একশ সাতাশ পৃষ্ঠার এ বইটি শুরু হয়েছে হালকা চালে, সূক্ষ্ণ হাস্যরসাত্মক ঘটনাবলী দিয়ে। ধীরে ধীরে যত এগিয়েছে, তত উঠে এসেছে আমেরিকার ঝাঁ চকচকে জীবনের আড়ালে এর অন্ধকার দিকগুলোর কথা। উঠে এসেছে কীভাবে আদিবাসীদেরকে লুটে পুটে হত্যা করে জমির দখল নিয়েছে শ্বেতাঙ্গরা, আমেরিকান ড্রিমের মূলা ঝুলিয়ে কীভাবে গরীবদের শুষে নিচ্ছে আমেরিকান সিস্টেম। লেখক আমেরিকায় বসবাসকারী বাংলাদেশি সমাজের নানাবিধ অদ্ভুত আচরণ নিয়েও হাস্যরসাত্মক বর্ণনা দিয়েছেন। এখানের দাওয়াত কালচার, ব্যাচেলর বনাম নন-ব্যাচেলর দ্বন্দ্ব, পশ জায়গায় বাড়ি কেনার ফাঁপড়বাজি, সবকিছুই অকপটে উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, লেখক সাহস করে এমন কিছু অপ্রিয় সত্য সরাসরি বলেছেন, যেগুলো সচরাচর কেউ বলে না।
লেখক আমেরিকায় নিজের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, সাথে আবার আমেরিকার অন্ধকারাবৃত অতীত ইতিহাস নিয়েও আলোচনা করেছেন। ফরম্যাট আমার বিশেষ পছন্দ হয়নি। অভিজ্ঞতা বা ইতিহাস যে কোনো একটার বর্ণনা থাকলেই বেশি আনন্দ পেতাম পড়ে। এমনিতে পুরো বইটিই তথ্যবহুল ও সাবলীল ভাষায় লেখা।
সৈয়দ মুজতবা আলী একসময় কি মজা করে দেশ বিদেশের গল্প লিখতেন, মনে পড়ে? নানা দেশের, নানা মুনির নানা মত চর্চা করেই তো এগিয়ে যেতে হয়, নাকি?
প্রতি বছর বহু মানুষ স্বর্গরাজ্য, স্বপ্নরাজ্য আমেরিকায় পাড়ি জমান। আমার মতো পোড় খাওয়া সন্তানেরা যখন নিজের পটেনশিয়ালকে মিট করতে পারবে কিনা শঙ্কায় দিন কাটায়, তখন অসহায় হয়ে 'গ্রেট আমেরিকান ড্রিম' কল্পণা করে। একদিন কেউ কেউ আমরা সেদেশে যাই। তারপর 'মুক্তচিন্তা'র দেশে গিয়ে আমরা অবাক হয়ে ভাবি বিল অফ রাইটস কেনো ঠিকঠাক কপালে জুটছেনা। এমনটা তো হবার কথা নয়, এসব তো কেউ বলেনি আগে। তখন মনে হয়, যে দেশে ঘর বাঁধবো বলে উড়ে আসলাম সে দেশে কেনো অতিথি পাখি হয়েই থাকলাম। দেশটা সম্পর্কে আগে কিছু জানলাম না কেন? সবাই এসব দেখেও না দেখার ভান করলো কেন?
তাই ২০ বছরের অধিক সময় আমেরিকায় থাকা প্রবাসী লেখক তানভীর ইসলাম এগিয়ে এলেন। দেশটিকে নিরিক্ষণের দৃষ্টিতে দেখে নিজ দেশের মানুষের জন্য নিজ অভিজ্ঞতা ছাপার অক্ষরে এনে এসব কৌতুহল মেটানো আর দরকারি কিছু ধারণা দেয়াকে দায়িত্ব মনে করলেন। শুনে শুনে কত রকম কৌতুহল জন্মায়...ও দেশে নাকি গাড়ি ছাড়া চলা সম্ভব না, সবার ঘরে ঘরে নাকি বন্দুক, শিক্ষাদিক্ষায় নাকি ওরা অনাগ্রহী, ছেলেমেয়ে চলে গেলে বৃদ্ধরা না জানি কিভাবে জীবন কাটান ইত্যাদি নানান রকম কথা। সব কিছুই লেখক গল্প করতে করতে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি ব্যক্ত করেছেন পেছনের ইতিহাসও। কিছু মিছু অংশ যদি তুলে ধরি-
আমেরিকার আছে তিনশ চারশ বছরের কলঙ্কের ইতিহাস। দেশটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো রয়ে গেছে নানাবিধ অনধিকার চর্চা। পৃথিবীর চোখে ধনীক দেশ, আর মোড়লগিরি ফলাবার কারণে চোখ বুঝে এর নাগরিকেরাও জপতে শুরু করেছে Love it, or leave it।
সারাবিশ্বে সমঅধিকারের বুলি ফোটানো দেশটার সকল নাগরিক কিন্তু আদতে সমঅধিকার ভোগ করেন না, প্রদীপের নিচে অন্ধকারটা যেনো। শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতিতে নেই সমতা। আর দশটা দেশের মতোই আছে ধন-বৈষম্য। মজা করে বললে 'গুলশান' ওদেরও আছে। মানে Either you are one of them or you serve them -সার্বজনীন!
জেনে অবাক হবেন, পরিবেশবাদী দেশ আমেরিকা আর চীনই নাকি বিশ্বের ৪০% গ্রিণহাউজ গ্যাসের জন্য দায়ী। মধ্যপ্রাচ্যের সাথে এত কোন্দল, অথচ সম্পর্ক খারাপের পেছনে আর কোনো কারণই কারণ নয়; ঠিক মতো তেল সাপ্লাই দাও, অওর জি লে আপনি জিন্দেগী! দুঃখে হাসিই পায় এসব তেল চুরি, শিক্ষা চুরি, চিকিৎসা চুরি, অধিকার চুরির লেভেল দেখে; বাঙাল করে সিধেঁল চুরি, বড়ভাই করেন জোচ্চুরি।
Microaggression, Racism আমাদেরও আছে। তবে ওদের আর আমাদের অবস্থানে বিস্তর ফারাক। লক্ষ লক্ষ মানুষ বর্ণবাদের বর্বরতার শিকার হয়ে বিলুপ্ত হয়েছে। রেসিজমের যে কালো দাগ ওদের গায়ে লেপে আছে, সে দাগ না মুছে তা যেন আস্তে আস্তে ট্যাটুর মতো পার্মানেন্ট হয়ে যাচ্ছে। মেনিফেস্ট ডেস্টিনি নামক উদ্ভট ধর্মীয় প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে নেটিভ আমেরিকানদের যে উচ্ছেদ-অত্যাচার চলেছিল, এরপরেও ইমিগ্রেন্ট রুল, কলম্বাস ডে, থ্যাংকসগিভিং ডে এইসকল বিষয় এই একবিংশ শতাব্দীতেও খোদ আমেরিকায় দেখা একটা আয়রনিই বটে। এসব ওরা জায়েজ বলে মেনে না নিলে কি আজও এসব থাকে?
আমেরিকান বাঙালিদেরও এড়িয়ে যাননি লেখক। ওখানে বাঙালীপাড়ার কি অবস্থা, বাঙালি মুসলিমদের ওখানকার ব্যাপারস্যাপার, বাঙালিরা প্রধানতঃ ওখানে কি কাজ করে এসব প্রশ্নের একটা উত্তর মিলবে এখানে। আপন মনেই হেসে উঠবেন আমাদের দ্বিচারিতার স্বভাব দেখে।
সব মিলে আমেরিকান ড্রিমকে বর্ণণা করতে লেখক বইয়ের নামকরণে রেখেছেন আমেরিকান স্ল্যাং, 'ব্লেস ইওর হার্ট'। যেটাকে আপনি না জেনে আশীর্বাদও ভাবতে পারেন, জানলে তিরষ্কারও ভাবতে পারেন। ছোট পরিসরে এতকিছু সহজ ভাষায় জানতে পারায় বইটি দারুণ লেগেছে। কমতি বলতে মনে হয়েছে ইতিহাস ও সমালোচনার বাইরে ইনসাইটের পরিমাণটা। আরও কিছু দর্শন, জীবন, ভালোদিকের বর্ণণা পেলে, কিছু তুলনামূলক সভ্যতার সাথে তুলনা করলে হয়তো খুব ভালো লাগতো। সে যাইহোক, পৃথিবীর সন্তান হিসেবে আমিও চাই অন্ততঃ কেউ বুঝুক আমরা সবাই এক। গ্রেট হোক চাই না হোক, জানুক প্রাণের মূল্য অত্যধিক। অনুধাবণ করতে যেনো দেরি না হয়ে যায়-
"কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে, বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে।"
হালকা চালে গল্প গুলো শুরু হলেও এরপর দাসপ্রথা,বর্ণবাদিতা,বন্দুক সহিংসতা,সামাজিক বৈষম্য-এসব ইস্যু নিয়ে আলাপ ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন দীর্ঘকাল ধরে আমেরিকায় বসবাস করা লেখক।নতুন লেখক হিসেবে ওনার লেখা বেশ ভালো লেগেছে। বইটি নিঃসন্দেহে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেশটিকে দেখতে সহায়তা করবে।