সুমুদ্রিত, সযত্নে সম্পাদিত এবং সুদৃশ্য এই বইটিতে আছে ছয়টি উপন্যাস ও তিনটি গল্প। তারা হল~
(ক) উপন্যাস:
১. মেঘদূতের মর্তে আগমন;
২. ময়নামতীর মায়াকানন;
৩. নীল সায়রের অচিনপুরে;
৪. হিমালয়ের ভয়ংকর;
৫. অসম্ভবের দেশে;
৬. মান্ধাতার মুল্লুকে।
(খ) গল্প:
১) গুহাবাসী বিভীষণ;
২) বনের ভেতরে নতুন ভয়;
৩) পিশাচ।
এদের মধ্যে একাধিক উপন্যাস বহুলপঠিত; অন্য লেখাগুলোও নেহাত অপরিচিত নয়। প্রকাশের সময় তো বটেই, পরেও (মানে যখন প্রকাশকেরা তাদের বাজারে রেখেছেন আর কি) পাঠকদের মধ্যে তারা জনপ্রিয়ই ছিল। তাই লেখাগুলো নতুন করে সংকলিত করে আমাদের কাছে পেশ করার জন্য ধন্যবাদ জানাতেই হচ্ছে। কিন্তু...
প্রথমেই একটা বিষয়ের ফয়সলা হওয়া দরকার। সেটা হল, কল্পবিজ্ঞান কাকে বলে?
প্রশ্নটা এজন্যই জরুরি যে এই খণ্ডে এমন বেশ কিছু লেখা আছে যার মধ্যে বর্তমান বা ভবিষ্যতের বিজ্ঞানের তেমন প্রয়োগ নেই (বন্দুক বা জাহাজের ব্যবহার ছাড়া)। তাহলে তারা কেন ও কীভাবে এই বইয়ে স্থান পেল?
সম্পাদক কল্পবিজ্ঞানের সংজ্ঞা হিসেবে স্বর্গত অনীশ দেবের বক্তব্য অনুসরণ করেছেন। তাতে পাই, "কল্পবিজ্ঞান কাহিনিতে বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিশেষ নিয়ন্ত্রণী ভূমিকা থাকবে। থাকবে সম্ভাব্য জগতের কথা, প্রাণীর কথা, আর আগামী দিনের কথা।"
'সম্ভাব্য জগত' হিসেবে চোখের আড়ালে থেকে যাওয়া নানা সভ্যতা বা জনগোষ্ঠীর কথা ধরা হলে তবেই এদের মধ্যে একাধিক লেখা কল্পবিজ্ঞান পর্যায়ভুক্ত হয়। 'প্রাণী' হিসেবে ক্রিপটিডদের কথাও ধরতে হবে সেক্ষেত্রে। কিন্তু এই ধারার লেখালেখি (যে ধরনের লেখার মডেল তথা টেমপ্লেট হিসেবে রাইডার হ্যাগার্ডের 'কিং সলোমোনস্ মাইনস্' এবং আর্থার কোনান ডয়েলের 'দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড'-কে ধরতেই হয়) সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং অ্যাডভেঞ্চার ঘরানারই অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য কল্পবিজ্ঞান বলতে যদি কল্পকাহিনি বা স্পেকুলেটিভ ফিকশনের গোটা ধারাটিকেই ধরতে হয়, তাহলে এমন লেখাগুলোকে কল্পবিজ্ঞান গোত্রভুক্ত করা চলে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সম্পাদকীয় বাছাইয়ে 'সোনার পাহাড়ের যাত্রী' আর 'সূর্যনগরীর গুপ্তধন' বাদ দেওয়াকে সমর্থন করা চলে না।
এরপর আসা যাক টীকার কথায়। বইগুলোর প্রকাশকালীন তথ্য, তাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে রচনার সময়ে প্রচলিত নানা তত্ত্ব ও ভাবনার বর্ণনা, এমনকি লেখকের তৎকালীন মনোজগতের সম্ভাব্য ছবিটি তুলে ধরা— এ-সবের মাধ্যমে বইটিকে এমনই সমৃদ্ধ করে তোলা হয়েছে যে ভবিষ্যতে হেমেন্দ্রকুমারকে নিয়ে ধর-তক্তা-মার-পেরেক সংকলন করার আগে প্রকাশকেরা দুবার ভাববেন। কিন্তু এই টীকার প্রসঙ্গে তিনটি বিষয় বাদ পড়েছে বলে মনে হল। সেগুলো হল~
প্রথমত, 'অসম্ভবের দেশে'-র মূল প্রেরণা যে এইচ. জি. ওয়েলস্-এর 'দ্য ফুড অফ দ্য গডস অ্যান্ড হাউ ইট কেম টু আর্থ' (১৯০৪)-এ বর্ণিত তত্ত্ব, এমনকি লেখার ডার্ক হিউমারও যে ওয়েলসীয় চিন্তার প্রতিফলক, এটা বলা দরকার ছিল।
দ্বিতীয়ত, 'মান্ধাতার মুল্লুকে'-তে কামাথির বলা 'টিকে টিকে' সম্প্রদায়টি যে কঙ্গোর জঙ্গল থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো পিগমি জনগোষ্ঠী হতে পারে, এমনটা বলা চলে। টীকায় সেটার উল্লেখ দেখলাম না। 'বনের ভেতরে নতুন ভয়'-এ বর্ণিত পুতুল-মানুষ হেমেন্দ্রকুমারের কল্পনা হলেও তার পেছনে কি ইন্দোনেশিয়ার ক্রিপটিড এবু-গোগো (বিলুপ্ত হোমো ফ্লোরেসিয়েন্সিস) নিয়ে মিথের কোনো ভূমিকা ছিল? তা-ও জানতে পারলাম না।
তৃতীয়ত, 'পিশাচ' গল্পের গোড়ার কথা বলতে গিয়ে টীকায় ওয়েলসের গল্প 'দ্য ফ্লাওয়ারিং অফ দ্য স্ট্রেঞ্জ অর্কিড' (১৮৯৪)-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ১৮৮০ সালের 'লন্ডন সোসাইটি'-র বার্ষিক ক্রিসমাস সংখ্যায় আর্থার কোনান ডয়েল "দ্য অ্যামেরিকান'স টেল" নামক গল্পে এই ধারণাটির প্রয়োগ করেছিলেন। তাই উৎস হিসেবে সেটিকেই চিহ্নিত করা যেত।
তবে সম্পাদককে আলাদাভাবে কুর্নিশ জানাতে হচ্ছে 'পরিশিষ্ট' অংশের "বিমল-কুমারের অভিযানসমূহ: একটি সম্ভাব্য কালক্রম" লেখাটির জন্য। এতটা নিবিড়ভাবে হেমেন্দ্রকুমারের লেখা পড়ে তাদের অভ্যন্তরীণ কালানুক্রম অনুসরণ করার কাজটি এযাবৎ হয়নি। সত্যি বলতে কি, এইরকম কাজের ক্ষেত্রে প্রদোষবাবুর পূর্বসূরি হিসেবে বারিং গুল্ড বা লেসলি ক্লিংগারের মতো মহাজনকেই চিহ্নিত করতে হচ্ছে। এমন যত্ন নিয়ে হেমেন্দ্রকুমারের রহস্য কাহিনিগুলোও একদিন তাঁর দ্বারা চর্চিত ও বিশ্লেষিত হবে— এই আশা তাই করাই চলে।
আবারও বলি, বইটি অসাধারণ। মুদ্রণসৌকর্যের মাধ্যমে পড়ার পাশাপাশি এটিকে স্থায়ী সম্পদ হিসেবে রেখে দিতেও একরকম বাধ্য করেছেন প্রকাশকও। তাই অতি অবশ্যই এটিকে সংগ্রহ ও পাঠ করতে অনুরোধ জানাব।