"ছেলেবেলায় রথের মেলায় কেনা চার পয়সার রঙিন-কাচের দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে একটু নাড়া দিলেই এক-একবার এক-একটা নতুন ছক হয়ে যেত , কত রকমের রঙ জায়গা পাল্টে নতুন চেহারা নিত। প্রেম জিনিসটাও ঠিক তেমনি কিনা কে জানে। আসলে হয়তো নানা রঙের কয়েকটা কাচের টুকরো নিয়েই জীবন। কাচের পিছনেই ছুটে বেড়ানো। কোনোটার রঙ লাল, কোনোটা সবুজ আবার হলদে নীল বেগুনী কিংবা কমলা রঙের। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ থেমে পড়লে তুমি, প্রেম তোমার বুকের মধ্যে একটু নাড়া দিয়ে গেল আর চতুর্দিক তোমার সাত মিশালী রঙের মেঘ হয়ে স্বপ্ন বুনে দিল। তুমি রঙিন হয়ে উঠলে। কিন্তু আবার একটু নাড়া দাও, কোথায় কি, কাচ কাচ রঙিন কাচের টুকরো শুধু ।"
বই - যে যেখানে দাঁড়িয়ে
লেখক - রমাপদ চৌধুরী।
কর্মব্যস্ত জীবন থেকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি পেতে মুসাবনি হলুদপুকুরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেড়াতে আসে অনুপম। সাঁওতাল অধ্যুষিত এই নিরিবিলি অঞ্চলে হঠাৎ করেই হাটে দেখা হয় অঞ্জলির সাথে। এই হঠাৎ দেখায় অনুপম ও অঞ্জলির মধ্যে খুশির হাওয়া বইতে থাকে।২০ বছর আগের অব্যক্ত প্রেম তাদের মধ্যে জেগে ওঠে। কিশোর বয়সের ভালোবাসা কেউ কাউকে জানাতে পারেনি কিন্তু মনের মধ্যে তা এতদিন জিইয়ে রেখেছিল। এই অচেনা জায়গায় এসে সবকিছু ভুলে গিয়ে তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে চেয়েছিল। অনুপমের পরিবার ও অঞ্জলির পরিবারের মধ্যে নিয়মিত আসা যাওয়া হতে লাগল।এই সুবাদে অনুপমের ছেলে বাপ্পা ও অঞ্জলির মেয়ে ঝুনঝুনের মধ্যে এক গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হয়।এই বন্ধুত্বের মধ্যে তারা তাদের কিশোর বয়সের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার ছায়া দেখতে পায়,যার সুন্দর একটা পরিণতি তারা দুজনেই দেখতে চেয়েছিল।
সচ্ছলতা, শান্তির সংসারে থেকেও অসুখী ছিল অঞ্জলি।তাই এই মধ্যবয়সে অনুপমের সাথে স্মৃতি জাগাতে এসে স্বামীর সাথে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। হঠাৎ একটি ঘটনার কারণে অঞ্জলির মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। স্বামীর সাথে ব্যবধান ঘুচে যায় কিন্তু অনুপমের সাথে চিরদিনের মতো দেয়াল তৈরি হয়।যে অনুপমের সান্নিধ্য সে দিবানিশি কামনা করতো, সেই অনুপমের উপস্থিতি তার কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।ফলে বাপ্পা ও ঝুনঝুনের মধ্যকার বন্ধুত্ব পরিণতির আগেই থমকে যায়।
ছোট সাধারণ একটি গল্প। কিন্তু সম্পূর্ণ গল্প জুড়েই রয়েছে লেখকের কথাসাহিত্যের নিপুণ ব্যবহার।