কঙ্কাবতীর জগৎ… সেই প্রাচীন কঙ্কাবতী, আদি অকৃত্রিম, যাকে নিয়ে আজ থেকে একশো বত্রিশ বছর আগে গল্প লিখেছিলেন স্বয়ং ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু আমরা জানি না, এক দীর্ঘ সময়ে সেই জগৎও পরিবর্তন হয়ে গেছে বহু। বাংলায় লেখা সেই প্রথম কল্পকাহিনি ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক বীভৎস খেলা। সে খেলা যতখানি কাল্পনিক, তার থেকে অনেক বেশি বাস্তবের। মধ্যে মধ্যে সোনালি সুতোয় নকশা তোলার মতো বুনে গেছে এক অদ্ভুত অলংকারের গল্প। কয়েক হাজার বছর আগে সেই অপরূপ অলংকার তৈরি হয়েছিল এই ভারতের মাটিতেই, তারপর প্রবাদকথন হয়ে হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। কঙ্কাবতীর জগতের অষ্টপাশের গোলকধাঁধায় নীলকমল কি কন্যের সঙ্গে থাকবে শেষ অবধি? নাকি স্বর্গদেও আর পাতরগণ্যদের এই কূটখেলায় মাঝপথে হাত ছেড়ে যাবে তাদের? এক রূপকথা নিয়ে লেখা আরেক অরূপকথার গল্প। পশ্চিমবাংলার প্রথম মেটাফিকশন ফ্যান্টাসি থ্রিলার উপন্যাস, ‘কালসন্দর্ভা’ সিরিজের দ্বিতীয় বই, ‘কুহককাল’।
একশোরও বেশি বছর আগে গঙ্গার বুকে এক চরে একটি মেয়েকে 'সতী' করা হয়েছিল। ব্যাপারটা ঠিক একতরফা হয়নি। চিতা জ্বলে ওঠার পাশাপাশি অন্য কিছু একটা ঘটেছিল সেখানে। তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেনি; তবে সেই ঘটনায় যে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, তা অনেকেই জানত। তারপর ইতিহাসের অমোঘ চলনে সেই ঘটনাক্রম হারিয়ে গেছিল বিস্মৃতির অতলে। কিন্তু... দুর্ঘটনার শিকার এক কিশোরী, স্বর্ণশিল্পী তথা ব্যবসায়ী হিসেবে স্বনামধন্য পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান, সর্বস্ব হারানো এক লেখক, নিঠুর খেলায় সবাইকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে চাওয়া ক'জন মানুষ— এদের সূত্র ধরে ফিরে এল সেই চিতা। স্থান-কাল একাকার করে দেওয়া সব জগৎ তলিয়ে যেতে চাইল এক ভয়ানক গহ্বরে। কিচ্ছু না জেনেও এই অদ্ভুত খেলায় শামিল হয়ে পড়া ক'টি চরিত্র প্রাণপণে খুঁজতে চাইল মুক্তির উপায়। তারই সঙ্গে তারা চাইল কাছের মানুষদেরও বাঁচাতে। কহ্না কি ফিরে পেল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা? হিরণ্য কি বুঝতে পারল তাদের পরিবারের রহস্যময় আচারগুলোর প্রকৃত কারণ? কঙ্কাবতীর চিতা কি নিভল শেষ অবধি? কোনো-কোনো উপন্যাস সীমিত-সংখ্যক চরিত্রকে নিয়ে রচিত হয়েও ঘটনাক্রমের ব্যাপ্তি ও জটিলতায় মনকে একেবারে ধাঁধিয়ে দেয়। আলোচ্য উপন্যাসটি তেমনই। এটি আকারে যেমন বিশাল, তেমনই কৌতূহলোদ্দীপক এর চরিত্রদের পরিচয় ও কার্যকলাপ। ধারালো সংলাপে এবং গতিময় গদ্যে এটি পাঠককে রীতিমতো সজাগ, এমনকি সতর্ক রেখে দেয় গোটা সময়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে যায় এই বইয়ের ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিং। যে কুশলতার সঙ্গে লেখক একের পর এক বাস্তব, প্রায়-বাস্তব এবং কল্পিত ভুবনের নির্মাণ করেছেন, তা মুক্তকণ্ঠে প্রশংসনীয়। তারই সঙ্গে প্রশংসনীয় তাঁর ভাবনার অভিনবত্ব। এই সিরিজের প্রথম বই 'কালসন্দর্ভা' আকর্ষণীয় হলেও তার ভাবনার পেছনে তন্ত্র একটা বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল। সেই তুলনায় এই উপন্যাসে বরং সোনা আর তার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন কিংবদন্তিই প্রেরণার কাজ করেছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত দুই চিরশত্রু সম্প্রদায়ের সংঘাতে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে ওই ধাতুটিই— যার মাধ্যমে আমাদের চেনা দুনিয়ার সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা পড়েছে কল্পনা ও বিশ্বাস দিয়ে গড়ে তোলা এক সমান্তরাল পৃথিবী। ফ্যান্টাসি এইরকমই হওয়া উচিত— বিশাল, গতিময়, জটিল, হিংস্র, অথচ কেন্দ্রে প্রেমের অব্যক্ত প্রকাশে স্পন্দিত। বইটির মুদ্রণসৌকর্য অসাধারণ। প্রচ্ছদে, ভেতরের মোটিফে, লে-আউটে, বর্ণশুদ্ধিতে এটি অন্যান্য বইয়ের কাছে মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। সুযোগ পেলে অবশ্যই পড়ুন।
বন্ধুরা আজকে আমি যে বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া নিয়ে এসেছি, যেটার প্রথম পার্ট ইটসেলফ একটি হিউজ সাকসেস পেয়েছিল। আমি ভাবতে পারিনি, তার সেকেন্ড পার্ট পড়ে আমি এতটা এক্সাইটেড হয়ে যাব। বন্ধুরা আমি আজকে কল্পবিশ্ব পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হওয়া একটি হরর থ্রিলার তন্ত্র সমণ্বিত কাহিনী সিরিজ কালসন্দর্ভার দ্বিতীয় পার্ট কুহককালের নন স্পয়লার পাঠ প্রতিক্রিয়া নিয়ে হাজির হয়েছি। লেখিকা অবশ্যই কাল সন্দর্ভা খ্যাত - অঙ্কিতা দেবী। প্রথম পার্টে যে লেভেলের অকাল্ট থ্রিলার পেয়েছিলাম, এই পার্টে কি সেই লেভেলই ছিল নাকি সেই তুলনায় একটু কম ছিল?
প্রথমেই আগে বইটির কাহিনী সম্বন্ধে নন স্পয়লারভাবে একটু ধারণা দিয়ে নিই। প্রাণ চঞ্চল, সর্বগুণ সম্পন্না কহ্নার জীবন সেদিন ওলট পালট হয়ে যায়, যেদিন তার কার অ্যাক্সিডেন্ট হয়। সেই অ্যাক্সিডেন্টে প্রাণে বেঁচে যায় কহ্না ঠিকই, কিন্তু তার পা পঙ্গু হয়ে যায় এবং তার সাথে সাথে তার মাও মারা যায়। তারপর থেকেই কহ্নার লাইফে আরেকটা নতুন সমস্যা এসে দেখা দেয়। মাঝে মাঝেই সেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় এবং তার সেই ঘুম ভাঙ্গে অনেক কদিন পরে। কিন্তু এরকম কেন হয় কহ্নার সাথে? ডাক্তার দেখিয়েও এর কোন সলিউশন পায় না কহ্নার বাবা সুবিনয় বাবু। এছাড়া সেদিন তাদের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট কি করে হয়েছিল, তার কোন স্মৃতিই কহ্নার থাকে না। যদিও প্রাথমিক একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সেই গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের জন্য কহ্নাই কোনভাবে দায়ী। এছাড়া কহ্না যখন ঘুমিয়ে যায়, তখন সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা স্বপ্নের জগত দেখতে পায়, যেখানে সে দেখতে পায় একটি শ্বেতবর্ণ স্বর্নালী চুলের ছেলেকে, যে তাকে বলে এটা নাকি কঙ্কাবতীর জগত। কিন্তু কে এই কঙ্কাবতী? কহ্না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সেই জগতে কি করে চলে যায়? কে এই রহস্যময় স্বর্ণালী চুলের ছেলেটি? এরপরে একদিন কহ্নার সাথে আরেকটা ঘটনা ঘটে। টিঙ্কা বলে একটি মেয়ে কহ্নাকে বুলি করার জন্য তার জামা কাপড় খুলে দেওয়ার চেষ্টা করতেই কহ্নার চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে এবং সে আবার জ্ঞান হারিয়ে কঙ্কাবতীর জগতে চলে আসে, কিন্তু অদ্ভুত ভাবে এবার ও নিজের সাথে টিংকাকেও ওই জগতে নিয়ে আসে, যেখানে এসে টিংকা হঠাত কিছু অদ্ভুত দর্শণ প্রানীর হাতে মারা যায়। সেই দেখে কহ্না আঁতকে ওঠে। একি আদৌ সত্যি ঘটল নাকি সবই তার কল্পনা। জেগে ওঠার পর কহ্না জানতে পারে যে টিংকা বেঁচে আছে ঠিকই, কিন্তু সে যেন একটা জম্বী হয়ে গেছে। যাকে সামনে পারছে তাকে মেরে খেয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু টিংকার এরকম পরিবর্তন হল কি করে? কহ্নার স্বপ্নের সেই কঙ্কাবতীর জগত কি কোন ভাবে দায়ী? তাহলে কহ্নার স্বপ্নের সেই কাল্পনিক কঙ্কাবতীর জগত কি কোনভাবে বাস্তবের মানুষদের মধ্যেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে? এটা কি মানবতা ধ্বংসের কোন ইঙ্গিত? কহ্নার ভয় কে সত্যি করে এবারে কোলকাতা শহরে ঘটতে থাকে অপার্থিব খুন এবং সেই খুনের আশেপাশে যে বা যারাই থাকছে, তারা ধীরে ধীরে ওইরকম জম্বিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কে করছে এইসব খুন এবং কি তার উদ্দেশ্য? সে কি সতিই মানবজাতিকে সম্পুর্ন রূপে ধ্বংস করে দিতে চাইছে? কঙ্কাবতীর জগতই কি এই রহস্যের চাবিকাঠি? কঙ্কাবতীর জগত বলে বাংলায় প্রথম ফ্যান্টাসী লিখেছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ মুখার্জী। সেই কাল্পনিক জগত ঘিরেই গড়ে উঠছে একটি বীভৎস খেলা, যেখানে কল্পনা আর বাস্তব মিলেমিশে হয়ে যাচ্ছে একাকার। নীলকমল আর কহ্নার সাথে সাথে কূটখেলায় মেতে উঠেছে দুই গোপন সম্প্রদায়। কহ্না আর নীলকমল কি পারবে এই কূট খেলার হাত থেকে মানব সমাজ কে বাঁচাতে? এই নিয়েই লেখা হয়েছে বাংলার সম্ভবত প্রথম মেটাফিকশন ফ্যান্টাসী থ্রিলার কাহিনী কুহককাল।
এই কাহিনী কিন্তু এই পার্টে শেষ হয়নি, তার কারণ এটা আসলে কালসন্দর্ভার প্রিক্যুয়েল ছিল। কালসন্দর্ভাতে যে যে প্রশ্ন আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, তার বেশিরভাগ উত্তর এখানে আমরা পেয়েছি এবং এটাও বুঝতে পেরেছি যে সামনেই উঠে আসছে এক ভয়ংকর বিপদ। এবার সেটা কিভাবে আমাদের সামনে লেখিকা পরিবেশনা করবেন, সেটাই দেখার। ভৌতিক সাহিত্য প্রেমীদেরকেও অতি অবশ্যই এই কাহিনী আমি রেকমেন্ড করছি, তার সাথে থ্রিলার এবং ফ্যান্টাসী ঘরানার পাঠকদের জন্য তো রসদের ভান্ডার রয়েছে এই কাহিনীতে। বাংলার যে কোন সাহিত্যপ্রেমী মানুষ, যারা ভালো সাহিত্য পড়তে পছন্দ করেন, তাদের কে আমি অতি অবশ্যই এই কাহিনী বা বলা ভালো এই সিরিজটি আমি রেকমেন্ড করব। তবে হ্যাঁ, আরেকটি কথা যেটা অবশ্যই বলতে চাই, সেটা হল - যদিও কুহককাল, কালসন্দর্ভার প্রিক্যুয়েল, তা সত্ত্বেও কালসন্দর্ভা পড়ে, তারপরেই কুহককাল পড়ার জন্য সাজেস্ট করব, নাহলে কিছু বিষয় বুঝ��ে অসুবিধা হতে পারে।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো এই সিরিজের প্রথম(দ্বিতীয় ?) বইটি আমার পড়া হয়নি । কাহিনীর কোন চরিত্র যা ভাবছেন সেটাই বাস্তবায়িত হয়ে যাচ্ছে এরকম লেখা আগে পড়ে থাকলেও , বাংলা মেটাফিকশন ফ্যান্টাসির সাথে এটাই আমার প্রথম সাক্ষাৎ। তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে এই লেখার মূল্যায়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
কালসন্দর্ভার জগতের বিস্তার ঘটেছে এই লেখায় । একক উপন্যাস হিসাবে পড়তেও বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি । শুরুতে গঙ্গাবক্ষে অভিযান এবং পৈশাচিক জন্তুর আবির্ভাব হেমেন্দ্র কুমারের যেকোন অ্যাডভেঞ্চার কে মনে করিয়ে দেবে। কাহিনী একটু এগোতে মনে হল এটা হয়তো কোন ড্রাগ এডিক্ট টিনএজ প্রেমের গল্প হতে চলেছে। তারপর মনে হল এটা সিরিয়াল কিলারের গল্প হতে চলেছে। এর মাঝে খেয়াল করছিলাম কিছু কিছু অধ্যায়ে নাম্বার নেই। এই সব কিছু ভাবতে ভাবতে ১৫ তম অধ্যায়ে পৌঁছে বুঝলাম ব্যাপারটা আসলে কি চলছে। তারপর আবার ফিরে গিয়ে প্রথম থেকে শুরু করলাম, এইবার স্টোরিলাইন একটু ভালো করে বুঝতে পারলাম। মূলত তিনটি সময় জুড়ে এই কাহিনীর চলাফেরা। প্ৰথমে ত্রৈলোক্যনাথের কঙ্কাবতী প্রকাশকালের সময়কার প্রাচীন বাংলা, পরে ১৯৫০ এর অস্ট্রিয়া, আর শেষে ফসিলস এর অ্যালবাম রিলিজ হয় এরকম কোন সময়ে দমদম এর কাছাকাছি কোন জায়গা । এর বাইরেও কঙ্কাবতীর জগৎ আছে। যার স্থান কাল পাত্র নিজের মতো করে কল্পনা করে নিতে হয়। আক্ষরিক অর্থে বিশেষ ভাবে সক্ষম কহ্নার অবাধ যাতায়াত এই জগতে । বইটিতে কোন অলঙ্করণ না থাকলেও প্রতিটি বর্ণনা নিখুঁত ও প্রাণবন্ত । আমি অস্ট্রিয়ার প্রাসাদে নতুন প্রাণ সৃষ্টির বর্ণনাটা বেশ উপভোগ করেছি । কল্পবিজ্ঞান লেখকদের বিদ্রুপের সম্মুখীন হওয়ার ঘটনা, বা ব্যাংকে সাধারণ পরিষেবা পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে থাকার ঘটনা বাস্তব থেকে তুলে আনা। কাহিনী মোটামুটি দ্রুতলয়ে এগিয়েছে , শেষের একশ পাতার কিছু বেশি একটানা পড়ার দাবি রাখে । শেষ সমন্ধে কিছুই প্রকাশ করছিনা , তবে উত্তেজনা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে নিয়ে পাঠকের মনোগ্রাহী পরিসমাপ্তি ঘটাতে লেখিকা চূড়ান্ত সফল হয়েছেন ।
বইটি বিশাল হলেও ছোট ছোট অধ্যায় বিভাজন, দ্রুত পড়তে সাহায্য করেছে। কিছু অংশে মনে হয়েছে একটু কমানো যেত , তবে সিরিজ সম্পূর্ণ না হলে এ ব্যাপারে মন্তব্য করা অবান্তর । বিভিন্ন পাশের উল্লেখ, জগতের বিভিন্ন স্তরের কথা আর কঙ্কাবতীর জগতের স্তোত্রগুলি আমার মতো গোলা পাঠকের একটু কঠিন লাগতে পারে । কিছু ক্ষেত্রে টিকা থাকলে হয়তো বুঝতে সুবিধা হতো ; আজকাল আমরা টিকা পড়তে ভালবাসি । সুন্দর নামের চরিত্র আর বিভিন্ন গোষ্ঠী গুলির পরিচিতি নিয়ে বইয়ের শুরুতে একটি তালিকা থাকলে কিছু বিভ্রান্তি দূর হবে । আর সামান্য কিছু অলঙ্করণ থাকলে বইটি আরো মনোগ্রাহী হয়ে উঠতো ।
কল্প বাস্তবের মেলবন্ধনের এই জগতের কথা খুবই উপভোগ্য । এই সিরিজের অন্য লেখাগুলি আশা করি দ্রুত হাতে পাব ।
আমরা চোখের সামনে যে জগতটাকে দেখি সেটাই কি সত্যি!!! চোখ খুললে যে আলো, চোখ বন্ধ করলেই অন্ধকার। ফিকশনের মধ্যে ননফিকশন। "আট কুঠুরি নয় দরজার এই শরীর" কোন জাদুবলে অলৌকিকতার স্পর্শে খুলে দেয় অজস্র জগতের প্রবেশদ্বার। আর সেখানেই শুরু হয় মেটাফিকশনের জগত। এই উপন্যাস শুধু মেটাফিকশনের উপন্যাস নয়, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের কঙ্কাবতী যেখানে যাত্রা শেষ করেছিল, ঠিক সেখান থেকেই এর যাত্রা শুরু। বৌদ্ধ পুরাণ এর জাতক অলঙ্কারের কাহিনী খুব সুন্দর ভাবে এক বাঙ্গালী পরিবারে প্রবেশ করেছে স্বর্নকর্মা রূপে। বিশ্বকর্মা যেমন ভাস্কর্যের সৃষ্টিকর্তা ঠিক তেমন ভাবে স্বর্ণ কর্মার হাতে সোনার মতো এক নির্জীব ধাতু সজীব হয়ে অলঙ্কারের রূপ নেয়।
লেখকরা বলে থাকেন গল্পেরা সাধারণত শুরু হয় মাঝখান থেকে । খানিকটা বর্তমান আর অনেকটা অতীত নিয়ে গল্প এগিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে। কিন্তু ছা পোষা মানুষদের কাছে গল্প আসলে শুরু হয় শেষ থেকে। লেখিকার কথায় প্রত্যেক অধ্যায় এর শুরুতে শুরু হয় এক মর্ম স্পর্শী বাণী দিয়ে যেমন - মহাকালের পথের মাঝে হাঁটছে কারা ওই ? কল্পলোকের গল্প কথা বুনছে কে লো সই ? জগৎ মাঝে ভাসছে দেখ, কুঁচ বরণী এক কন্যে।। মিলন হবে আলোক শিখার , পরাণ বধূর চৈতন্যে।
এই উপন্যাস মানুষের প্রবৃত্তি গুলিকে নতুন ভাবে চিনিয়ে দেয়। জীবনে রাগ হিংসার যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি ক্ষমা , দয়া ইত্যাদির ও। এরাই অত্যধিক হয়ে উঠলে মানুষকে পুড়িয়ে দেয়, আবার এদের অভাব মানুষকে শীতল করে মৃত্যু মুখে ছুড়ে দেয়। এদের সৃষ্ট সামঞ্জস্য ই একটা মানুষকে , একটা সমাজকে চলমান হতে সাহায্য করে। কোন্ স্মৃতি??
জন্ম জন্মান্তরের স্মৃতি। এই জন্মে তুমি নিজের কাজ নিয়ে ভাবছ করব কি করব না। কিন্তু একবারও ভেবে দেখেছ কার সুকৃতী বলে তুমি কষ্ট সাধ্য হলেও পাশ ছিন্ন করে চলেছ? সব মায়ার বন্ধন কে ছিন্ন করার জন্য। সেটাই তোমার জন্ম জন্মান্তরের সাধনা, এই দেহ শুধু এক আধার মাত্র এক গেলে আরেক আসবে আসল তোমার ব্যাপ্তি অনেক বেশি। কত স্মৃতি ভেসে আসে। কত স্মৃতি মিলিয়ে যায়। এই জীবনের স্মৃতি , অন্য জীবনের স্মৃতি , স্মৃতি থেকে স্মৃতিতে ভেসে বেড়ায় কহ্ণা - দুই জগতের প্রবেশ দ্বার , শুভ ও অশুভ লড়াই এ জয় পরাজয়ের ভাগ্য নির্ধারক। শীল পরিবারের ইতিহাসের এক প্রাচীন ঐতিহ্য আছে , জন্মের পরে ই জাতকের নাড়ির সাথে স্বর্ণ রঞ্জক মিশিয়ে তৈরি হয় এক বিশেষ জাতক অলঙ্কার। বলা হয় সেই বিশেষ দিনে স্বয়ং বিধাতা পুরুষ নেমে আসে সেই জাতকের ললাট লিখনের জন্য। সত্যিই কি তাই!!!!!
না এর পেছনে আছে কোন অন্ধকার অতীত , এমন অতীত যা আলোয় এলে পৃথিবীতে নেমে আসবে ঘন অন্ধকার।
কহ্নার মতো এক রুগ্ন অষ্টাদশী ও তার সবথেকে কাছের বন্ধু হিরণ্য কে নিয়ে কি পারবে পৃথিবীতে ঘনিয়ে আসা নরকের আগমনকে আটকাতে আর তার সাথে থাকা নরকের অলৌকিক জীবদের উপস্থিতি ছিন্ন ভিন্ন করে দেবে সমস্ত জীবনকে , মুছে দেবে জীবনের সব চিন্হ কে। জানতে হলে পড়তেই হবে মেটা ফিকশনের ফ্যান্টাসি থ্রিলার উপন্যাস "কুহককাল"।
লেখিকার কুশল লেখনিতে প্রতিটি অধ্যায় হয়ে উঠেছে অসাধারন। লেখার ভাষায় ফুটে উঠেছে অপুর্ব ফ্যান্টাসি ময় এক কাল্পনিক জগৎ, আর পাঠককেও সেই জগতের অনুভুতি এনে দেয়।
একটাই অভিযোগ Hardcover বই হলেও খোসার মতো প্লাস্টিকের সুক্ষ্ণ আবরণ খসে পড়ছে বই এর গা থেকে । এটা কি মেটাফিকশনের প্রভাব , প্রশ্ন রয়ে গেল প্রকাশ��ের প্রতি। তবে প্রচ্ছদ আর অলঙ্করণ অপূর্ব।
বইয়ের নাম: কুহককাল লেখিকা: অঙ্কিতা জনরা: ফ্যান্টাসি, থ্রিলার
লেখিকার আগের উপন্যাস কালসন্দর্ভাতে যে অলৌকিক জগতের বর্ণনা লেখিকা দিয়েছিলেন সেটারই পূর্ববর্তী ঘটনা এবং জগতকে নিয়েই বিস্তারলাভ করেছে লেখিকার দ্বিতীয় উপন্যাস কুহককালের মাধ্যমে।
সুদূর অতীতকাল থেকে আমরা লড়াই দেখতে অভ্যস্ত। সেটা হোক দেবতা কিংবা অসুরে, মানুষ বনাম মানুষে অথবা পাতরগণ্য বা স্বর্গদেও। সেই লড়াই কখনো বা ক্ষমতা দখলের জন্য অথবা নিজেদের অস্তিত্বরক্ষার জন্য।
গল্পের শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের কোনো এক সময়ে জনৈক বাঙালির একটা দ্বীপে অভিযান নিয়ে, যে দ্বীপের ব্যাপারে স্থানীয় মানুষের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হচ্ছিল বেশ অদ্ভুত এবং অলৌকিক গল্পগাথা নিয়ে। স্বরাজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে সেই বাঙালি ভদ্রলোক এবং তার দলের মানুষেরা মুখোমুখি হন এক অদ্ভুত কর্মকান্ডের যার মধ্যে মিশে ছিল অলৌকিকতার ছোঁয়া।
ধীরে ধীরে কাহিনী আবর্তিত হয় বর্তমান সময়ের দুই স্কুল পড়ুয়া এবং বান্ধবী কহ্না ও হিরণ্যর মধ্যে। হিরণ্য একজন স্বর্ণকার বংশজাত এবং কহ্না তাদের পরিবারের অনুগতলাভ করা একজন প্রাক্তন কর্মচারীর কন্যা। কহ্না তার মা এবং চলতশক্তি দুটোই হারিয়ে ফেলে অতীতের এক দুর্ঘটনার কারণে। আর তারপর থেকেই তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায় "স্লিপ এট্যাক" নামক এক অদ্ভুত ধরণের রোগ। কাহিনীর অগ্রগতিতে আমরা অবগত হয়ে থাকি বিভিন্ন কার্যকলাপ ও ঘটনাসমূহের। পাঠকগণ আস্তে আস্তে বিস্তারিত জানতে পারবেন বেশ কিছু ঘটনা ও তার কারণসমূহের। যেমন,
১. কহ্নার স্লিপ এট্যাকের কারণ আর কেনই বা সে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে দীর্ঘসময়ের জন্য ২. হিরণ্যর পরিবারে কোনো সদ্যজাতর জন্মের পরেই কেন করা হয় জাতক-অনুষ্ঠান ৩. এসবের সাথেই বা কিসের সম্পর্ক পাতরগণ্য এবং স্বর্গদেও-এর ৪. সব কিছুর সাথে কিভাবে যোগসূত্র কাজ করছে দিক্করবাসিনী ও নীলকমলের যার কথা আমরা আগের উপন্যাসে ৫. কঙ্কাবতীর জগতের অষ্টপাশের গোলকধাঁধায় নীলকমল কি কন্যের সঙ্গে থাকবে শেষ অবধি? নাকি স্বর্গদেও আর পাতরগণ্যদের এই কূটখেলায় মাঝপথে হাত ছেড়ে যাবে তাদের?
সব প্রশ্নের উত্তর পেতে পড়ে নিতে হবে ৫০৯ পৃষ্ঠার সুবিশাল উপন্যাসটি।
ভালো লাগা: বইটির কাহিনী এগিয়েছে ছোট ছোট অধ্যায়ে এবং বেশ দ্রুত কাহিনী এগিয়ে চলার কারণে টান টান ভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে কয়েক হাজার বছর আগের এক অদ্ভুত অলংকারের গল্প। সেই অপরূপ অলংকার তৈরি হয়েছিল এই ভারতের মাটিতেই, তারপর প্রবাদকথন হয়ে হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। লেখিকার অলংকারের বিশদ বর্ণনা বেশ উপভোগ্য।
খারাপ লাগা: চোখে পড়েছে কিছু বানান ভুল। যেমন, "শাসন" হয়ে গেছে "শাষন"। বেশ কিছু ইংরেজি ফেজে ভুল ইংরেজি চোখে পড়েছে যেমন "আ অসাম", হওয়া উচিত ছিল "এন অসাম"। আশা করবো পরবর্তী সংস্করণে এসব ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিছু ক্ষেত্রে আমার কাহিনী মেদবহুল মনে হয়েছে। মৈত্রেয় বসুর মাধ্যমে কল্পবিজ্ঞান এবং সামাজিক কাহিনীর যে তর্ক চোখে পড়লো সেটা অপ্রয়োজনীয় মনে হলো কাহিনী হিসাবে। প্রকাশক যে লেখকদের রয়্যালটি মেরে দেন সেটার বর্ণনার কোনো দরকার ছিল না কাহিনীতে। লেখিকা কি সূক্ষ্মভাবে বইপাড়ার একশ্রেণীর মানুষকে খোঁচা দিলেন? হতেও পারে। তবে কাহিনীতে এসব অপ্রয়োজনীয় ছিল এবং আমার মনে হয় এসব তিনি অন্য কোনো কাহিনীর জন্য তুলে রাখতে পারতেন। সর্বোপরি কাহিনী পড়তে বেশ ভালোই লাগলো এবং অপেক্ষায় থাকলাম নীলকমল ও কন্যের পরবর্তী কাহিনীর জন্য।
বই টি লেখিকা অঙ্কিতা রচিত "কালসন্দর্ভা" এর পরের পর্ব। এবং কল্প বিজ্ঞান (ফ্যান্টাসি) এর উপর আধারিত।। আরো ভালো ভাবে বলতে গেলে "কুহককাল" এর কাহিনী যেখানে শেষ হচ্ছে, "কালসন্দর্ভা"র কাহিনী সেখান থেকে শুরু।। উপন্যাস এর পটভূমি ২০০৮ -২০০৯ সালের। প্রধান চরিত্র কহ্ন, হীরণ, সিদ্ধম।।
উপন্যাস টি ফ্যান্টাসি (কল্পবিজ্ঞান) হলেও পড়ার সময় মনেই হবে না সেটা।।। মনে হবে সত্যি বাস্তব। পড়তে পড়তে সাসপেন্স। পাঠক পাঠিকা রা পড়াশোনা শুরু করলে বই শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠতে ইচ্ছা করবে না।। উপন্যাস এ যেমন ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় এর কঙ্কাবতী চরিত্র টি আছে। সেরকম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় এর ইউরোপ এর বর্ণনা আছে। ব্রিটিশ ভারতীয় সময়কার ঘটনা আছে। আছে স্বর্গদেও, পাতরগন্য সম্প্রদায় এর কথা, যোগিনী কালসিদ্ধার কথা।। কাহিনী র প্রধান চরিত্র কনহা একটু জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত। সে মাঝে মাঝেই অন্য একটা জগতে চলে যায়। তার ঘুম আসেনা। সেজন্য সে ড্রাগ এর আশ্রয় বেছে নেয়।। একের পর এক ঘটনা পরম্পরায় উপন্যাস এর কাহিনী এগিয়েছে। বই টি সব পাঠক পাঠিকা র কাছে পড়ার অনুরোধ রইলো।।
বাংলা ফ্যান্টাসির জগতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো এই বইয়ের মাধ্যমে। তবে বইটা বেশ underrated। কঙ্কাবতীর জগৎ নিয়ে এরকম লেখা বেশ ভালই লাগলো। পরবর্তী বইটির অপেক্ষায় রইলাম। কালসন্দর্ভায় যে তন্ত্র মন্ত্র ছিল সেসব বাদ দিয়ে এই বইটা বেশ আলাদা।