এই দেশের জনসংখ্যা এমনিতেই বেশি। কাজেই ছিন্নমূল জনগণ হারিয়ে গেলে পুলিশ কিংবা প্রশাসন কেউই খেয়াল রাখে না। আর যারা এই দেশে একা, তারা হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না।
এমনই এক হারিয়ে যাওয়া মানুষের তদন্ত ভার পেলো হীরক। এক সময় সে গোয়েন্দা বিভাগের কাজ করত। এখন বিভিন্ন কেসে পরামর্শক হিসেবে কাজ করে।
প্রথমিক স্কুলের এক শিক্ষিকা, নাম তৃণা, এসে জানালো যে ক'দিন হলো তার হবু স্বামী রিয়াদ নিখোঁজ। আর গতকালই এক লোক বৃষ্টির মধ্যে এসে বলেছিল সে-ই রিয়াদ। কিন্তু তার শরীরে মানুষের পচা গন্ধ।
হাসপাতালে হীরক যখন তার বন্ধু রাতুলের সাথে দেখা করতে গেল, ঝড়-বৃষ্টির দিনে, জানতে পারলো নিহত এক ট্রাক ড্রাইভারের লাশ মর্গ থেকে গায়েব!
রাতুলকে সাহায্য করতে গিয়ে হীরক দেখল কোনো এক পৈশাচিক মন্ত্র বলে মৃত ট্রাক ড্রাইভার পরিণত হয়েছে পিশাচে! এরপর অভিযোগকারী মেয়েটাও গায়েব হয়ে গেল!
মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। রিয়াদ ও তৃণার অন্তর্ধানের তদন্তে নেমে আক্রমণের শিকার হলো হীরক। গাজীপুর থেকে ভালুকার মাঝখানে শালবনে অস্বাভাবিক কিছু ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ বলছে মানুষ পশুপাখি আক্রান্ত হচ্ছে বিচিত্র একধরণের জন্তু দ্বারা।
অথৈ সাগরে পড়লো হীরক আর রাতুল। তদন্তের কোনো মাথামুণ্ডুই খুঁজে পাচ্ছে না ওরা। শুধু বুঝতে পারছে বিপদ ঘনিয়ে আসছে এদেশের মানুষের ওপর। চরম বিপদে পড়তে যাচ্ছে দেশবাসী!
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছু জম্বি হরর আগেও পড়েছি, কিন্তু সেসব ছিল মূলত ফেসবুককেন্দ্রিক। আবার কাহিনীর গঠনও অত আহামরী ভাল ছিলনা বিধায় সেগুলোকে পূর্ণাঙ্গ গল্পও বলা যেত না। বইপাড়ার দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ পলাশ পুরকায়স্থ সাহেবের 'অতীন্দ্রিয় অন্ধকার' বইটি তাই বাংলা সাহিত্যের অফিসিয়াল জম্বি হরর।
কাহিনী সংক্ষেপঃ একটি বিলাশাকায় বিল্ডিংয়ের কন্সট্রাকশন সাইটের দু'জন গার্ড অস্বাভাবিক কিছু দেখে অসুস্থ হয়ে গেল। অন্যদিকে তৃণা নামের একজন স্কুলশিক্ষিকা একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে এলো তার নিখোঁজ বয়ফ্রেন্ডের ব্যাপারে তদন্তের কেস নিয়ে। গোয়েন্দাপ্রবর হীরক তদন্তে নামতে নামতেই অস্বাভাবিক ব্যাপারগুলো প্রবল আকার ধারন করল। গাজীপুর আর ভালুকার মাঝে অবস্থিত শালবনের গভীর কী হচ্ছে আসলে? ভয়ংকর, হিংস্র একদল জীব বনের আশেপাশের গবাদী পশু খেয়ে ফেলছে, সেগুলো কী ধরনের জীব? আর এসবের সাথে তৃণার মিসিং বয়ফ্রেন্ডের কানেকশনই বা কী? দেশে দুই বছর আগে আবির্ভাব হওয়া বিদেশি কোম্পানিটার কী কোন দূরভিসন্ধি আছে?
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ অল্প পৃষ্ঠার একটি মেদহীন জম্বি থ্রিলার পড়লাম। CapCom এর বিখ্যাত Resident Evil, Activision এর Prototype, Techland কোম্পানির Dying Light এবং হাল আমলে Sony কোম্পানির বিখ্যাত The Last of Us; উল্লিখিত ভিডিও গেমসগুলো খেলার কারনে জম্বি জনরাটা আমার কাছে সুপরিচিত। তো জম্বি গল্পের যে টিপিক্যাল স্ট্রাকচার থাকে, এ বইতে লেখক অল্পকিছু পরিবর্তন বাদ দিলে সেই কনভেনশনাল পথেই হেঁটেছেন - - শক্তিশালী কোন বায়োটেকনোলজি কোম্পানি থাকবে, যাদের অনেক ইনফ্লুয়েন্স এবং টাকা রয়েছে। - কোম্পানিটা বিদেশি, যারা দরিদ্র দেশে আনইথিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট করে থাকে। - প্রকৃতিতে প্রাপ্ত কোন অনুজীব যেমন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ফাংগাস দিয়ে হাইটেক এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার হয়ে যাবে একধরনের সুপার প্যারাসাইট, যারা পোষকদেহে ঢুকেই র্যাপিড ট্রান্সফর্মেশন করে উক্ত মানুষগুলোকে রক্তলোলুপ, ভয়ংকর রাক্ষস/পিশাচজাতীয় কিছু বানিয়ে দেয়। - সেই সুপারপ্যারাসাইট একের পর এক হোস্টবডি বদলাতে বদলাতে সেটার ভিতরেও চেঞ্জ আসবে। মিউটেশন হতে হতে উদয় হবে একধরনের ইন্টেলিজেন্ট জম্বির। যারা বেসিক্যালি সুপারহিউম্যান। কিংবা তৈরী হবে কোন অতিরাক্ষস বা মনস্ট্রসিটি (Monstrosity)। - লাস্টে মিলিটারি এবং অস্ত্রধারীদের ভূমিকায় সব নিকেশ হবে এবং গোপন ল্যাব ধ্বংস হয়ে এই ভয়াল গবেষণার সমাপ্তি হবে। - কিছু ফাইনাল টুইস্টে দেখানো হবে যে, কীভাবে যেন একটা বা দু'টো প্রাইম স্যাম্পল নিয়ে ভেগে গেছে উক্ত ল্যাবের প্রধান বিজ্ঞানী বা প্রতিষ্ঠানের মালিক।
তো মোটাদাগে ঠিক এই স্ট্রাকচারে গল্প লিখেছেন পলাশ সাহেব। কিন্তু এটাকে সেই অর্থে সমালোচনা করছিনা, কারন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অফিসিয়ালি এরকম সাজানো-গোছানো জম্বি থ্রিলার (বইয়ে তেমন ভয় নেই, তাই জম্বি হরর বলা যাচ্ছেনা) আগে লেখা হয়েছে বলা যায়না। তাই উনার প্রয়াশ অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য।
তবে হ্যাঁ, লেখকের কাছে অপশন ছিল চিরায়ত রাস্তায় না হেঁটে ভিন্ন কোন রুটে গল্প সাজানোর। যেমন, গল্পের নাম অতীন্দ্রিয় অন্ধকার। অতীন্দ্রিয় শব্দের অর্থ 'যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়', ইন্দ্রিয়ের উর্ধ্বে কিছু। তো লেখক হয়ত কালোজাদুর পিশাচ, ভুডু জম্বি কিংবা কোন পৈশাচিক যজ্ঞ দেখাতে পারতেন। টেকনো জম্বির বদলে জাদু বা অনুরূপ কিছু দিয়ে জম্বি বানানো হচ্ছে এমন দেখাতে পারতেন। তাতে নামটা জাস্টিফাইড হত।
আরেকটা জিনিস হত, জাদু বা অতিপ্রাকৃত ফিকশনে কল্পনার কোন সীমা নেই বিধায় সেরকম গল্প লেখার সময় লেখকের হাতে ফ্রিডম বেশি থাকে। যেটা সাইন্স ফিকশন বা ফ্যাক্টবেসড থ্রিলারে কম থাকে। ল্যাবে বানানো মিউটেটেড সুপারপ্যারাসাইটের একটা স্ট্রেইন মানুষের শরীরে ঢুকে তাকে জম্বি বানিয়ে ফেলেছে, এখানে লেখকের কাছে অপশন কম। কারন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া, ফাংগাস, কিছু কৃমি আর কয়েকপ্রজাতির পোকা; এগুলি ছাড়া তেমন কোন প্যারাসাইট মানুষের কাছে তেমন পরিচিত না। কিন্তু লেখক যদি দেখাতেন যে, জম্বি হবার কারনটা অপার্থিব, সেখানে তিনি নিজের ইচ্ছামত যা খুশি তাই বানাতে পারতেন।
তবে এগুলো একান্তই আমার ব্যাক্তিগত মত। পার্সোনাল রেটিং ৩.৬/৫