বইটা হাতে নিবেন। তারপর দেখবেন আপনি প্রেমে পড়ে গেছেন। কেন সেটা না বলি (পাঠক হাতে নিলেই অনুভব করবেন)। তারপর বইটার ভিতরে ঢুকলে ওঙ্কারনাথের করা হেডপিসগুলোতেও তীব্র আকর্ষিত হবেন। বলা বাহুল্য এর প্রত্যেকটা হেডপিস গল্পগুলোর মূল জিনিসটাকেই কিন্তু উপস্থাপন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে এখন গল্পগুলো কেমন? আমার মতো প্রত্যেকটা গল্প উপাদেয়। ঝরঝরে সাবলীল লেখা। তবে কয়েকটা গল্পে বিদেশী গল্পের ছায়া আমি দেখতে পেয়েছি। কিছুটা আরবান লেজেন্ডস কে নিয়ে গল্প ফাঁদলে যেমন হয় আরকি। বড় ছোট মিলিয়ে সব গল্প আমাকে তৃপ্তি দিয়েছে। মেলানকোলি প্রথম খন্ডটা না পড়ে রেখে দেওয়াটা দেখছি ঠিক হয়নি।
ছোটো আকারের, মাঝারি প্রস্থের একটা গল্প-সংকলন। তাতে আছে মন-কেমন আর চোরাভয় মেশানো এক ডজন ছোট্ট গল্প। আপাতদৃষ্টিতে এমন সংকলন মোটেই দুর্লভ নয়। শুধু বইমেলাতেই নানা শেডের অন্ধকার বুকে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ডজনখানেক সংকলন। কিন্তু... কিন্তু যদি সেইসব বিষণ্ণ অন্ধকারের জন্মদাতা লেখকটি হন কৌশিক সামন্ত? তখন ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যায় বইকি। আলোচ্য বইটিও সেজন্য অন্যরকম। কিন্তু কতটা 'অন্য' সে? আর কেনই বা তাকে আলাদা করছি এমন আরও বহু সংকলনের থেকে? আগে লিখি, কী-কী গল্প আছে এই বইয়ে। তারা হল~ ১. বইমেলায় কেন বউকে নিয়ে আসি না; ২. জাজমেন্ট ডে; ৩. শেফালি অন দ্য রকস্; ৪. কুলুপাহাড়ের গাছবুড়ি; ৫. রস; ৬. ব্লু চেয়ার; ৭. হো হো মেরি ক্রিসমাস; ৮. মাঝদরিয়ায় আইল তুফান; ৯. ট্রিপল টেলস্; ১০. চাবি; ১১. খাটের তলায়; ১২. চর পাহারা। কোন গল্প কী নিয়ে, কোনটার মধ্যে আছে লাভক্র্যাফটীয় ভুবনের ইশারা, কোথায় রূপকথার আশীর্বাদ বদলে গেছে অভিশাপে, আর কোন কাহিনিতে স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নের দুঃসহ রূপান্তরের ডার্ক ফ্যান্টাসি আমাদের পেঁচিয়ে ধরেছে অচ্ছেদ্য বন্ধনে— তার আলাদা করে বিবরণ দেব না দেওয়ার দরকারই নেই। ছোট্ট এই বইটা স্টারি নাইটের হাতছানিতে একবার আপনার হাতে উঠে এলে আপনি বুঝতেও পারবেন না, কখন চারপাশে ঘনিয়েছে এক বিষণ্ণ, একাকী, গুমরে মরা অন্ধকারের রাত। মেলানকোলির রাত। লেখকের লেখনী এই ক'বছরে হয়েছে আরও ক্ষুরধার। হয়তো সেজন্যই সূক্ষ্ম আঁচড়ে গভীর, সহজে ভরাট হয় না এমন ক্ষত তৈরি করতে পারে এই গল্পরা। তবে ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের হেডপিসগুলো এক্ষেত্রে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছে; তাই তাঁকেও আলাদাভাবে ধন্যবাদ দিতে হচ্ছে। যদি অন্ধকারের অনুরাগী হন, যদি অভ্যস্ত চলনের বাইরে গিয়ে অন্যরকম চরিত্র আর ঘটনার সান্নিধ্যে এসে মুহূর্তের জন্য সেই সর্বগ্রাসী অনস্তিত্বকে স্পর্শ করতে চান, তাহলে এই বই অবশ্যই আপনার জন্য।
মেলানকোলি অর্থাৎ বিষাদ অর্থাৎ দুঃখ। এই দুঃখ বা বেদনা জিনিসটা মনে হয় আমাদের মানব জীবনের একটা অন্যতম গুরুত্বপুর্ন বিষয়, কারণ এটা না থাকলে হয়তো আমরা খুশি হওয়ার অনুভূতি কি, বুঝতে পারতাম না। কিন্তু সেটা আবার অন্য বিষয়। সেটা নিয়ে নাহয় অন্য কোন দিন কথা বলা যাবে। আজকে বরং এমন একটি বইয়ের কথা বলি যেখানে এই দুঃখ বিষয়টা রয়েছে, তবে অলৌকিকতার মোড়কে, সেটা হল মেলানকোলির রাত এর দ্বিতীয় খন্ড। বইটির শুরুতেই রয়েছে সুলেখক ঋজু গাঙ্গুলি বাবুর ভুমিকা। ওনার সেই লেখনীকে বেস করেই, বিষয়টি বলি আমি। এই বইতে যে কাহিনীগুলি রয়েছে, তাদের রুপময়তা ও গভীর অন্ধকারের কথা মনে রাখলে হয়তো জীবনানন্দের কবিতাকেই আশ্রয় করা উচিৎ। এই গল্পগুলিতে অবসাদ নেই, তবে আছে এক অদ্ভুত একাকীত্ব, যার মধ্যে রয়েছে অসহায়তা, আছে রক্তাক্ত হৃদয় আর আছে ভয়। প্রায় প্রতিটা গল্পেই পাওয়া যাবে ঝড়ের রাতে বেরিয়ে পড়া কোন না কোন একলা পথিককে। এই সংকলনে রয়েছে মোট ১২ টি কাহিনী। নিজের প্রথম পার্টের উত্তরসুরি হিসেবে মেলানকোলির রাত ২ খুবই দারুণ একটি সংযোজন হয়েছে বলেই আমার মনে হয়েছে। যারা এই সিরিজের প্রথম পার্ট পড়েছেন এবং পছন্দ করেছেন, তাদের বলবো, এই দ্বিতীয় পার্টটিও আপনাদের পছন্দ হবেই। এছাড়া যে কোন অলৌকিক সাহিত্য প্রেমী মানুষদের কেও আমি অতি অবশ্যই এই বইটি রেকমেন্ড করবো। আর হ্যাঁ, এখানে আরেকটি কথা বলা দরকার যে, কেউ যদি এর প্রথম পার্ট না পড়ে ডাইরেক্ট দ্বিতীয় পার্ট পড়তে চান, তাতেও কোন অসুবিধা নেই। প্রতিটা কাহিনীই যেহেতু স্বতন্ত্র তাই দ্বিতীয় পার্ট আগে পড়লেও কোন অসুবিধা হবে না।
🌞বহুদিন ধরে অনেক বইয়ের রিভিউ লিখে আসছি। বেশিরভাগ সময়েই সে কাহিনীর ছোট্ট বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি নিজের ভাষায়। কিন্তু আজ এই বইটি পড়ার ক্ষেত্রে মনে হল, সেই ধরন থেকে সরে এসে অন্য কায়দায় লেখা যাক।
✨কয়েকদিন ধরেই যা মেঘের ঘনঘটা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে গল্পের বইতে মজে থাকা সকল বইপ্রেমীর কাছেই স্বাভাবিক। গত পরশু হাতে নিয়ে নিয়েছিলাম, কৌশিক সামন্তর লেখা,❝মেলানকোলির রাত ২❞ বইটি।
🌧️ যা কিছু ব্যক্তিগত/থিম বর্ণনা:- আমিই একমাত্র যে বোধ হয়, নতুন থেকে শুরু করে পুরাতনের দিকে যাই। ❝নভেম্বর রেইন❞ দিয়ে দাদার লেখা পড়তে শুরু করার পরে এই বইটি ধরলাম।
🌻পাঠ প্রতিক্রিয়া:- বইটিতে রয়েছে ভিন্ন সাথে বারোটি গল্প। ভিন্ন স্বাদের এজন্যই বলছি কারণ ,কোনো গল্পের সাথে কোনো গল্পের কানেকশন নেই। হ্যাঁ তবে ❝নভেম্বর রেইনের❞ ক্ষেত্রে শেষে যে চমকখানি পেয়েছিলাম, তা এখানকার প্রায় প্রতিটি গল্পেই পেয়েছি। গল্পের নামগুলোও বেশ খাসা, অন্যধরনের, শুনলেই যেন পড়তে ইচ্ছা করে। প্রতিটি গল্পের মধ্যেই রয়েছে যেমন রোমান্টিসিজম+মেলানকোলি'র এক পারফেক্ট কম্বিনেশন। এই দুই ওতপ্রোতভাবে বিন্যস্ত হয়ে সৃষ্টি করেছে কিছু না বলা কথার। লেখকের গল্পের স্টোরিটেলিং যথেষ্ট শক্তিশালী। শুধু যে কল্পনার আশ্রয় নিয়েই লেখক কাহিনী গুলোকে সাজিয়েছেন এমনটাই নয়! কিছু কাহিনী এমনও রয়েছে যা আমাদের গল্প, দৈনন্দিন জীবনে ঘটতে থাকা গল্প। বইয়ের পেছনে মলাটে লেখাই রয়েছে,'১০০% স্যাচুরেটেড হ্যালোজেন হৃদয়' সত্যিই তাই। গল্পগুলো কেমন জানি আমাদের কথা বলে, সাধারনদের কথা, বাস্তব জীবন থেকে ফ্যান্টাসি, রোমান্টিসিজম থেকে না পাওয়ার ক্লেশ, ট্রাজেডি এবং কল্পনাতীত টুইস্ট, পরিশেষে বিষাদ। আর সে কারণেই বইয়ের নাম ❝মেলানকোলির রাত ২❞ রাখাটা যুক্তিযুক্ত।
🍃 শুধুমাত্র চরিত্রের চরিত্রায়নই নয়, তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্ক যেন ফিজিক্স বা ম্যাথমেটিক্সের রিলেশন-ভেক্টরের মতই গড়ে উঠেছে। একটি গল্পের মাঝে আমার নাম দেখে আমি বেশ খুশি হয়েছি। 'জাজমেন্ট ডে' তে লেখক যেমন এক ভয়াল কাহিনী, তীব্র অনিশ্চয়তা কে তুলে ধরেছেন, তেমনি 'চাবি' গল্পে লেখক দৈনন্দিন জীবনে চলতে থাকা খেঁটে খাওয়া মানুষদের বেঁচে থাকার রসদের খোরাক জুগিয়েছেন।
✨ এই বইতে থাকা যে কাহিনীগুলি একেবারে আমার মন ছুঁয়ে গেছে» ১. জাজমেন্ট ডে ২. কুলুপাহাড়ের গাছবুড়ি ৩. রস ৪. মাঝদরিয়ায় আইল তুফান ৫. চাবি ৬. চর পাহারা
🌧️ সব মিলিয়ে দারুন লেগেছে। অলংকরণগুলি জাস্ট ফাটাফাটি। প্রচ্ছদটি বইয়ের নামের সাথে মানানসই রেখে করেছেন শিল্পী কৃষ্ণেন্দু মন্ডল। অরণ্যমন প্রকাশনী একের পর এক যেভাবে মারাত্মক কন্টেন্ট আনছে, সত্যি বইগুলো না পড়ে থাকা যায় না।