পৃথিবী জুড়ে এতো মানুষের ভীড়ে শূন্য হওয়ার অনুভূতি কেমন? এটা কি কাঁদামাখা জলে মরে থাকা ইদুরের মতো নাকি দশ হাজার ফুট উপরে বেলুনের সাথে ফেটে যাওয়া তীব্র একাকীত্ব। মানুষ কি কোনো ভুলে জন্ম নেয়, নাকি মৃত্যুর প্রক্রিয়া অতি স্বাভাবিক। মানুষের জীবন কি চোখের পলকের চেয়েও গাঢ়? নাকি মৃত্যু উপত্যকায় চষে কুক্যাবুরা পাখির হাসির সমান? কয়েক হাত সবুজের সমারোহে আজও কেঁদে উঠি আমি, আমার বাপ, বাপের সম্পত্তির সবটুকু।।
ওয়ালিদ প্রত্যয়ের লেখা 'সমবেত শূন্যতায় ' উত্তম পুরুষের জবানিতে লেখা।গল্পটার কাহিনী আহামরি কিছু না। কোনো জটিল প্লট বা থ্রিলার, কিংবা শিরদাঁড়া বেয়ে গলিতহিমস্রোত নেমে যাওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। ঘটনাগুলোও বিশেষ কিছু না। এই পায়ের তলে ইঁদুর পিষ্ট হচ্ছে, গ্লাসের পর গ্লাস মদ গিলছে, দুধওয়ালা কিছু টাকা ধার চাইতে আসছে কিংবা ষড়তন্ত্রে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে যদিও সেখানেও গল্প কথক ভীড়ের মধ্যেও নিজের একাকিত্ব জাহির করতে ভুলেন না।
একটা এলোমেলো একাকী চিন্তার ইন্ট্রোভার্ট যুবকের তিনদিনের কাহিনী নিয়েই 'সমবেত শূন্যতায়'। যুবকটি এক কারখানার বিস্ফোরণে সম্প্রতি বাবাকে হারিয়েছেন, এবং সে ঘটনার আফটারম্যাথ নিয়েই সাজানো হয়েছে প্লট।
মূলত লেখক 'কমলাকান্তের দপ্তরের' মতো তবে এখানে তিনি আফিমের পরিবর্তে মদের আশ্রয় নিয়েছে নিজের ভিতরের এলোমেলো ভাবনাগুলোকে কথোপকথনের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন। সেখানে কথকের সঙ্গ দিয়েছেন কারখানার বিস্ফোরণের অন্যতম পরিকল্পনাকারী কিংবা তার বাবার খুনি সম্যক । দুইজনেই নিজেদের এলোমেলো ভাবনাগুলোকে ব্যক্ত করেছেন। কখনও সঙ্গ দিয়েছেন মেহেরান কিংবা গল্প কথকের ভালো বন্ধু নিক্বণ।যদিও লেখক স্বীকার করেছেন তা মাতালের প্রলাপ।
গল্পে যে চরিত্রগুলো এসেছে, সে চরিত্রগুলো সম্পর্কেও খুব বেশি কিছু বলা নেই। বই শেষ করে আপনি সবার সম্পর্কে ভাসাভাসা ধারণা নিয়ে উঠবেন, গল্প কথক ছাড়া বাকি চরিত্রগুলোর পরিণতিও জানা যায় না।
‘সমবেত শূন্যতায়’ লেখক ওয়ালিদ প্রত্যয়ের লেখা তৃতীয় বই এবং প্রথম উপন্যাস। বইমেলায় বইটি যেদিন নালন্দার স্টলে আসে, সেদিনই বইটি সংগ্রহ করি এবং দুদিন পরেই ১৩২ পৃষ্ঠার বইটি একদিনেই পড়ে ফেলি। কিন্তু সময়ের অভাবে রিভিউ লেখা হচ্ছিল না।
ফেসবুকে কবিতা পড়ার মধ্য দিয়ে ওয়ালিদ প্রত্যয়ের লেখার সাথে আমার পরিচয়। লেখকের আগের দুইটি বই (গল্পগ্রন্থ-এখানে ভীষণ রোদ; জলের দেশের স্থলপদ্ম) পড়ে মনে হয়েছে লেখক ভিন্ন ধারায় লিখতে চান। আমার কাছে মনে হচ্ছে প্রথম দুটি বইয়ে তিনি যে ভিন্ন কিছু করার আভাস দিয়েছিলেন ‘সমবেত শূন্যতায়’ এসে লেখক সেই ভিন্ন ধারার যাত্রায় নিজেকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন।
প্রথম কথা হচ্ছে, লেখক হয়ত বইটি লেখার সময় পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখাটি লেখেননি। কারণ এই গল্পে রঙ-চঙে কোন বিষয় নেই, নেই আবেগী সংলাপ, নেই মধ্যবিত্তের গৎ বাঁধা দুঃখের কাহিনী, গল্পটি একেবারেই পরিচিত নয়, গল্পের উপস্থাপনাও ভিন্ন মাত্রার, চমক লাগানো সমাপ্তিও নেই। অনেকের কাছে এও মনে হতে পারে যে এখানে কোন গল্পই নেই। ফলে কেউ-কেউ উপন্যাসটাকে এক কথায় নাকচ করে দেবেন। এই উপন্যাসটি যে পাঠককুলের একটা বড় অংশের কাছেই ভালো লাগবে না, এটুকু হয়ত লেখক নিজেও জানেন। পাঠকের ভালো লাগা না লাগা মাথায় রেখে না লিখলেও, লেখক একটা বিষয় মাথায় রেখেছিলেন, যে তিনি এমন করে লিখতে চান, এমন করে উপস্থাপন করতে চান, যেন সমালোচকেরা এটার তেমন ভুল ধরতে না পারেন। প্রারম্ভিকভাবে কিছু জায়গায় অসংগতি মনে হলেও, সেগুলোকে একসময় গিয়ে অসংগতি মনে হয় না।
আমরা যদি গল্পের দিকে একটু তাকাই তাহলে গল্পটা শুরু গল্পের মূল চরিত্রের ঘুম জাগরণের মধ্য দিয়ে। যেখানে গল্পের নায়ক ঘুমের জগত এবং বাস্তবের জগতের সাথে বারবার গুলিয়ে ফেলছে। পড়ার সময়ে একজন পাঠকও গল্পের নায়কের সাথে সেই তন্দ্রার মাঝে বারবার চলে যাচ্ছে এবং গল্পের যে অংশে নায়ক বাস্তব জগতে চলে এসেছে, পাঠকের তখনও মনে হবে গল্পের নায়ক হয়ত এখনো স্বপ্নের মধ্যেই আছে। এরপরে আমরা নায়কের পিতৃবিয়োগের কথা জানতে পারি। পিতৃবিয়োগ পরবর্তী তিনদিনের কাহিনী নিয়েই গল্পটি রচিত হয়েছে, পিতৃবিয়োগকে কেব্দ্র করেই গল্প এগিয়েছে, কিন্তু পিতৃবিয়োগ মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়নি। এই গল্পে একে একে চলে আসে নায়কের বন্ধু নিক্বণের কথা, আমরা দেখা পাই নায়িকা মেহেরামের (যিনি নায়কের প্রেমিকার মতো) মতো বাস্তবিক চরিত্রের, আসে রাহেলা নামক একটি মেয়ে এবং গল্পের আরেকটি প্রধান চরিত্র সম্যক। যারা কেউই ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয়, কেউই তেমন বিশেষ কিছু নয়, বাস্তব জীবনে আমরা যেমন সাধারণ-তারাও তেমন। এবং গল্পে একটি কাকতালীয় বিষয়ও আছে। এই কাকতালটুকু এড়িয়ে চলতে গেলে লেখকের আর গল্প লেখা হয় না, ফলে সেটুকু মেনে নিতেই হচ্ছে।
গল্পের বিভিন্ন অংশে আমরা বিভিন্ন চরিত্রের দর্শন, শিল্পকলা সম্পর্কিত আলোচনা দেখতে পাই, যেগুলো হয়তো খুব বেশি গভীর নয়। কিন্তু এটাই তো স্বাভাবিক, লেখক নিজে অনেক জানেন বলেই গল্পের সব চরিত্রকেই অতিমাত্রার জ্ঞানীভাবে উপস্থাপন করতে হবে তাতো নয়।
এই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর অংশ হচ্ছে, শেষের অধ্যায়টি। এখানে লেখক নিজের দর্শনটাকেই পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এই অধ্যায় নিয়ে বিরুদ্ধমত তৈরী হবে অনেকের, যা কিনা লেখকের ভবিষ্যতের জন্য ভালো নয়, একদল পাঠক তাকে বর্জন করে যেতেও পারেন। ব্যক্তিগতভাবে এই অংশটুকুই আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে। লেখকের এভাবে চিন্তা করার দক্ষতা এবং এই কথাগুলো এভাবে বলতে পারার ক্ষমতা আমাকে কিছুটা অবাক করেছে।
বইমেলায় জনপ্রিয় অনেক বইয়ের মধ্যে হয়তো ‘সমবেত শূন্যতায়’-এর নামটি শোনা যায়নি একেবারেই। তবে ধীরে ধীরে এই বই নিয়ে আলোচনা হবে বলেই আমি মনে করি। আমি বলছি না, লেখক বিশাল কোন সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করে ফেলেছেন, তবে ‘সমবেত শূন্যতায়’ একেবারে ছোট কিছুও নয়। সুদূর ভবিষ্যতে এই বইটি সমকালীন অনেক উপন্যাসকেই ছাড়িয়ে যাবে এই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
বইটা বেশ ভালো লেগেছে। নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্টের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলো উপন্যাসটা। উপন্যাসে বর্ণিত প্রত্যেকটা ঘটনার বর্ণনা ভীষণ সুন্দর এবং ডিটেইলড ছিলো। তবে একটা বিষয় দৃষ্টিকটু লেগেছে‚ বইয়ে প্রতি পাতায় প্রচুর ‘— (em dash)’ ব্যবহার করা হয়েছে। বাক্যগঠন একটু অন্যভাবে করা যায় কি না– লেখককে সেটা বিবেচনায় আনার অনুরোধ রইলো।
লেখকের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। আশা করছি ভবিষ্যতে আমাদেরকে আরও সুন্দর বই‚ সুন্দর গল্প উপহার দিবেন।