ঘর থেকে উঠোনে নামতে গিয়ে হঠাৎ রসুইঘরের পৈঠা বরাবর, যার কোলঘেঁষে রাখা আছে বাইরের পানির কলসটা, যার পাশেই ভাঙা কাঁসার ওপর পড়ে আছে রাতের বাসী বাসনকোসন মাজার কালিমাখা ন্যাতাটা, আর পড়ে আছে একটা ভাঙা ডিমের খোসা, ঠিক সেই জায়গায় ফুলটা চোখে পড়ল ফিরোজার! ঠিক কী ফুল সে চিনতে পারল না বটে, তবে তার রং-রূপ এতই বাহারি যে, সেদিকে চোখ পড়ামাত্র এক দৌড়ে তার কাছে ছুটে আসতে বাধ্য হলো। কোনো গাছ নাই, কোনো ঝোপঝাড় নাই, হাতমুখ ধোয়ার জায়গা হিসেবে নিয়মিত চোখের সামনে ভিজে স্যাঁতস্যাতে হয়ে থাকা মাটি ফেটে বেরিয়েছে শুধুই একটা ফুলের ডাঁটি। ডাঁটির মাথায় পিতল বর্ণের ফুল! শ্যাঁওলার স্তর জমা সবুজাভ মাটি ফেটে বেরোনো ফুলের গন্ধটা যেমন তীব্র, তেমনই ঝাঁঝালো। অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়া তীব্র ঝাঁঝালো ঘ্রাণ উপেক্ষা করেই ফুলের সামনে এসে বসে পড়ল ফিরোজা। একটিমাত্র ফুল দেখে এগিয়ে এসেছিল সে। এসে বসতে বসতে তার পাশ দিয়ে গজিয়ে উঠলো আরো তিনটা ফুলের ডাঁটি! তারপর আরো তিনটা! উঠতেই থাকলো! দেখতে দেখতে যেখানটায় বসেছে ফিরোজা, তার চারপাশ ভরে উঠলো অজস্র পিতলবর্ণের ফুলে! ফুলগুলোর কোনো একটা হঠাৎ যেন তাকে ডেকে উঠলো- ‘মা!’
কাহিনী খুব আহামরি কিছু না কিন্তু বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষাতে লেখা বই পড়ে ভালোই লেগেছে কিন্তু মাঝে মাঝে আমার কাছে খাপ ছাড়া, অহেতুক কথা মনে হয়ছে। ডাকাত এসাক চরিত্রটা আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে। লেখকের খালিদ, আর ঘানি বই পড়ে আশাটা ছিলো অনেক বেশি। সে হিসেবে আশা ঐভাবে পূরণ হয় নাই। রেটিংঃ ২.৫/৫
সংসারে অযত্নে পইড়ে থাকা আসবাব যেমুন, তেমুনি হাল আসাদ-পরীর। বাপ মায়ে সেই যে কেমতে করি ম রি গেল এরপর তে চাঁনবিবি তার ভাইয়ের পোলা-মাইয়েকে নিজের অভাবের সংসারেই রাখি দিলেন। এরাও এই সংসারের না থাকি, থাকি এক অংশ হয়ে গেল। হারাদিন খালি বনে বাদাড়ে ঘুরপি। খাওয়ার সময় হলি পরে চারটে খেয়েই এই বাড়ির সরবী, ওই পাগলাপুকুরের এই সেই তুলতি যাবি। এদের আশকারা দেয়ার জন্যি এখন আবার যোগ হসে তাদের ❛লতুন ভাবী❜ ফিরোজা। হাবিজুলের (হাফিজুল) লতুন বিয়ে করা বউ। হাবিজুল-ফিরোজার লতুন সংসার। সেখানে দারিদ্র্যের অভাব ভরপুর। কিন্তু সেজন্য নাই কোনো হতাশা। কিছু না থাকলি পরে যে হতাশা থাকে তার বাদে নাই কোনো কাইজ্জা বিবাদ। নাই বউ-শাউরিতে চুলোচুলি। আধপেটা খাইয়েও তারা কেমন সুখের মধ্যি থাকে। বিয়ানে কাজ সেরে নিশুতি রাইতে যখন মঈন-চাঁনবিবি-হাবিজুল-ফিরোজা-আসাদ-পরী খাতি বসে সে এক ফাইন দৃশ্য।
কথায় কয়, ❛আল্লাহর কুদরতে কী না হয়!❜ লম্বা সুময় ছলের মুখ না দেখা এসাক-দিলজানের ঘর আলো করে আসি এক ফুটফুটে বাচ্চা। এই নিয়েই পাড়া-গাঁয়ে বাঁধে বিপত্তি। ❛এ আবার কেমনতারা ছল গো! দেখতি লাগে বাছুরের মতোন। আবার নাহি দুইটা শিং আছে। হাত-পাও তিনটে!❜ এসাকের বউ কি বিয়ালো এইটে! রটনা আছে, ❛কাকের মতো থেকে একেবারে কাকই হইছে রটে যাওয়া।❜ এসাকের ছাওয়ালের বেলায় হইছি তাই। একটু কী হইছে এদিক সেদিক তারে বাছুর বানি দেলো! বুঝবার পারছেন না এসাক কেডা? সেই হরিণচড়ার আলী এসাক যারে গাঁওয়ের মাইনষে এসাক ডা কা ত কয়ে ডাকে। পিরিতির বিয়ে ছিল দিলজনের সাথে। কিন্তু এতদিন জানতো এই মিইয়ে মানুষ বাঁজা। এর উদরে ছাওয়াল আল্লাহর কুদরতই বটে! ❛যার বিয়া তার খবর নাই, পাড়াপড়শীর ঘুম নাই।❜ এমুনটাই হইছে পরে এসাকের। ছল হইছে তাইর, কিন্তু গায়ের শ য় তা ন গুলো আকথা কুকথা ছড়াচ্ছি তার বউ আর মোটে হওয়া দুধের শিশুর নামে। গাঁয়ের লোক সরল হলিও তেনাদের কুটিলতার অবস্থা বেজায় কঠিন। তাইতো একদল চাচ্ছি এসাকরে গাঁও ছাড়া করতি। হলোও তাই! কি একভাবি তার সব্বনাশ করি ছাড়লো। সব্বনাশের অন্ত করি ছাড়লো বউটাও! কী করা দুধের ছলডাকে লইয়ে পাড়ি জমাতে হলো আরেক গাঁয়ে। ফিরোজার গায়ের লতুন বউয়ের গন্ধ গেল না, সাথে অভাবও গেল না। তবুও এক পরম মমতায় সে এই সংসারকে আঁকড়ি ধরি আছে। আশা করি আছে একদিন আল্লা অভাব ঘুচিয়ে দিবে। স্বামীকে গোর গাদা খাটুনি খাটটি হবি না একদিন। স্বপ্ন দেখে সে। স্বপ্নের দিনে ঘটি যায় নানা ঘটনা। রটেও অনেক। কিন্তু যেনে খুঁটি শক্ত সেনে যাই করুক খুঁটি অনড় থাকে। তাইতো শত বিপত্তির মাঝেও ফিরোজার পেটে জাগে আরেক প্রাণের অস্তিত্ব। বগ ধরি, কয়লামূর্তি হই, লোরাপোড়া করি কেটে যাচ্ছি আসাদ-পরীর দিন। লতুন ভাবীর সাথে মজেছে বেশ। ফাইন লাগে তারে। এভাবেই কি কাটি যাবে তাদের দিন? অভাব ঘুচে সুখের মুখ দেখপি কি তারা?
এসাক বিগত কষ্ট ভুলি লতুন করি বাঁচার জন্যে চলছি। এরমধ্যেই সুখের দিন আসতে না আসতেই ❛গেরামে ওলাবিবি আইছে❜। দেশভাগের উত্তাল উই সুময়ের পরে এই ভাগ খালি বঞ্চিতই হইছে। তাইতো সামান্য জ্ঞান নাই, নাই পরিচ্ছন্নতা। তারই সুযোগ নেয় ওলাবিবি নামের কলেরা। বাড়ির পর বাড়ি শুইয়ে দেয় সে। এরই মাঝে যেন এসাক মিয়াকে আল্লাহ ফেরেশতা করি পাঠাইছে। সকলের দুঃখে সে হাজির হয়। সকলের দুঃখে হাজির হওয়া লোকটা নিজের দুঃখের দিন পার করি সুখের মুখ দেখপে তো?
এনে অভাব আছে, আছে তেল চিটচিটে বাঁশের মাচার বিছানা, এক বেলা খাইলি পরে বাকি বেলা মুখ খালি থাকা লাগে। তবুও আছে বিশ্বাস, আছে ভালোবাসা। যার শক্তিতে গেঁয়ো মানুষগুলান টিকে থাকে। বানের জল আলি পরেও এদের বন্ধন ফাইন!
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝জলমিছরি❞ রবিউল করিম মৃদুলের গ্রাম্য পরিবেশের ছোঁয়ায় লেখা এক উপন্যাস। যেখানে লেখক তুলি ধরেছেন গাঁয়ের সেই লোকেদের সরলতা, সরলতার মাঝের কুটিলতা। আর সব শেষের মাঝেও হাসিমুখে বেঁচে থাকার কঠিন উদ্যম। দুইটা ভাগে এই উপন্যাসকে আগিয়ে লিয়ে গেছেন লেখক মৃদুল। এক অংশে এসাক আর তাইর বউয়ের জীবন। অন্যদিকে সদ্য বিয়ে করা ফিরোজা-হাবিজুলের সাদা কালোর জঞ্জালের লাল লীল সংসার। যেনে দুবেলা খাওয়ার গ্যারান্টি নাই কিন্তু আছে অফুরন্ত ভালোবাসার গ্যারান্টি। আছে বিশ্বাস। এসাকের চরিত্র আর তার আশেপাশের ঘটনা লেখক সাজিয়েছেন মনোমুগ্ধকর করি। তাইতো বিলাসীতা না থাকলিও সেইনে ছেলো মুগ্ধতা। পড়তি গি হামার দারুণ লেগেচে। গাঁওয়ের এত সুন্দর বর্ণনা লেখক করিচেন যেন মনে হচ্ছিলো হামিই সেই গাঁয়ের কেউ। এসাকের জীবনের ঘটনাগুলো লেখক কী সুন্দর করি বর্ণনা করলেন! হরিণচড়াৎ যে ছিল একরোখা, ত্যা দ র প্রকৃতির সেই চাপিলায় আসলি পরে কেমন দায়িত্ববান, নিঃস্বার্থ হই গেল।
এরপর আসে ফিরোজার সংসার। অভাবে লেপ্টে থাকা সংসারে যদি সাচ্চা দিলের কয়জন মানুষ থাকি তাইলে পরে সেই অভাবকে বুড়ো আঙুল দেখানোই যায়? তাই হইছে এই সংসারে। খাওয়ার নাই ঠিক কিন্তু তাদের বন্ধন একেবারে কঠিন। তাইতো হাজারো বিপদে বউকে ভুল বুঝে না স্বামী। স্বামীর অপারগতা নিয়ে ফোড়ন কাটে না বউ। হামার ছলডাক তাবিজ করি লাইলো আবাগির বেটি বলে গাল পারেন না শাশুড়ি চাঁনবিবি। পরম মমতায় ব্যাটার বউকে মেনে নিয়েছেন। মায়ের মমতায় হগ্গলের সাতি লড়ছেন। এমনকি সময়ে লিজের মেয়ের সাথেও বিপক্ষে চলে যান হক কথায় বউকে সঙ্গ দিতে। এমন সংসারে অভাব এসে তো বিপদে পড়ি যায়! এক হাতে তালি বাজে না। তাই ফিরোজাও এই ভালোবাসাকে লেপ্টে নিয়ে নিজেকে এই সংসারের একজন করে নিয়েছে। মাতৃস্নেহে পালন করছে বনে বাদাড়ে টইটই করা দুটো প্রাণকে। ভালোবাসা আছে বলেই শ্বশুরের চোখ ফাঁকি দিয়ে চ্যাঙ মাছের তরকারি রেঁধে দেন তাদের। শ্বশুর মিয়া যে এই মাছ রুচি করেন না। দুটো সময়ের একত্রে চলায় যখন এক সুতায় মিলি গেল গপ্প কী ফাইন না লাগলো হামার তখন। গ্রামীণ পরিবেশের রূপের মাঝেও যে কদর্যতা আছে লেখক সেইটে দেখিয়েছেন সুচারুভাবে। তাইতো কোথাও রাগ হলে পরক্ষণেই তারে সরলতায় মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। এত সুন্দর করেও গল্প ফাদা যায়! তবে এই গল্পটা কুন সময়ের? বুঝা যায় দেশ ভাগের সময়ের থেকে আরো এগিয়েছে। কিন্তু কত এগিয়েছে কেডা কইতে পারে? লেখক দেখিয়েছেন প্রযুক্তির ছোঁয়াহীন কুসুমহাটি গেরামের সৌন্দর্য কেমনে ম্লান হয়ে যায় অপরিকল্পিত প্রযুক্তির যাচ্ছেতাই ব্যবহারে। প্রযুক্তি আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ সেইটাও শেষে দিয়ে কিছুটা ধরা দেয়। এই উপন্যাসের বর্ণনা থেকেও সবথেকে মন ধরানো ব্যাপার ছেলো চরিত্র। প্রতিটা চরিত্র বাস্তব। কিছু আবার পরাবাস্তব লেগিচি হামার। যেমন ফিরোজা, তেমন হাবিজুল। তবে মনকাড়ি নিছে চাঁনবিবি। এত সুন্দর চরিত্রও হয়! চাঁনবিবির অতীতের গল্পের সাথে ফিরোজার সময়ের সংযোগ ফাইন লেগেচে। কোনো উত্তেজনা নেই, নেই কোনো আশা তাও সামনি কী হবি জানতে মনটা উথাল পাতাল করছিল। কারণ এই সুখের মাঝে আবার কী বিপত্তি ঘটে আবার এই বিপত্তির মাঝে সুখ কেমনে আসবি এই চিন্তা করে করেই ২৮০ পাতায় এসেছি। লেখক বইতে গেরামের চটচটে জীবনের পাশাপাশি গেরামের স্যালুন রান্নার যে বর্ণনা দিয়েছে সেসব খেতে যে ইচ্ছে হয়নি তা কী করে কই? ছোটো আলুর পাতলা ঝোল, বউখুদা ভাতের অভাবের সাথে লাউ পাতার ঝাল ভর্তা কিংবা কুমড়োর ফুল দিয়ে ভাজা ডিমওয়ালা মুরগির সদ্য পারা ডিম। আসছি নি আপনার জিভে জল? এত অভাবের মাঝেও যেদিন ভালো পদ রান্না হয় সেদিন অভাবগ্রস্ত মানুষগুল রসুইঘরে বসে পরিবারশুদ্ধ লোকের একত্রে খাওয়ার যে দৃশ্য লেখক তৈরি করেছিলেন তা বাঁধিয়ে রাখার মতো! ধৈর্য্য, উদ্যম আর সততা দিয়ে যে জীবনের এগিয়ে যাওয়া যায় সেটি এই বইতে দৃশ্যমান। কাল পেরিয়ে এই চরিত্রগুলোর কী হয়েছিল কেন হইলো না এসব খালি এটাই বুঝায় জীবনে ❛লাইগ্যা থাকলে মাইগ্যা খায় না❜।
দারুণ ফাইন একটা বই লিখেছেন লেখক। মুগ্ধতা বিরাজ করেছে। সাতে ভাবছিলাম এইটে কি পরাবাস্তব কোনো দুনিয়া? না লৌকিকের বাইরের কিছু! তাও ভালোর মাঝিও আছে কিছু ব্যাপার। সেগুলো লেখক ঠিক প্রকাশ করেননি, বর্ণনা দিয়ে ভেঙে দেননি। কিছু ঘটনার উত্তর পাইনি কো। উত্তর পেলে পরি কিলিয়ার হয়ে যেতুম। হইনি তাতেও বিশেষ আক্ষেপ নেইকো।
অসাধারণ। অবিশ্বাস্য একটা অনুভূতি হলো বইটা পড়ে। বহুদিন পর এত মুগ্ধ হয়ে কোনো বই পড়লাম। পড়ার আগে অনেকগুলো রিভিউ দেখেছিলাম। সবাই এত প্রশংসা করছিল বইটার। আমারও দারুণ লাগলো। বিশেষ করে লেখকের গদ্য অসাধারণ। একমুহূর্তের জন্য পিছলে যেতে হয়নি। শব্দগুলো যেনে মেপে মেপে বসানো। ক্লাসিক বাংলা বইয়ের স্বাদ পেলাম। রেটিং: ৪.৮/৫
২০২৪ সালে পড়া বেস্ট বই। একেবারে ভেতরটা ছুঁয়ে গেল। বহু দিন পর ছবির মতো গ্রাম দেখলাম চোখের সামনে। এই লেখকের আর কোনো বই পড়া হয়নি আগে। ফেসবুক ঘেটে দেখলাম, লেখকের বয়স খুব বেশি না। অথচ বই পড়তে পড়তে বয়স্ক কাউকে ভাবছিলাম আমি। বর্তমান প্রজন্মের কারো কাছ থেকে এমন গল্প ভাবাই যায় না। এবার তার লেখা সবগুলো খুঁজে খুঁজে পড়তে হবে।
গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে লিখা সুন্দর এক উপন্যাস। দারিদ্র্যের করাল গ্রাসের সম্মুখেও সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় বুকবাধার এক উপ্যাখান। ভালোবাসা বিসর্জন দেওয়ার এবং নতুন করে ভালোবেসে শুন্যস্থান পূরণ করার এক অনিন্দ্য সুন্দর শব্দ-বাক্যের সমষ্টি হচ্ছে এই কাগুজে মলাটবদ্ধ "জলমিছরি" বইটা। ❤️🌸
‘ওহ রে ও যৈবতী বন্ধুয়া রে.... ভরদুপুরে আচ্চি বাড়িত পান সাজায়ে দে পানোত দিবু মরিচ বাটা আগাত দিবু চুন সেই পান ও রে মিঠা লাগে, তোরই হাতের গুণ ওহ রে যৈবতী বন্ধুয়া রে।’
বাড়ির আগোত ডালিম গাছে চিরল চিরল পাতা নিশি রাইতে মনে পড়ে বন্ধুয়া তোর কথা ওহ রে যৈবতী বন্ধুয়া রে কাম থুইয়্যা আচ্চি বাড়িত পান সাজায়ে দে।’
শহরের যান্ত্রিক জীবন যাপন ছেড়ে গ্রামীণ পরিবেশের গল্প পড়তে বা শুনতে ভালো লাগে। প্রকৃতির সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে যেন সেই গল্পের মাধ্যমে। প্রাকৃতির সাথে গ্রামের মানুষের জীবন যাপনে, খুঁজে পাওয়া যায় ভিন্ন জীবনের বিচরণ। যে জীবন দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হয়েও সুখ খুঁজে নিতে চায় যেখানকার মানুষজন। তারা আশায় বুক বাধে সুখের জীবনের, ভাবে অতি নিকটেই আছে সেই সুখ স্বর্গ। “জলমিছরি” যেন সেই জীবনের এক টুকরো গল্প । শহুরে জীবন ছাপিয়ে পাঠক ঘুরে আসতে পারবে প্রকৃতির ছায়তলে থেকে জীবনযুদ্ধ করা কিছু মানুষের কাছ থেকে। যারা সুখের আশায় দিনের পর দিন খেটে চলেছে, করে চলেছে অক্রান্ত পরিশ্রম। "জলমিছরি " পড়ে সেইসব মানুষের জীবনযাপনের মাত্রা উপলব্ধি করা যায়।
হরিণচরা ও কুসুমহাটি গ্রামের কিছু মানুষের জীবন - জীবকা, দারিদ্র্যতা, ভালোবাসা,বিচ্ছেদ, দ্বন্দ,কলহ, সুখ - দুঃখ ইত্যাদি অনুসংঙ্গ নিয়ে রচিত "জলমিছরি " উপন্যাস। “জলমিছরি” উপন্যাসে দুইটি দিক রয়েছে। একদিকে আলী এসাকের জীবন। অন্যদিকে হাফিজুল-ফিরোজার সংসার। সমান্তরালে ছুটে যাওয়া দুই সময়ের গল্প, যেন একই সুতায় গাথা তাদের জীবন এসে এক অদ্ভুত বন্ধনে মিলিত হয়। যে গল্পে অনেক পাওয়া না পাওয়া, সুখ - দুঃখ, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, যোগ বিয়োগের এক খন্ড চিত্র ফুটে ওঠে।
হরিণচরা গ্রামের আলী এসাক,যাকে সবাই এসাক ডাকাত বলে ডাকে। ভালোবেসে বিয়ে করে দিলজানকে। কিন্তু বিয়ের অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তান মুখ দেখছিলো না তারা। এইজন্য দিলজান এসাকের ভেতরে লুকালো হাহাকার ছিল।কিন্তু হঠাৎ একদিন রাতে দিলজান প্রসব বেদনায় ছটফট করতে থাকে, কোনরকম মাতৃ চিহ্ন ছাড়াই দিল যান জন্ম দেয় একটি শিশু পুত্রের। কিন্ত গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে দিলজান জন্ম দিয়েছে বাছুর আকৃতির শিশু। গ্রামের মানুষ গুজবে বিশ্বাস করে বেশি, সেই গুজবকে সত্যি ভেবে গ্রামের গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা ভীর জমায় এসাকের বাড়িতে। গ্রামের সবার এক কথা হয় এসাক গ্রাম ছাড়বে না হয় বাছুর আকৃতির শিশুকে পুঁতে ফেতলে হবে মাটিতে। এই টানাপোড়েন কীভাবে সামলাবে এসাক দিলজান? তাঁরা কি পড়েছিল তাদের ভীটে মাটি বাঁচাতে? কি হয়েছিল তাদের সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া সন্তানে?
অন্যদিকে ফিরোজা - হাফিজুলের নতুন জীবন। সদ্য বিবাহিত দম্পতি তাঁরা, তাদের মধ্যে ভালেবাসার কমতি না থাকলেও দরিদ্রতা তাদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। ফিরোজা নববধূ হয়ে আসে কুসুমহাটি গ্রামে, মনে তার অনেক রঙিন স্বপ্ন । কিন্তু সবার সব স্বপ্ন পূরণ হয়না,ফিরোজারও হয়নি। সে ভেবেছিল অবাভ বুঝি তার পিছু ছাড়বে এইবার নতুন সংসারে কোন অভাব থাকবে তাঁর। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে ফিরোজার বাপের বাড়িতে থাকা অভাব অনটন যেন তাঁর পিছু ছাড়বে বা তাঁর পিছু ধরে শ্বশুর বাড়িতেও হানা দিয়েছে সেই অভব। যে সুখের স্বপ্ন নিয়ে ফিরোজা স্বামীর ঘরে এসেছিল সেই স্বপ্ন ফিরোজা বির্সজন দেয় বিয়ের প্রথম রাতেই। সেই রাতেই নিজেকে নতুন পরিবেশে নতুনভাবে গড়ে তোলার পণ করে ফিরোজা। অভাবকেই দুই হাতে জড়িয়ে বুকে তুলে নেয়। নতুন সংসারে স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ীর সাথে ফিরোজা আরও দুই দুস্যকে (আসাদ- পরী) নিয়ে শুরু হয় ফিরোজার নতুন জীবন।
গ্রামীণ জীবনের বর্ণনা লেখকের লেখাতে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। বইটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছে আমি নিজের চোখেই যেন দেখতে পারছি জীবন্ত ফিরোজার সংসার,আসাদ পরীর দস্যিপনা, তাদের ছুটে চলা,ধান কুড়ানো, সাঁতার কাটার দৃশ্য সব চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল যেন। কখনও ধানক্ষেতের আইল ধরে ছুটে ছিল, কখনো বা বক শিকার কিংবা ওলাবিবির কারণে যে টানাপোড়েন— ঠিক সেখানেই যেন ছুটে গ���য়েছিলাম। লেখাতে ভাষার যে আঞ্চলিক টান লেখক রেখেছেন, তা চমৎকার এবং প্রশংসনীয়। প্রথম দিকে পড়তে একটু অসুবিধা হলেও কয়েক লাইন পড়ার পর ভালো লেগেছে পড়তে কোনো ধরনের কঠিন মনে হয়নি বা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। প্রকৃতির বর্ণনায় লেখকর লেখায় কোন কমতি ছিল না নিপুণভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন গ্রামের মানুষের জীবন।অসাধারণ একটি বই পড়ে শেষ করে এখন দারুণ লাগছে। প্রতিটা অধ্যায় মুগ্ধতার সাথে পড়েছি, কখনো থমকে গেছি নিয়তির কঠিন কার্যকলাপে। বারংবার মনে হয়ছে এই বুঝি ফিরোজার সংসারে সুখ মিললো এই বুঝি এসাকের জীবনে নতুন ফুল ফুটলো, ফুট ফুটেছিল ঠিকই কিন্তু নিয়তির পরিহাসে তা ক্ষণস্থায়ি হয়নি। এমনি সুখ দুঃখ,হাসি, কান্না মাখা গল্প "জলমিছরি " শেষ করে বুকটা বিষাদে ভরে গেল। কিছু চরিত্রের শেষটা অন্যরকম হলেও পারতো কিন্তু তা আর হলো কই, নিয়তির কাছে সবই ফিকে।
নিম্নবিত্ত পরিবারের সাধারণ জীবনের সুন্দর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। যান্ত্রিকতার যুগে প্রান্তিক মানুষের জীবনাবলী পড়তে আরামই লাগে। নাটোরের সংলাপ পড়তে বেশ ভালোই বেগ পেতে হয়েছে। তবুও এটাকে ছেড়ে দিতে হবে কারণ সংলাপই উপন্যাসের প্রাণ৷
তবে বর্ণনাভঙ্গি মসৃণ না। একটা দেয়াল তুলে দেওয়ার পর আস্তরণ যেমনভাবে দেয়ালকে মসৃণ করে তেমনরূপ মসৃণতা পাইনি। এবড়োখেবড়ো লেগেছে বাক্যগঠন। এজন্য পড়াতে বেগ পাইনি, গল্পে বেশি রিলেটেড হতে পারিনি।