ঊধর্বতন-অধস্তন কিংবা উত্তমর্ণ-অধমর্নের মধ্যে যে-কোনও সম্পর্কই কি প্রভূ আর কুকুরের সম্পর্ক? সই জাল করার অভিযোগে চাকরি খোয়ানোর মুহূর্তে অনিরুদ্ধর মাথায় আচমকা এসেছিল কথাটা। সেই আইডিয়ার সূত্র ধরেই সায়ন্তনের সংস্পর্শে আসে অনিরুদ্ধ। এক নতুন কর্মকাণ্ডের রূপরেখা ক্রমশ আদল পেতে থাকে। তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় টিভি সাংবাদিক প্রমিত ব্যানার্জি, কলমচি কিংশুক, নায়িকা রূপমতী, গায়ক পিয়াল। না জড়িয়েও জড়িয়ে থাকে অনিরুদ্ধ স্ত্রী অন্তরা, অন্তরার বান্ধবী সংস্থিতা, সংস্থিতার শিক্ষিকা কেয়া মৈত্র। মানুষগুলিকে ঘিরে গড়ে ওঠে সম্পর্কের একেকরকম ত্রিভুজ যার কোনওটায় মাথাচাড়া দেয় ক্ষমতালিপ্সা, কোথাও প্রেম, কোথাও-বা বৈরাগ্য। বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আদ্যন্ত কৌতুহলকর টানটান উপন্যাসে জেগে আছে সেই অভিজ্ঞান, যেখানে একাকার হয়ে গেছে গরল-অমৃত।
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম কলকাতায়। বাবা খ্যাতনামা সংস্কৃত পণ্ডিত, স্বর্গীয় পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; মা গৌরী বন্দ্যোপাধ্যায়। পিতৃকুল নিঃসম্বল উদ্বাস্তু, মাতৃকুল মলুটির রাজপরিবার। প্রথম কবিতা প্রকাশ পায় সাউথ পয়েন্ট স্কুল ম্যাগাজিনে। প্রথম গল্প ‘উনিশ-কুড়ি’ পত্রিকায়। প্রথম উপন্যাস, শারদীয় ‘দেশ’ পত্রিকায়, ২০০৭ সালে। লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। কবিতার জন্য পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার, বাংলা আকাদেমি শক্তি চট্টোপাধ্যায় পুরস্কার, ভাষানগর পুরস্কার ইত্যাদি। গদ্যের জন্য পেয়েছেন শর্মিলা ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার। লিখতে ভালবাসেন এমন লেখা যা আমরা পড়তে চাইলেও লেখার সাহস পাই না। আইওয়া আন্তর্জাতিক লেখক শিবিরে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ২০১৪ সালে। ঠাকুর শ্রীশ্রী দুর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেবের শিষ্য। শখ: নতুন বই, পুরনো গান।
একদম সাদামাটা প্লট আর মনে-দাগ-কাটা চরিত্রের অভাব পুষিয়ে দিচ্ছিল বিভিন্ন চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এগিয়ে চলা গল্পের প্রবাহ আর মাঝেমাঝে খোলামকুচির মতো লেখকের জীবনবোধ। তবে শেষের অংশটা খুব অগোছালো ।উপন্যাসের এই অদ্ভুত নামকরণ যে কারণে সেটাই অনেকটা গৌণ হয়ে গেছে শেষে এসে। তাই শেষে যখন লেখক বারবার কুকুরের সাথে তুলনা টানেন মানুষের ব্যবহারের সেটা বড্ড বেশি চোখে লাগে। আরও যেটা চোখে লাগল পুরো উপন্যাস জুড়েই যেন একটা অজুহাত দেওয়ার চেষ্টা। চরিত্রেরা নিজেদের ন্যায়সঙ্গত দেখতেই চাইবে কিন্তু লেখক নিজেও যেন সূক্ষ্মভাবে সমঝোতার রাস্তায় দেখাতে চাইলেন। তাই চরিত্রেরা কেউই ঠিক জায়গা করতে পারল না। যেমন জায়গা করতে পারল না সম্পর্কের জটিলতার নামে শুধুই পাঁক ঘাঁটা আর শরীর শরীর খেলা। তাই দীর্ঘদিনের সম্পর্কে ইতি পড়ছে দেখে কোনরকমে কান্না চেপে রাখা কিংশুকের জন্য এতটুকুও মন খারাপ হয় না, দুদিন আগে অন্য মেয়েদের প্রতি তার দুর্বলতা দেখে। এত বেশি শারীরিক আর টক্সিক না দেখিয়েও সম্পর্কগুলো গোছানো যেত। পাঠক হিসাবে আমার মনে হয়েছে অগোছালোভাবে শুরু করে লেখক বইয়ের মাঝামাঝিতে গল্পকে চূড়ান্ত বিন্যাস দিতে পেরেছিলেন যেটা আবার শেষে আসার পথে খেই হারিয়ে ফেলেছে। স্বল্প পরিসরে এতগুলো চরিত্র চিত্রণ আর সমান্তরালে গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় লেখক মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। যদিও উপন্যাস শেষ হওয়ার পর কোনো চরিত্রই আর সাথে থাকেনি।তবে আবারও স্বীকার করতেই হয়, লেখকের লেখায় প্রাণ আছে, মেলোড্রামা আর অগভীর মেকি কিছু জায়গা বাদ দিলে লেখকের জীবন বোধও ভালো লেগেছে।এই সুন্দর ঝরঝরে লেখনীর কারণেই গল্পটা একবার পড়ে দেখা যায়। শেষের হাস্যকর প্যানপ্যানে মেলোড্রামা হুড়মুড় করে পেরিয়ে যেতে পারলে ভালোই লাগবে। ২.৫ তারা
সম্প্রতি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস ভৌ পড়া শেষ করলাম। উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে অনিরুদ্ধ নামে একজন ব্যক্তি যে চাকরি হারানোর পর একটি রেডিও স্টেশন খোলার পরিকল্পনা করে। রেডিও স্টেশনটির নাম স্থির করে "ভৌ"... যেটা হলো কুকুরের ডাক। আসলে কি ঊর্ধ্বতন-অধস্তন অথবা উত্তমর্ণ-অধমর্ণ এই সম্পর্কগুলি আসলে প্রভু এবং কুকুরের সম্পর্ক?? এই তুলনা এবং প্রশ্ন বারবার এসেছে উপন্যাসটির বিভিন্ন চরিত্রগুলির মধ্যে। উপন্যাসের মধ্যে বারবার আসা চরিত্রগুলি ক্ষমতার দখল, প্রেম, ছলনা, লোভ, মানবিকতা এই সকলের মধ্যে দিয়ে বাস্তব রূপ পায়। অনিরুদ্ধ যেমন চেয়েছিলো যে তার রেডিও স্টেশন ভৌয়ের শ্রোতা হয়ে উঠুক আট থেকে আশি সকলে... তেমনি ভৌ উপন্যাসটি সকলের পড়া উচিৎ বাস্তবিকতাকে খুব নির্মমভাবে বোঝার জন্যে। উপন্যাসের চরিত্রগুলির ক্রমাগত ভাঙাগড়া এবং তাদের টানাপোড়েন মনে বড় দাগ কেটে যায় এবং পাঠককে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। এই কারণেই ভৌ উপন্যাসটি সকলকে পড়তে অনুরোধ জানালাম।