Jump to ratings and reviews
Rate this book

যুগান্ত

Rate this book
Fantasy Novel

424 pages, Hardcover

First published January 27, 2024

1 person is currently reading
16 people want to read

About the author

Riju Ganguly

39 books1,872 followers
Minding the Gap, always.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
8 (100%)
4 stars
0 (0%)
3 stars
0 (0%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 3 of 3 reviews
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,448 reviews431 followers
June 29, 2025
বই: যুগান্ত
লেখক: ঋজু গাঙ্গুলি
প্রকাশনা: অরণ্যমণ প্রকাশনী
প্রাপ্তি বছর: ২০২৪
পাঠকাল: ২০২৪ সালে একবার আর বিগত দু'দিন


ঋজু গাঙ্গুলির যুগান্ত নিছক একটি উপন্যাস নয়—এ এক বর্ণময়, বহুমাত্রিক মহাযাত্রা, যেখানে কাহিনির প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন সময়ের উন্মুক্ত ক্যানভাসে আঁকা এক মহাজাগতিক মানচিত্র। এখানে পুরাণ আর বিজ্ঞানের সম্মিলনে গড়ে ওঠে এমন এক বাস্তব, যা কাল্পনিক হলেও বুকে বাজে, আর অলৌকিক হলেও মাটির সোঁদা গন্ধে ভেজা। রাজনীতি, পরিবেশচেতনা, অস্তিত্বের প্রশ্ন আর আন্তঃমানবিক টানাপোড়েন একসঙ্গে মিশে যায় সেই মহাস্রোতে, যাকে আমরা বলি ‘কথা’, কিন্তু এখানে, আদতে তা এক নতুন ভাষার জন্ম।

এই বই পড়তে পড়তে মনে হয়েছে—এটি যেন কোনও কলমের কাজ নয়, বরং কোনও অদৃশ্য আদি-সত্তার নিঃশ্বাস, যা কেবল লেখকের হাত দিয়ে রূপ পেয়েছে। ঋজু গাঙ্গুলি এখানে একজন লেখক নন—তিনি হলেন আখ্যান-অর্চকের এক নতুন রূপ, যিনি একাধারে পুরাতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, শব্দের স্থপতি এবং মহাবিশ্বের পাঠ-অনুবাদক।

‘যুগান্ত’ শুধু অতীতের ব্যাখ্যা নয়—এ এক ভবিষ্যতের ভাষ্য। এখানে পৌরাণিক দেবতারা শুধু প্রতীক নন, তারা সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত এক-একটি শক্তিপুঞ্জ। অস্ত্র এখানে প্রযুক্তির ভাষায় কথা বলে, উপমা ও রূপকরা লুকিয়ে থাকে সামাজিক মনস্তত্ত্বের স্তরে। মহিষ্মতি থেকে জম্বুদ্বীপ, প্রতিটি স্থান যেন এক সত্ত্বা—জাগ্রত, প্রতিধ্বনিময়, আর বর্ণনায় মূর্ত।

এটি পাঠকের কাছে কেবল এক বই নয়, বরং এক ধ্বনি, এক দ্যুতি, এক চেতনাজাগানিয়া অভিজ্ঞতা। এখানে প্রতিটি অধ্যায় যেন একটি মন্ত্র—যা উচ্চারিত হলেই পাঠক প্রবেশ করেন এক নতুন ব্রহ্মাণ্ডে, যেখানে সময়-কাল-পাত্র ভেঙে যায়, এবং ভাবনারা রূপ পায় শব্দে, শব্দেরা রূপ পায় জ্যোতিষ্কে।

প্লটের বিন্যাস: পুরাণের নেপথ্যে বিজ্ঞানের ছায়া, বিজ্ঞানের অভ্যন্তরে পুরাণের ধ্বনি

মাতৃগর্ভে নয়—জন্ম এক গবেষণাগারে। তিনি মানুষ নন, এক নির্মিত সত্তা—রক্তমাংসের মধ্যে মিশে আছে কণা-পরমাণুর বিশুদ্ধ বিন্যাস। উপন্যাসের শুরু সায়েন্স ফিকশনের পরিমিত কাঠামোয়, যেখানে সৃষ্টির প্রক্রিয়া একেবারে বিজ্ঞানসম্মত, কড়া পরীক্ষাগার নির্ভর। কিন্তু সেই বিজ্ঞান ধীরে ধীরে গলে যায়, রূপ নেয় মিথে—আর উপন্যাস ঢুকে পড়ে এক বৃহত্তর, বহুস্তরীয়, মেদহীন কিন্তু বিশদ ফ্যান্টাসি জগতে।

এই জগতে আছে এক নির্বাসিত বিজ্ঞানী, যিনি একইসঙ্গে পিতার ছায়া ও ভবিষ্যতের আশ্বাস। আছে এক স্মৃতিভ্রষ্ট সহচর, যার অতীত অজানা হলেও শক্তি অতুলনীয়। আর আছে এক দুর্বার যাত্রা—যা কেবলমাত্র কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা ভূখণ্ডের দিকে নয়, বরং অন্তর্লীন অস্তিত্বের এক নিঃশব্দ ব্যাখ্যার খোঁজে, এক মহার্ঘ প্রশ্নের দিকে।

জম্বুদ্বীপের মানচিত্র এখানে কেবল ভৌগোলিক নয়—এ এক চলমান পালিম্পসেস্ট, যেখানে প্রতিটি নদী, পর্বত, উপত্যকা, মরুভূমি নিজস্ব কাহিনী বহন করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রেরা যেমন এগোয়, তেমনই বদলায় চারপাশের সামাজিক বুনট, ক্ষমতার বিন্যাস, আর ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

এই উপন্যাস ধাবমান এক সংঘাতের দিকে—যেখানে যুদ্ধ শুধু তরবারির নয়, বরং যুক্তির, বিশ্বাসের, স্মৃতির। যেখানে প্রতিপক্ষ একমাত্র বাহ্যিক শত্রু নয়, বরং নিজস্ব অতীতের ছায়া, নিজস্ব প্রশ্নের অসহ্য ভার।

এ এক অদ্ভুত, প্রায় পৌরাণিক গতিতে লেখা কাহিনী, যেখানে বিজ্ঞানের মেধা আর কল্পনার মায়া গলে গিয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক ভাষ্য—যা পুরাণকে আধুনিকতা দেয়, আর আধুনিকতাকে দেয় চিরন্তনতার গাম্ভীর্য।

ভাষা, বিন্যাস ও অলঙ্করণ

ঋজু গাঙ্গুলির ভাষা রূপকসমৃদ্ধ ও ভাবগভীর, অথচ দুর্বোধ্য নয়—তিনি বহতা নদীর মতো লেখেন, যেখানে প্রতিটি বাক্য নিজস্ব গভীরতা নিয়ে আসে, কিন্তু অতিরিক্ত ভার টানে না। তাঁর বর্ণনার মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত ভারসাম্য—“economy with richness,” যেন ঠিক T.S. Eliot-এর কথার প্রতিধ্বনি: “Genuine poetry can communicate before it is understood.” গাঙ্গুলির গদ্যও তেমন—তা প্রথমে অনুভব হয়, তারপর বুঝতে শেখে পাঠক।

তিনি যেমন সাবলীল ভাবে বেদের সূত্র, সূক্ত, মণ্ডল উল্লেখ করেন প্রাসঙ্গিকভাবে, তেমনই বিজ্ঞানের পরিভাষাও অনায়াসে বুনে দেন কথার জালে। কোথাও আলোকরশ্মির প্রযুক্তি এসে মিশে যায় গুহাচিত্রের মতো পুরাণের শরীরে, কোথাও মহাকাশযান অবতরণ করে দ্রোণগিরির উপত্যকায়। এগুলি অলীক নয়, বরং অলংকার—“myth is the womb of all science,” এই ধারনারই যেন জীবন্ত উদাহরণ।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহৃত মানচিত্র ও অলঙ্করণ—এগুলি কেবল সহায়ক চিত্র নয়, বরং পাঠের গতিকে একটি দৃশ্যমান অভিঘাতে রূপান্তরিত করে। পাঠক যেন শুধু পড়ছেন না, participating in an illuminated journey across imagined geographies. অলঙ্করণগুলি পাঠ্য নয়, পাথেয়।

আর প্রচ্ছদ? সে যেন লুকোনো যন্ত্রচালিত দরজা—একবার খুললে আপনি আর আপনি থাকেন না। তার গ্রাফিক রহস্য ও প্রতীকী নিপুণতা যেন চোখ দিয়ে ঢুকে আত্মায় প্রশ্ন তোলে। বইটি যেন নিজের ভাষায় বলে ওঠে: “Abandon your known self, all ye who enter here.”

ঋজু গাঙ্গুলির যুগান্ত তাই কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং এক নব-ভাষ্যের আহ্বান—যেখানে পুরাণ এবং প্রযুক্তি, যুক্তি ও যাদু, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ এক আশ্চর্য সঙ্গমস্থলে মিলিত হয়।

পুরাণের পুনর্নির্মাণ: অতীতের ছায়ায় ভবিষ্যতের রেখা

যুগান্ত উপন্যাসের সবচেয়ে বিপ্লবী দিক হল—ঋজু গাঙ্গুলির পুরাণ-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি কেবল পুরাণকে পুনর্পাঠ করেননি, বরং তাকে reimagine করেছেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায়। ব্রহ্মা, রুদ্র, সতী, লক্ষ্মী—এঁরা এখানে আর দেবলোকে বন্দি কোনও প্রতীক মাত্র নন। এঁরা রাজনীতির চালে বাঁধা মানুষ, আত্মদংশনে জর্জর, ভালবাসার পিপাসু, ভুল ও বিষাদে জর্জরিত স্বপ্নভ্রষ্ট সত্তা।

সতী—এই চরিত্রটির নতুন রূপায়ণ উপন্যাসটির অনস্বীকার্য শিখরবিন্দু। তাঁর অপমান এখানে কোনও যজ্ঞকুণ্ডে নয়, ঘটেছে এক মহাকাশযানে। আর সেই অপমানে তাঁর আত্মবলিদান এক আকাশমণ্ডল জুড়ে আগুন জ্বালায়—an explosion not of fire, but of meaning. তিনি যেন আমাদের কাছে পুরাণ থেকে উঠে আসা প্রথম রক্তমাংসের মানুষ, যিনি simultaneously divine and doomed. এই সতী একাধারে দেবী, বিপ্লবী, এবং আত্মরক্তাক্ত নারীমিথ।

ঋজু গাঙ্গুলির অসুরদের উপস্থাপনা এবং মহিষাসুর বধের পুনরায় নির্মাণও এক নতুন পাঠের দিগন্ত উন্মোচন করে। অসুররা এখানে আর শুধু দানব নয়—তাঁরা বিজ্ঞানচর্চায় ব্যস্ত সভ্যতার নির্মাতা, যাঁদের অস্তিত্ব টিকে আছে তথ্যপ্রযুক্তি, শক্তিচক্র ও মেটালার্জির ভিতরে। এবং তবু, তাঁদের উদ্বেগ, তাঁদের আশঙ্কা, তাঁদের হিংসা—সবই ভীষণভাবে মানবিক।

উপন্যাসে পরিবেশ-দূষণ, খনিজ লোভ, এবং আত্মঘাতী উন্নয়নচক্রের যে উল্লেখ রয়েছে, তা নিছক প্রসঙ্গ নয়—তা এক সতর্কতা, এক ভবিষ্যতের আহ্বান। “Myth is what never was, but always is”—এই ইংরেজি মিথ-তত্ত্ব যেন এখানে পূর্ণতা পায়।

ঋজু গাঙ্গুলির পুনর্লিখিত পুরাণ আমাদের বলে—ঐতিহ্য মানে শুধু স্মৃতি নয়, এক গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক আলাপ। এবং সেই আলাপ যতই পুরাকালের হোক, সে আসলে আজকের দিনটার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সংলাপ।

যুগান্ত একটি অনন্য গ্রন্থ, যেখানে পুরাণের আখ্যান ও আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। ডিএনএ প্রযুক্তি, মহাকাশযান, আলোকরশ্মি ও শক্তিচক্র—এই সব আধুনিক আবিষ্কার পুরাণের শরীরে মিশে গিয়ে সৃষ্টি করেছে এক অলৌকিক বাস্তবতা। ঋজু গাঙ্গুলির কল্পনায় দ্রোণগিরির বুকে নামে স্পেসক্র্যাফট, সতীর আত্মবিসর্জন ঘটে মহাকাশযানে, আর অসুরেরা হয়ে ওঠে প্রযুক্তির মেধাবী ধারক। এখানে ‘মিথ’ আর ‘মডার্নিটি’ দুই-ই সত্য—একটি হৃদয়ের, অন্যটি যুক্তির। আর যুগান্ত দেখিয়ে দেয়, এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব নয়, মিলনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের দরজা।

থ্রিলার ও টেকনোলজি

যুগান্ত নিছক ফ্যান্টাসি নয়, এটি এক চরম উৎকর্ণতা-জাগানো থ্রিলার, যেখানে প্রতিটি অধ্যায়ে ছড়ানো আছে উত্তেজনার শিরা-উপশিরা। গুপ্তঘাতকের ছায়া, সাইবার যুদ্ধের প্রজ্ঞা, তেজস্ক্রিয় উপাদানের বিধ্বংসী হুমকি, আর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ঘনঘটা—সব মিলিয়ে উপন্যাসটি যেন এক সুসংগঠিত স্ট্র্যাটেজিক মহাযুদ্ধ। প্রযুক্তির ব্যবহার কখনও কল্পনাবিলাসী নয়; বরং তা এতটাই নিখুঁতভাবে গল্পের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত যে পাঠক বিশ্বাস করে ফেলেন, "এ তো পুরাণেরই অংশ ছিল, শুধু আগে কেউ এমন করে বলেনি!"

To borrow from Arthur C. Clarke: “Any sufficiently advanced technology is indistinguishable from magic.” আর যুগান্ত সেই জাদুকরি প্রযুক্তির পরম পাঠ।

যুগান্ত: এক জিজ্ঞাসার open-ended আয়না

যুগান্ত নিছক কাহিনি নয়—এ এক অন্বেষণের আখ্যান, যেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠা তুলে ধরে চিরন্তন দ্বন্দ্ব: ক্ষমতা বনাম বিশ্বাস, সৃষ্টি বনাম নিয়তি, বিজ্ঞান বনাম পুরাণ। ঋজু গাঙ্গুলি এই দ্বন্দ্বগুলির পরতে পরতে বুনেছেন এক গাঢ় দার্শনিক বয়ান—যেখানে চরিত্রগুলি কেবল গল্পে অংশ নেয় না, তারা নিজেই প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

এই উপন্যাসে কল্পনা ও দর্শনের সীমারেখা মুছে যায়—যেন পাঠক হঠাৎই আবিষ্কার করেন, তারা কাহিনি পড়ছেন না, বরং নিজেদের সত্তার সঙ্গে এক নিরব অন্বেষণে নেমে পড়েছেন। ধর্ম, যুক্তি, প্রযুক্তি, আত্মার দহন—সবকিছু এক অদৃশ্য ছায়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

Nietzsche-এর ভাষায়: “He who has a why to live can bear almost any how.” আর যুগান্ত পাঠকের সামনে সেই ‘why’—অস্তিত্বের প্রগাঢ় প্রশ্নটি সাহসের সঙ্গে তুলে ধরে। এটি একটি বই নয়—এ এক আত্মানুসন্ধান।

পাঠানুভব: ব্যক্তিগত আবেগ

২০২৪-এর এক হেমন্তসন্ধ্যায় যুগান্ত হাতে আসার পর, প্রথম দু’দিনেই আমি ডুবে গিয়েছিলাম এক বিকল্প ইতিহাসে, এক জটিল অথচ আশ্চর্যভাবে চেনা কল্পজগতে। কিছু পৃষ্ঠা পড়ে শিউরে উঠেছিলাম, কিছু অধ্যায়ে চুপিচুপি কেঁদেছিলাম। মনে হচ্ছিল, চরিত্রদের যন্ত্রণা, প্রেম, দ্বন্দ্ব যেন আমার নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি—আমি যেন তাদের পাশে হাঁটছি, যুদ্ধ করছি, ভালবাসছি।

সত্যি বলতে, খুব অল্প ক’টি বাংলা বই আছে যেগুলিকে পড়ে মনে হয়েছে—“আরে, এ তো একবার পড়লেই হবে না, বারবার ফিরে আসতে হবে।” যুগান্ত সেই বিরল গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। যথারীতি আবার ফিরে এসেছি এই বইয়ে, বিগত দু'দিন।

একটা অসামান্য বই আসলে অনেকটা সেই পুরনো প্রেমিকার মতো, যার সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় বছরখানেক পরে—আর কথার শেষ থাকে না। স্মৃতি, নৈঃশব্দ্য, আর প্রশ্ন—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক রকম অদ্ভুত সংলাপ, যা থামে না, চলতেই থাকে।

যুগান্ত শুধু পড়া নয়—যুগান্ত আসলে একটা সম্পর্ক। একবার গড়ে উঠলে, আর ছাড়াও যায় না।

উপসংহার: বাংলা সাহিত্যে এক মহাজাগতিক সংলাপের সূচনা

বাংলা সাহিত্যের পরম্পরায় থ্রিলার, ফ্যান্টাসি এবং পুরাণ যেন তিনটি আলাদা নদী—যা নিজের নিজের গতিপথে চলেছে বহুদিন। যুগান্ত সেই নদীগুলিকে একত্র করেছে, এক মহাসমুদ্রে মিলিয়ে দিয়েছে—যেখানে যুক্তির তরঙ্গ, কল্পনার জোয়ার এবং ইতিহাসের গম্ভীর ধ্বনি একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হয়।

ঋজু গাঙ্গুলির সাহস, মেধা ও সাহিত্যকৌশল বাংলা কল্পসাহিত্যের পরিসরটিকে যেমন প্রসারিত করেছে, তেমনই নতুন প্রজন্মের কাছে খুলে দিয়েছে এক আলোকময় দ্বার—যেখানে বাংলা ভাষায় লেখা একথা শুনলেই কেবল গৃহসজ্জার নস্টালজিয়া নয়, অনুভব করা যায় এক বিস্তৃত নক্ষত্রলোকের সম্ভাবনা।

প্রকাশক অরণ্যমণ প্রকাশনীকেও প্রণাম জানাতে হয়—এমন নিরীক্ষাধর্মী, শিল্পময়, মননশীল প্রয়াস সাহিত্যের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

যুগান্ত নিছক একটি বই নয়—এ এক সময়ভেদের সেতু। একে পড়া মানে শুধু বিনোদন নয়, একে পড়া মানে নিজেকে আরেকবার নতুনভাবে আবিষ্কার করা।

পড়ুন, অনুধাবন করুন, আর নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনার মধ্যেও কি কোনও যুগান্ত নিঃশব্দে ঘুমিয়ে রয়েছে?
Profile Image for Rwik.
56 reviews5 followers
March 16, 2024
বই : যুগান্ত

লেখক :  ঋজু গাঙ্গুলি

প্রকাশক : অরণ্যমন

মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০/-


ঋজু বাবুর বিভিন্ন লেখার সাথে আমি সুপরিচিত ।  সুনির্দিষ্ট ভাবে বললে ওনার বাহুল্যবর্জিত থ্রিলার লেখা গুলির অনেক গুলোই মন ছুঁয়ে গেছে । তবে যুগান্ত সম্ভবত ওনার ম্যাগনাম ওপাস।

 এই বই পড়ে সম্পূর্ণ রূপে অনুধাবন করার মত বেদ ও পুরাণ জ্ঞান আমার এই মুহূর্তে নেই । তাই সমালোচনা না করে আমি শুধু ব্যক্তিগত পাঠ অভিজ্ঞতা জানাচ্ছি ।

এই লেখাটির পেছনে লেখকের বিস্তৃত গবেষণার আন্দাজ পাওয়া যায় বইটির শেষের কয়েক পাতার উৎস নির্দেশ থেকে। পুরাণ ও বেদের থেকে অনুপ্রাণিত লেখা আজকের যুগে বিরল নয় , তবে লেখায় উল্লেখিত  বেদের সমস্ত প্রাসঙ্গিক মন্ডল ও সূক্ত সংখ্যার উল্লেখ নিঃসন্দেহে বিরল ।

ব্রম্ভা , সতী, রুদ্র, লক্ষী সহ বাকি প্রায় সকল চরিত্রের সাথে আপনি সুপরিচিত হলেও এই কাহিনী লেখকের কল্পনাপ্রসূত। জম্বুদ্বীপ সমন্ধে কল্পনায় সাহায্য করতে বিভিন্ন মানচিত্রের ব্যাবহার বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য । গল্পের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রচুর সুন্দর অলঙ্করণ, কাল্পনিক জগত সম্বন্ধে সম্মক ধারণা সৃষ্টি করতে বিশেষ সাহায্য করেছে ।


মহিষাসুর বধের সাথে মিল থাকা এই কাহিনী অনেক ক্ষেত্রেই পুরাতন কল্পনা কে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেছে ।সর্বসমক্ষে সতীর অপমান ঘটলেও , সেটা মহাকাশ যানে র মধ্যে । মহিষ্মতি নগরী জম্বু দ্বীপের অঘোষিত রাজধানী হয়ে ওঠার ফলে উন্নতির ছাপ সর্বত্র , কিন্তু অসুর প্রধান মহিষ চিন্তিত নিজ সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত নিয়ে। হাল আমলের সমস্যা যেমন অপরিকল্পিত খননকার্য এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টের বর্ণনা । আছে আলোক রশ্মির সাহায্যের যুদ্ধের বর্ণনা। গুপ্ত ঘাতকের আক্রমনের পরিপ্রেক্ষিতে মিলিন্দ ও লক্ষীর তরবারি যুদ্ধের বর্ননা বেশ মনে ধরেছে । শুরু থেকে শেষ অবধি কাহিনীর লয়ের নিয়ন্ত্রন , বিস্তৃত বর্ণনা বিশেষ করে উল্লখযোগ্য।


অ্যালকেমিস্ট এর একটি রিভিউতে পড়েছিলাম , সমালোচক বলেছিলেন বইটি পড়ার পর ওনার মনে হয়েছে যেন ভোরের সূর্যের আলোয় এসে দাঁড়িয়েছেন।

বর্তমান বাংলা ফ্যান্টাসির জগতে এই ধরনের স্নিগ্ধ প্রয়াসের প্রয়োজন ছিল । উৎসর্গ পড়ে মনে হয়েছে এই ধরনের আরও সুন্দর লেখা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে, আশায় রইলাম।
Profile Image for Dipankar Bhadra.
676 reviews60 followers
July 19, 2025
```
✦   যুগান্ত   ✦
+-------------------------+
|      ঋজু গাঙ্গুলী      |
|   অরণ্যমন প্রকাশনা    |
+-------------------------+
```

‘যুগান্ত’—ঋজু গাঙ্গুলীর একটি অনন্য সৃষ্টি, যেখানে বৈজ্ঞানিক কল্পনা ও পুরাণের একটি অসাধারণ মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এমন এক সত্তা, যার জন্ম মাতৃগর্ভে নয়; বরং রাসায়নিক আর শক্তির সমন্বয়ে। এই সৃষ্টি কোনও সাধারণ প্রাণী নয়, বরং একটি পরিশ্রমী গবেষণালয়ের ফসল। বিজ্ঞানী ও যন্ত্রদের সহায়তায় বেড়ে ওঠা এই জীবনটি যখন সমাজের অমানবিক লাঞ্ছনার শিকার হয়, তখনই সে পালিয়ে যায় আলো-ঝলমল নগরী থেকে দূরে – এক নির্বাসিত বিজ্ঞানীর আশ্রয়ে। কিন্তু নিয়তি তাকে থামায় না। এক অন্তিম আবেদন তাকে বাধ্য করে একটি বিপদসংকুল লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে। সেই যাত্রায় তার সঙ্গী হন এক রহস্যময় পুরুষ, যার অতীতটি অজ্ঞাত, কিন্তু শক্তি অবিশ্বাস্য। পাহাড়, সমুদ্র, মরুভূমি, জঙ্গল পেরিয়ে তারা এগিয়ে যায়—এবং তাদের যাত্রাপথের পাশেই বদলাতে থাকে জম্বুদ্বীপের প্রাকৃতিক বৈচিত্র। সংঘাত অনিবার্য হতে শুরু করে। এবং পাঠক পৌঁছে যায় নতুন একটি বাস্তবতায়, যেখানে সময় আর গন্তব্যের সমন্বয়ের পরিসীমা ভেঙে যায়।

ঋজু গাঙ্গুলীর লেখার প্রবাহিত রূপে আমরা দেখতে পাই কীভাবে একরকমের সামাজিক বাস্তবতা অনুধাবনের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও পুরাণ একত্রিত হয়েছে। উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্র শুধুমাত্র কাহিনিতে যুক্ত নয়; তারা সমগ্র সমাজের রাজনৈতিক-মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে তাদের মাধ্যমে লেখক মানবজীবনের সংকটগুলো এবং নৈতিক দ্বন্দ্বগুলো তুলে ধরেন—যার মধ্যে সমাজের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার গভীরতা রয়েছে।

অন্যদিকে, ‘যুগান্ত’ চরিত্রগুলোর অভিযানে এই দ্বন্দ্বগুলো সরাসরি প্রভাব ফেলে, যেখানে পাঠককে একটি ক্রমবিকাশমান মহাজাগতিক মনস্তত্ত্বের দিকে নিয়ে যায়। মহাকাশের পথে তাদের অভিযান, প্রাণের উৎকর্ষের উদ্দেশ্যে, সদা সাক্ষাৎকার দেয় মানব অস্তিত্বের লক্ষ্য সম্পর্কে।

‘যুগান্ত’ কেবল অপরিচিত চরের জীবন কাহিনি নয়, এটি ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের একটি যাত্রা। এই ব‌ইটি আমাদের নিজেদের অন্তর্নিহিত 'যুগান্ত' এর সন্ধান করতে প্ররোচিত করে, যা আমাদের নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং অস্তিত্বের উদ্দেশ্যসমূহকে উন্মোচন করার প্রেরণা সরবরাহ করে। লেখকের দ্বারা নির্মিত এই বিশ্ব আমাদের প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে এবং আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে আওয়াজ তুলে বলে যে, আমরা সবাই এক বিশেষ কাজের জন্য এখানে এসেছি।

বাংলা সাহিত্যের পরম্পরায় এই ব‌ইটি একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করে। এটি কল্পনা এবং বাস্তবতার মধ্যে এক সেতুবন্ধন তৈরি করে যা আমাদেরকে ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং আবেগের সাগরে নিয়ে যায়। প্রতিটি অধ্যায়ের সাথে সঙ্গতি রেখে ব্যবহৃত মানচিত্র ও অলঙ্করণগুলি পাঠের অভিজ্ঞতাটিকে আরো জীবন্ত ও ছবির মতো উজ্জ্বল করে তুলেছে।
অরণ্যমন প্রকাশনীর জন্য এমন একটি শিল্পময় প্রয়াস সত্যিই গর্বের।

অত‌এব, হে পাঠক, বইটি পড়ুন এবং আপনার ভেতরকার মহাজাগতিক আলোকে জাগ্রত করুন। 'যুগান্ত' আমাদের জীবনে একটি নতুন সূর্যালোকের সুস্পষ্ট চিহ্ন, যা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে এবং আমাদের অস্তিত্বের লক্ষ্যকে খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
Displaying 1 - 3 of 3 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.