খ্যাতিমান সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু জন্মেছিলেন পূর্ববাংলায়। তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময়ই কেটেছে ঢাকায়। বুদ্ধদেব বসুর লেখক-জীবনের সেই প্রস্তুতিপর্বের নানা অজানা কথা এ বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নানা প্রাসঙ্গিক বিষয়। বুদ্ধদেব বসুর জীবনের সেই মূল্যবান সময় নিয়ে লেখা এই বই। সূচি: অধ্যায় ১. উপক্রমণিকা অধ্যায় ২. স্কুলজীবন অধ্যায় ৩. ঢাকার সাহিত্যিক পরিবেশ অধ্যায় ৪. পুরানা পল্টন অধ্যায় ৫. কৈশোরিক কাব্যচর্চা অধ্যায় ৬. মর্ম্মবাণী অধ্যায় ৭. মুন্সিগঞ্জ সাহিত্য সম্মেলন অধ্যায় ৮. বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন ও ‘প্রগতি’ সম্পাদনা অধ্যায় ৯. ঢাকায় নজরুল-সান্নিধ্যে অধ্যায় ১০. ‘শনিবারের চিঠি’: ঢাকার বুধু বোস অধ্যায় ১১. বন্দীর বন্দনা অধ্যায় ১২. পূর্ব বাংলার লেখকদের সঙ্গে সম্পর্ক ও বিবিধ প্রসঙ্গ অধ্যায় ১৩. ঢাকায় শেষ সফর অধ্যায় ১৪. প্রথম আলাপ: বুদ্ধদেব-শামসুর রাহমান অধ্যায় ১৫. উপসংহার পরিশিষ্ট ১. অগ্রন্থিত কবিতা পরিশিষ্ট ২. ঢাকায় থাকাকালীন রচিত ও প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর গ্রন্থাবলি পরিশিষ্ট ৩. নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি পরিশিষ্ট ৪. জীবনপঞ্জি
Syed Abul Maksud (Bangla: সৈয়দ আবুল মকসুদ) was a Bangladeshi journalist, columnist, research scholar, essayist, and writer. He was acclaimed for his critical and research work. His essays on literature, society, culture, and politics are much appreciated for his clear view, lucid language, and simple style. He carried out substantive research works on the lives of famous litterateurs such as Rabindranath Tagore, Buddhadeva Bose, Mohandas Karamchand Gandhi, Syed Waliullah, etc. His Journal of Germany is a popular travel book. In 1995 he has been awarded the Bangla Academy Award for his contributions to Bengali Literature.
সুরভী আন্টির থিসিস ছিলো ঢাকার স্থাপত্য বা এমন কিছু একটা নিয়ে। কাজেই ওনার বুকশেলফের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে কেবল ঢাকার ওপর বই। আমি আন্টিকে বলেছিলাম, ঢাকাবিষয়ক বইয়ের তাকটা আমি কচকচিয়ে খেয়ে ফেলবো, কিন্তু কোনটা দিয়ে শুরু করবো বুঝতে পারিনি। শেষে আন্টি স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী খুঁজে খানিকক্ষণ হা-হুতাশ করে কপাল চাপড়িয়ে বললো, বুদ্ধদেবের বইটা দিয়ে শুরু করতে। ওতে নাকি আগ্রহ বাড়বে।
তা, বাড়লো বটে। ঢাকার প্রতি খানিকটা, কিন্তু বুদ্ধদেবের প্রতি অনেকখানি। স্রোতের বিপরীতে কাউকে হাঁটতে দেখলেই ভালো লাগে—এ নিশ্চয়ই আমার বয়সের দোষ। কিন্তু বইয়ে লেখা বুদ্ধদেবের চিঠিগুলো যে অসাধারণ—এর দায় নিশ্চয়ই আমার বয়সের না? আর চিঠিপত্রে বুদ্ধদেব যেভাবে তাঁর সাহিত্য-দর্শন ব্যাখ্যা করেছেন, এবং সেই দর্শনের আলোয় যে চমৎকার একজন সাহিত্যিককে, সাহিত্যবোদ্ধাকে দেখা গেছে—সেটাও নিশ্চয়ই ভ্রম না?
সৈয়দ আবুল মকসুদের কৃতিত্ব কেবল এখানেই যে, তিনি বুদ্ধদেবকে নিয়ে ঘেঁটেঘুঁটে তথ্যগুলো একটু সাজিয়ে আমাদের সামনে উপস্থাপিত করেছেন। গবেষণা হিসেবে কাজটা হয়তো ভারী, শ্রমসাপেক্ষ। সাহিত্য হিসেবে…ঠিক অসুখপাঠ্য বলা যায় না, তবে খানিকটা অগোছালো। তবু তরতর করে যেই বইটা পড়া যায়, তার একটা বড় কারণ পাতায় পাতায় পড়ে থাকা বুদ্ধদেবের উদ্ধৃতির অংশ, চিঠির ছেঁড়া টুকরো। বুদ্ধদেব লোকটার হাত ছিল, ভাষার জাদুতে মানুষকে মোহিত করার শক্তিও ছিল।
বইতে আমরা বুদ্ধদেবের মেধাবী-মুক্তমনা-অহংকারী এবং একইসাথে তরুণ সাহিত্যিকদের প্রতি মমতায় আর্দ্র একটা মূর্তি দেখি। এই মূর্তি গড়তে লেখকের ব্যক্তিগত আবেগের প্রভাব থাকবে না—এমন সম্ভাবনা খুব কম। কাজেই আরও কিছু বই পড়ার আগে সিদ্ধান্তে আসাটা কঠিন। কিন্তু আরও কিছু বই যে পড়তে হবে—এই আগ্রহটা জ্বালিয়ে দেয়ার ঋণটুকু আবুল মকসুদের কাছে স্বীকার করতে আমি বাধ্য।
সেই সময়ের ঢাকার ছোটখাট একটা চিত্রও উঠে এসেছে বইতে। পুরান পল্টন সম্পর্কে বুদ্ধদেবের বর্ণনা তো যাকে বলে, পুরো বিধ্বংসী! সতেরো বছরের বুদ্ধদেবের চোখে বিশের দশকের পল্টনের বর্ণনা—রীতিমত শিহরণ তোলার মত একটা ব্যাপার! এই যে, বর্ণনাটা এমন—
“পুরানা পল্টন—অনেক দিন আগে যে-মেয়েকে ভালোবাসতাম হঠাৎ কেউ যেন আমার সামনে তার নাম উচ্চারণ করলো। … … তবু, এখন ভেবে দেখছি, হয়তো আগেকার সে সব দিনই ভালো ছিলো, যখন বড়ো রাস্তার মোড়ে ঘোড়ার গাড়ি থামিয়ে তারপর জল-কাদা পার হয়ে বাড়ি আসতে হতো; যখন বন্ধুরা মাঝে-মাঝে সাইকেল ঘাড়ে করে এক হাঁটু কাদা ভেঙে আমার বাড়ি এসে পৌঁছতো; যখন কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকারে তারার আলোয় পথ দেখে মাঠ পেরিয়ে আমি বাড়ি ফিরতুম; নির্জন মাঠের উপর দিয়ে একা হেঁটে আসতে কী ভালোই লাগতো। অন্ধকারে খানিক দূর এসে হঠাৎ অদূরে ইলেকট্রিক পাওয়ার-হাউসের তীব্র আলো চোখে চমক লাগাতো; এক বন্ধু প্রায়ই বলতো যে তার মনে হয় ওখানে খুব সুখী এক পরিবার বাস করে। কত রাত্রে আসতে আসতে ডান দিকের সবুজ বনরেখার ওপরে লাল হয়ে চাঁদ উঠতে দেখেছিল আর আমার মন কবিতার রসে আপ্লুত হয়ে গেছে। … … …
পুরানা পল্টনের যে-জিনিশটি আমি কখনো ভুলবো না, তা হচ্ছে তার বর্ষার রূপ। অমন ধ্বনিবর্ণবহুল, উচ্ছৃঙ্খল, অজস্র বর্ষা আর দেখতে পাবো না। কী ঘন সমারোহেই না বর্ষা নামতো সেই নির্জন বিস্তীর্ণ প্রান্তরে! সারা আকাশ মেঘে-মেঘে নিবিড়—স্তরের পর স্তর, ঢেউয়ের পরে ঢেউ, গাঢ়-নীল; কখনো দিগন্ত থেকে যেন মেঘের স্তম্ভ উঠে আকাশ বিদীর্ণ করে দিতো; কখনো তরঙ্গক্ষুব্ধ মেঘের সমুদ্র আকাশকে জাপটে ধ’রে থাকতো, শুধু দিকরেখার কাছে খানিকটা দেখা যেতো বর্ণহীন শূন্য। মেঘের মিছিল গড়িয়ে চলেছে, প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে আকাশের চেহারা, জানালার কাছে বসে বসে আমি দেখতুম। ঠান্ডা হাওয়া ছুটতো; তার ছোঁওয়ায় এক আশ্চর্য সুখের স্রোত নামতো আমার মেরুদন্ডে। তারপর রেল-লাইন আর দেখা যায় না, মাঠ অস্পষ্ট হয়ে এলো—শোঁ-শোঁ শব্দ উঠলো বাতাসে। বট গাছ দুটো ঢেকে গেলো আবছায়াকে, আমাদের টিনের চাল ঝমঝম শব্দে বেজে উঠলো। মুহূর্তে মেঘের রং মুছে গেছে, সারা আকাশ বিবর্ণ এখন। বৃষ্টি! বৃষ্টি! জানালা বন্ধ করে দিতে হতো, তবু বেড়ার ফাঁক দিয়ে জল এসে ঘরের মেঝেতে রীতিমত স্রোত ব’য়ে গেছে। চালের উপর বৃষ্টির অবিরাম গান—সে-গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছি কত রাত্রে।
পুরানা পল্টনের বর্ষার রূপ কিছুতেই ভোলবার নয়; সকালবেলাকার ছেঁড়া মেঘের আকাশ, ভিজে হাওয়া, মাঠে জমে-থাকা জল, মাঠ-ভরা নতুন সবুজ ঘাস, আমাদের উঠোনের তুলসীমঞ্চে ঘন লতার আড়ালে ঘন-নীল মেঘ, সেই অশ্রান্ত, অজস্র বর্ষণ; বাইরে তাকালে মনে হ’তো সমস্ত সৃষ্টি যেন ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে; মনে হতো, পৃথিবীর শেষ সীমা এইখানে।”
একখানি সমালোচনা গ্রন্থ। আগাগোড়াই। বুদ্ধদেবের উন্নাসিকতাই যার অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। যেন তাঁর ভালো কিছু ছিলো না। যা ভালো ছিল, সব তাঁর সমসাময়িক অন্যদের। বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বুদ্ধদেবের মত জানার কারণেই বইটি পড়া। তিথিডোর, রাত ভরে বৃষ্টি, কালের পুতুল, সব পেয়েছির দেশের লেখককে নিয়ে যা আলোচনা হয়েছে তা কিছুটা একতরফা। কেবলই যেন তাঁর অপ্রিয় ব্যাপারগুলোই তুলে এনেছেন লেখক। নাম ঢাকার হলেও, মোটামুটি তাঁর সাহিত্যজীবন সম্পূর্ণই আলোচনার একটা চেষ্টা ছিল। সত্যিই অনেক কবিতায় রবি-নজরুলের ছাপ ছিল বুদ্ধদেবের। অনেক ব্যাপারেই প্রমাণ দিয়েছেন বটে লেখক। তবে বুদ্ধদেব তো আর এমনি এমনি বুদ্ধদেব হননি, নিজ যোগ্যতাতেই হয়েছেন৷ সেটারই প্রতিফলন যেন কম পেলাম।