তিন কিশোরের দুঃসাহসিক শিকার অভিযানকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাস রচিত। এতে আছে এক অন্যভুবনের কথা, অথবা বলা যায় লেখকের কালজয়ী উপন্যাস 'নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে' রচনার প্রস্তুতিপর্ব। সেই এক অত্যাশ্চর্য পৃথিবী যেখানে গাছপালা নদী আবহমানকালের। ভরা বর্ষায় নদীর প্লাবনে মাঠ ঘাট খাল বিল জলে জলময়। জ্যোৎস্নারাতে মাহু শিকারীরা বের হয়ে পড়ে অতিকায় মীনের খোঁজে। কিংবদন্তির মতো শোনা সেই সব শিকার কাহিনীতে প্রলুব্ধ হয় তিন কিশোর। সেই ভরা কোটালে নদী উত্তাল জলের গভীরে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ঢাইন মাছ উঠে আসে মোহনা থেকে। নদীর অতলে মাছেররাজা পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় মাছের রাজার খোঁজে তিন কিশোরের বিস্ময়কর শিকার অভিযানের এই কাহিনীতে আছে মাছের সঙ্গে মানুষের জীবন-মৃত্যুর লড়াই, আছে দিগন্তবেলায় সেই আহত মীনের দুয়ে দাপাদাপি। সৃষ্টি স্থিতির কিছু সূক্ষ্ম অনুভূতিমালাসহ আছে প্রাণীজগতের সঙ্গে মানুষের নিগূঢ় সম্পর্কের কথা। সবশেষে আছে সম্পূর্ণ নতুন স্বাদের নতুন ভুবনের রহস্যময় উপস্থিতি।
Atin Bandyopadhyay (Bangla: অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়; anglicised spelling of surname: Banerjee) is a noted writer of Bengali literature. He was born in 1934 in Rainadi, Dhaka.
He spent his childhood in a joint family set-up in the then East Bengal of undivided India and studied in Sonar Gaon Panam School. After the Partition, migrated to India. He earned his undergraduate degree in commerce in 1956 and subsequently earned a teacher's training degree, all from the University of Calcutta. He took various jobs as a sailor, truck-cleaner, primary school teacher. Also became headmaster of a senior basic school. Settled permanently in Kolkata in 1963. Here also he took on various jobs like factory manager, publication advisor and lastly journalist.
The first story of the author was published in the magazine Abasar of Berhampore. He has penned many works since then, but his masterpiece is a three-part trilogy on the Partition: Nilkantha Pakhir Khonje (নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে), Aloukik Jalajan (অলৌকিক জলযান) and Ishwarer Bagan (ঈশ্বরের বাগান). Another famous writer of Bengal, Syed Mustafa Siraj has compared Nilkantha Pakhir Khonje (নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে) with Greek tragedies and also found it tuned with the core spirit with the Bangla literature like Bibhutibhushan Bandyopadhyay's Pather Panchali.
গ্রামে তো তেমন থাকিনি। ছেলেবেলা কেটেছে শহরের এক বিষণ্ণ গলিতে। ছুটিতে যখন গ্রামে যেতাম সারাদিন কখনো জলে কখনো ডাঙ্গায় ছুটোছুটি করে বেড়াতাম। আমাদের বাড়ি বহুকাল আগে ছিল পদ্মার বিস্মৃত গর্ভধারায়। মনে পড়ে বর্ষায় চারিদিকে জল থৈ থৈ করত। পুকুরের জলে উপুড় হয়ে স্পষ্ট দেখতে পেতাম রঙিন খলিশা মাছের ঝাঁক। আমার খুব প্রিয় একটি খেলা ছিল সেই সব মাছ ধরে কাঁচের বয়ামে রেখে সূর্যের আলোয় মাছের শরীরের রঙিন ঝিকিমিকি দেখা। কি যে এক আনন্দ পেতাম! মায়ের পাশে শুয়ে রাত্রে স্বপ্ন দেখতাম আমার ঘর জুড়ে শুধু কাঁচের বয়াম। সেগুলোতে ঝিকমিক করছে রঙিন মাছের ঝাঁক। একবার বর্ষায় খুব জল এলো। বাড়ির উঠোন অবধি জল উঠে এলো। কলপাড়ে জল আনতে গিয়ে দেখি একটা বিরাট লিকলিকে মাছ আমাদের বাড়ির উঠোনের এক কোনায় সাঁতরে বেড়াচ্ছে। শরীরে এক লোভনীয় শিহরন বয়ে গেল। আমার সুদূর পূর্ব-নারী-পুরুষগন মৎস্য শিকারি ছিলেন কি না জানিনা। হয়তো তারা নিজেরাই ছিলেন মাছেদের নিকটবর্তী কোন ভার্টিব্রাটা। কোন এক কালে পদ্মার জল থেকে উঠে এলো ডাঙ্গায়। মাছ ধরবার সুযোগ আমি আর কখনো পাইনি। মায়ের চোখের সামনে মামা জলে ডুবে মারা যায়। তাই মায়ের সেই মেয়েবেলা থেকে জলের প্রতি আতংক। আমায় আজও জলে নামতে দেন না। এদিকে আমি লুকিয়ে লঞ্চ ইস্টিমারে বরিশাল বিক্রমপুর সাঁতরে বেড়াই।
একটি জলের রেখা আমায় নিয়ে গেছে সেই ছেলেবেলায়। কাঁচের জাড়ে রাখা রঙিন মাছের স্বপ্ন এখন দু’চোখে ভাসছে। বইটি তিন বন্ধুর মেঘনার বুকে মাছ শিকারের গল্প। মাছ শিকার নয় শুধু, চল্লিশের দশকের বৃহৎ বাংলার ক্ষুদ্র একটি জগতে লেখক তুলে ধরেছেন প্রকৃতি সাথে মানুষের সখ্যতা ও দ্বান্দ্বিকতা। সেই তো ছেলেবেলার খেয়াল, ডানপিটে সময় আর অফুরন্ত অবসর। লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের পূর্ব বাংলার সন্তান। তাঁর পূর্বনারীর ভার্টিব্রাটা মেঘনা হতে বিবর্তিত। দেশভাগের পর পশ্চিমবাংলায় মাইগ্রেশন। জীবনে অসংখ্য লিখেছেন। তন্মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখা নীল কণ্ঠ পাখির খোঁজে। একটি জলের রেখা তাঁর একটু কম পরিচিত কিশোর উপন্যাস। হাতে ক্ষুদ্র সময় থাকলে পড়বার অনুরোধ রইল।
সেই কবে কোন বাল্যকালে শ্রীকান্ত পড়েছিলাম, তার স্মৃতি আজও ভুলতে পারি না। ইন্দ্রের সাথে গভীর রাতে মাছ ধরতে যাওয়ার বর্ণনাটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে পড়ার প্রথম স্মৃতিটা এখনো জ্বলজ্বল করে। ওই এক রাতের ঘটনা থেকে যতটা থ্রিল পেয়েছিলাম, যতটা রুদ্ধশ্বাসে বাক্যগুলো পড়েছিলাম তার সাথে পরবর্তীতে পড়া সবগুলো রহস্য গল্পের থ্রিল মিলালেও সমকক্ষ হবে না। আর সমকক্ষ হলেও, ছাপিয়ে গেলেও আমি কখনো স্বীকার করবো না।
আজন্ম সাপের ভয়ে তটস্থ থাকি আমি। সাপের নাম শুনলেই গলা শুকিয়ে যায় আমার। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট চরিত্র নারাণ, যে কি না শঙ্খিনী সাপের হাড় গলায় ঝুলিয়ে মাছের রাজা হতে চায়, সে যখন শঙ্খিনী সাপ ধরে খেল দেখাচ্ছিল তখন তার সঙ্গীদের পাশাপাশি আমিও ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম যেন। সমস্ত গা শিরশিরানি দিয়ে আমাকে মনে করিয়ে দিলো ইন্দ্রনাথের কথা, মাছ ধরতে গিয়ে তার গা ঘেষে ভেসে যাওয়া সাপের কথা! আমি ফিরে গেলাম আরো ১৬ বছর পেছনে, দেখে এলাম শ্রীকান্তকে নৌকায় বসিয়ে কী দুর্দান্ত সাহসে ভেসে থাকা সাপদের সাথে ওয়াটার পোলো খেলে চলেছে ইন্দ্রনাথ।
কিশোর উপন্যাস পড়ে কিশোর হওয়া যায় না, কিশোরের প্রকৃত অনুভূতি পাওয়া যায় না এই চিন্তাটা এতদিনে বুঝে গেছি আমি। কিন্তু ঢাইন মাছ ধরতে চুপিসারে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়া, নৌকায় ভাসতে থাকা তিন বালক আমাকে সত্যি সত্যি কৈশোরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ভাবিনি। আমাকে আমার শ্রীকান্ত খুলে বসতে হবে সম্ভবত অষ্টমবারের মতো, তাও ভাবিনি।
চমৎকার, নির্মোহ বর্ণনা! কী দারুণ ডিটেইলিং! এমন নাহলে আর মনে দাগ কেটে যায়?
না চাইলেও বয়স বাড়ছে, সাথে ব্যস্ততা! কৈশোরের শুভ্র সূর্যের আলো আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক ব্যস্ত জীবনের চোখে যাতে না পড়ে সেজন্য জানালায় সময়ের ভারী পর্দা টেনে দিই আমরা। তবুও কোথা থেকে এমন কিছু লেখা দুরন্ত হাওয়ার মতো জানালার স্বাস্থ্যবান পর্দাকে সরিয়ে দেয়, আর আমাদের চোখে এসে পড়ে কৈশোরের নরম, পবিত্র আলো। তখন আড়মোড়া ভেঙে সেই আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে খারাপ লাগে না। মনে হয় এই তো বেশ....
লেখকের ভাবনায় নদী একটা জলরেখা সেই জলরেখার উপর মাছ শিকারে নামে তিনজন কিশোর। তিনজন কিশোরের অভিযানের গল্প হলেও নদীর পাড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্রামীণ জীবনের উৎকৃষ্ট প্রতিরূপ ফুটে উঠেছে। লেখকের ব্যাখ্যা গুলা এতো সুন্দর যে সব দৃশ্য যেন চোখের সামনে আসছে। সিরিজের বাকি বইগুলো সংগ্রহে আছে, পড়ে ফেলব শিগগিরই