাজনৈতিক দল সক্রিয়, বয়সের হিসাবে জামায়াত সামনের কাতারে। পুরনো দল কমিউনিস্ট পার্টি ও মুসলিম লীগ খণ্ড—বিখণ্ড হয়ে গেছে। এদের মধ্যে কত ফেরকা তা গুনে বলা যাবে না। সেক্ষেত্রে বলা যায়, বর্তমানে সবচেয়ে পুরনো ও সক্রিয় রাজনৈতিক দল হলো জামায়াতে ইসলামী। সে হিসেবে দলটি আলোচনার যোগ্য।
জন্ম ১৯৫২, ঢাকায়। পড়াশোনা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনে মুহসীন হল ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বিএলএফের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দৈনিক গণকণ্ঠ-এ কাজ করেছেন প্রতিবেদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকোংহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মাস্টার্স ইন এনজিও স্টাডিজ’ কোর্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক। তাঁর লেখা ও সম্পাদনায় দেশ ও বিদেশ থেকে বেরিয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা অনেক বই।
১৯৮১ সালের ২৯ মার্চ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আযম বললেন: 'একাত্তরে আমরা ভুল করিনি। একাত্তরে যা ঠিক মনে করেছি তাই করেছি, এখনো তা-ই করব।'
"লেখক" গোলাম আযম আমাদের পাঠ্যতালিকায় নেই বলে এই বই পড়ে বিরক্ত হলাম না। অর্ধেক বই জুড়েই গো আযমের বই থেকে উদ্ধৃতি ও ঘটনা নিয়ে লেখা সাজিয়েছেন মহিউদ্দিন আহমদ। পাকিস্তান আমলে জামায়াতের উদ্ভব, তৎকালীন রাজনীতি নিয়ে বেশকিছু তথ্য জানা যায়।যেমন - শেখ মুজিব অস্থিরচিত্তের ছিলেন।তাকে নিয়ে মওদুদী মন্তব্য করেছিলো, "আল্লাহ তাকে এতো বড় নেতা বানিয়ে দিলেন বটে,কিন্তু নেতাসুলভ দূরদৃষ্টি দান করেননি।" মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট কিছু লেখার সুযোগ থাকলেও, তাদের যুদ্ধাপরাধ নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকলেও লেখক শুধু একাত্তরে প্রকাশিত পত্রিকার কিছু ঘটনা উল্লেখ করেই থেমে গেছেন। গো আযম যুদ্ধে বিরোধিতা করে যেসব যুক্তি দিয়েছে, তাতে বেশ গোঁজামিল থাকলেও মহিউদ্দিন আহমদ যুক্তি খণ্ডন করে কোনো পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করেননি।
এরশাদ আমলে, পরবর্তী গণতন্ত্রের কালে জামায়াতের ভূমিকা, কেন বিএনপি আর আওয়ামী লীগ বারেবারে জামায়াতের কাছে ধর্না দিয়েছে তার যুক্তিসংগত বর্ণনা আছে বইতে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি জামায়াতের নেতৃত্বে সংঘটিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর করা নৃশংস হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা বিলকুল এড়িয়ে গেছেন লেখক। জুলাই অভ্যুত্থানের পর জামায়াত যে নতুনভাবে জাকিয়ে বসেছে, এর পেছনের জনমনস্তত্ত্ব ও এদের কৌশল কী ছিলো, সেগুলো জানার ইচ্ছাও অপূর্ণ রয়ে গেলো।
পূর্বের অভিযোগই করি,টানা ঘটনা বর্ণনা না করে গবেষক হিসেবে মহিউদ্দিন আহমদের উচিত ঘটনা বিশ্লেষণ, তুলনা করা, বিভিন্ন ঘটনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা - সেগুলোর কিছুই তিনি করেননি। একটানা বলে গেছেন শুধু।
বলতে দ্বিধা নেই এই বছরের জুলাই এবং আগস্ট অনেক বেশি রাজনৈতিক সচেতনতার জন্ম দিয়েছে আমার মধ্যে। বর্তমানে বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এই রাজনৈতিক দলটি। এর উত্থান এবং রাজনীতি সম্পর্কে একটা গ্রস আইডিয়া থাকলেও পরিষ্কার একটা ধারণার দরকার হয়ে পড়েছিল। এই বইটি সেই প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশেই মিটিয়েছে৷ খুব স্বাভাবিকভাবেই দলটি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য উপাত্তা একেবারে দলের মানুষের কাছ থেকে লেখক নিতে পারেননি, সাক্ষাৎকার নেয়ার মতো সুযোগ-সময়ও হয়তো ছিল না, তাই কিছু খামতি রয়ে গেছে। এরপরেও জামায়াতের রাজনীতি এবং প্রধান চিন্তাধারা বোঝার জন্য বইটি অত্যন্ত সহায়ক। ভারতে জন্ম নেয়া দলটি ধাপে ধাপে নানা বিপর্যয় পেরিয়ে আজো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে, যেখানে ভারত বা পাকিস্তানেও জামায়াতের তেমন কোন প্রভাবের কথা শোনা যায় না। ব্যাপারটা বিস্ময়কর এবং অবশ্যই ভাবার মতো বিষয়। যথেষ্ট নির্মোহ থেকে অত্যন্ত স্বাদু ভাষায় জামায়াতের গোড়া থেকে একেবারে হাল পর্যন্ত রাজনীতির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেছেন লেখক, যা কোন ধরনের বায়াসনেস দূর করতে বেশ সাহায্য করবে বলেই আমার বিশ্বাস। বর্তমান সময়ের জন্য, হয়তো ভবিষ্যতের জন্যও, বইটি অত্যন্ত কাজের। এটুকু বলা যায়।
জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে লেখা সহজ কাজ নয়, সেকথা লেখক ভূমিকাতেই উল্লেখ করেছেন। জামায়াতকে নিয়ে লিখতে গেলে তথ্যের যেমন ঘাটতি আছে, তেমনি নিরপেক্ষ থেকে সামগ্রিক বিষয়বস্তু আলোচনা না করতে পারারও ভয় রয়েছে।
৭১ সালে স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য জামায়াত সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং সমালোচিত। এ সম্পর্কে জামায়াত নেতা গোলাম আযমের নিজস্ব একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। গোলাম আযম বলেছেন তারা ৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছিল মূলত আদর্শিক দিক বিবেচনা করে। অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র (জামায়াতে ইসলামীর মতে যা ইসলামবিরোধী) কায়েম হবে এই ভয়ে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন।
মজার ব্যাপার হলো ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র দুটো ন্যারেটিভই মুক্তিযুদ্ধের পরের আমদানি। নিরপেক্ষ বা দলীয় কোনো ডকুমেন্টের কোথাও এ দুটো জিনিস মুক্তিযুদ্ধের আগে আলোচিত হয়েছে বলে জানা যায় না। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের তাত্ত্বিক বা প্রায়োগিক কোনো প্রস্তুতি ছিল না, ন্যুনতম কোনো আভাসই ছিল না, ২৫ মার্চের আগে আমাদের শীর্ষ নেতারাই জানতেন না আগামীতে কী হবে সেখানে এমন গালভারি, সাধারণ জনতার কাছে দুর্বহ দুটো আদর্শ(!) সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এ দাবি হাস্যকর। যে বিষয়বস্তুর আগমন মুক্তিযুদ্ধের বেশ পরে সে বিষয়ের জন্য আযম সাহেব স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন এই যুক্তি ধোপে টিকবে না।
সংবিধানের চার মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের উল্লেখ আছে। সংবিধানের মূলনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি আলাদা জিনিস। এ দুই জিনিসকে এক করে দেখার প্রয়াস চালানো হয় মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের বাম ঘরানার রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম। মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটা অংশ ছিল স্বল্পশিক্ষিত এবং অশিক্ষিত মানুষ। তারা যুদ্ধে নেমেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তাদের জাতীয়তা 'বাঙালি জাতীয়তা' হবে কিনা সেটা বিবেচ্য ছিল না, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের মতো দুর্বোধ্য থিওরি অ্যাপ্লাই করার জন্যেও তারা অস্ত্র ধরেননি। মূলকথা, এমন একটা জনযুদ্ধের বিরোধিতা করে সেটাকে 'আদর্শিক যুদ্ধ' বলে চালিয়ে দিয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচানো সম্ভব হয়নি জামায়াতের এবং সে বিতর্ক এখনো পিছু ছাড়েনি দলটির। আরো অবাক করা ব্যাপার হলো এ নিয়ে তাদের খুব অনুশোচনা নেই। গোলাম আযম বেশ দাম্ভিকভাবেই বলেছিলেন একাত্তরে তারা ভুলে করেননি, যা সঠিক মনে হয়েছিল তা-ই করেছেন এবং সামনেও এমন করবেন।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার আরেকটা যুক্তি দেখিয়েছেন গোলাম আযম। তার মতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কিছু করতে গেলে তার এবং তার দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ভারতে আশ্রয় নিতে হত এবং সেখান থেকে সবকিছু পরিচালনা করতে হত, যেটা তাদের মূলনীতির সাথে যায় না। আরেকটা হাস্যকর যুক্তি। ভারতে যারা গিয়েছিল তারা সবাই যুদ্ধ করেছে বা যুদ্ধের সাথে জড়িত ছিল? বরং ভারতে অবস্থানকারী বহুসংখ্যক তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম নিয়ে বিস্তর সমালোচনা রয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধে শামিল হতে ভারতেই যেতে হবে এই খাম্বা যুক্তি কোত্থেকে আমদানি হলো? দেশের ভেতরে অবস্থান নিয়েও অনেকে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে নিজ প্রচেষ্টায় বা দলীয় সহযোগিতায়। জামায়াতের অবস্থান এখানে শূন্যের চেয়েও তলানিতে।
পাকিস্তান আমলেও যে জামায়াত খুব ভালো অবস্থানে ছিল এমন নয়। গোড়া থেকেই জামায়াতের পথচলা ছিল বেশ কঠিন। পাঞ্জাবের কাদিয়ানী ম্যাসাকারের অভিযোগে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদূদীর মৃত্যুদন্ডের রায় পর্যন্ত দিয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক আদালত, যদিও পরবর্তীতে সাজা কমিয়ে তা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায়ে নামিয়ে আনা হয়। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান কারোই সুনজর ছিল না জামায়াতের প্রতি। তবুও ৭১ এ পাকিস্তানের প্রতি জামায়াতের নিরঙ্কুশ সমর্থন শুধুই কি আদর্শিক সংগ্রান তথা ভারত বিদ্বেষ ছিল? নাকি পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার কোনো কৌশল? প্রশ্ন থেকেই যায়।
জামায়াতে ইসলামী অদ্ভুত এবং রহস্যময়ী একটা দল। গলার বিঁধে থাকা কাঁটার মতো এদের গিলে ফেলা যায় না আবার বের করাও যায় না। ৭১ এর কর্মকাণ্ডের পরও এ দলকে খুব বেশিদিন মূলধারার বাইরে রাখা যায়নি। স্বাধীনতার স্বঘোষিত একমাত্র ধ্বজাধারী ও জামায়াত বিরোধী হিসেবে স্বীকৃত আওয়ামী লিগ যেমন জামায়াতের সমর্থন পাওয়ার জন্য একসময় মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তেমনি জামায়াত-শিবিরের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত বিএনপির সাথেও জামায়াতের দ্বন্দ্ব হয়েছ অনেকবার, হয়েছে একে অপরের দিকে কাদা ছোড়াছুঁড়ি। দিনশেষে কোনো দলই জামায়াতকে মাইনাস করতে পারেনি। বর্তমান সময়কে বিবেচনায় নিলে এ ব্যাপারে দ্বিমত থাকার কথা নয়। ১৬ বছর পর দলটির প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত নাটকীয় ও চমকপ্রদ, যা তাদের সাংগঠনিক শক্তির পরিচায়কও বটে।
এককভাবে দেশ চালানোর মতো শক্তিশালী নাহলেও জামায়াত এদেশের রাজনীতিতে বরাবরই বড় ফ্যাক্টর, সেটা ধর্মের জন্য কি না সে অন্য আলোচনা (যদিও সব ইসলামী দল জামায়াতকে সমর্থন করে এমনটা না, ইসলামপন্থী অনেক রাজনৈতিক দল জামায়াতের কড়া সমালোচক)।
জামায়াত সম্পর্কে মহিউদ্দিন আহমদের একটা টার্ম খুব প্রাসঙ্গিক, এদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী সবসময় একটা "ব্যালেন্সিং ফ্যাক্টর"।
মহিউদ্দিন আহমদের "জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস" এমন সময়ে প্রকাশিত হলো যখন বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী আবারো আলোচনার শীর্ষে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এক মাসের ও কম সময় পর। লেখার সময় বোধহয় উনি ভাবতেও পারেন নি এমন একটা সুযোগ এসে যাবে বইটা প্রকাশের জন্য। অবশ্য কাছাকাছি সময়ে উনার আরো কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে যেগুলোর বিষয়বস্তুর চাহিদাও এই সময়ে এসে অনেকটাই বেড়ে গেছে। সেই থেকে ধরে নিচ্ছি উনার একই সাথে কয়েকটি বইয়ের কাজ চলমান থাকে।
বাংলাদেশে ইতিহাস ভিত্তিক যত বই রচিত হয়েছে তার বেশির ভাগ ই নির্দিষ্ট কয়েকটি ধাঁচের অনুসরণ করে - কেউ ইতিহাসের ছোট একটি অংশের বর্ণণা করে যান প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে, কেউ বা বলে যান দিনলিপি আকারে। নির্দিষ্ট কোন ঘটনা কিংবা ধারাবাহিক ভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী বিভিন্ন আঙ্গিকে ঘুরে ফিরে দেখা বা নিরীক্ষণ করা, বিভিন্ন মতামত তুলে ধরা কিংবা যৌক্তিক বিশ্লেষণ, এ সমস্ত নজির খুব ই কম।
দুর্ভাগ্যজনক ভাবে মহিউদ্দিন আহমদ এর বইগুলোও শেষোক্ত ধাঁচের মাঝে পড়ে না।
উনার ইতিহাস লেখার ধরণ অনেকটা ফিচার লেখার মতন, সময়কাল ধরে ধারাবাহিকভাবে ঘটনার বর্ণনা করে যান, এবং প্রায় পুরোটা বর্ণনাই সাবজেক্ট কে ফোকাসে রেখে বা তাদের বয়ানে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নিরীক্ষণ কিংবা বিপরীতমুখী বয়ানে ঘটনা বা কার্যকলাপ বিশ্লেষণ প্রায়ই অনুপস্থিত। এমন না যে প্রতিটা পদে পদে এসবের প্রয়োজন আছে, তবে ইতিহাসের ক্রান্তিকাল বলে ধরা হয় যেসব মুহূর্ত সেসব ক্ষেত্রেই অনুপস্থিতিটা প্রকট হয়ে ধরা পড়ে। এবং এটা ইচ্ছাকৃত।
শুধু তাই না, যিনি ইতিহাস নিয়ে বই লিখছেন তার থেকে পাঠকরা আশা করেন যে বিভিন্ন পক্ষের বয়ানে যে অসংগতি গুলো আছে সেগুলো তুলে ধরবেন বা সেই বিষয়ে মতামত দিবেন কিংবা প্রশ্ন রাখবেন। উনি এই কাজটা করেন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, নিরাপদ দূরত্বে থেকে, সকল পক্ষকে সন্তুষ্ট করে।
এক কথায় যদি বলি, ইদানীং উনার ইতিহাস লেখার ধরণ হয়ে গিয়েছে সরলরৈখিক, কি তুলে ধরছেন সেই বিষয়ে অত্যন্ত সাবধানী, কোন কিছু ইচ্ছাকৃত ভাবে গোপন করেন না কিন্তু সব তুলেও ধরেন না, অর্থাৎ কোন প্রকার ঝুঁকি নেন না। অথচ এরকমটা কিন্তু ছিল না, জাসদের উত্থান পতন বইটা কিন্তু বেশ চমৎকার ছিল।
এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বলবো, মহিউদ্দিন আহমদের বইগুলো পড়া প্রয়োজন, সবগুলো না অবশ্য, কিন্তু অনেক গুলোই। যারা বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠ শুরু করছেন তারা উনার বই দিয়ে শুরু করতে পারেন, তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না। কৌতুহল মেটানোর জন্য, বিভিন্ন আঙ্গিকে নিরীক্ষণের মাধ্যমে নিজস্ব মতামত গঠনের জন্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বইয়ের আশ্রয় নিতেই হবে।
এবার প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আসি।
বইয়ের অর্ধেকই গোলাম আযমের জীবনী থেকে তুলে দেয়া। সাথে প্রাসঙ্গিক এবং সমসাময়িক বিভিন্ন দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক এর কলাম এবং খবর।
কারও জীবনী থেকে নেয়া তথ্য ইতিহাসের সূত্র হিসেবে নেয়ার একটা অসুবিধে আছে। সমসাময়িক ঘটনার ক্ষেত্রে যে মতামত বইয়ে লেখা উনি সত্যই সেটা ধারণ করতেন নাকি ভবিষ্যতের পাঠকের জন্য উনি ভিন্ন কিছু লিখে গেছেন যাতে বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হয় সেটা যাচাই করার উপায় নেই। মহিউদ্দিন আহমদ নিজেও ভূমিকায় সেই কথা প্রথমেই বলে নিয়েছেন। আর অতীত ইতিহাস বিকৃত করা এবং নিজের পুরানো মতামত চেপে নতুন বাণী হাজির করা এই বিষয়ে মওদূদী নিজেই পথ প্রদর্শক যা সব জায়গাতেই ওয়েল ডকুমেন্টেড, এই বইতেও তার কিছু প্রমাণ উল্লেখ আছে।
মওদূদী ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ইসলাম বিষয়ে তার চিন্তাভাবনা ছিল ভিন্ন। উনি ইসলামকে একটি আন্দোলন হিসেবে দেখতেন। তার চোখে সদ্যোজাত পাকিস্তান ছিল মুসলমানদের জন্য একটি রাষ্ট্র, কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র না। তিনি ইসলামী রাষ্ট্র চাইলেও মাঠে ময়দানে কাদিয়ানীদের অমুসলিম এবং সংখ্যালঘু ঘোষণার দাবিতে তুমুল আন্দোলন করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত দাঙ্গার দিকে গড়ায় এবং পাকিস্তানে মিলিটারি শাসন পোক্ত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। প্রশ্ন জাগে, ইসলামী রাষ্ট্র হওয়ার আগেই যদি এরুপ কার্যকলাপে নেমে পড়েন, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে কি করতেন?
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম পরিক্রমা নিয়ে গোলাম আযমের বেশ ইন্টারেস্টিং কিছু পর্যবেক্ষণ আছে যেগুলো আমার জানা ছিল না, আমার ধারণা অনেক পাঠকই জানেন না। সেগুলো সম্পর্কে পাঠকরা একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা পাবেন এখানে।
যদি সংক্ষেপে বলি তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এইরকম, উনারা পাকিস্তানকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ের পর নেতৃত্ব অবধারিত ভাবেই চলে যায় শেখ মুজিবের হাতে। উনি ক্ষমতায় আসলে সাংবিধানিকভাবেই পাকিস্তান দুভাগ হয়ে যেত ছয় দফার ভিত্তিতে। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকদের হঠকারীতায় তা যুদ্ধে গড়ায় এবং ভারত হস্তক্ষেপের সুযোগ নেয়। জামায়াত আশংকা করে এর ফলে বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব বলয়ে চলে যাবে, এবং আর কখনো ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। তাই তারা রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষে সমর্থন দেন এবং কোন যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন না।
জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কেন ছিল সেটার আসল কারণ তুলে ধরাবকিংবা এর প্রমাণ দেয়া খুব ই সহজ কিন্তু লেখক ওদিকের ছায়াও মাড়ান নি। তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেই তৎকালীন সময়ে জামায়াতের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে তারা যা বলেছেন তখন তা ই ধারণ করতেন, তা সত্ত্বেও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে তাদের যে দ্বিচারিতা সেটাই আসলে গড়ে দেয় জামায়াতের ব্যাপারে সাধ���রণ মানুষের মনোভাব। এছাড়াও ইসলামকে জামায়াত যেভাবে আন্দোলন হিসেবে প্রচার করতে চায় তাও ঠিক জনগণের পছন্দ না। লেখক নিজেই বলেছেন, জামায়াত এর রাজনীতি গণমানুষের রাজনীতি না, এটি একটি রেজিমেন্টেড দল এবং বামপন্থীদের সাথে মিল আছে।আফসোস, লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এগুলোর কোনকিছুই ঠিকঠাক তুলে ধরতে পারেন নি।
জামায়াতের নেতারা মুখে যাই বলুক না কেন মুক্তিযুদ্ধে তাদের নির্লজ্জ প্রোপাগান্ডা কত নিকৃষ্ট ছিল তা খুঁজতে বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই, জামায়াতের মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামের ভূমিকা তুলে ধরাই যথেষ্ট। কিন্তু লেখক দৈনিক সংগ্রামের রেফারেন্সে শুধু একাত্তরে তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কতিপয় খবর তুলে ধরলেন, তাদের ঘৃণ্য প্রোপাগান্ডার নমুনা আড়ালেই রয়ে গেল। অথচ এই বিষয়ে তথ্য আজকাল খুবই সহজলভ্য।
যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্রেও একই কথা, উনি জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক একটা সরাসরি প্রমাণও তার বইয়ে তুলে ধরলেন না, স্রেফ দৈনিক ইত্তেফাকের রেফারেন্সে যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক কয়েকটি খবর তুলে ধরলেন। পাঠক বইটি পড়ার সময় জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে কোন নিশ্চয়তা নিয়ে যেতে পারলেন না। এত সাবধানতা কিসের জন্য মহিউদ্দিন আহমদের?
ইসলামী ছাত্র সংঘ এবং ইসলামী ছাত্র শিবির, এই দুয়ের ভূমিকা সম্পর্কেও তেমন কিছু বলা নেই। একেবারে অনুচ্চারিত না, তবে যা আছে তা অপর্যাপ্ত। এই নিয়ে নতুন কোন বই বের করবেন সেই পরিকল্পনা থেকেই কমিয়ে লিখেছেন কিনা কে জানে!
ইতিহাসে প্রথমবারের মত সরকার গঠনে অংশ নেয় জামায়াতে ইসলামী ২০০১ সালে। আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম, এই আমল সম্পর্কে একটি শব্দও ব্যয় করেন নি লেখক, একটিও না। অথচ এই সময়ে ঘটে যাওয়া ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শক্তিশালী করতে অস্ত্র পাচার এর উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়া, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম একটা টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়, সেই সম্পর্কে একটি অক্ষরও তিনি উচ্চারণ করলেন না। কার প্রশ্রয়ে এগুলো ঘটলো তার অনুসন্ধান তো আরো অনেক পরের কথা। কিসের এত ভয় লেখকের?
এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মহিউদ্দিন আহমদের বইয়ের মোটামুটি নিয়মিত পাঠক ছিলাম। ইতিহাসের ঘটনাবলীর গভীরে যাওয়া না হোক, অন্তত গুছিয়ে বুঝতে সাহায্য করে উনার বইগুলো। তাছাড়া আমার ধারণা ছিল ইতিহাস নিয়ে উনি অসততার আশ্রয় নেন না, যেটা উনার বইয়ের পাঠক হওয়ার আরো একটা বড় কারণ। কিন্তু ২০২৪ এর আগস্টের পটপরিবর্তনের পর যেন ভিন্ন এক মহিউদ্দিন আহমদকে আবিষ্কার করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম প্রথম আলোয় প্রচ্ছন্ন সুরে বিরাজনীতিকরণ এর পক্ষে ফরমাইশি কলাম প্রসব করতে শুরু করেছেন নিয়মিত। করবেন ই বা না কেন? উনার মোটা মোটা বইগুলোর বেশিরভাগ ই প্রথমা থেকে প্রকাশিত। যেটা বাদ গিয়েছে সেটা ৭২-৭৫ সাল নিয়ে লেখা, সেই বই ও অবশ্য মতিউর রহমানকে উৎসর্গ করতে ভোলেন নি আবার!
পুনশ্চঃ এই বইয়ের পাঠকদের জন্য ছোট্ট একটা প্রমাণ রেখে যেতে চাই চিন্তার খোরাক হিসেবে, যারা আমার মতই হতাশ হয়েছেন মহিউদ্দিন আহমেদের ইতিহাস লেখার নামে শঠতা দেখে, যারা নিশ্চিত কিছু জেনে যেতে পারলেন না জামায়াতে ইসলামীর আসল চেহারা সম্পর্কে। তাদের জন্য দৈনিক সংগ্রামে ১৯৭১ সালে ১৩ এবং ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার থেকে কিছু কথা তুলে ধরছিঃ
'আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থেই আবশ্যক' শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার এ তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল "পাকিস্তানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করণের জন্য আপনার মতে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত?"
জবাবে গোলাম আযম বলেন,
"পূর্ব পাকিস্তান সোসালিস্ট ও কম্যুনিস্টদের সমস্ত উপদল বাংগালী জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সেজে তাদের চিন্তা নায়কদের গেরিলা পদ্ধতি অনুসরণ করে চলেছে। তার মোকাবেলা করতে হলে সরকারী ও বেসরকারী সকল মহল থেকে এসব মহলের পরিচালকদের তালাশ করে বের করতে হবে। কারণ যারা হাতবোমা ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে তারাই দুষ্কৃতিকারী নয়। তাদেরকে যারা ব্যবহার করছে তারা বড় দুষ্কৃতিকারী। তাদের হাতে হাতবোমা অস্ত্রশস্ত্র নেই বলে তারা দুষ্কৃতিকারী নয় বলে মনে করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ময়দানে কর্মরত দুষ্কৃতিকারী দমন করলেও এদের দমন ব্যতীত দুষ্কৃতিকারী সাপ্লাই হওয়া বন্ধ হবে না।"
লেখক ভূমিকায় বলেছেন জামায়াতে ইসলামী কে নিয়ে লেখা কঠিন কাজ, কেননা নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে লেখা একরকম হবে, জামায়াতের দৃষ্টিতে দেখলে আরেকরকম হবে। নিরপেক্ষ হিসেবেও লেখা কঠিন দলটির বিতর্কিত ইতিহাসের কারণে। এই কথাটি আসলে পাঠকের ক্ষেত্রেও সত্য। নিজের মনে গাঁথা কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে সেটার মুক্ত হয়ে একটি বই পড়া কঠিনই। কেননা বইয়ের লেখা যদি নিজস্ব চিন্তাধারা সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, মনে হয় যেনো লেখকই বায়াসড। আবার উল্টোভাবে চিন্তা করলে বইয়ে অপতথ্য থাকলেও সেটা যদি নিজের মতধারার সাথে মিলে যায় তাহলে সেই লেখাকেই বেদবাক্য মনে হয়। জামায়াতকে নিয়ে লেখা একটি বইয়ের ক্ষেত্রে একজন পাঠক হিসেবে আমারও অবস্থা এরকমই। মূলত শুধু তথ্য আহরণের উদ্দ্যেশ্যেই বইটা ধরা। যারা মহিউদ্দিন আহমদ এর লেখার সাথে পরিচিত, তারাও জানবেন লেখকের লেখার স্টাইলও আমার পাঠের উদ্দেশ্যের সাথে মিলে যায়। তিনি বিভিন্ন উৎস ঘেটেঘুটে তথ্য উপস্থাপন করেন এবং বাম ডান না ঘেঁষে মধ্যবর্তী একটা অবস্থা থেকে তথ্যের সামান্য বিশ্লেষণ করেন।
এই বইয়ের বড় সোর্স জামায়াতের নেতাদের লেখা বই পত্র। অবিভক্ত ভারতে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদূদী লেখা, গোলাম আযমের ৯ খণ্ডে লেখা আত্মজীবনী 'জীবনে যা দেখলাম' - এগুলোই মূল উৎস। তাই বইয়ের ন্যারেটিভ যে কিছু ক্ষেত্রে একমুখী তা অস্বীকার করার জো নেই। কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে গোলাম আযমের আত্মজীবনীর সার সংক্ষেপ পড়ছি। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদূদী দেশভাগের আগে ছিলেন পাকিস্তান বিরোধী। পাকিস্তান ছিলো তাঁর মতে 'আহম্মকের বেহেশত', 'কাফেরানা রাষ্ট্র'। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাত পরই আবার তাঁর কাছে পাকিস্তান হয়ে যায় 'খোদাদাদ' - আল্লাহর দান।
১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যে জামায়াতে ইসলামী অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষাতেই ব্রত ছিলো এটা ওপেন সিক্রেট। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াতের আমির গোলাম আযমের যুক্তি ছিলো, আওয়ামী লীগ যদি ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরিহার করে স্বাধীনতার ডাক দিত, তবে ইসলামপন্থীরাও হয়তো মুক্তিযুদ্ধে শামিল হত!
গোলাম আযমের ভাষ্যে জামায়াতের রাজনীতিতে ইসলামী ছাত্র শিবিরের ভূমিকে উঠে এসেছে। গোলাম আযম যখন দেশ থেকে নির্বাসিত ছিলেন (৭১ পরবর্তী সময়ে), তখন তার সাথে বাংলাদেশের জামায়াতের নেতাদের দেখা সাক্ষাৎ হতো মক্কায়। ১৯৭৭ সালে মক্কায় তিনি ছাত্র সংগঠনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে পরামর্শ দেন 'হাইস্কুলের ছাত্রদের মধ্যে ক্লাস সিক্স থেকেই মেধাবী ছাত্রদের টার্গেট করে সংগঠনভুক্ত করা প্রয়োজন। কলেজ ও ইউনিভার্সিটি পর্যায়ে পৌঁছে গেলে এ জাতীয় ছেলেদের মধ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। তাই স্কুল জীবনেই মেধাবী ছেলেদেরকে ইসলামী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। ' জামায়াতের উচ্চ পর্যায়ে ইসলামী ছাত্র সংঘ/ শিবিরের কর্মীদের নেতৃত্বের পর্যায়ে আসীন হওয���া জামায়াতের রাজনীতিতে শিবিরের ভূমিকাকেই প্রতিফলিত করে। ১৯৭১ সালে নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদ। ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্র সংঘের নাম পালটে রাখা হয় ইসলামী ছাত্রশিবির। সভাপতি হন মীর কাসেম আলী।
১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ এর তিনটি সংসদ নির্বাচনেই জামায়াত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকে রেখেছে। ৯১ এ বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয় জামায়াতের সহায়তাতেই। আবার ৯৬ এর ২য় নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামীলীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলনেও শরিক হয়েছিলো জামায়াত। ২০০১ এর নির্বাচনের পর তো বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারে মন্ত্রিত্বও পেয়েছিলো।
বইতে পরিবেশিত তথ্য ও উপস্থাপনার জন্য ৪ তারা দিলাম। বইয়ের কন্টেন্ট এর সত্যতা ও নির্ভুলতা যাচাই করার মতো জামায়াতে ইসলামী বিষয়ক জ্ঞান আমার নেই। সত্য বলতে জামায়াত সম্পর্কে এতটা বিস্তারে জানলাম এই প্রথম। তাই সত্য মিথ্যা যাচাই ও বাছাই এর জন্য আরও সময়ের প্রয়োজন। ততদিন পর্যন্ত ৪ তারাই থাক।
[Not a review. Just personal notes. A little unorganized]
জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদূদী মনে করতেন মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিল জাতীয়তার দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়।
ভারতে যখন পাকিস্তান আন্দোলনে এগিয়ে যায় জামায়াত তখন এই আন্দোলনের বাইরে থাকে, এমন কি বিরোধিতাও করে। মওদূদীর ব্যাখ্যা ছিল পরিষ্কার; তিনি বলেন হয় পাকিস্তান হবে অথবা হবে না। যদি না হয় তাহলে ভারতের ১০ কোটি মুসলমান হতাশ হবে, তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। আর যদি পাকিস্তান হয়, তাহলে তা ইসলামী রাষ্ট্র না হয়ে তুরস্কের মত একটি ধর্মহীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে বিচক্ষণ মওদূদী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে আবার যদি বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় তবে তা শুরু হবে পোল্যান্ড থেকেই।
১৯৪৮
মওদুদী করাচিতে এক জনসভায় বলেন যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর, সব ইসলামবিরোধী আইন বাতিল করতে হবে। মওদূদীর এসব কথাবার্তায় সরকার অস্বস্তি বোধ করতে থাকে, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, ১৯৫০ সালে তিনি ছাড়া পান।
মওদুদী পাকিস্তানকে আহাম্মকের বেহেস্ত এবং মুসলমানদের কাফিরানা রাষ্ট্র বলে আখ্যা দেন। মুসলিম লীগ সম্বন্ধে বলতেন ওরা খোদা সম্বন্ধে অজ্ঞ, ওরা পরিবেশকে শৌচাগারের চাইতেও নোংরা করে ফেলেছে। জিন্নাহ সম্পর্কে তার বক্তব্য ছিল এই ব্যক্তিটির ত্রুটি বর্ণনা করে শেষ করা যায় না, ইসলামের মুসলিমের নেতৃত্ব দিবে কোট-টাই পরা এক ব্যক্তি তা হতে পারে না। তিনি নিজেকে ইমাম মাহদী রূপে আকারে ইঙ্গিতে প্রকাশ করতে থাকেন। তিনি বলেন লীগের কায়েদে আজম থেকে শুরু করে কেউই মুসলমানের অর্থ পর্যন্ত জানে না। গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে তিনি কুকুরের দৌড় বলেছেন। আরো বলেছেন কোন মানুষ ইসলাম বহির্ভূত হয়ে গেল কিনা এটা শুধু কোরআন দ্বারাই প্রমাণিত হতে পারে, হাদিস দ্বারা নয়। বলেন যদি কেউ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত কোন কিছুকে অস্বীকার করে তবে সে ইসলাম বহির্ভূত হবে না। বলেছেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দু বছরের কম সময় সাহচর্য লাভ করেছেন এমন কাউকে সাহাবী বলা যাবে না এবং মুসলমানদের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা সে পেতে পারে না। তিনি আরো বলেন সুবাহ সাদেক এর পর খাদ্য গ্রহণ করলেও রোজা হবে।
জামায়াতের কমিউনিস্ট বিরোধিতার কথা সবারই জানা। সমাজতন্ত্রের একটি প্রচলিত সংজ্ঞা হল সম্পদের উপর সামাজিক মালিকানা। ব্যক্তি মালিকানার স্থান নেই এখানে। এর সমালোচনা করতে গিয়ে জামায়াতের লোকেরা এটা বলে থাকেন হাতের পাঁচ আঙ্গুল সমান হয় না। এর অর্থ হলো মানুষের মানুষের যে পার্থক্য তা আল্লাহর বিধান।
তাবলীগ জামাত ও তমুদ্দিন মজলিসের ইসলামী অর্থনীতি সম্বন্ধে ধারণা ছিল ব্যক্তি মালিকানাই পুঁজিবাদী শোষণের মূল, তাই ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা থাকা স্বাভাবিক নয়। তারা আরো মনে করতেন যে শ্রমই উৎপাদনের উপাদান এবং যে শ্রম দেবে না সম্পদে তার কোন অধিকার নেই। তবে মওদূদী এ প্রসঙ্গে বলেন কুরআনে যত জায়গায় নিজের কর্মের জন্য নিজের ফল উল্লেখ করা হয়েছে সর্বত্রই আখিরাতে প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে। আখিরাতে প্রত্যেকেই একমাত্র তাই পাবে যা সে নিজে অর্জন করেছে। এ কনসেপ্ট দুনিয়ায় প্রয়োগ করলে শিশু, বৃদ্ধ ও কর্মে অক্ষম কোন মানুষই সামান্য সম্পত্তি পেতে পারে না। শ্রম সম্পর্কে মাওলানা বলেন কুরআনে তো স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ইসলামে সম্পদের ব্যক্তি মালিকানা আল্লারই সিদ্ধান্ত।
১৯৫৩
লাহোরে কাদিয়ানী দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে মওদূদীকে আটক করা হয়।
১৯৬২
সামরিক শাসন উঠে যাওয়ার পরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার শুরু হয়।
১৯৬৪
জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। মওদূদী সহ ৫০ জন জামাত নেতাকে জেলে পাঠানো হয়। যখন ফাতিমা জিন্নাহকে কপ (কম্বাইন্ড অপোজিশন পার্টি) থেকে মনোনীত করা হয় তখন মওদূদী অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ নেতৃত্ব মেনে নেন এই বলে যে স্বৈরাচার মেনে নেওয়া থেকে নারী নেতৃত্ব মেনে নেওয়া ভাল।
১৯৭০
সত্তরের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের পরে দ্বিতীয় স্থানে ছিল জামাত।
১৯৭১
ইন্দিরা গান্ধী ১৬ই ডিসেম্বরে যে ভাষণ দেন তিনি সেখানে বলেন যে টু নেশন থিওরির ভিত্তিতে তাদের ভারত মাতা কে ১৯৪৭ সালে বিভক্ত করা হয়েছিল ওই থিওরি বাংলাদেশের জনগণই পরিত্যাগ করেছে, মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে কোন রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না।
মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের কথা শুনে মনে হতে পারে তারাও স্বাধীন বাংলাদেশ চাইতো যদি স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতারা ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্লোগান না দিতেন।
গোলাম আযম বলেন ইতিহাস তো একথা বলবে না যে পাঞ্জাবি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। ইতিহাস জোর গলায় বলবে যে ১ লাখ মুসলিম সশস্ত্র বাহিনী হিন্দুদের সেনাপতির নিকট আত্মসমপর্ণ করেছেন।
গোলাম আযম বলেছিলেন কোন ভাল মুসলমান তথাকথিত বাংলাদেশ আন্দোলনের সমর্থক হতে পারে না। বিরোধী শক্তি ইসলামী ও অ-ইসলামী যাই হোক তারা জামায়াতের ভাষায় কাফের।
পাকিস্তানি শাসকদের হাতে জামায়াত যথেষ্ট নিগৃহীত হলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের পেছনে যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বোধ কাজ করত জামাত সেটি সর্বান্তকরণে লালন করত।
১৯৭৩
শেখ মুজিব যুদ্ধাপরাধীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল হয়। আওয়ামী লীগ দাবি করে জাতীয় রাজনীতিতে একজন বিদেশির নাক গলানো দেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত।
১৯৭৪
শেখ মুজিব পাকিস্তান সফর করে তাদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন। গণহত্যার জন্য পাকিস্তান অনুতাপ প্রকাশ করেনি। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পূর্ব শর্ত হিসেবে বাংলাদেশ দাবি করতে পারতো পাকিস্তান তার অপরাধের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাইলে ও ক্ষতিপূর��� না দিলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানে যাবেন না। পাকিস্তান সফর ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিজয়।
১৯৭৫
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল কোন ব্যক্তি সংসদে নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হবেন যদি তিনি বাংলাদেশ যোগসাজসকারী আদেশের অধীনে যে কোন অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইয়া থাকেন। বিচারপতি এ এস সায়েম এই উপধারাটি বাতিল করলে জামায়াতের জন্য রাজনীতির মঞ্চে ফিরে আসা সম্ভব হয়।
সাতটি দল মিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামে নতুন একটি দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই কমিটিতে জামায়াত একটু কোণঠাসা ছিল, সাত দলের মধ্যে সবথেকে বড় হওয়া সত্ত্বেও তারা সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য বিবেচিত হয়নি।
শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর সৌদি আরব বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া সত্ত্বেও ঢাকায় তারা রাষ্ট্রদূত পাঠায়নি।
বিপ্লবের পর নতুন সরকারকে যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বিপ্লবের পূর্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি, সেই চীন এবং সৌদি আরবও বিপ্লবী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।
৫ ই নভেম্বর সকালে ঢাকায় একটি প্রচার পত্র বিলি করা হয়। এর শিরোনাম ছিল ‘ভারতের পা চাটা কুকুর খালেদ মোশাররফ’। এই লিফলেটটি প্রচার করেছিল ইসলামী ছাত্র সংঘ।
৭ নভেম্বর আরেকটি স্লোগানের কথা শোনা যায় ‘রুশ-ভারত সাবধান, আমরা সব মুসলমান’।
১৯৭৭
জিয়াউর রহমান এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি বাদ দেন এবং সমাজতন্ত্রের নতুন এক ব্যাখ্যা দেন। সৌদি আরবকে খুশি করার জন্য এটা যথেষ্ট ছিল। ওই বছরই সৌদি আরব ঢাকায় রাষ্ট্রদূত পাঠায়।
আইডিএল জামায়াতের দখলে চলে আসে।
ইসলামী ছাত্রসংঘ নাম পাল্টে ইসলামী ছাত্রশিবির রাখা হয়।
১৯৭৮
গোলাম আযম লন্ডন থেকে তিন মাসের ভিসা নিয়ে জুলাই মাসে ঢাকা আসেন।
১৯৭৯ জামায়াতের সদস্যরা আইডিএল এর প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। তবে এরপর থেকে জামাতে ইসলামী বাংলাদেশে প্রকাশ্যে কাজ করবে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংসদ নির্বাচনের পর সামরিক শাসন উঠে যায়। গোলাম আযম জনসম্মুখে আসলে বাংলাদেশের নাগরিক নন এমন ব্যক্তি প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছেন এ নিয়ে গণমাধ্যমে বিতর্ক ও হইচই হয়।
১৯৮১
গোলাম আযম বলেন ৭১ এ আমরা ভুল করিনি। একাত্তরে যা ঠিক মনে করেছি তাই করেছি, এখনো তাই করবো।
জামায়াত কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তাব দেয় বাকি দলগুলোকে।
১৯৮৪
এরশাদ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কাজে হাত দিয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় থানাগুলো উপজেলায় উন্নীত হয়। তিনি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন দেন। এটি ছিল তৃণমূলে এরশাদের ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করার একটি কৌশল।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সমমনাদের নিয়ে গঠন করেছিল ১৫ দলীয় জোট, বিএনপি নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল ৭ দলীয় জোট। জামাত ছিল একা।
১৯৮৬
স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম স্বনামে নির্বাচন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমঝোতা হয়, বিএনপি-জামাতকে ২০টি আসন ছেড়ে দিতে চেয়েছিল, জামায়াতের দাবি ছিল ন্যূনতম ৮০ আসন। দর কষাকষির পর পঞ্চাশ টি আসন নিয়ে রফা হয়।
শেখ হাসিনা এক জনসভায় বলেন এরশাদের অধীনে নির্বাচন করার কোন মানে হয় না এবং কেউ যদি নির্বাচনে যায় তাহলে তাকে ‘জাতীয় বেইমান’ হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে আওয়ামী লীগ নিজেই নির্বাচনে অংশ নেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোটের শরিক পাঁচটি বামপন্থী দল ১৫ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি করে পাঁচ দলীয় জোট।
এই নির্বাচনে সংখ্যায় জামায়াতে ইসলামি হয় তৃতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী হিসেবে জনমনে জায়গা করে নেন।
সংসদ নির্বাচন হওয়ার পর সামরিক শাসন উঠে যায়। ৩১ আগস্ট এরশাদ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান। ১৫ই অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। এই নির্বাচন নিয়ে কারো উৎসাহ ছিল না।
আওয়ামী লীগ এরশাদ সরকারের অধীনে সংসদে যোগ দেওয়ায় এরশাদ বিরোধী আন্দোলন স্থিমিত হয়ে পড়ে। এরশাদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদ চালাবে এমন একটা সম্ভাবনা ছিল। জবরদস্তি করে জাতীয় পার্টি কে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাইয়ে দেওয়ায় আওয়ামী লীগ হতাশ হয়। সংসদ থেকে এক যোগে সবার পদত্যাগের দাবি উঠলেও আওয়ামী লীগ শুরুতে সাড়া দেয়নি। তাদের যুক্তি ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় সংসদ ভেঙ্গে গেলে সরকারের পতন হবে না।
১৯৮৮
জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের ১০ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে, কিন্তু আওয়ামী লীগ পদত্যাগ করে না। এরশাদ সংসদ ভেঙ্গে দেন। এ সংসদের আয়ু ছিল মাত্র দুই বছর।
তবে এর আগে ১১ই মে সংসদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে একটি বিল পাস হয়। এ ধরনের বিলের জন্য মাঠে কোন দাবি আন্দোলন ছিল না। এরশাদ এটা করলেন একটা ধারণা দিতে যে তিনি ইসলামের খাঁটি সেবক। জামায়াত এই বিলের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়। তাদের কথা ছিল ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম না করে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করলেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে না। ২৮ বছর পর ২০১৬ সালে এ নিয়ে আদালতে শুনানির দিন ঠিক হলে জামায়াত এর প্রতিবাদে ও রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখার দাবিতে ঐদিন সকাল সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল। এমন ১৮০° খুলে যাওয়ার পেছনেও রাজনীতি আছে। ১৯৮৮ সালে এই আইন করেছিল এরশাদ প্রশাসন এবং জামায়াত তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ছিল। ২০১৬ সালের প্রেক্ষাপট আলাদা। ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার তখন জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করছে। জামায়াত রাষ্ট্রধর্মকে তখন নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
১৯৯১
৯১ এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি ইসলামী দল একটি জোট গঠন করেছিল। জামাতে ইসলামী এই জোটে ছিল না। প্রকাশ্যে সমঝোতা করে বিএনপি জামাতকে নির্বাচনী সঙ্গী হিসেবে দেখাতে চায়নি, সমঝোতা হয়েছে গোপনে। এরশাদ কারাগারে থেকে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করেন এবং সবগুলোতে জয়ী হন। শেখ হাসিনা তিন আসনে প্রার্থী ছিলেন এবং কেবল গোপালগঞ্জের একটি আসনে তিনি জয় পান। ঢাকার দুটি আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপির অপেক্ষাকৃত ও অখ্যাত প্রার্থীর কাছে হেরে যান। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করবে বলে আশা করেছিল। এই নির্বাচন তাদের জন্য হয়ে যায় এন্টি ক্লাইম্যাক্স। বিএনপি ১৪০ টি আসনে জয়ী হয় কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
এ সুযোগে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে আগ্রহী হয়ে গেল। তারা পেয়েছিল ৮৮ টি আসন।
জামায়াত সরকার বিএনপিকে সমর্থন দেয় কিন্তু তাদের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেনি। গোলাম আযম খালেদা জিয়াকে বলেন যে আপনারাই সরকার গঠন করুন, মন্ত্রীত্বের প্রতি আমাদের লোভ নেই। বিএনপি'র সঙ্গে কোয়ালিশন সরকারে না যাওয়া ছিল জামাতের একটি রণকৌশল। জামাত এ ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি বজায় রাখছিল। তারা ইতিমধ্যে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বৈধতা পেয়েছে এখন তাদের দরকার দলের শক্তি বাড়ানো। বিএনপি চেয়েছিল ক্ষমতা আর জামাত চেয়েছিল পুনর্জীবন এবং গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া।
১২ই মার্চ সন্ধ্যায় গুলশানে একটি গেস্ট হাউসে বিদেশি কূটনীতিকদের সম্মানে একটি নৈশভোজের আহ্বান করা হয়, দুইজন বাংলাদেশীকে আমন্ত্রণ জানানো হয় খালেদা জিয়া এবং গোলাম আযম। খালেদা জিয়া শেষ মুহূর্তে যোগ দেন না। ওই সন্ধ্যায় গোলাম আযমের উপস্থিতিতে কূটনীতিকদের মুখোমুখি হতে তিনি চ���ননি।
এ বছর যে উপনির্বাচন হয় সেখানে দুটি আসনে বিএনপি জামাতের সাথে প্রার্থী দেবে না এমন অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বিএনপি কথা রাখেনি। ওই দুটি আসনে তারা প্রার্থী দেয়, জামাতের প্রার্থীরা হেরে যান।
বিএনপি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা রেখে দিতে চায়, খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি হতে আগ্রহী ছিলেন। বিএনপিকে সম্মত করতে জামায়াত উদ্যোগ নেয়।
জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত সবাই একসঙ্গে বসলেও ইউনিভার্সিটি আবহাওয়া ছিল ভিন্ন। ছাত্রলীগের একটি মিছিল নিজামীর উপর হামলা চালিয়ে তাকে গুরুতর ভাবে আহত করে।
১৯৯২
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন গোলাম আযম দেশের নাগরিক নন এবং জামাত ইসলামী কেমন করে তাকে দলের আমির নির্বাচন করল সরকার তা খতিয়ে দেখবে।
ভোটের আগে বিএনপি'র প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাস গোলাম আযমের সাথে দেখা করেছিলেন। তবে সরকার গঠন করে বিএনপি উলটো পথে হাটে। রাত দুইটার সময় গোলাম আযমের বাসায় পুলিশ পাঠিয়ে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেখানো হয়।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে গণ আদালত গঠিত হয়। গোলাম আযমের অনুপস্থিতিতে তার পক্ষ সমর্থন করতে গণআদালত আসিফ নজরুলকে নিযুক্ত করেন।
১৯৯৩
বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের যে মধুচন্দ্রিমা পর্ব চলছিল তাতে ছেদ পড়ে। তারা এমন স্লোগান দেয় ‘খালেদা জিয়া স্বৈরাচার, হুশিয়ার হুশিয়ার’ ।
আওয়ামী লীগ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন দাবি করে। এই আন্দোলন আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। আওয়ামী লীগ আদর্শিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে জামাতের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, তাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জামায়াতের পক্ষে আন্দোলনে শরিক হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ ব্যাপার ছিল না।
১৯৯৪
হাইকোর্ট গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বহাল রাখে। বিএনপি সরকারের বাধা সত্বেও আদালতের নির্দেশে গোলাম আযম নাগরিকত্ব ফিরে পান।
আমেরিকায় জাহানারা ইমামের মৃত্যু হয় এরপর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে এবং আওয়ামী লীগের একটি অঘোষিত লেজড় সংগঠনে পরিণত হয়।
২৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির ১৪৭ জন সংসদ সদস্য সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে যান। কমনওয়েলথ মহাসচিব, আমেরিকান সরকারি পররাষ্ট্র সচিব ও অস্ট্রিয়ার সাবেক গভর্নর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দুতিয়ালী করার চেষ্টা করেন, তবে তা ব্যর্থ হয়। সরকারের আমলাতন্ত্র ভেঙ্গে পড়েছিল। বিএনপি জামাতকে পাশে রাখতে চেয়েছিল তবে জামায়াত রাজি হয়নি।
১৯৯৬
জামাতে ভোটের স্লোগান হাজির করে ‘ভোট দিলে পাল্লায়, খুশি হবে আল্লায়’। এটি সমালোচনার মুখে পড়ে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সেবার সবথেকে বেশি সংখ্যায় বিরোধী দলের প্রার্থীরা জয় পায়।
আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত দিবস উপলক্ষে ১৫ ই আগস্ট সরকারি ছুটি থাকবে।
১৯৯৭
লীগ সরকার পুরনো একটি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে সেটি হল পাহাড়ি বাঙালি সম্পর্ক। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এই চুক্তির বিরোধিতা করে।
নতুন করে শুরু হয় বিএনপি জামাত যোগাযোগ।
১৯৯৯
বিএনপি, ইসলামী ঐক্য জোট, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের চার দলীয় জোট গঠিত হয়।
২০০০
গোলাম আযম স্বেচ্ছায় জামাত ইসলামীর আমির এর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
২০০১
আওয়ামী লীগ চার দলীয় জোট ভাঙ্গনের চেষ্টা চালায়। শেখ হাসিনা বলেন ‘এরশাদ রাজপথে থাকবেন নাকি রাজঘরে তা নির্ভর করবে এরশাদের উপর নয়, হাসিনার উপর'। এই কথাতেই কাজ হল। এরশাদ জোট থেকে বেরিয়ে যান। তবে দলের একটি ভগ্নাংশ থেকে যায় চারদলীয় জোটে।
বিএনপি নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ২০০১ সালে নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়ী হয়। বাইরে থেকে নয়, সরকারের অংশ হিসেবে এবার জামায়াত বিএনপির সহযাত্রী হয়। নিজামী হন কৃষিমন্ত্রী। ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নিয়ে দলটি প্রথমবারের মতো একটি দেশে সরকার পরিচালনার অংশ হয়। পাকিস্থানে যেটি হয়নি বাংলাদেশ এটি কি করে সম্ভব হল তা গবেষণার বিষয়।
২০০৬
সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিতে না পারেন সেজন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট তখন তুমুল আন্দোলন করে।
২৭ অক্টোবর থেকে তিন দিনের তুমুল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আওয়ামী লীগ কার্যত রাজপথ দখলে নেয়। বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানান। খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সাথে দেখা করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
২০০৭
ওয়ান ইলেভেন।
এক এগারো সরকারের পুরো সময়টি জুড়ে চলছিল বিএনপির দুঃসময়। এই পুরোটা সময় জামাতে ইসলামী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য বজায় রেখেছিল। নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসলে জামায়াত খালেদা জিয়ার কাছে সেই আনুগত্যের পুরস্কার চায়। ২০০১ সালে বিএনপি জামাতকে ৩০ টি সংসদীয় আসন ছেড়ে দিয়েছিল। দলটি এখন ৮০টি আসন চায়। তবে এ নিয়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস বেশ চিন্তিত। রাষ্ট্রদূত এর মন্তব্যে এটা পরিষ্কার যে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেখছে না। নাইন ইলেভেনের পরবর্তী বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ এবং তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ইসলামীকরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অস্বস্তিতে আছে।
২০০৮ নির্বাচন কমিশনের বাধ্যগতকতা থাকায় জামায়াতে ইসলামী কিছু মৌলিক পরিবর্তন করে তাদের গঠনতন্ত্র জমা দেয়।
এ নির্বাচনে জামায়াত ২০০১ সালের থেকে বেশি ভোট পায়। তবে চার দলীয় জোটের পরাজয় ঘটে।
২০১০
জামায়াত এমন প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে যায় যা এর আগে দেখা যায়নি। শীর্ষ নেতারা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কারাগারে আটক। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ অ্যাক্টের অধীনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মোঃ কামরুজ্জামান ও কাদের মোল্লাকে আটক করা হয়।
জামায়াতের ভেতর থেকে সংস্কার প্রচেষ্টা তৈরি হয়, তবে এটি পরে ব্যর্থ হয়। জামায়াত নেতারা একে সংগঠনকে দুর্বল করার একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেন যার পেছনে সরকারের উস্কানি থাকতে পারে।
২০১১
জামাতে ইসলামীর অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়।
২০১৩ জামায়েত নেতা আবুল কালাম আজাদকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। তিনি গোপনে দেশ ত্যাগ করেন।
ফেব্রুয়ারিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় কাদের মোল্লাকে। তাকে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট বিস্মিত হয়। ফাঁসির দাবিতে শাহবাগ মোড়ে বিক্ষোভ সমাবেশ হয় যাকে গণজাগরণ মঞ্চ বলা হয়। শাহবাগ আন্দোলনের প্রতি সরকারের আচরণ ছিল খুবই অনুকূল, যা ছিল দৃষ্টিকটু।
অবশেষে ফাঁসি দেওয়া হয় কাদের মোল্লার। ফাঁসি হয় নিজামীর, বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।
২০১৪
প্রিজন সেলে গোলাম আযমের মৃত্যু হয়।
২০১৭
সুপ্রিম কোর্ট জামায়াত এর জন্য বরাদ্দ দাঁড়িপাল্লা নির্বাচনী প্রতীকের তালিকা থেকে বাদ দেয়।
২০১৮
নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করেন।
২০১৯
জামায়াতের আমির নির্বাচিত হন ডাক্তার শফিকুর রহমান।
২০২০
জামাতের কয়েকজন নেতাকর্মী, সমর্থক নতুন করে সংস্কারের উদ্যোগ নেন । আমার বাংলাদেশ (এ বি) পার্টি গঠিত হয়।
���০২৩
প্রিজন সেলে মারা যান দেলোয়ার হোসেন সাঈদী
২০২৪
গণ অভ্যুত্থানের পরে দীর্ঘ ১৩ বছর পর দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর অফিস খোলা হয়। তারা আযান দিয়ে তাদের অফিসে ঢোকেন ।
জামায়াতে ইসলামী – উত্থান বিপর্যয় পুনরুত্থান লেখক: মহিউদ্দিন আহমদ প্রকাশনী: অনন্যা বিষয়: রাজনৈতিক গবেষণা ও প্রবন্ধ
মহিউদ্দিন আহমদের "জামায়াতে ইসলামী – উত্থান বিপর্যয় পুনরুত্থান" বইটি বাংলাদেশের অন্যতম বিতর্কিত,প্রাচীন রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস,রাজনৈতিক ইতিহাস এবং তাদের রাজনীতিতে টিকে থাকার সংগ্রাম নিয়ে একটি বিশদ গবেষণাধর্মী কাজ।
বইয়ের আলোচ্য বিষয়: বইটিতে জামায়াতে ইসলামী জন্ম সময় থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখক দলটির উত্থান,একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিতর্কিত ভূমিকা এবং যু*দ্ধপরবর্তী পুনর্গঠনের চিত্র তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে সামরিক শাসক আইয়ুব খান এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দলটির ভূমিকা এবং বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ রাজনীতির প্রসঙ্গগুলো গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে। ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে গোলাম আজমের বাংলাদেশে আগমন,রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয়তা,নাগরিকত্ব ফেরতের বিশাল ইতিহাস বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। বইটি ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির অবস্থান,ওয়ান ইলেভেন সময়কালীন দলটির পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের নেতিবাচক কর্মকান্ডের সমালোচনাও স্থান পেয়েছে।
পরিশেষে আওয়ামিলীগ সরকার কতৃক যুদ্ধাপরাধের বিচারে দলের সিনিয়র নেতাদের গ্রে*ফতার এবং ফাঁ*সি চলাকালীন দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড,পরবর্তী বিরুপ পরিস্থিতিতে দলটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। এছাড়াও সময়ের প্রেক্ষাপটে দলটির সাথে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সম্পর্ক, শাহবাগ আন্দোলন সহ বিভিন্ন সমসাময়িক দিকগুলো স্বল্প বিস্তার আলোচনা করা হয়েছে।
বইটির লেখনী সূত্রঃ লেখক গবেষণার জন্য প্রধানত দলটির নিজস্ব দলিলপত্র,ততকালীন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা,সবচেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে গোলাম আযমের লেখা আত্নজীবনী থেকে। বইটি থেকে যদিও দলটির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক চিত্র পাওয়া যায়,কিন্তু লেখক বেশ কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করতে কৌশলে এড়িয়ে গেছেন,যা আরও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বইয়ের দুর্বল দিকঃ ১.তথ্যের উৎসের সংকীর্ণতা: লেখক প্রধানত গোলাম আযম সহ দলীয় লেখার ওপর নির্ভর করেছেন। ফলে বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব লক্ষ্য করা যায়। ২.অপর্যাপ্ত বিশ্লেষণ: অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিশ্লেষণ করার সুযোগ থাকলেও লেখক তা এড়িয়ে গেছেন। ৩.নেতিবাচক দিকের সমালোচনার অভাব: দলটির নেতিবাচক কাজের চিত্র কিছুটা একপাক্ষিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে একটি প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যদিও এর বিশ্লেষণে কিছু ঘাটতি রয়েছে,তবে এটি ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়কে বোঝার জন্য প্রয়োজনীয়। বইটি পাঠকদের একটি রাজনৈতিক দলের উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির জটিলতা এবং পরিবর্তনশীলতাকে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দিবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী নিয়ে গভীরভাবে জানতে আগ্রহী,তাঁদের জন্য বইটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাঠকের উচিত বইটি পড়ার সময় বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্যান্য সূত্রের আলোকে বিচার করা।
জামায়াতে ইসলামী একটি পুরাতন রাজনৈতিক দল এই দল সম্পর্কে মিডিয়া সহ অন্যান্য মাধ্যমে নানারকম গল্প রয়েছে। অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে একত্রে দাবী দাওয়া পেশ । শুরু থেকেই এরা ইসলাম এবং ইসলামিক জীবনধারা নিয়ে কাজ করছে। এ বই পড়ে আরো একটি বিষয় জানা গিয়েছে যে ১৯ ৫২ সালে গোলাম আযম রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা করার সময় ভাষার জন্য আন্দোলনকালে ব্যাপক ধরপাকড়ের করে সময় গ্রেফতার ও হয়েছিলেন ।
একটি চ্যাপ্টার পড়ে জানা যায় যে ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পরেও আওয়ামী লীগের মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফ এর পিতা নজরুল ইসলাম উনিও অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে রয়েছে বলে জানান। বিষয়টা বড় আক্ষেপের।
১৯৭১ সালে জামাত ইসলামের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান প্রচার করা হয় যে তারা ইসলামের পক্ষে আছে আর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলে ভারতের করদরাজ্যে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলই ক্ষমতায় আসার জন্য জামাতকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। এমনকি গোলাম আযমকে ১৯ ৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরেও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেননি এমনকি উনি হাইকোর্টে যাওয়ার পরেও সরকারের বিরোধিতা করেছে ।
আরেকটি বিষয় জেনে অবাক হবে যে কেউ কেয়ারটেকার গভমেন্টের ধারণা জামাত উনি ১৯৮১ সালেই প্রথম দিয়েছিল।
বইটি মূলত রেফারেন্স ভিত্তিক সে কারণে মহিউদ্দিন আহমেদ তার সুনিপুণ লেখনীর মাধ্যমে জামাতের ভেতর বাহির সবকিছু বের করার চেষ্টা করেছেন।