নাতাশা যখন বুকস্টোরের ব্যবসা নিয়ে চিন্তিত তখন তার পরিচয় হলো সুদর্শন ডক্টর রাহেলের সাথে। পরিচয় থেকে প্রেম। সম্পর্ক যখন গভীর হতে শুরু করল তখন হঠাৎ একদিন নাতাশা জানতে পারল সে রাহেলের জীবনের প্রথম প্রেমিকা না। এর আগেও রাহেলের আরেকজন প্রেমিকা ছিল। নাম মীরা। রাহেলের বন্ধুরা প্রতিনিয়ত মীরার প্রসঙ্গ তুলে নাতাশাকে বিব্রত করে তুলত। কিন্তু নাতাশা যখন রাহেলের কাছে মীরার প্রসঙ্গে জানতে চাইত, রাহেল চুপ মেরে যেত। এই বিব্রতকর অবস্থার ভেতর শুরু হলো আরেক উপদ্রব। নাতাশার মনে হতে থাকল কেউ একজন তাকে সব সময় অনুসরণ করছে। একদিন তার বুকস্টোরের ভেতর ঢুকে সব বই তছনছ করে দিলো কেউ। দেয়ালে রক্ত দিয়ে লিখে রেখে গেল আপত্তিকর একটা শব্দ। নাতাশা বুঝতে পারল এসবের পেছনে রয়েছে মীরা, রাহেলের প্রাক্তন। পাঠক যতই নাতাশা-রাহেলের প্রেম কাহিনি পড়তে থাকবেন ততই একের পর এক ভয়ংকর ঘটনার সম্মুখীন হবেন। আর গল্পের এক পর্যায়ে এসে বুঝতে পারবেন যে, এতক্ষণ যা যা অনুমান করে এসেছেন সব ভুল। পাঠককে আবার নতুন করে ভাবতে হবে সবকিছু। নাতাশার সকল দুর্ভোগের পেছনে আসলে কে? নাতাশার জীবনের গোপন রহস্যটাই বা কী?
কয়েস সামী। ছেলেবেলা থেকেই বইয়ের সাথে তার নিবিড় বন্ধুত্ব। সাহিত্যকে ভালোবেসে পড়েছেন সিলেটের এমসি কলেজের ইংরেজিতে। পড়তে পড়তে লেখালেখিতে ঝুঁকে পড়েন একসময়। আনন্দ খুঁজে পান গল্প বলায়। সহজ সরল ভাষায় গল্প বলাতেই পছন্দ করেন বেশি। তাঁর লেখা লাকি থার্টিন গল্পগ্রন্থটি দেশ পান্ডুলিপি পুরস্কার অর্জন করে নেয় ২০১৯ সালে। পেশায় ব্যাংকার হওয়ায় লেখালেখির জন্য সময় খুঁজে বের করা কষ্টকর হয়ে পড়ে অনেক সময়। তবু তিনি সময় বের করে নেন—নেশার টানে, ভালোবাসার টানে।
এটা বলে অনেকদিনের কিংবা অল্পদিনের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে দেয়া যায়। এরপর কেউ মুভ অন করে, কেউ ভাঙ্গা সম্পর্কের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। কেউবা আবার নীরার মতো আকাশ কুসুম চিন্তা করে এই বুঝি প্রাক্তন ফিরে আসবে!
হ্যাঁ, ❛তোমার সাথে আমার ঠিক যাচ্ছে না❜ এই বলেই রাহেল নীরার সাথে সম্পর্ক শেষ করেছিল। রাহেল, প্রতিষ্ঠিত, সুদর্শন পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী একজন ডাক্তার। রাহেলের সাথে নীরার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। দুইজনেই প্রাপ্ত বয়স্ক। সব ভালো যাচ্ছিলো কিন্তু এরমাঝেই রাহেলের কী মর্জি হলো এতদিনের সম্পর্কটাকে শেষ করে দিলো। সম্পর্ক শেষ হলে একজন ছ্যাঁ ক খাওয়া মানুষ কী করে? নিজেকে ভুলে থাকতে ভুল পথে পা বাড়ায়, কেউবা ভাগ্যে যা ছিল তাই হয়েছে এই ভেবে সামনে এগিয়ে যায়। আবার কেউ এক্সকে সা পে র সাথে তুলনা করে চলতে থাকে। কিন্তু নীরা তার একটাও পারছে না। কিছুতেই সে মানতে পারছে না ওটি ড্রেস পরে যে রাহেল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করে সেই কিনা সম্পর্ক ভেঙে দিলো। রাহেলের সাথে সম্পর্ক শেষ কিন্তু রাহেলকে সে অনুসরণ করেই যাচ্ছে। নতুন কাউকে পেয়েই ছেড়ে দিলো না কী হলো সে বুঝতে পারছে না। সীমাহীন ভালোবাসা অনেক সময় সীমাহীন ঘৃণার জন্ম দেয়। রাহেলের অনাগত কোনো সম্পর্ককে ঘৃণা করতে শুরু করে সে। প্রচণ্ড ঘৃণা!
এমনভাবেই অনুসরণ করে শ্যামল দর্শন মেয়েটাকে একদিন দেখে তার প্রাক্তনের সাথে। এই মেয়েটার সাথে নতুন করে জুড়েছে বলেই কি না নীরাকে ত্যাগ করলো সে। এই মেয়ের মধ্যে এমন কী পেলো নীরার ভাবনায় আসে না। আর একটা সম্পর্কে জড়ালে যা হয় তার বন্ধুবান্ধবদের সাথেও সখ্যতা গড়ে ওঠে। আবার সম্পর্ক শেষ হলে কোথাও গিয়ে সেই সখ্যতাও শেষ হয়ে যায়। যে উপলক্ষ সেই না থাকলে বাকি কিছু থেকে লাভ কী?
নাতাশা একটা বইঘর চালায়। দাদার রেখে যাওয়া বইঘরের দায়িত্ব সে বইকে ভালোবেসেই নিয়েছে। তবে দুঃখের ব্যাপার মডার্ন এই যুগে লোকে বই পড়ে না তেমন। সবার আগ্রহ চারকোনা ওই স্ক্রিনের দিক। পুরোনো নতুন দুষ্প্রাপ্য বই রেখেও ডুবে যাওয়া ব্যবসাটাকে দাড়া করানো যাচ্ছে না। চিন্তার শেষ নেই। দোকানে বসে মাছি মা রা ছাড়া অন্য আর কোনো কাজ নেই। মাছি তাড়াতে তাড়াতে এক দুটো বইপড়ুয়ার দেখা মেলে আবার কেউ মেডিকেলের বই খুঁজে না পেয়ে বিদায় নেয়। এভাবে চলে! তবুও এত দুঃখের মাঝে স্বস্তি জীবনে একজন পুরুষ দোলা দিচ্ছে আবার। ডাক্তার লোকটা বেশ ভালো। প্রথম দেখাতেই কেমন একটা বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার মতো ব্যাপার হয়েছিল। ধীরে ধীরে একটু একটু করে কাছে আসা। এত ভালোবাসার মাঝে ভয় হয় ডাক্তারকে সে হারিয়ে ফেলবে? সোজন বাদিয়ার ঘাটের দুলালীর মতো তাদের সম্পর্ক হবে বা তার দাদা-দাদী আজীবন যে ভালোবাসাতে জীবন কাটিয়েছেন ডাক্তারের সাথে তেমন সম্পর্ক হবে? তার গোপন কথা জানলে রুচিশীল, উঁচু তালার এই মানুষটা তার সাথে থাকবে তো? ভয় হয়।
শত চেষ্টা করেও নীরা পারছে না রাহেলের জোটা নতুন এই প্রেমিকাকে অনুসরণ না করতে। মেয়েটার মাঝে কী যেন এক অশুভ ব্যাপার আছে। রাহেল এর সাথে সুখে থাকলে থাকুক না। কিন্তু অজানা এক শক্তি বারবার তাকে এগিয়ে নিচ্ছে রাহেল ও শ্যামল এই মেয়ের পিছে ছুটতে। এদিকে ফুপু পা গ ল হয়েছেন নীরাকে বিয়ে করতেই হবে। বড়ো, ছোটো যাকে পাচ্ছেন তার সাথেই নীরাকে কল্পনা করছেন। কোত্থেকে রাহেলের বন্ধু সায়েম এসে হাজির। তাকে সুচিত্রা সেন বলে ডাকছে। আরে এও হয় নাকি! নীরা ভাবে, সে যদি সুচিত্রাই হতো তবে কি ফেলে যেতো রাহেল তাকে? এই লোকটাকে মন্দ লাগছে না। কিন্তু রাহেলের জায়গায় আর কাউকে ভাবতে পারছে না নীরা। কিন্তু অবুঝ সায়েম তার পিছে ঘুরেই চলেছে। নাতাশার ভয় হয়। কে জানি তাকে অনুসরণ করে। দোকানের শাটারে, বাসায় বাজে শব্দ লিখে যাচ্ছে। অজানা নাম্বারে কল আসছে। কী সব হচ্ছে। এসব কি তবে রাহেলের সেই প্রাক্তন করছে? যাকে রাহেল ছেড়ে দিয়েছিল। যার কথা রাহেলের বন্ধুপত্নী ইরিনা সবসময় বলে। যার সাথে নাকি নাতাশার চেহারার মিল আছে! যার সাথে তুলনা করে ইরিনা বারবার অপমান করে নাতাশাকে। প্রাক্তনের কথা শুনে কেমন হয়ে যায় রাহেল। আজও তাকে ভালোবাসে সে? বাসলে নাতাশার সাথে কেন এত ঘনিষ্ঠ হলো? কিছুই বুঝে আসছে না। অনেক ঘটনা ঘটে গেছে এরমধ্যে। ভয়ে নাতাশার অবস্থা খারাপ। এরমধ্যেই কে যেন এলো। কলিং বেলের শব্দ। রাহেল নাকি আয়ানের মা? নীরা অনেককিছু জানতে পেরেছে। এবার মুখোমুখি হবার পালা। কলিং বেল দিলো।
এরপর?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝প্রাক্তন❞ লেখক কয়েস সামীর সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ঘরনার বই। লেখকের আগে দুটো বই পড়েছি একই ঘরনার। এই ঘরনা লেখকের হয়তো ❛কমফোর্ট জোন❜। যাই হোক প্রাক্তন বা এক্স বা সা প যাই বলি না কেন এটা শুনলেই লোকের মনে একজন ধোঁকাবাজ নেগেটিভ চরিত্র ভেসে ওঠে। এই বইতে সেই প্রাক্তন নিয়েই বেশ উপভোগ্য এবং রোমাঞ্চকর এক সাইকোলজির গল্প ফেঁদেছেন লেখক।
সম্পর্ক ভেঙে গেলে প্রতারিত হওয়া মানুষটার কী অবস্থা হয় কেউ ভেবে দেখি কী না কে বলতে পারে! তুচ্ছ কারণে বা বড়ো কোনো কারণেই হোক ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো বেশ কষ্টের। যদি নিজের দিক থেকে কোনো কমতি না থাকে তখন ❛প্রাক্তন❜ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে ভুলে যাওয়া কষ্টের। ভালোবাসা আর ঘৃণার অদ্ভুত এক মিশেল কাজ করে। নীরার ক্ষেত্রেও এমনটাই ছিল। বর্তমান, প্রাক্তনের ভাষ্যে মোট ৪৭ টা অধ্যায়ে লেখক এই উপন্যাস সাজিয়েছেন। পুরো উপন্যাসের গতি ছিল বেশ ভালো। পড়তে পড়তে আমি ভুলে যাচ্ছিলাম বইটার কোনো সংশোধন থাকলে সেটা দেখা আমার কাজ তথা বেটা রিড করা। গল্পের গতিতে বারবার নিজেকে সেট করে ফেলছিলাম বলে সংশোধন করতে হবে এটা পরে মনে পড়তো। এরপর আবার শুরু থেকে পড়তে হতো। যাই হোক উপন্যাসের শুরু আমার তেমন ভালো লাগেনি। শুরুর বিল্ডআপে লেখক হয়তো একটু বেশি সময় দিয়েছেন। ভাষা কঠিন ছিল পড়তে আরাম লাগছিল না (অবশ্য এটা র ফাইলের সময়ের কথা। বর্তমানে সমস্যা গুলো লেখক ঠিক করেছেন আশা করি।)। এরপর গল্প কাহিনি এগিয়ে গিয়েছে নিজেকে গল্পে মানিয়ে নিতেও সময় কম লেগেছে। মাঝের দিকে প্রাক্তন নিয়ে একটা অদ্ভুত ধোঁয়াশা তৈরি হয় সেটা এই বইয়ের টার্নিং পয়েন্ট। এতে কিছুদূর পড়তে গিয়েই হয়তো আমি ধরে ফেলেছিলাম ঘটনা কী। তবে এক্ষেত্রে আমি হয়তো ৬০-৪০% সঠিক এমন। ধারনা পুরোপুরি না মিললেও মূল ধারনা ঠিক করেছিলাম। শেষটা লেখক দারুণ টুইস্ট দিয়েছেন। এমনটা সন্দেহতে আসেনি। শেষের টুইস্ট দারুণ লেগেছে। শেষেরও শেষ থাকে। এই উপন্যাসের ক্ষেত্রেও তাই ছিল মনে হয়। শেষের শেষ টুইস্টটাও লেখক চমৎকার দিয়েছেন।
চরিত্র:
চরিত্র খুব বেশি ছিল না আবার একদম কম ছিলনা। আমার হিসেবে উপন্যাসের প্রোটাগোনিস্ট নীরাই। তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ রহস্য ছিল। ভালবাসার জন্য সে অনেক কষ্ট করেছে। আবার সেই কষ্ট কিছু জায়গায় আমার কাছে ছ্যাবলামী লেগেছে। আরে ভাই তোরে ছেড়ে দিসে তুই মুভ অন কর না। এমন পিছে পিছে কেন ঘুরবি? আত্মসম্মান নাই? তবে ভালোবাসার জন্যে মানুষ কি ই না করতে পারে। একটু পিছে পিছে ঘুরা তো যায়ই! আর সে এমন ছোকছোক না করলে উপন্যাসের কাহিনি তো এগোতো না।
রাহেল চরিত্রটা আমার এভারেজ লেগেছে। প্রেম করে ছেড়ে আবার নতুন সম্পর্কে জড়ানোর মধ্যে তার যে সময়ের স্বল্পতা ছিল সেটা আমার ভাল লাগে নাই। তবে একজন ৩০+ প্রতিষ্ঠিত লোকের এমন স্টাইলে প্রেম কেমন জানি দামড়া ব্যাটা রং করছে টাইপ লেগেছে।
নাতাশা চরিত্রটা শুরুত��� ধোঁয়াশা ছিল। ভালো মন্দ দুইই লেগেছে। একটু নিব্বি নিব্বি ব্যাপার ছিল। তবে ডাক্তারের সাথে সাথে প্রথম ঘুরতে যাওয়ার উপলক্ষ তৈরি হওয়ার বিষয়টা আমার আরোপিত লেগেছে। সায়েম চরিত্রটা ভালো লেগেছে বেশ। যদিও এক জায়গায় একটা ব্যাপার ছিল। খোলা রাস্তায় এমন ব্যাপার আসলে এরকম একই বয়সের (৩৫-৩৭) লোকের জন্য কতটা সমীচীন আমি জানিনা। আমি আসলে এসবে স্বস্তি পাইনা। বাকি চরিত্র ভালো ছিল তাদের স্থানে।
পড়ার অভিজ্ঞতা ভালো ছিল বলা যায়। যেসব সমস্যা আমার চোখে পড়েছিল আশা করি মূল বইতে সেটা ঠিক করা হয়েছে। বিধায় এখানে টানলাম না কথাগুলো।
তবে কিছু বিষয় যেসব আসলে বেটা রিডার হিসেবেও পরির্বতন করার কথা আমার বলা সমীচীন নয় কিন্তু একজন রিভিউয়ার হিসেবে বলা যায় সেসব বলছি,
চরিত্রদের মাঝেই কিছু অপছন্দের কথা তুলেছি। এছাড়াও এতোটা মডার্ন খোলামেলা বিষয় বইতে একদম সাধারণ ভাবে দেখানো আমার আসলে অন্যরকম লেগেছে। আমি নেহায়েত সাধারণ মানুষ বিধায় আমার অস্বস্তি লেগেছে হতেও পারে। বিশেষ করে নাতাশার বাসায় ইরিনার লাল পানি উপহার হিসেবে নিয়ে যাওয়া তার কাছে একদম সাধারণ ব্যাপার হলেও আমার কাছে পশ্চিমা ধাঁচের লেগেছে। এখনো আমাদের দেশে এই ব্যাপার এতটা সাধারণ মনে হয়না। কারো বাসা গেলে ওই মিষ্টি, ফল, জুস কিংবা অন্য কিছু নেয়া উঁচু সমাজেও হয়তো আছে। তাই বলে লাল পানি নিয়ে যাওয়াটা এই দেশে এখনো ভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে না। পড়লেও আমার পছন্দ হয়নি। লিভ টুগেদার ব্যাপারটাও উপন্যাসে একদম স্বাভাবিক ভাবেই দেখিয়েছে। যদিও সমাজে এখন এই বিষয় অনেকতাই স্বাভাবিক। তবুও আমার কাছে ভালো লাগেনি।
এরকম বিষয় ছাড়া উপন্যাস ভালো লেগেছে। শেষের দিকে খুব দ্রুত এগিয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত মোড় নিয়েছে গল্প যা উপভোগ করা যায়।
আপনার দীর্ঘদিনের ভালোবাসা আপনাকে ছেড়ে গেলে সেই প্রাক্তনের জন্য আপনার মনে একরাশ কেমন অনুভূতি কাজ করতে পারে বলে আপনি মনে করেন? ঘৃণা ঠিক কতটা বিস্তার হলে সেটা আমাদের অপরাধের দিকে নিয়ে যায়?
ভালোবাসা কী বাতাসে ভেসে বলে দেয় তার উপস্থিতি? কাকে কখন ভালো লাগে আগে থেকেই তো আসলে বলা মুশকিল। একটা মানুষের জীবনে ভালোবাসা কতবার আসতে পারে? দুইবার? তিনবার? নাকি আরো বেশি? যাকে ভালোবাসি বলা যায় আবার তার সাথেই যখন সম্পর্ক ছেদ পড়ে তখন তার পরিচয় হয়ে যায় প্রাক্তন হিসেবে। তখন প্রাক্তন তকমা জোটা ওই মানুষটার কথা কী ভাবা হয়? সেও তো নিজের সবটা উজাড় করে ভালোবাসতে চেয়েছিল। তবে আজ এই প্রাক্তন তকমা তার জীবনকে কতটা ছারখার করে দিবে আমরা কী সেটা ভেবে দেখেছি কখনো?
~ রাহেলের বহু প্রেমের আসক্তি ~
রাহেল একজন ডাক্তার। জীবনে তার বুঝি প্রেম এসেছিল কয়েকবার। তার জীবনে এসেছে কয়েকজন। কিন্তু রাহেল কিন্তু থিতু হতে পারলো না জীবনে এখনো। রাহেলের অতীত স্মৃতি খুব একটা সুখকর নয়। ব্রেকাপ শব্দটিকে নিজের জীবনে সে বয়ে নিয়ে চলছে যেন। "প্রাক্তন" শব্দটির সাথেও রাহেলকে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। তবে তার প্রাক্তনদের সাথে তার স্মৃতি কী রাহেল ভুলতে পারবে? বর্তমানে যে মেয়েটিকে সে ভালোবাসে বলে ভেবে নিজেকে সম্পর্কে জড়িয়েছে সেই নাতাশা কখনো জানবে এসব?
~ নাতাশার কথা ~
নাতাশা একটা বইয়ের দোকানের মালিক। কিন্তু এদেশের মানুষ বই কিনতে কতটা আগ্ৰহী নাতাশা জানে না। দোকান খুব লসে চলছে। তবুও বান্ধবী রুবির সাথে দাদার আমলের এই বইয়ের দোকান সে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এই বুক স্টোরেই একদিন আসে ডাক্তার রাহেল। একটা বই খোঁজ করছিলো নিজের মায়ের জন্য। রাহেল বেশ সুপুরুষ, দেখলে যেকোনো মেয়ের পছন্দ হতে বাধ্য। বান্ধবী রুবি তো নাতাশাকে রীতিমতো জোর করতে শুরু করলো রাহেলের সাথে সে যেন রিলেশনে যায়। নাতাশা নিজেও কখন যেন রাহেলের প্রতি দূর্বল হতে থাকে। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়।
~ যখন আসে প্রাক্তন ~
নাতাশা রাহেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে সবখানে একটা নাম খুব বেশি শুনছে। "মীরা" এই নামটা রাহেলের বন্ধুর বউ ইরিনা যেন নাতাশাকে রীতিমতো অপমান করতেই বলতে শুরু করেছে প্রায়শই দেখা হলেই। মীরা খুব গুনী মেয়ে, মীরা ভালো রান্না জানতো, রাহেল মীরার রান্না পছন্দ করতো। নাতাশা এসব শুনে বেশ অস্বস্তি বোধ করে। করবেই তো কারণ নিজের বয়ফ্রেন্ডের প্রাক্তন এর সাথে তুলনা কোন মেয়ে পছন্দ করবে। রাহেল মীরার নাম শুনলেই চুপ হয়ে যায়। এটা নাতাশার বেশ আশ্চর্য লাগে। রহস্য কী? রাহেল মীরার সম্পর্কে নাতাশাকে কেন কিছু বলতে চায় না?
নাতাশা রাহেলের উপর রেগে যায়। কখনো অভিমান করে বসে থাকে মনে মনে। এবার প্রশ্ন এভাবে নাতাশার জীবন বারবার বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে কে? নাতাশার বাড়িতে টের পাওয়া যায় কারো উপস্থিতি। কে তার বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে বারবার? নাতাশার বইয়ের দোকানের শাটারে লেখা থাকে রঙ দিয়ে নোংরা গালিগালাজ। আবার একদিন বইঘর হয় তছনছ। কিন্তু বইয়ের দোকানটা এভাবে তছনছ হয় কীভাবে? নাতাশার কে শত্রু থাকতে পারে? ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে কেউ। কিন্তু কে করে এসব? মীরা, না অন্যকেউ? মীরা ছাড়া রাহেলকে কে আর ফলো করবে, প্রাক্তন বলে কথা। কিন্তু রহস্য কিন্তু ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে।
🌽পাঠ প্রতিক্রিয়া :
বিদেশি বইয়ের ছায়া অবলম্বনে দেশি মোড়কে যখন গল্প সাজানো হয় তখন পাঠক হিসেবে আমিও ভাবি যে ঠিকঠাক কী আদৌও লেখক ফুটিয়ে তুলতে পারবেন সবকিছু? অ্যাডপটেশন এমনি কঠিন একটা কাজ যেখানে গল্পের আদলে প্লট সাজানো বেশ মুশকিল। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সংস্কৃতির সাথে তাদের অমিল পাওয়া যায়। তাই লেখককে থাকতে হয় খুব সচেতন অবশ্যই। নাহলে আসল মজা হারিয়ে যায়।
লেখক কয়েস সামীর লেখা “প্রাক্তন” বইটা বিদেশি বইয়ের ছায়া অবলম্বনে হলেও, প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির মিল খুঁজে পেলাম না। এবং বলতে হবে লেখক প্লট অনুযায়ী গল্প সাজাতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ এখানে শুধু বাংলাদেশী নামগুলো না থাকলে অনায়েসেই এটাকে অনুবাদ হিসেবে চালিয়ে দেয়া যাবে। এবং এই প্রশ্নটা আমার এই বইয়ের বহু জায়গায় রয়ে গেছে যে অ্যাডপটেশন কী আসলেই উপযুক্ত হলো? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব আদৌও হয়?
পারিবারিক পার্টিতে অ্যালকোহল খাওয়া, কারো বাসায় উপহার হিসেবে অ্যালকোহল নিয়ে যাওয়া, লিভ টুগেদার, প্রথম ডেটেই চুমু খাওয়া, খোলামেলা আচরণ, একে অন্যের সাথে সরাসরি ফ্লার্ট করা এগুলো আদৌ বাঙালি কালচারে চলন আছে? ঠিক মানানসই লাগলো না। প্রেমিকের সাথে অতিরিক্ত খোলামেলা কথাবার্তা কিংবা রাহেলের প্রাক্তনের ফুপির রাহেলের প্রাক্তনকে উদ্দেশ্য করে নতুন কোনো ছেলেকে নিয়ে ডেট করার উৎসাহ দেয়া। এসব কী আদৌও হয়? এসব দিকগুলো দেখলে বইটি পুরোপুরি বাংলাদেশী প্লটে হয়নি গল্পের গাঁথুনি।
তবে বই হিসেবে যদি বলি তবে বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে শেষটায়। এবং এখানে মনস্তাত্ত্বিক একটা দিক আছে। তীব্র আঘাত কিংবা রয়েছে ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। রয়েছে ভালোবাসার আবেগ। তাই এটাকে আমার সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার লেগেছে। এবং লেখক খুব সুন্দর ছিমছাম গল্পে শেষটায় দারুন একটা টুইস্ট দিয়ে শেষ করেছেন। এবং শুরুতে আপনি যদি একটা ধারণা নিয়ে পড়তে শুরু করেন শেষটা অবশ্যই আপনাকে চমকে দেবে।
এই বইয়ে অতীত বর্তমানের একটা সংমিশ্রণ ঘটেছে। কারণ এখানে প্রাক্তন আর বর্তমান দুই চরিত্রকেই মুখোমুখি করেছেন চমৎকারভাবে লেখক। এবং শুরুতে বেশ স্লো এগিয়েছে যেমনটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে হয়। আমারও শুরুতে তাই বেশ একঘেয়ে লাগছিলো। তবে ঠিক যখন থেকে গল্প মাঝপথে এসেছে তখনই যেন গতিশীল হতে লাগলো সব। এবং লেখক একের পর এক চমক দিতে শুরু করলেন। আরেকটা বিষয় এখানে লেখক প্রাক্তন হিসেবে যে চরিত্রটি উপস্থাপন করেছেন তার মানসিক অবস্থা কিন্তু দারুন ফুটিয়ে তুলেছেন। আমার এই বিষয়টা ভালো লেগেছে।
সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারগুলোতে মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো ফুটিয়ে তোলা একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকে আমি মনে করি লেখক এক্ষেত্রে বেশ সফল। এবং সবমিলিয়ে বইটি উপভোগ্য ছিলো। অ্যাডপটেশন ঠিক নয় কোথাও গিয়ে অনুবাদ পড়ার অনুভূতি হলো। তবে পাঠের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল যদি আমি এটাকে মূল গল্পে বিবেচনা করি
"তুমি যাকে ভালোবাসো স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো তার জীবনে ঝড় তোমার কথার শব্দ দূষণ তোমার গলার স্বর আমার দরজায় খিল দিয়েছি আমার দারুণ জ্বর তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর"
শেষ করতে গিয়ে এই গানটা মনে পড়লো। কারো জীবনে প্রাক্তন হবার চেয়ে যে সত্যিকারের ভালবাসে তার হাত ধরাটাই বরং বুদ্ধিমানের কাজ। জীবনে প্রকৃত ভালোবাসা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কেউ সেটা পায় আর কারো জীবনে প্রাক্তন হিসেবে তৃতীয় পক্ষ এসে সৃষ্টি করে ঝামেলা।
একজন মানুষের জীবনে প্রেম কতবার আসে? হুমায়ূন আহমেদ তার কোনো এক বইতে লিখেছিলেন, মানুষের জীবনে দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রেম বলে কিছু হয় না। সবই প্রথম প্রেম। হয়তো সত্য, কিন্তু আবার নাও হতে পারে। অতীত মানুষ নানান কারণে ভুলে যায়। ভুলতে বাধ্য হয়। নতুনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। কিন্তু জীবনের এক গল্পে অতীত যে কখনও পিছু ছাড়ে না। বারবার ফিরে ফিরে আসে। বড্ড অসময়ে মনে করিয়ে দেয় সেই দিনগুলো। হয়তো জানান দেয় নিজের ভুল বা দোষ! তখন এলোমেলো হয়ে যাওয়া খুবই সম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
রাহেল একজন ডাক্তার। জীবনের এক অতীতকে ভুলে নতুনভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। নাতাশার সাথে তাই নতুন করে প্রেমের সম্পর্ক জড়িয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করছে। তার অতীত যে খুব একটা সুখকর নয়। “মুভ অন” করতেই হবে এবারে।
নাতাশা একটি বুকস্টোরের মালকিন। বাংলাদেশে বর্তমানে বই পড়ার প্রচলন খুবই কম। তাই কোনো মতে ঠেলতে ঠেলতে বইয়ের দোকানটা চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কতদিন পারবে কে জানে! একসময় হয়তো বন্ধই করে দিতে হবে। সেই স্টোরেই একদিন আসে রাহেল। গায়ে অ্যাপ্রন জড়িয়ে ডাক্তার সাহেব যেন মেয়েদের ঈর্ষার একজন। এমন ড্যাশিং, হ্যান্ডসাম সুপুরুষকে না বলার সাধ্য কোনো মেয়ের থাকে না। তাই নাতাশাও পারেনি। জড়িয়ে পড়েছে গভীর এক ভালোবাসায়।
এই প্রেমে জড়িয়ে নাতাশা জানতে পারে মীরার কথা। রাহেলের প্রাক্তন ছিল সে। কথায় কথায় রাহেলের বন্ধুর বউ ইরিনা মীরার কথা তুলে আনে। কিন্তু একজন বর্তমানের কাছে কেন প্রাক্তনের গল্প শুনতে ভালো লাগবে? নাতাশা অস্বস্তি বোধ করে। কিন্তু ইরিনা যেন ইচ্ছে করেই নাতাশার জীবন বিষিয়ে দিতে চায়। কে ছিল এই মীরা? নাতাশা খুঁজে বেড়ায়। রাহেলও যেন চুপ হয়ে যায় মীরার কথাতে। তাই আগ্রহ বাড়ে বারবার। কিন্তু যখন সত্যতা সামনে আসবে, থমকে যেতে হবে। অনুতপ্তে ছেয়ে যাবে মন।
তারপরও কিছু কথা থাকে, নাতাশার জীবন এভাবে বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে কে? কে তার বাড়ির ভেত প্রবেশ করে বারবার? বইয়ের দোকানটা এভাবে তছনছ হয় কেন? ভয় দেখানোর চেষ্টা? কে করে? মীরা, না অন্যকেউ? একজন হ্যান্ডসাম সুপুরুষের পানিপ্রার্থীর অভাব থাকার কথা না। তাদের কেউ?
খুব ভালোবাসার কেউ যদি বলে— তোমার সাথে আমর মিলছে না, আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত। তখন মনের মধ্যে উথাল পাথাল ঝড় ওঠে। নীরার সাথে ঘটেছে তেমনই। যাকে ছাড়া সে এক মুহুর্ত থাকতে পারে না, সে এখন তার নেই। তাকে ছেড়ে চলে গেছে। দূরে অনেক দূরে। কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে তো ছেড়ে যাওয়া যায় না, ভুলে থাকা কষ্টকর। তাই সময়-অসময়ে তাকে অনুসরণ করতে না চাইলেও চলে যেতে হয়।
আর যদি দেখা যায়, নতুন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার তোড়জোড় চলছে, তখন জীবনটা অসহায় মনে হয়। যখন প্রাক্তন অন্যকে নিয়ে সুখে থাকতে চাইছে, নিজের সুখে থাকতে দোষ কোথায়? তাও বারবার অতীত মনে পড়ে। প্রাক্তনকে ভুলে থাকা যায় না। কিন্তু সময় মানুষ কে ভুলিয়ে দেয়। হয়তো মনের কোণে জমে থাকে সেই স্মৃতি। যা একসময় ঝলসে ওঠে। সেখানেই অনেক কিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
আমার কাছে সবসময় মনে হয়, অ্যাডাপটেশন লেখা সবচেয়ে কঠিন একটা কাজ। বিদেশি বইয়ের ছায়া অবলম্বনে লিখতে গেলে সবচেয়ে যে বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার, সেটা নিজ দেশের সংস্কৃতি, প্রকৃতি। বিদেশের সংস্কৃতির সাথে আমাদের সংস্কৃতির বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সেই পার্থক্য বুঝে, সঠিকভাবে চিত্রিত করতে না পারলে অ্যাডাপটেশন লেখার যে সফলতা, সেটা অনেকাংশেই হারিয়ে যায়।
কয়েস সামীর লেখা “প্রাক্তন” বইটা বিদেশি বইয়ের ছায়া অবলম্বনে হলেও, অনেকাংশে আমার বারবার অনুবাদ বই বলেই মনে হচ্ছিল। কেননা লেখক দেশীয় সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে কিছু ঘটনা যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল বইটি বিদেশি। এই বিষয়টি লেখকের আমলে নেওয়া দরকার ছিল। দেশীয় নাম, জায়গার নাম না থাকলে হয়তো এই বইটিকে পুরোপুরি অনুবাদ গ্রন্থ বলে মনে করতাম।
লেখক অবশ্য বেশকিছু ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু তারপরও বইটি যথাযথ অ্যাডাপটেশন হিসেবে গড়ে ওঠেনি। পারিবারিক পার্টিতে অ্যালকোহল খাওয়া, কারো বাসায় উপহার হিসেবে অ্যালকোহল নিয়ে যাওয়া, লিভ টুগেদার, প্রথম ডেটেই চুমু খাওয়া, খোলামেলা আচরণ, একে অন্যের সাথে সরাসরি ফ্লার্ট করা— এগুলো বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে যায় না।
তাছাড়া বিদেশে একটা সময় পর প্রত্যেকেই স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। নিজেরা কিছু করতে চায়। ফলে পরিবার থেকে দূরে কিছু, বাবা-মাকে আলাদা রেখে নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করে। এই ঘটনা বিদেশের ক্ষেত্রে খুব বাস্তব হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়। এখানে মা-বাবা পরিবারকে নিয়েই বসবাস করতে হয়। কিন্তু লেখক তার প্রতিটি চরিত্রকে আলাদা আলাদা সত্ত দিয়েছেন। প্রত্যেকের নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট আছে। একা একা থাকে। কিন্তু কারো পারিবারিক বিষয়টি ফুটে ওঠেনি। লেখক তুলে ধরার চেষ্টা করেনি। ছায়া অবলম্বনে বই লিখলেই যে বিদেশি গল্পটি যেমন তেমনই তুলে ধরতে হবে বিষয়টি এমন না, মূল গল্পটি ঠিক রেখে দেশীয় আদলে ফুটিয়ে তোলাটাও ধরনের দক্ষতা। এই দক্ষতা এখানে অনুপস্থিত ছিল।
তবে গল্পটা দারুণ। এই গল্প ভালোবাসার। একজনের সাথে আরেকজনের নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যাওয়া। মূলত উপন্যাসটিকে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হবে ধরে নেওয়া যায়। মানুষের মনস্তত্ত্ব এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। ভালোবাসার জন্য মানুষ কতটা কাঙাল হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত এখানে উপস্থিত। একে রোমান্টিক থ্রিলার হিসেবেও হয়তো বলা যেতে পারে।
প্রতিটি ভিন্ন সত্তার ভিন্ন প্রেম, ভালোবাসার গল্প এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক। সাইকোলজিক্যাল গল্প সাধারণত ধীরগতির হয়। গল্প তৈরিতে সময়ক্ষেপ��� থাকে। এখানেই তার ব্যতিক্রম নেই। শুরুটা কিছুটা ধীর গতির। গল্পে প্রবেশ করে কিছুটা সময় লাগে। তবে গল্প যত এগিয়েছে, লেখক তার আড়ষ্টতা ভেঙে সাবলীলতা ফিরে পেয়েছেন। গল্পও গতি পেয়েছে দ্রুত। পড়তে আরাম লেগেছে। লেখকের বর্ণনাভঙ্গি চমৎকার। শব্দচয়ন পরিমিত। খুব ভারিক্কি কিছু ব্যবহার করেন না। ফলে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে লেখার ধরন।
একাধিক কাহিনি একটার সাথে একটার জুড়ে যাওয়া। এখানে লেখক দারুণ কাজ দেখিয়েছেন। গল্পের মাঝপথে রহস্যের যে আবহ তৈরি করেছেন, পাঠকের মনে এক ধরনের দোদুল্যমান অবস্থা তৈরি হয়। শেষদিকে লেখকের মাস্টার স্ট্রোক! যে চমক লেখক বইতে উপস্থাপন করেছেন, এটা ছিল দারুণ। আগে থেকে উপলব্ধি করা যায়নি।
▪️চরিত্র :
বইটার মূল চরিত্র রাহেল যেন ভালোবাসার কাঙাল। তাই একের পড় এক প্রেম তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। একজনকে হারিয়ে আরেকজনের সাথে খুব দ্রুত জড়িয়ে নিতে পারে। এটা আমার কাছে খুব একটা স্বাভাবিক মনে হয়নি। বইটি পড়লে মনে হবে রাহেল খুব ভালো, ভালোবাসার মানুষের কেয়ার করে। কিন্তু একজনের সাথে লিভ টুগেদ���র করার পরও তাকে ছেড়ে আরেকজনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা ভালো চরিত্রের লক্ষণ না। তাছাড়া একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার ৩৬ বছর বয়সেও বিয়ে না করে প্রেম করছে, এটা বোধগম্য হয়নি।
বিয়ে ছাড়া লিভ টুগেদার করা, প্রেম করে খুব গভীরে জড়িয়ে গিয়ে বিয়ে করতে দেরি করে দেশি সংস্কৃতির সাথে মেলে না। লেখকের এই দিকে নজর দেওয়া উচিত ছিল। নাতাশা মেয়েটা বয়সের তুলনায় একটু বেশি নিব্বি জাতীয় হলেও মেয়েটার দৃঢ়তা ভালো লেগেছে।
খুব বেশি চরিত্রের আনাগোনা বইটিতে না হলেও যে কয়জন ছিল, প্রত্যেকেই খুব গুরুত্বপুর্ণ ছিল। এখানে প্রত্যেকের মনস্তত্ত্ব লেখক খুব দারুণভাবে চিত্রিত করেছেন।
মেয়েদের মধ্যে যেমন কিছু বন্ধনের দৃঢ়তা একইসাথে ঈর্ষা যে কতটা ভয়ংকর হতে, তার দৃষ্টান্ত লেখক উপস্থাপন করেছেন। নীরা, মীরা, ইরিনা, নাতাশা সবাই ভিন্ন সত্তা থেকেও কোথায় যেন এক। ভালোবাসার জন্য সবাই কাঙাল। কেউ না থেকেও গল্পের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছে। আবার কেউ প্রেমের জন্য সব করতে পারে, কেউ আবার প্রিয় বন্ধু বা বোনের জন্য।
ছেলেদের ক্ষেত্রে এমন কিছু হয় না। সামাজিকভাবে সবাই একই। এরূপ ঈর্ষা নারীদের যেভাবে ধরে রাখে, পুরুষদের ক্ষেত্রে তা লক্ষ্য করা যায় না।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
সম্পাদনার ত্রুটি খুব একটা লক্ষ্য করিনি। বানান ভুল না থাকলেও ছাপার ভুল ছিল কয়েক জায়গায়। যদিও সেগুলো খুব এটা চোখে লাগে না।
প্রচ্ছদ গল্পের সাথে মানানসই। বেশ ভালো লেগেছে। গল্পটা অনুধাবন করতে পারলে প্রচ্ছদও অনুধাবন করা যাবে।
▪️পরিশেষে, কিছু রহস্য থাকে যা এক সময় উন্মোচন হয়। কিছু রহস্য আবার আড়ালে থেকে যায়। চোখের সামনে সমাধান থাকার পরও কেন যেন সামনে এসে না। তখন এক অপরাধীর সাজায় অন্য অপরাধী মুচকি হাসে। কারণ সে যে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
"অন্ধকারে লুকানো মুখোশে ঢেকে যায়, সাজা তার যেন ধূসর হয়ে মুছে যায়।"
কাহিনী সংক্ষেপ : প্রাক্তন উপন্যাসটি একদিকে যেমন সুন্দর, অন্যদিকে জটিল ও রহস্যে ভরা। নাতাশা একটি বুকস্টোরের মালিক, মূলত তার দাদার ছিলো স্টোরটি উনার মৃত্যুর পর এখন সে-ই কোনো রকম ঠেলেঠুলে চালাচ্ছে। অন্যদিকে, রাহেল একজন সফল ডাক্তার, যার জীবন অনেকটা সাধারণ মনে হলেও, অতীতের রয়েছে কিছু দূর্বিষহ স্মৃতি। নাতাশা আর রাহেলের পরিচয় হয় তার বুকস্টোরেই, এবং সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
প্রথমে সবকিছুই সুন্দরভাবে চলছিল, কিন্তু হঠাৎ নাতাশা জানতে পারে যে সে রাহেলের জীবনে প্রথম নারী নয়। রাহেলের অতীত জীবনে ছিল মীরা নামের একজন। যদিও রাহেল মীরার ব্যাপারে নাতাশাকে কিছু জানায়নি, কিন্তু রাহেলের বন্ধুরা এবং বন্ধুর বউ ইরিনা বারবার নাতাশার সাথে মীরার তুলনা করে তাকে অবমাননা করত। কে ছিল এই মীরা? কেন রাহেল এই প্রসঙ্গে এড়িয়ে যায় বারবার?
এরই মধ্যে, নাতাশার জীবনে অদ্ভুত ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করে। তার বুকস্টোরে একদিন কেউ এসে তছনছ করে দেয়, দেয়ালে লিখে কিছু আপত্তিকর শব্দ। তারপর, সেই ঘটনাটি আবারো পুনরাবৃত্তি ঘটে তার বাসাতেও। নাতাশার মনে সন্দেহ জাগে, এসব কি মীরার কাজ? নাকি অন্য কারো?
সব কিছু যখন নাতাশার জীবনে জটিলতা বাড়াচ্ছিল, নাতাশার মনে হতে থাকে তার এবং রাহেলের মধ্যকার সম্পর্কে দূরত্ব বাড়ছে দিনদিন। কোনো করনে মনে হচ্ছে রাহেল তাকে এড়িয়ে চলছে, তাহলে কি সত্যিই আবার মীরা ফিরে এসেছে তার জীবনে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া : ‘প্রাক্তন’ মূলত একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার জনরার বই, বইটি প্রাক্তনকে কেন্দ্র করে লেখা। গল্পটি মূলত প্রেম ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের আবহ তৈরি করেছে। গল্পের প্লট ও লেখকের সহজ বর্ণনাভঙ্গি এবং সাবলীল শব্দচয়ন আকর্ষণ করেছে। গল্পের বিভিন্ন উপকাহিনীর মেলবন্ধন ও রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করা বেশ প্রশংসনীয়। শুরুতে উপন্যাসের গতি কিছুটা ধীর ছিল, স্টোরি বিল্ডআপে লেখক হয়তো একটু বেশি সময় দিয়েছেন, পরে স্বাভাবিক গতিতেই পুরো গল্পটি এগিয়েছে। গল্পের বিভিন্ন উপকাহিনী একত্রিত হওয়ার ধরণ বেশ প্রশংসনীয়। মাঝামাঝি সময়ে প্রাক্তন নিয়ে একটি রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন লেখক, এছড়া প্রতিটা মেইন চরিত্রে কিছু না কিছু সিক্রেট ছিল। গল্পের শেষের দিকে মারাত্মক টুইস্ট আছে, যা পুরো চিন্তা-ভাবনাকে উলটপালট করে দিয়েছে, সেটা দারুণ লেগেছে।
চরিত্র : বইয়ে যে কয়েটি চরিত্র ছিল মোটামুটি সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে। গল্পের প্রোটাগোনিস্ট ক্যারেক্টারকে রীতিমতো মানসিক রোগী মনে হয়েছে, সে জানে কাজটা ভুল কিন্তু সে ভুলটাই করবে। তারপর তার মনে হয়, কেন সে ভুলটা করল এবং এটা নিয়ে তার ভেতর একটা অনুশোচনা কাজ করে। আবার এটার পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণ-ও আছে। গল্পের আরেক প্রধান চরিত্র রাহেল, ৩৬ বয়সী একজন ডাক্তার। প্রতিষ্ঠিত হয়েও বিয়ে না করে লিভ টুগেদার করা, এজনের সাথে এতোদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে আরেক জনের সাথে দ্রুত সম্পর্ক জড়ানো। কেন জানি তার ব্যাক্তিত্বের সাথে এসব বিষয় খাপছাড়া মনে হয়েছে। অন্যদিকে, নাতাশা চরিত্রেও কিছুটা রহস্য আছে। সহজ-সরল অতি আবেগী কিশোরী টাইপ মনে হলেও তার ধৈর্য ও দৃঢ়তা আছে। এছাড়া বইয়ের বাকি চরিত্রগুলো তাদের জায়গায় ঠিকঠাকই লাগছে।
প্রোডাকশন : কোনো ভুল বানান দৃষ্টিগোচর হয়নি। প্রচ্ছদ টাও গল্পের সাথে মানসই, অসাধারণ হয়েছে, হাতে নিলে একটা লেদার টাইপ ফিল আসে। এটা অনুজের সেরা প্রোডাকশন বললেও ভুল হবে না।
কিছু কথা : অ্যাডাপটেশন লেখা আসলে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। বিদেশি বইয়ের ছায়া অবলম্বনে লিখতে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিজের দেশের সংস্কৃতি ও সমাজকে ঠিকভাবে উপস্থাপন করা। দেশীয় এবং বিদেশি সংস্কৃতির মাঝে বিশাল ফারাক রয়েছে। এই পার্থক্য যথাযথভাবে গল্পে প্রকাশ করতে না পারলে অ্যাডাপটেশন কাজটির আসল স্বাদ অস্বাদ হয়ে যায়। গল্পের মূল থিম বজায় রেখে সেটা দেশীয় প্রেক্ষাপটে ফুটিয়ে তোলার মধ্যেই লেখকের সার্থকতা। ‘প্রাক্তন’ বইটি বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে হলেও দেশীয় সংস্কৃতির উপস্থাপনে লেখক কিছুটা অসফল ছিলেন। যেমন—পারিবারিক অনুষ্ঠানে অ্যালকোহল সেবন, ফ্লার্ট করা, প্রথম ডেটে চুম্বন, কিংবা লিভ-ইন সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো আমাদের সমাজের সাথে পুরোপুরি মানানসই নয়, যদিও বিদেশি সংস্কৃতিতে এগুলো স্বাভাবিক।
ব্যাক্তিগত র্যাটিং : ৭.৫/১০ (অভারওল, বইটা পড়ে ভালো লেগেছে, রেকমেন্ডেড)।
লেখক বলেছেন বইটি বিদেশি গল্প অবলম্বনে তৈরি। তবে আপনি যদি 'লেখকের কথা' অংশটুকু বাদ দিয়ে বইটা পড়তে শুরু করেন তাহলে তেমন একটা মনেই হবে না এটা এদেশীয় গল্প নয়। কারণটা স্পষ্ট, লেখক গুরুত্বসহকারে এর পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন, সংস্কৃতির পরিবর্তনসহ নিজের মতোও অনেক কিছুই সংযোজন করেছেন। তাই তিনি এটিকে অনুবাদ হিসেবে উল্লেখ করেননি। আমারও মনে হয় তিনি যথার্থই ভেবেছেন।
থ্রিলার কমবেশি পড়া হয়েছে, আপনারাও অনেক পড়েছেন। থ্রিলার মানেই আমাদের কাছে টুইস্টে ভরপুর। কখনও কি এমন মনে হয়েছে যে বইটি শেষ করার পর আবার দ্বিতীয়বার পড়তে হবে রহস্য বোঝার জন্য? আমার হয়েছে এমন। "প্রাক্তন" বইটি পড়ে শেষ করার একটু আগেই। মনে হচ্ছিল লেখক উল্টাপাল্টা কী না কী লিখেছেন। এতক্ষণ তো সব ঠিকই ছিল। প্রায় শেষের দিকে গিয়ে কী এমন হাবিজাবি লিখে দিয়েছে। আমিও তো মনোযোগ সহকারেই পড়লাম। তাহলে লেখকেরই ভুল। তারপর চিন্তা করলাম একবার রকমারি তে দেখে আসি নিশ্চয়ই অন্য পাঠকরাও এই বিষয়টা নিয়ে অভিযোগ করে থাকবেন। আমিও চেয়েছিলাম লেখককে জিজ্ঞেস করতে যে শেষের বিষয়টা আমাকে বুঝিয়ে দিন। আমি বুঝিনি তেমন কিছু। কিন্তু রকমারিতে অন্যদের অনুভূতি দেখে নিজেই বোকা বনে গেলাম।
তারপর ভাবলাম আমারই বোধহয় কোথাও বুঝতে সমস্যা হয়েছে। আসলে আমি যাকে প্রাক্তন প্রথমেই ভেবে ফেলেছিলাম তাকে নিয়েই পুরো বইটার কথোপকথন কল্পনা করে ফেলেছি। অথচ প্রথম পেইজেই সুন্দরভাবে গুছিয়ে দেওয়া ছিল। আর আমি বেক্কলের মতো পড়েছি। পরবর্তীতে যে জায়গা গুলোতে কনফিউশন ছিল সেগুলো আবার উল্টেপাল্টে পড়েছি এবং এমনিতেও চিন্তা-ভাবনা করেছি তারপর বুঝতে পেরেছি।
যাইহোক, বিদেশি গল্প অবলম্বনে তৈরি হলেও এখানে তেমন কোনো সমস্যা হবে না পড়তে। শব্দচয়ন সুন্দর ও ঝরঝরে। যেকেউ পড়তে পারবেন। কোনো ভায়োলেন্স নেই। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হলেও এখানে সিরিয়াল কি*লিং এর মতো অবস্থা নেই। তাই যে কেউ অনায়াসে পড়তে পারবেন।
তবে গল্পের এন্ডিং এ অসন্তুষ্টি রয়েছে আমার। সবার শাস্তি হয়েছে কিন্তু যার জন্য একটা নিষ্পাপ শিশুর মৃ*ত্যু হলো তার কোনো শাস্তিই হলো না। সে তো বরং বেশি সুখেই রয়েছে। এখানে যাদের শাস্তি প্রয়োজন নেই বা নগন্য বলেই মনে হয়েছে তাদেরই এত বড় বড় শাস্তি হলো। অথচ সে যা করেছে তা অনুচিত। তার প্রাক্তন যদি তাকে ভালোবাসতো তাহলে এমনিতেও ছেড়ে যেত না। কিন্তু সে দোষ দিয়েছে অন্যদের ও শাস্তিও দিয়েছে তাদের৷ একবার ভাবলো না যে তার প্রাক্তন তো তাকে ভালোইবাসতো না। নাহয় অন্যের কথায় ছেড়ে গেল কেন? অন্য কেউ বললেই সুড়সুড় করে মেনে নিবে?
আর তার প্রাক্তনও একজনের পর আরেকজনকে বদলানো যেন তার ট্রেন্ড হয়ে গিয়েছিল। যদিও বিদেশি গল্পের ছায়া রয়েছে তারপরও লেখকের উচিত ছিল তার ঐ চরিত্রটাকে ফীল করানো যে সে এভাবে ভালেবাসার মানুষ বদলানোর কাজটা ঠিক করেনি তাও এত অন্তরঙ্গ হয়ে যাওয়া বিয়েই পূর্বেই। সে যেহেতু ভালোইবাসেনা মনে করে তাহলে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে লেখককে এই জায়গায় অন্তরঙ্গ হওয়ার টপিকটা ছাঁট করা দরকার। নাহলে এটাকে ধীরে ধীরে মানুষ সিম্পলি নেওয়া শুরু করবে। অর্থাৎ লিভ-ইন-রিলেশনশিপের বিষয়টা।
প্রচ্ছদও মানানসই মনে হয়েছে। প্রায় বেশি অর্ধেকটা পড়ার সময় তেমন কোনো বানান ভুল চোখে পড়বেনা। তবে শেষের দিকে কিছু টাইপিং মিসটেইক রয়েছে। এগুলো স্টোরির ভালো লাগায় ততটা প্রভাব ফেলবেনা। এটা সিম্পলি নেওয়া যায়। অতিরিক্ত ভুল হলে সেটা অন্য কথা।
প্রতিটা পৃষ্ঠায় সুন্দর কারুকার্য শোভিত ফুল,লতা,পাতা রয়েছে। এমনটা আমার পঠিত কোনো বইয়ে এখনও পাইনি। বিষয়টা ইউনিক।
কাগজের মান, বাইন্ডিং সব ভালো ছিল।
লেখকের এই বইটাই আমি প্রথম পড়লাম। আর কোনো বই সংগ্রহে নেই। একটা বই পড়েই মুগ্ধ হয়ে গেছি।
সব মিলিয়ে আমার দারুণ লেগেছে। সব বিষয় উল্লেখ করেছি। আপনার পড়তে কেমন লাগবে তা নিজেই বুঝে নিন। শুভকামনা রইল।
কায়েস সামীর লেখা "প্রাক্তন" এক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, যেখানে সম্পর্কের জটিলতা, অতীতের ছায়া, আর রহস্যময় ঘটনার এক মোহময় মিশ্রণ রয়েছে।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নাতাশা, যে একজন বুকস্টোর মালিক। যার জীবন প্রেম, স্বপ্ন আর স্বাধীনতায় ভরা । তার জীবনে হঠাৎ করেই আবির্ভাব ঘটে ডা. রাহেলের—একজন সুদর্শন, স্মার্ট ও রহস্যময় পুরুষের। তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে, কিন্তু কিছু একটা ঠিক নেই। রাহেলের অতীত যেন এক অদৃশ্য শিকলে বাঁধা, আর সেই শিকলের নাম মীরা—তার প্রাক্তন প্রেমিকা।
নাতাশা অনুভব করতে থাকে, কেউ তাকে অনুসরণ করছে। তার বুকস্টোরে কেউ ঢুকে বই তছনছ করে দেয়, দেয়ালে রক্ত দিয়ে অদ্ভুত সব বার্তা লিখে রেখে যায়। রাহেল কি সত্যিই নাতাশাকে ভালোবাসে, নাকি সে কোনো গোপন সত্য লুকিয়ে রেখেছে? আর মীরার ভূমিকা কী? সে কি সত্যিই গল্প থেকে হারিয়ে গেছে, নাকি নীরবে প্রতিশোধের অপেক্ষায়?
কায়েস সামীর লেখনী একদম শুরু থেকেই পাঠককে গল্পের গভীরে টেনে নেয়। বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করে—কোনো মুহূর্তেই বোঝা যায় না, পরের পৃষ্ঠায় কী অপেক্ষা করছে। সম্পর্কের জটিলতা, বিশ্বাস আর সন্দেহের দোলাচল এত নিখুঁতভাবে আঁকা হয়েছে যে, পাঠক নিজের অজান্তেই চরিত্রগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে।
তবে বইটির কিছু অংশ বিদেশি থ্রিলারের ছায়া মনে হতে পারে, বিশেষ করে যারা পশ্চিমা রহস্য উপন্যাসের পাঠক, তারা হয়তো মিল খুঁজে পেতে পারেন। কিছু চরিত্রের গভীরতা আরও একটু বিস্তারিত হলে হয়তো কাহিনির আবেগী দিকটি আরও বেশি শক্তিশালী হতো। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে, গল্পের রহস্য ধরে রাখার কৌশল একদম নিখুঁত।
* যারা থ্রিলার ও রহস্যময় গল্প পছন্দ করেন, যারা সম্পর্কের জটিলতা ও মানসিক দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখা উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, যারা নতুন লেখকদের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ট্রাই করতে চান তাদের জন্য "প্রাক্তন" হতে পারে চমৎকার একটি বই । এটি শুধু একটি থ্রিলার নয়, এটি এক অতীতের ছায়ার গল্প, যা পাঠকের মনে দীর্ঘদিন গেঁথে থাকবে।
📖 শেষ কথা: "প্রাক্তন" বইটি কায়েস সামীর অন্যতম আলোচিত থ্রিলার। গল্পের কাহিনি ধীরে ধীরে গা ছমছমে মোড়ে এগোয়, যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখবে। কিছু দুর্বল দিক থাকলেও, সামগ্রিকভাবে এটি একটি উপভোগ্য সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার।
প্রাক্তন পড়ার শুরুতে খুব একটা ইন্টারেস্টিং লাগেনি। কখনো মনে হয়েছিল আর পড়বো না, ২০/২৫ পৃষ্ঠা পরে ২/৩ দিন খুব ধীরে পড়েছি।তবে বাদও দিতে পারিনি দুইটা কারণে_ ১.টাকা খরচে করে কিনেছি! পড়ে দেখি। টাকার সাথে সময়ও যাক। ২. লেখক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বলেছেন সেটাই বা কোথায়? পড়তে পড়তে মাঝখানে আসলাম তো আরও বেশি বোরিং লাইতে শুরু হয়েছে। তারপরও এগোচ্ছিলাম, তৃতীয় চতুর্ভাগে এসে এতোটাই আসক্ত হয়ে পড়লাম যে শেষ করছি রাত ৩টা ৫০ মিনিটে। অর্থাৎ অর্ধেক বই এক বসাতেই শেষ করে ৪ টায় মন্তব্য করে ঘুমোতে চলেছি।
৪/৫ ⭐ বলাই আছে বিদেশী গল্প অবলম্বনে লেখা। কিন্তু কোন গল্প সেটা জানিনা তবে কাহিনী সুন্দর ছিলো। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার তাও আবার ফাস্ট পেস্ড! শেষটা আমার জন্য আনপ্রেডিক্টেবল ছিলো তাই বেশি ভালো লেগেছে।
তুমি যাকে ভালোবাসো স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো তার জীবনে ঝড়, তুমি অন্যকারো সঙ্গে বেঁধো ঘর।
প্রেম মানুষকে সুখ দেয় আবার দুঃখও দেয়। ' তোমার সাথে আমার আর যাচ্ছে না ' এই ছোটো বাক্যটার মাধ্যমে একটা প্রেমের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। দুইজন মানুষের সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক একজন মানুষের একটা কথায় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু অপর দিকের মানুষের কাছে এই বাক্যটা কতটা ভারী এর ওজন বহন করার মতো শক্তি তাঁর আছে কিনা তা ভেবে দেখলে হয়তো কোন সম্পর্ক শেষ হতো না। প্রাক্তন বলতে কোন শব্দের সৃষ্টি হতো না। সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পরে সবাই কি মুব অন করতে পারে? না পারে না হয়তো! যেমন পারেনি রাহলের প্রাক্তন। সম্পর্ক শেষ হওয়ার দুঃখ তাকে প্রতিহিংসার আগুনে দগ্ধ করতে থাকে, এবং এক সময় প্রতিশোধ নেওয়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। রাহেলের প্রাক্তনও প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মোরিয়া হয়ে উঠেছিল।
নাতাশা যখন বুকস্টোরের ব্যবসা নিয়ে চিন্তিত তখন তার পরিচয় হলো সুদর্শন ডক্টর রাহেলের সাথে। পরিচয় থেকে প্রেম। সম্পর্ক যখন গভীর হতে শুরু করল তখন হঠাৎ একদিন নাতাশা জানতে পারল সে রাহেলের জীবনের প্রথম প্রেমিকা না। এর আগেও রাহেলের আরেকজন প্রেমিকা ছিল। নাম মীরা। রাহেলের বন্ধুরা প্রতিনিয়ত মীরার প্রসঙ্গ তুলে নাতাশাকে বিব্রত করে তুলত। কিন্তু নাতাশা যখন রাহেলের কাছে মীরার প্রসঙ্গে জানতে চাইত, রাহেল চুপ মেরে যেত। এই বিব্রতকর অবস্থার ভেতর শুরু হলো আরেক উপদ্রব। নাতাশার মনে হতে থাকল কেউ একজন তাকে সব সময় অনুসরণ করছে। একদিন তার বুকস্টোরের ভেতর ঢুকে সব বই তছনছ করে দিলো কেউ। দেয়ালে র*ক্ত দিয়ে লিখে রেখে গেল আপত্তিকর একটা শব্দ। নাতাশা বুঝতে পারল এসবের পেছনে রয়েছে মীরা, রাহেলের প্রাক্তন। আসলেই কি এইসবের পিছনে রয়েছে মীরা? নাকি অন্য কেউ? পাঠক যতই নাতাশা-রাহেলের প্রেম কাহিনি পড়তে থাকবেন ততই একের পর এক ভয়ং*কর ঘটনার সম্মুখীন হবেন। আর গল্পের এক পর্যায়ে এসে বুঝতে পারবেন যে, এতক্ষণ যা যা অনুমান করে এসেছেন সব ভুল। পাঠককে আবার নতুন করে ভাবতে হবে সবকিছু। নাতাশার সকল দুর্ভোগের পেছনে আসলে কে? নাতাশার জীবনের গোপন রহস্যটাই বা কী?
'প্রাক্তন' লেখক কয়েস সামীর সাইকোলজিক্যাল জনরার বই। লেখক বইয়ের প্রথম পাতায় বলে দিয়েছিলেন 'প্রাক্তন' তার নিজস্ব কোন গল্প না, আবার লেখাটা অনুবাদও না। 'প্রাক্তন' আসলে বিদেশি গল্প অমলম্বনে লেখা। লেখক এও বলেছেন বিদেশি গল্প আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না ,তাই তিনি নিজের মতো করে গল্পের চরিত্র, তাদের সংলাপ,গল্পের গঠন,ভাষারীতি, পরিবেশ - সবকিছুই ভিন্ন রেখেছেন। কিন্তু বইটি পড়ে আমার তা মনে হয়নি, আমার মনে হয়ছে আমি হুবুহু অনুবাদ পড়ছি। এটা মনের হওয়ার কারণ আমি আশা করিছিলাম লেখক তাঁর কথা অনুযায়ী আমাদের সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে বইটি লিখেছেন। তবে বইটা পড়ে আমার মনে হয়ছে লেখক তা লিখতে ব্যর্থ। তা ভাবার কারণ হচ্ছে প্রথম ডেটে চুমু খাওয়া, লিভ টুগেটার, একই সাথে রাত কাটানো, খোলাখুলি কথা বলা, প্রথম দিন দেখা করেই হাত ধরে হাটা, একে অপরের কাছে নিজেদের ফ্ল্যাটের চাবি আদান প্রদান,রাহেদের প্রাক্তনের ফুফুর আচরণ এইসব কিছু আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় না। এই পয়েন্টগুলোর জন্যই আমার কাছে মনে হয়েছে 'প্রাক্তন ' বিদেশি বইয়ের অনুবাদ।
অন্যদিক থেকে দেখলে বইটা বেশ ইন্টারেস্টিং পল্টের গল্প। সাইকোলজিজ্যাল থ্রিলার অনুযায়ী বইটা বেশ চমৎকার ভাবে লিখেছেন লেখক। প্রাক্তন এবং বর্তমানকে শেষের দিকে এক সুঁতোতে গেথেছেন। পাঠক এক মুহুর্তের জন্যও বুঝতে পারবে না রাহেলের প্রাক্তন আসলে কে, সবাই মীরাকে তাঁর প্রাক্তন হিসেবে কল্পনা করবে শেষে গিয়ে বেশ চমকাবে। আমিও বেশ অবাক হয়েছিলাম আসল প্রাক্তনের নাম দেখে। শুরু থেকে আমি মীরাকেই রাহেলের প্রাক্তন ভাবছিলাম । মীরা রাহেলের প্রাক্তন হলেও নাতাশার পিছু নেওয়া মেয়েটি সে নয়। বইয়ের শেষ দিকে প্রাক্তন নিয়ে টুইস্টটা আমাকে ভরকে দিয়েছিল রীতিমতো। একের পর এক টুইস্ট বেশ উপভোগ করেছি আমি। একদিনে আমি কখনোই একটা বই আমি শেষ করে পারি না,দুই থেকে তিনদিন সময় লাগে। কিন্তু 'প্রাক্তন' বইটা আমি একদিনে পড়ে শেষ করেছি। প্রথম দিকে ধীরে এগোলেও আস্তে আস্তে প্রতিটা রহস্যের জাল খুলাতে পড়তে বেশ মজা লাগছিলো। লেখক পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে বেশ সক্ষম হয়েছে। পাঠক পড়তে গিয়ে নিজেরা যেইরকম ভাববে হঠাৎ করে তা পাল্টে যাবে। পাঠক ধারণাও করতে পারবে না গল্পের মোড় এভাবে ঘুরে যাবে। কিছু দিক বাদ দিলে বইটা বেশ উপভোগযোগ্য ছিল। আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। বলতে গেলে পারফেক্ট সাইকোলজি থ্রিলার বই পড়েছি।