গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের প্রধান ও আবশ্যিক শর্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন। কিন্তু সেটা উকিল ব্যারিস্টারদের মুসাবিদা করার ব্যাপার নয়। স্বাধীন ও মুক্ত মানুষের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের স্বীকৃতির ওপরই রাষ্ট্রের বৈধ্যতা। গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা মানে মানুষ নিজেকে নিজে স্বাধীন ও মুক্ত সত্তা হিসাবে সুরক্ষার সনদ তৈরির প্রক্রিয়া। এই দিক থেকে নাগরিকতার অর্থ নিজের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় সম্পর্কে সচেতন হওয়া, অন্যান্য নাগরিকের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের সঙ্গে বিরোধ ও ঐক্যের জায়গাগুলো চেনা এবং ব্যক্তির ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে সমষ্টির ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের সনদ হিশাবে সংবিধান প্রণয়ন।
জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ধারণ করবার প্রক্রিয়া অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক বিকাশের দিক থেকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংবিধান ও রাষ্ট্র কায়েম হয় নি। সংবিধান রচনা করবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন সংবিধান সভা ডাকবার প্রয়োজনীয়তা ছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় নি। যাঁরা পাকিস্তানের সংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁরাই নিজেদের সংবিধান সভা বলে দাবি করেছেন। রাষ্ট্রগঠনের গোড়াতেই এই মারাত্মক ও বিপজ্জনক দুর্বলতা পরবর্তীতে রাজনীতির স্থায়ী অসুখে পরিণত হয়।
ফরহাদ মজহারের চিন্তাশীলতা ও পর্যালোচনার অসাধারণ ক্ষমতা কিংবদন্তিতুল্য। চেনা-পরিচিত ধারা ও প্রবণতাকে উল্টে-পাল্টে তার শাঁস বের করে আনায় তিনি যেমন সিদ্ধহস্ত, তেমনি প্রতিক্রিয়াশীল বাজে ধ্যান-ধারণাকে নির্মমভাবে ছুঁড়ে ফেলায়ও তাঁর জুড়ি নেই।
ফরহাদ বাংলাদেশের চিন্তাকে একটি নতুন ধারায় তাতিয়ে তুলছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে, দেখিয়েছেন যে, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানটি অগণতান্ত্রিক, বর্ণবাদী আর নারীবিরোধী; ঢালাও ইসলাম বিরোধিতার পেছনে যে পশ্চিমা বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নামে যে ইসলাম বিদ্বেষ তাও আসলে সাম্প্রদায়িকতারই নামান্তর।
Farhad Mazhar (ফরহাদ মজহার) is a Bangladeshi writer, columnist, poet, social and human rights activist, and environmentalist. He graduated with honours in pharmacy from the University of Dhaka in 1967 and worked as a pharmacist in New York in the seventies and eighties. Mazhar also studied political economy in New School of Social Research. He is the founding member and managing director of UBINIG (Policy Research for Development Alternative) a policy research and advocacy group in Bangladesh working as an integral part of the community with the grassroots people to strengthen common resistance against the dominant processes of globalisation as well as creating space for strategic negotiations whenever possible.
চিন্তাশীলতা ও পর্যালোচনার অসাধারণ দক্ষতায় চেনা-পরিচিত ধারা ও প্রবণতাকে উল্টে-পাল্টে তার শাঁস বের করে আনায় সিদ্ধহস্ত হিসেবে পরিচিত ফরহাদ মজহার। একই সাথে প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যান-ধারণাকে নির্মমভাবে ছুঁড়ে ফেলায়ও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। দেশে সত্যিকার অর্থেই গণতন্ত্র রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার তিনি। আর এই গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল চাবিকাঠি যে একটি আগাগোড়া গণতান্ত্রিক সংবিধান এই বক্তব্যও জোরালোভাবে দিয়ে আসছেন অনেকদিন ধরে।
এসব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পত্রপত্রিকায় স্পষ্ট ভাষায় লিখে আসছেন তিনি। নব্বইয়ের দশকের পুরোটা সময় থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় লেখা বিভিন্ন কলাম নিয়ে ২০০৭ সালে প্রথম বের হয় “সংবিধান ও গণতন্ত্র” বইটি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্র, গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, সরকারপদ্ধতি, আইন-আদালত, মৌলিক অধিকার, বিচার ব্যবস্থা, তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন- সবকিছু নিয়েই সহজ ভাষায় একেবারে জোড়ালো পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছেন কলামগুলোতে। তবে মোটামুটি সবকিছুতেই গুরুত্ব পেয়েছে সংবিধানের আলোচনা। সবগুলোই মূলত ফখরুদ্দিনের ৩ বছরের কেয়ারটেকার আর ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৫ বছরের দু:শাসনের আগের অবস্থার প্রেক্ষাপটে লেখা। তখনও ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থায় ৭২ এর সংবিধানের বিভিন্ন ধারাকে প্রশ্ন করে সেটাকে একটি অগণতান্ত্রিক সংবিধান হিসেবে বেশ জোড়ালো যুক্তি দেখিয়েছেন মজহার। সংবিধানের বিভিন্ন ধারার শুধুই সংস্কার নাকি পুরোপুরি নতুন সংবিধান প্রণয়ন এসব বিষয়ে সেসময় স্পষ্ট করে না বললেও দীর্ঘ ১৫ বছরের দু:শাসনের পরে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর পুরোপুরি নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবির পক্ষে বর্তমানে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন মজহার সাহেব। সেজন্য বিভিন্ন যৌক্তিক পর্যবেক্ষনও তুলে ধরেছেন তিনি তার ফেসবুক -সোশ্যালে।
আমাদের দেশের সংবিধান সম্পর্কে সাধারণ মানুষ আসলে কতটুকু জানে? শুধুমাত্র পরীক্ষায় পাশ আর আইনপেশার সাথে যুক্ত মানুষেরা ছাড়া সংবিধান বোঝার গুরুত্ব আর কারও কাছে নাই। আমাদের সকলের কাছে সংবিধান এক খটখটে মোটা অহেতুক পুস্তক। এ দিয়ে কি হয়, আর এর সম্পর্কে জেনে কী লাভ তো আমরা জানি না। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শুরু থেকেই এই সংবিধানকে ভাঙিয়ে নেয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তই ২০২৪ সাল পর্যন্ত থাকা এক ফ্যাসিস্ট সরকারের গড়ে ওঠার পেছনে অন্যতম নিয়ামক শক্তি ছিল। কিন্তু জনগন কিছুই জানে না। তারা কেবল জানে তাদের ভোটের অধিকার নেই।
সাংবিধানিকভাবে এদেশে প্রধানমন্ত্রীই একচ্ছত্র একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতার অধিকারী। এই ব্যাপারটিকেই ফরহাদ মজহার দীর্ঘদিন ধরে তাঁর লেখায় সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র বা সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র বলে উল্লেখ করে আসছেন। সংবিধান বিশেষজ্ঞ মিজানুর রহমান খানও এই ব্যবস্থাকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন- আসমানে খোদা, জমিনে প্রধানমন্ত্রী।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে অনেক আলাপ হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। একানব্বই সালে ঘষামাজা করলেও আদতে একই রকম রয়ে গেছে ধারাটি। তবে এখন আর শুধু সংষ্কার না, সংবিধানের আমূল পরিবর্তন চেয়ে আসছেন অনেকে। এ বিষয়ে ২০০৩ সালে মজহার লিখেছিলেন- বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বয়স তিরিশের বেশী হয়েছে। যদি এখনো সংবিধানের দোষ-দুর্বলতা, সংকট আমরা বুঝতে না পারি কিংবা সংবিধান পর্যালোচনা করার সৎ সাহস আমরা না দেখাই তাহলে সেটা হবে খুবই দুর্ভাগ্যের কথা। তিনি আরও বলেছেন- বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে সংবিধান। রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রাণভোমরা এই দলিলটির মধ্যেই নিহিত থাকে। সংবিধান কাগুজে হয়ে যায় যদি তার সাথে আমাদের প্রাণের কোনো যোগ না থাকে। যতদিন নাগরিকরা তাদের সংবিধান পড়ে এই এই সংবিধান তাদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও সংকল্পের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা সেই বিচারে না নামছেন ততোদিন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন বিকাশ অসম্ভব। যতদিন একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা ও প্রয়োজনে প্রাণ দেবার জন্য নাগরিকরা প্রস্তুত না হবেন ততোদিন আমাদের দুর্দষারও শেষ হবে না। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সরকার ব্যবস্থা কায়েমও অসম্ভব।
দেশের জন্য প্রাণ তো গেল অনেক। জনগণের ম্যান্ডেড নিয়ে এবার কেউ যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে আবারও পূর্বের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র চালু হওয়া অসম্ভব নয়। তাই চব্বিশ সালে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতনের পর ফরহাদ মজহার বলছেন, সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রয়োজন। আর সংবিধান যখন গণতান্ত্রিক হয় তখন আলাদা করে রাষ্ট্রধর্ম, জাতীয়তা এসব বিষয় নিয়ে কোনো মাথা ব্যথাই থাকে না। কারণ সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক দেশ জাতি ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেরই সমান অধিকার নিশ্চিত করে/করবে। সংবিধানসম্মত না হলেও নতুন করে সংবিধান প্রণয়নের সেই উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারকেই নেয়ার কথা বলেছেন মজহার। গণভোটের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়ার বৈধতাও আছে বৈকি। দেখা যাক। আগস্ট, ২০২৪