চারজন কিশোর। একই স্কুলে পড়ে। একসঙ্গে সারা দিন ঘোরে, খেলে, আড্ডা দেয়। টাকা থাকলে রেস্টুরেন্টে ঢোকে। না থাকলে পানি খেয়ে চলে আসে। আর দশটা কিশোরের মতোই তাদের জীবন। কিন্তু স্কুলের এক বড় ভাইকে একটা বিপদ থেকে বাঁচাতে অনেক বিপদে জড়িয়ে পড়ে তারা। বিপদ ঘিরে ফেলে তাদের চারপাশ থেকে। আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে, তারা চারজনও ঘিরে ফেলে বিপদকে। তারা বিপদ থেকে মুক্তি পায় কীভাবে? টানটান একটা সময়! চিনে নিতে পারেন সেই চার কিশোরকেও।
আমার মনে হয়, প্রত্যেকের জীবনেই বন্ধু বানানোর একটা সময় থাকে। আর সেটাকে আমরা শৈশব-কৈশোর হিসেবে চিনে থাকি। এই সময়টা পেরিয়ে গেলে পরবর্তীতে জীবনে যারা আসে- তারা বড়জোর ক্লাসমেট হয়, ব্যাচমেট হয়, সহকর্মী হয়, পার্টনার হয়... কিন্তু বন্ধু আর হয়ে ওঠে না।
‘হাফপ্যান্ট’ উপন্যাসের গল্প-কাহিনি গড়ে উঠেছে এমনই এক নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বকে ঘিরে। রাতুল, অতুল, মন্টু এবং সাইদ; চারজন কিশোর। একই স্কুলে পড়ে, ক্লাস এইটে। একসঙ্গে সারা দিন ঘোরে, খেলে, আড্ডা দেয়। টাকা থাকলে রেস্টুরেন্টে ঢোকে। না থাকলে পানি খেয়ে চলে আসে। আর দশটা কিশোরের মতোই তাদের জীবন।
কিন্তু স্কুলে হাসিব নামের এক বড়ভাইকে একটা বিপদ থেকে বাঁচাতে অনেকগুলো বিপদে জড়িয়ে পড়ে তারা। বিপদ ঘিরে ফেলে তাদের চারপাশ থেকে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, তারা চারজনও ঘিরে ফেলে বিপদকে! সেই বিপদ থেকে তারা মুক্তি পায় কীভাবে? এটাকে কেন্দ্র করেই কাহিনি এগিয়ে যায়।
বইয়ের বৃহৎ একটা অংশজুড়ে রহস্য এবং তার সমাধানে চার কিশোর ছিল বদ্ধপরিকর। একের পর এক ঘটনা, সমূহ বিপদ ও তা থেকে পরিত্রাণের মজার-বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল টানটান উত্তেজনা তৈরি করে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে কৈশোর জীবনের যে চিত্র শব্দ-কালিতে এঁকেছেন লেখক, তা তৃপ্ত করেছে হৃদয়কে। স্কুলের চার দেয়ালে ঘেরা দুরন্তপনা, পাড়া মহল্লায় স্বাধীনভাবে ছুটে বেড়ানো, পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে জাতপাত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বন্ধুত্বের টানে একদল কিশোরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা, সুখে-দুখে একে-অপরের পাশে থাকা; এটা সম্প্রীতির এক অটুট বন্ধনের কাহিনি। সেইসাথে আমরা দেখতে পারি- কীভাবে সমাজের অসঙ্গতিগুলো কত সহজেই বড়দের নজর এড়িয়ে যায়, অথচ কিশোরদের সরল দৃষ্টিতে তা ধরা দেয়। আর পরিবর্তন চাইলে যে কারো মাধ্যমেই আসতে পারে। বয়স ও অভিজ্ঞতা সেখানে বাঁধা তৈরি করতে পারে না।
লেখক তার বইয়ের ভূমিকাতে কয়েকটি কথা বলেছেন, ‘কিশোর উপন্যাস মূলত ঘুরেফিরে কোনো লেখক বা তাঁর আশপাশের কারও কিশোরজীবনী। যে সময়কে তিনি দেখে এসেছেন, সে সময়টাই কোনো না কোনোভাবে হয়ে ওঠে তার উপন্যাসের বিষয়বস্তু। এই উপন্যাসের কোথাও কোথাও হয়তো আমার জীবন আছে কিংবা আছে আমার আশপাশে দেখা বন্ধুদের জীবন। যে জীবন হয়তো আপনাদেরও, তোমাদেরও।’ এই কথাগুলোর সাথে সম্পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করছি। নিজের পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, উপন্যাসের অসংখ্য ছোট-বড় ঘটনার মাঝে একটিবারের জন্য হলেও নিজের শৈশবকে খুঁজে পাবেন। এর ব্যত্যয় ঘটবে না।
ও হ্যাঁ, বইয়ের নাম কেন ‘হাফপ্যান্ট’ অথবা কাহিনিতে হাফপ্যান্ট নিয়ে কী এমন ঘটনা রয়েছে, তা উল্লেখ করে স্পয়লার দিতে চাই না। কেবল এই রিভিউ নয়, বইটি পড়ার সময় এর রহস্য উদঘাটন করে আপনার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠুক, এমনটাই প্রত্যাশা করি।
সংক্ষেপে যদি বইয়ের লেখনশৈলী, বানান এবং সম্পাদনা নিয়ে কিছু বলতে হয়, তাহলে বলব- গল্প বলার ঢং, শব্দচয়ন, বাক্য গঠন ও সার্বিক লেখনশৈলী অত্যন্ত সাবলীল এবং মার্জিত ছিল। কোথাও কোনো বিচ্যুতি, অসঙ্গতি নজরে আসেনি। উপন্যাসের চরিত্র গঠনে, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কিশোর বয়সীদের চিন্তাধারা, কর্মকাণ্ড বেশ সুগঠিত ছিল। বর্ণিত দৃশ্যের বর্ণনা এতটাই ঝরঝরে আর সুন্দর ছিল যে, স্পষ্ট কল্পনায় ভাসছিল। অদূর ভবিষ্যতে এই উপন্যাসকে চাইলে টেলিফিল্ম রূপ দেওয়া সম্ভব। বইয়ের সম্পাদনাও যথেষ্ট ভালো ছিল। পুরো উপন্যাসে মাত্র দু’টো ভুল নজরে পড়েছে। ৮১ পৃষ্ঠার শেষ সংলাপটি অতুলের ছিল, কিন্তু সেখানে নাম চলে এসেছে রাতুলের। আরেকটি- ১১৬ পৃষ্ঠায় ‘বলল’ শব্দটি ভুলবশত ছাপা হয়েছে ‘বলর’।
এই বইটি যতটা ছোটদের-কিশোরদের, ঠিক ততটাই বড়দেরও। অফিসের কাজে কিংবা সারাদিনের ব্যস্ততায় যদি হাঁপিয়ে ওঠেন, ১০ মিনিটের বিরতিতে বইয়ের কয়েক পাতা পড়ুন। টাইম মেশিন ছাড়াই নিজের সোনালি অতীত ঘুরে আসতে পারবেন! শৈশব-কৈশোরের সুন্দরতম স্মৃতি রোমন্থনের জন্য এটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে। ক্রাউন সাইজের মাত্র ১২৬ পৃষ্ঠার এ বইটি একবসাতেই পড়ে ফেলা সম্ভব। লেখাও হয়েছে এমন পাঠকদের কথা ভেবে, যারা বর্তমানে কৈশোরের সময়টা কাটাচ্ছেন অথবা কাটিয়ে এসেছেন। যারা কিশোর উপন্যাস পছন্দ করেন, তারা সময় সুযোগ করে পড়তে পারেন। হ্যাপি রিডিং। .
বই: হাফপ্যান্ট লেখক: ইশতিয়াক আহমেদ প্রচ্ছদ: রাজীব রায় রাজু ধরন: কিশোর উপন্যাস প্রকাশনী: প্র প্রকাশন মলাট মূল্য: ২৬০