তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে স্পেসশিপ সাইমিন। সাইমিনের পাঁচজন অভিযাত্রী মহাশূন্যে দীর্ঘভ্রমন শেষে পৃথিবীতে ফিরে আসার পথে ইষ্টিন নামক এক বিপদগ্রস্থ স্পেসশিপকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইষ্টিনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে তারা বুঝতে পারে ‘পাইথিন’ নামক এক অদৃশ্য, অশুভ আর ভয়ংকর প্রোগ্রামের ফাঁটে আটকে পড়েছে তারা । সাইমিনকে সাহায্য কামনা করতে শক্তিশালী পাইথিন ধ্বংস করে ফেলে দুর্বল সাইমিনকে। স্পেসশিপ ইষ্টিনের অভ্যন্তরে বন্দি হয়ে পড়ে সাইমিনের সকল অভিযাত্রীরা। তারা বুঝতে পারে পাইথিন তাদের হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে। ইষ্টিনের অভিযাত্রীরা কি শেষ পর্যন্ত পরাজিত করতে পেরেছিল ভয়ংকর প্রোগ্রাম পাইথিনকে?
মোশতাক আহমেদ (English: Mustak Ahmed) ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭৫ সালে ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী ডিপার্টমেন্ট হতে এম ফার্ম ডিগ্রী অর্জন করেছেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ হতে এমবিএ এবং ইংল্যান্ডের লেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিমিনোলোজিতে মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন। কর্ম জীবনে তিনি একজন চাকুরীজীবি। তাঁর লেখালেখির শুরু ছাত্রজীবন থেকে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে তিনি অধিক আগ্রহী হলেও গোয়েন্দা এবং ভৌতিক ক্ষেত্রেও যথেষ্ট পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে- রোবটিজম, ক্লিটি ভাইরাস, নিহির ভালভাসা,অতৃপ্ত আত্না, নীল মৃত্যু, লাল শৈবাল, জকি, মীম, প্রেতাত্মা, রোবো, পাইথিন, শিশিলিন ইত্যাদি। সায়েন্স ফিকশন সিরিজ- রিবিট, কালোমানুষ, রিবিট এবং ওরা, রিবিটের দুঃখ, শান্তিতে রিবিট, হিমালয়ে রিবিট। প্যারাসাইকোলজি- মায়াবী জোছনার বসন্তে, জোছনা রাতরে জোনাকি ইত্যাদি। ভ্রমণ উপন্যাস- বসন্ত বর্ষার দিগন্ত, লাল ডায়েরি, জকি। স্মৃতিকথা- এক ঝলক কিংবদন্তী হুমায়ূন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধ- নক্ষত্রের রাজারবাগ, মুক্তিযোদ্ধা রতন। তিনি কালি কলম সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩, ছোটদের মেলা সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪, কৃষ্ণকলি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ পুরস্কার পেয়েছেন।
পাইথিনের প্রথম অধ্যায় আমার যথেষ্ট ভালো লেগেছে। তবে সেই সাথে এটাও বোঝা গিয়েছে ঘটনা শেষ মেষ কি হতে পারে। গল্পটি একমুখী। গল্পের প্লট অভিনব কিছুই নয়। মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এর গোটা দশেক সাইন্স ফিকশন পড়া থাকলে এই বইয়ের সমাপ্তি কিংবা অগ্রগতি ধারণা করতে কোনও পাঠকের বেগ পাবার কথা নয়।
গল্প খুব বেশি চরিত্রবহুল নয়। প্রথমে ৫ টি চরিত্র, পরবর্তীতে আরও পাঁচটি চরিত্র। যার মধ্যে তিনটি প্রথম অংশেও রয়েছে। এই চরিত্র গুলোর অন্তত চারটি আমার দারুণ লেগেছে। যথাক্রমে ইকো, তিনিন, ইবো এবং পাইথিন। বিশেষ করে ইকো চরিত্রটিকে বলা যায় সার্বিকভাবে একটি সার্থক চরিত্র। তার কথা বাত্রা, আচার আচরণ, খুবই বাস্তবিক এবং জীবন্ত লেগেছে আমার। সেই সাথে রোবট ইবোর মধ্যেও কিছুটা ব্যতিক্রম ধর্মী বিষয় লক্ষণীয়। এই রোবটের মানবিক অনুভূতির ব্যাপারটা খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা পাঠককে সহজেই সংযুক্ত করে ফেলবে।
গল্পে নিঃসন্দেহে জাফর ইকবাল স্যারের গল্পধারার ছাপ স্পষ্ট। তবে সেটা দোষের কিছুই নয়। কারণ রোবটের বুদ্ধিমত্তা মাত্রা দিয়ে বোঝানো, নামের গঠনে আধুনিকায়ন বোঝাতে সংক্ষিপ্ত রূপের প্রয়োগ, ইত্যাদিসহ আরও অনেক কিছুই মুহম্মদ জাফর ইকবাল যে মানদণ্ডে নিয়ে গিয়েছেন, সেটা অনুসরণ করা দোষের কিছুই হতে পারেনা। তবে আমার আপত্তি অন্যখানে। আর সেটা হচ্ছে লেখকের বর্ণনাভঙ্গি। একজন লেখকের বর্ণনা যত সাবলীল হবে, গল্প পড়তে পাঠকের তত সুবিধে হবে, তত সহজে গল্পের পথ ধরে হাঁটা যাবে। পাইথিন লেখক মোশতাক আহমেদ এর প্রথম বই কিনা জানিনা, তবে এই গল্পের মাত্রাতিরিক্ত বর্ণনা, আর লেখকের বেশ কিছু বর্ণনাভঙ্গি আমাকে ক্লান্ত করেছে। তাছাড়া একই কথা বারবার চলে আসায় এবং অত্যাধিক কথোপকথন কিঞ্চিৎ বিরক্তও করেছে। হয়তো পরবর্তী বইগুলোতে এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছেন লেখক। কে জানে!
সাইন্স ফিকশন গল্পে নতুন প্লট আনা আসলেই একটু কঠিন, কেননা রোবট, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, এলিয়েন, গোলাবারুদ, স্পেসশিপ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদির বাইরে সেভাবে যাবার উপায় খুব একটা নেই। তাই গল্পের মূল আকর্ষণ থাকে কিভাবে ঘটনার অগ্রগতি হবে সেটার উপর। আর এখানেই সম্ভবত পাইথিন গল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। গল্পের প্রধান টুইস্ট আবিষ্কার করে ফেলা যায় ১৫-২০% মতো পড়লেই। তারপরে আসলে শেষ গিয়ে মজা পাবার ব্যাপারটা ছিলোনা।
যাই হোক। আমার দৃষ্টিতে মোশতাক আহমেদ একজন সম্ভাবনাময় লেখক। চরিত্রের গঠনে তার দক্ষতা রয়েছে, যদি প্লট ভালো হয় এবং বর্ণনাভঙ্গি আরও সংশোধিত হয় তাহলে তার থেকে অনেক ভালো ভালো গল্প পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বইটি তার প্রথম দিকের বই দেখে হয়তো দুর্বলতার পরিমান একটু বেশি, তবে সেগুলো নির্ঘাত কাটিয়ে উঠবেন লেখক। কেননা লিখতে লিখতেই লেখকের দক্ষতা বাড়ে, ক্ষমতা উন্নত পর্যায়ে যায়।
সামগ্রিকভাবে গল্পটি মধ্যমমানের হয়েছে। রেটিং ৫ এ ২.৫।