পৃথিবীব্যাপী সংগঠনবিহীন গণআন্দোলনের একটা ধারা সূচিত হয়েছে সাম্প্রতিককালে। এ ধরনের সংগঠনবিহীন গণজোয়ার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ব্যাপক পালাবদলের সূচনা করেছে, অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট কোনো ফলাফল আনেনি। কিন্তু, এটা বিশ্বব্যাপী গণআন্দোলনে একটি অভিনব মাত্রা যোগ করেছে। সেই সঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে এসব গণজমায়েত সংগঠিত হচ্ছে আধুনিক, প্রযুক্তিগত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। গণঅভ্যুত্থান একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।
যুদ্ধাপরাধীর বিচারকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার শাহবাগে গড়ে ওঠা আশ্চর্য গণজমায়েত দেশ-বিদেশের অগতি মানুষকে আন্দোলিত করেছে। শাধিনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এক অন্যতম ঘটনা। এই জমায়েত ক্ষোভ, প্রতিবাদ প্রকাশের এক নতুন ভাষারও জন্ম দিয়েছে। এই গণজমায়েত এই বার্তাও দিচ্ছে যে আপাততভাবে ম্লান, হতাশাগ্রস্থ, দিকচিহ্নহীন বাংলাদেশের মানুষের সত্তার ভেতরে আছে এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি এবং সুযোগ মতো সেই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।
Shahaduz Zaman (Bangla: শাহাদুজ্জামান) is a Medical Anthropologist, currently working with Newcastle University, UK. He writes short stories, novels, and non-fiction. He has published 25 books, and his debut collection ‘Koyekti Bihbol Galpa’ won the Mowla Brothers Literary Award in 1996. He also won Bangla Academy Literary Award in 2016.
বইটা একটু আগে শেষ করলাম। শাহাদুজ্জামানের চিন্তার গভীরতা বরাবর মুগ্ধ করে। মনে হয় না এতো কম পড়াশোনা করে আমার পক্ষে ওনার বই নিয়ে কিছু বলাটা মানায়। শাহবাগ আন্দোলনের প্রতি অপার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে বইটা পড়েছি। লেখকের চিন্তা ধরার চেষ্টা করেছি। বুঝতে পেরেছি, যে উপর থেকে দেখলে তো দেখাই যায়, ভেতর থেকেও নানান তাত্ত্বিক বিশ্লেষনে ভালোবাসায় খামতি হয় না। আরো বুঝতে পেরেছি, কঠিন বিষয় ভেবে মেলা কিছু এড়িয়ে যাবার প্রবনতা ছাড়তে হবে। হ্যা, বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়ানোর জন্যই আমরা অনেকে বইয়ের পাতায় আশ্রয় খুঁজি, কিন্তু, মাঝে মাঝে এরকম বই মনে করিয়ে দেয় যে পালানোর ফাঁকে পৃথিবীকে আরো ভালোভাবে ধারন করতেও পড়ার বিকল্প নেই।
আমার ডায়রি লেখা হয় খাপছাড়াভাবে। আজকে লিখলাম তো লিখলাম না পরবর্তী দুই মাস, আবার তারপরে লিখলাম টানা এক সপ্তাহ। এইভাবে। কখনোই টানা লেখা হয় নি আমার, বিভূতিভূষণ যেভাবে লিখতেন সেভাবে তো হয় নি আরো। এত ডিটেইলিং এ যাওয়া আমার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব না। অথচ অনেকেই আছেন, ডায়রি খুব সুন্দর করে লিখেন। কত কত কথাই না লেখেন ডায়রিতে। আমার বোনের কথাই বলি, এমনিতে সে কোনো কিছু লেখে না, অথচ ডায়রিতে কি সুন্দর করেই না সব কিছু লিখে। আহা! পড়তেই ভালো লাগে (এখন আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না, আমি কিভাবে তার ডায়রির লেখা পড়লাম! জ্বী, অইভাবেই পড়া হয়েছে তার ডায়রি যেভাবে পড়া হয়েছিল তার প্রেমপত্রগুলো, অর্থাৎ লুকিয়ে, চুরি করে)।
বলছিলাম, আমার ডায়রি লেখার কথা। আমি কখনোই সেভাবে ডায়রি লিখি নি। মনে পড়ে, ২০০৯ সালের কথা, সেবারই যা একটু ভালো করে ডায়রি লেখা হয়েছিল আমার। খেয়াল করে দেখলাম, আমার জীবন বৈচিত্র্যহীন, এই খাওয়া ঘুমের মাঝেই সীমাবদ্ধ, নতুনত্ব তো কিছু নাইই, উল্টো পুরাতন জীবনযাপনকে বড়ই একঘেয়ে করে তোলা ছাড়া আর কিছুই করি নি আমি ডায়রি লিখে লিখে, কী দরকার এইসব অর্থহীন কথা লিখে! যে জীবন প্রতিদিন একই জিনিস দেখে সে জীবনের কথা লিপিবদ্ধ করে কী লাভ!!
আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, যে আমি ডায়রি লেখা ছেড়েই দিয়েছিলাম সেই ২০০৯ সালের পর থেকে সেই আমিই আবার কি এক আশ্চর্য কারণে ডায়রি লিখেছিলাম ২০১৩ সালে। অদ্ভুতভাবে খেয়াল করি, এই ২০১৩ সালেই ঘটেছিল শাহবাগ আন্দোলন, শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতের সমাবেশ। আরো বিস্ময়ের সাথে খেয়াল করি, এর প্রত্যেকটা জিনিস আমি কি এক ঘোরের মাঝে লিপিবদ্ধ করেছি আমার ডায়রির পৃষ্ঠায়। শাহাদুজ্জামানের "শাহবাগ ২০১৩" বইটা পড়তে পড়তে আমি ফিরে যাই আমার ডায়রির কাছে, মিলিয়ে নিই সেই উন্মাতাল দিনগুলিকে, যা এখন স্বপ্ন মনে হয়, পরাবাস্তব মনে হয়, জাদুবাস্তব মনে হয়।
আমি আমার ডায়রির পাতায় যা লিখেছিলাম তা ছিল রাজনৈতিক জ্ঞানহীন এক তরুণের কথা, অথচ শাহাদুজ্জামান তার এই বইতে সেই সময়ের প্রত্যেকটা জিনিসকে বিশ্লেষণ করেছেন তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক দিক থেকে। শাহবাগ আন্দোলন যে একসময় থেমে যেতে বাধ্য সেটাও তিনি ইংগিত দিয়েছেন তার লেখায়।
এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ অংশ ছিল তৈমুর রেজার সাথে শাহাদুজ্জামানের ই-মেইল গুলো। অনেক অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে সেই ইমেইলগুলোতে। ইসলাম-নাস্তিক দ্বন্দ্ব, বাঙালিত্ব, রাষ্ট্রধর্ম ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বেশ সুন্দর আলোচনা হয়েছে। পড়তে খুব ভালো লাগছিল।
এই বইয়ের কলাম এবং ইমেইলগুলো আজও কতটা প্রাসঙ্গিক তা ভেবে অবাক হয়েছি।
লেখক যার সাথে ইমেইল চালাচালি করেছিলেন তার ইমেইলের একাধিক বিষয়ের সাথে আমি একমত হতে পারিনি এবং তিনি নিজেও নিজের জ্ঞানের স্বল্পতার কথা মেনে নিয়েছেন এবং তার এই ধারণাগুলোর ব্যাপারে লেখক শাহাদুজ্জামান যে মতামত দিয়েছেন সেগুলো অত্যন্ত উপযোগী বলে মনে হয়েছে।