কৃষ্ণ, যাদবদের নায়ক বাসুদেব; হ্যাঁ তিনি রাজা বা কিং নন, কিংমেকার। আর তার সঙ্গিনী? হয়ত অনেকে একটিই শব্দ উচ্চারণ করবেন, 'রাধা'। কিন্তু রাধা কতদিন ছিলেন কৃষ্ণের সঙ্গে যদি মহাভারত, হরিবংশের পাঠ দূরে সরিয়েই তার অস্তিত্ব মেনে নিই? বৃন্দাবনের সময়টুকু হয়ত।
তারপরে?
যাদবদের নায়কের ভারতের যুগনায়ক হয়ে ওঠার যে বন্ধুর যাত্রাপথ, সেখানে কে ছিলেন তার সঙ্গী?
কৃষ্ণের প্রথমা পত্নী, বিদর্ভকুমারী রুক্মিণী, 'কৃষ্ণসঙ্গিনী রুক্মিণী' কাহিনীর মূল চরিত্র। এটি তার জীবনকাহিনীনির্ভর উপন্যাস; রুক্মিণী চরিত্রের সশ্রদ্ধ পুনর্নির্মাণ করেছেন সুচেতনা সেন কুমার। প্রচ্ছদ রূপায়ণে, সৌজন্য চক্রবর্তী।
কৃষ্ণ নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষের কোটি-কোটি মানুষের ভক্তি। আবার তাঁর নানা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে রিয়্যাল পলিটিকের পাঠ নেওয়ার মতো মানুষেরও অভাব নেই। কিন্তু এহেন পুরুষের সাফল্য ও প্রভাবের পেছনে যে নীরব নারীটির উপস্থিতি আমরা কেউ লক্ষ করি না, তিনি হলেন রুক্মিণী— কৃষ্ণের প্রথম স্ত্রী। কোনো অতিমানবিক শক্তির অধিকারী না হয়েও, শুধু ভালোবাসা আর মনোবলের সাহায্যে যা অর্জন করেছিলেন সেই নারী, তা ভাবলে চমকে উঠতে হয়। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আলোচনা... নেই! সে কি তাঁর এই নিতান্ত সাধারণত্বের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে তথা রুক্মিণীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর গল্প বলতেই লেখা হয়েছে এই বইটি। সুচেতনা এর আগে তাঁর বিখ্যাত 'সৌবল শকুনি' গ্রন্থে মহাভারতের বিভিন্ন রূপভেদ ব্যবহার করে এক অদ্ভুত কাহিনি পরিবেশন করেছিলেন। এবারে তিনি তেমন অপরিচিত কোনো উপাদানের সাহায্য গ্রহণ করেননি। বরং মহাকাব্যের নানা পার্শ্বচরিত্র ও অনালোচিত ঘটনাকে যুক্তি ও আবেগের শৃঙ্খলে জুড়ে তিনি রচনা করেছেন এই উপন্যাস। ক্ষমতার রাজনীতি ও ষড়রিপুর প্রাবল্য যে মহাভারতে ঘটনার গতি নিয়ন্ত্রণ করেছে বারবার, তা আমরা দেখেছি। কিন্তু নারী চরিত্রদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেইসব ঘটনা ও সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ করলে এক অন্য, অদ্ভুতভাবে মানবিক চিন্তাধারা প্রকট হয়। রুক্মিণীকে কেন্দ্রে রেখে লেখক সেই একান্ত মানবিক ভাবনাদের তুলে ধরতে চেয়েছেন লেখক। কৃষ্ণকে এক লার্জার-দ্যান-লাইফ অতিমানব হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত আমরা। এই উপন্যাস তাঁকে দোষে ও গুণে, শক্তিতে ও দুর্বলতায় অদ্বিতীয় মানুষ হিসেবেই দেখাতে চেয়েছে। তারই সঙ্গে দেখা গেছে এমন এক মানুষের জীবনসঙ্গিনী হলে পাওয়া আর না-পাওয়ার তালিকায় কী-কী জমে। সর্বোপরি, কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তিরূপী রাধাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে যে মানুষীটিকে আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি, তাঁকে আংশিকভাবে হলেও আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রে আনার লক্ষ্যে রচিত হয়েছে এই আখ্যান। লেখনী অত্যন্ত সুললিত অথচ প্রয়োজনে তেজোময়। চরিত্রেরা, বিশেষত রুক্মিণী একান্তভাবে ত্রিমাত্রিক। তবে পৌরাণিক কাহিনির সীমারেখা অতিক্রম করতে চাননি বলেই হয়তো উপন্যাসটি একরকম দুম্ করে শেষ হয়ে গেছে। বিনির্মাণের মাধ্যমে এই চরিত্র তথা কাহিনিকে এক অন্য পরিণতির পথে ঠেলে দেননি লেখক। এই দুঃখটি থেকে গেল। খুব ভালো ও শুদ্ধ মুদ্রণের এই বইটি পড়তে চমৎকার লাগল। যদি এক অন্যরকম 'কাব্যে উপেক্ষিতা'-র কাহিনি জানতে চান, বুঝতে চান তাঁর মনের উথালপাতাল আর দিনযাপনের ছোট্ট-ছোট্ট ঘাত-প্রতিঘাত, যদি এ-দেশের ইতিহাসে তাঁর নীরব প্রভাব বুঝতে আগ্রহী হন, তাহলে এই বইটিকে আপন করে নিতেই পারেন। হতাশ হবেন না বলেই আমার বিশ্বাস।
প্রথমে এই বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে ছোট্ট করে একটু বলে নিই, যেটা লেখিকাই জানিয়েছেন। কৃষ্ণের সঙ্গিনী রূপে বেশিরভাগ সময়ই নাম উচ্চারিত হয় রাধার। কিন্তু রাধা, শ্রী কৃষ্ণের সঙ্গে ফিজিক্যালি প্রেজেন্ট ছিলেন শুধুমাত্র কৈশর বয়স পর্যন্ত। শ্রী কৃষ্ণের মথুরায় আসার পর রাধার কিন্তু সেরকম কার্জকরী প্রেজেন্ট আমরা পাইনি। তারপরে শ্রী কৃষ্ণের সাথে বিয়ে হচ্ছিল বিদর্ভের রাজকন্যা রুক্মিনীর। শ্রী কৃষ্ণ যখন ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র প্রায় একা হাতেই বদলে দিয়েছিলেন, তখন কিন্তু তার শুধু সঙ্গিনী রুপেই নয়, একজন কর্ম সঙ্গিনী রূপেও তার পাশে ছিলেন রুক্মিনী। সামান্য রাজকন্যা হয়ে মগধরাজ জরাসন্ধের দাক্ষিণাত্য অভিযান প্রতিহত করার কল্পনা করেছিলেন যিনি, সেই রুক্মিনী কি আদৌ সামান্য? শ্রীকৃষ্ণের প্রথমা স্ত্রী, রুক্মিণীর জীবনের জানা অজানা কাহিনীই কল্পনার আশ্রয়ে লেখা হয়েছে এই বইতে।
কিছু কিছু কাহিনী পড়ে শেষ হওয়ার পরেও মনে যে তার ছাপ রেখে যায় এবং সেই ভাবনাতে খানিক বিভোর থাকা যায় - এরকমই একটি কাহিনী হচ্ছে এই কৃষ্ণ সঙ্গিনী রুক্মিনী।
বইটির পজিটিভ পয়েন্ট গুলি হলো - রুক্মিনীর চরিত্র গঠন, শ্রী কৃষ্ণ আর রুক্মিনীর সম্পর্কের গঠন বিশ্লেষণ, ভাষার প্রয়োগ, তৎকালীন সামাজিক নিয়ম নীতি গুলির প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারা, বিভিন্ন চরিত্রগুলির বিকাশ, ভগবানকে দেখানোর দৃষ্টি ভঙ্গী।
এবার যদি নেগেটিভ পয়েন্টের কথা বলি, তাহলে এটাই বলব যে এই কাহিনী নিয়ে আমার সেরকম কোন নেগেটিভ কিছু লাগেনি। তবে একটা কথা বলার - সেটা হল - হয়তো এই কাহিনীর ভাষা অর্থাৎ বেশ কিছু গুড় শব্দের প্রয়োগের কারণে কিছু মানুষের সমস্যা হতে পারে, যারা বাংলার সমস্ত সমার্থক শব্দের বিষয়ে পরিচিত নন। ফলে কিছু ক্ষেত্রে এই কাহিনী পড়তে গেলে তাদেরই সমস্যা হবে, যারা সব বাংলা শব্দ চেনেন না। তবে এখানে এটা বলার যে - সেই সমস্ত শব্দ ইউজ না করে সাধারণ চলিত ভাষায় লিখলে হয়তো এই কাহিনীর মাধুর্জ্যকে পাওয়া যেত না। তাই সেই অর্থে এটাকে নেগেটিভ পয়েন্ট বলা যেতে পারে না।
পরিশেষে এটাই বলার যে কৃষ্ণসঙ্গিনী রুক্মিনী উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে পড়া আমার ওয়ান অফ দি বেস্ট পৌরাণিক ফিকশন কাহিনীর মধ্যে স্থান নিয়ে নিয়েছে । এই কাহিনী কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও মন্থর হয়নি। বরং ঘটনার বহমানতায় এই কাহিনী হয়ে উঠেছে দারুণ ভাবে পাঠ উপভোগ্য। যারা এই ধরণের সাহিত্য পড়তে ভালোবাসেন, তাদের কে আমি এই কাহিনী মিস না করারই সাজেশন দেব।