তার নাম বৃষ্টি। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরে মেয়েটির জন্ম। ছেলেবেলা থেকে কিছু মূল্যবোধকে আশ্রয় করে সে বড় হয়েছে। মধ্য কলকাতার এক ভাড়াবাড়িতে ব্যাঙ্ককর্মী সুদীপ্ত সেনমজুমদারের বউ হয়ে এল বৃষ্টি। শ্বশুরবাড়িতে তাকে থাকতে হয় শাশুড়ি কল্পলতা, সুদীপ্তর দাদা প্রদীপ্ত, বউদি মনামির সঙ্গে। এই বাড়িতে এসে বৃষ্টি আশ্চর্য হয়ে দেখে, মানুষ কেমন অক্লেশে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে, অন্যকে বঞ্চিত করে নির্দ্বিধায়, অনর্গল মিথ্যাভাষণেও লজ্জিত হয় না। মধ্যস্বত্বভোগী এই নির্লজ্জ মানুষগুলো অন্যায়ের স্তূপের উপর বসে থাকে নির্বিকার চিত্তে, চরম পরিতৃপ্তিতে। জীবনের এই অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।
উপন্যাসটি শারদীয় আনন্দবাজার ১৪১৪ পত্রিকায় ‘হলাহল’ নামে প্রকাশিত।
হর্ষ দত্তর জন্ম ১৯৫৫, কলকাতায়। পড়াশোনা করেছেন বঙ্গবাসী কলেজ-স্কুল, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপনা বৃত্তির সঙ্গে নিযুক্ত থাকবেন- এই লক্ষ্যে সাধ্যমতো পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণির এম.এ এবং এম.ফিল।অধ্যাপনার সুযোগ পেলেও, আশির দশকে রাজনীতি-অধ্যুষিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবল প্রকোপে, এই পথে যেতে পারেননি। গ্রহণ করেছিলেন সাংবাদিকতার বৃত্তি।রামকৃষ্ণ-ভাবান্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আছেন আবাল্য। অস্ট্রেলিয়া, চিন, আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং ইত্যাদি দেশে সাহিত্যসংক্রান্ত আমন্ত্রণে ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজে পরিভ্রমণ করেছেন।লেখক হিসেবে স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। যেমন সমরেশ বসু সাহিত্য পুরস্কার, বিচয়ন সাহিত্য পুরস্কার, নিবেদিতা পুরস্কার, দ্বিজেন্দ্রলাল স্মৃতি পুরস্কার, আনন্দ-স্নোসেম পুরস্কার, তারাপদ বসু পুরস্কার ও উত্সব সম্মান।
প্রতিটি মানুষের একান্ত নিজস্ব কিছু চিন্তা ভাবনা বা ইচ্ছে থাকে। এগুলো খুবই ব্যক্তিগত হয়। আর এই ব্যক্তিগত ইচ্ছা গুলো হয়তো খুব কাছের কাউকে বলা যায় আবার একান্ত নিজের কাছেই থেকে যায়। তবে একজন মানুষ মারা গেলে তার সেই ব্যক্তিগত ইচ্ছা গুলো আর ব্যক্তিগত থাকে কি? না, তখন তা পরিবার, সমাজ ও সংস্কারের কাছে পৃষ্ঠ হয়ে যায়। যেমন ভাবে দয়াময় সেনমজুমদারের শেষ ইচ্ছে টা পৃষ্ঠ হয়েছে- পরিবার, সমাজ আর সংস্কারের হাতে। বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিটের চারতলা বাড়ীর তিনতলার পুরোটা নাম মাত্র ভাড়া দিয়ে থাকেন। দুই ছেলে ভালো চাকরি করেন, কোন অভাব নাই। রিটার্ড করার পর দয়াময় বাবুর খুব ইচ্ছে হলো নিজের শরীর টা মারা যারার পর মেডিকেলের ছাত্রদের দান করার। সেই মত সব কাগজপত্র সব সই করে গোপনে রেখে দিলেন। দুপুরে ভাত ঘুমের পর প্রতিদিন বিকালে তিনি ছোট ছেলের বউ বৃষ্টির সাথে গল্প করতে খুব ভালোবাসেন। তেমনই এক বিকালে নিজের ইচ্ছার কথা জানালেন বৃষ্টি কে। এরপর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থেকে স্ত্রী ও ছেলেদেন জানালেন। হাসপাতালে যমে মানুষে টানাটানি করে অবশেষে দয়াময় বাবু মারা গেলেন। তার সাথে সাথে ই পরিবারের লোকেরা ভুলে গেলেন দয়াময় বাবুর শেষ ইচ্ছেটা। তবে একজন মানুষ মনে রাখলেন সেই ইচ্ছার কথা। তবে পরিবারের নতুন বউ তাকে গুরুত্ব দেবার মত মানসিক প্রশস্ততা এদের নাই। সেই থেকে শুরু, তবে শ্বশুর বাড়ী এসে থেকেই বৃষ্টি দেখে অন্যায় সঙ্গে আপোষ করে, অন্যকে বঞ্চিত করে কি সুন্দর ভাবে নির্দ্বিদায় এরা টিকে আছে, লোন অনুতাপ অনুশোচনা নাই। এই সব অন্ধকারের মধ্যে থেকেও বৃষ্টি আত্মসম্মান বিসর্জন না দিয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, সত্য থেকে কখনও সরে আসে না। এতে তার এই প্রতিবাদীতা ও সত্যবাদীতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে?
লেখক হর্ষ দত্ত এর উপন্যাস "অগ্নি বৃষ্টি "। একটা বলিষ্ঠ নারী চরিত্র, যা আর দশটা নারীর মত সাধারণ জীবনে অভ্যস্থ হয়ে নিজের স্বার্থ নিয়ে টানাটানি করে জীবন পার করে দিতে রাজি না। অসাধারণ এক উপন্যাস যা আমাদের এই সমাজেরই এক প্রতিচ্ছবি।