ঝিম ধরে বসে আছি 'হিমযুগ' পড়ে। মাথার ভেতরটা ঝা ঝা করছে। বনবন করছে তীব্র মৌসুমী হাওয়া। এমনটা হবে কে জানত? অমন বিশ্রী প্রচ্ছদের বইতে এতটা ধাক্কা? ঠিকই। মলাট দেখে বইয়ের ললাট বিচার না করাই ভালো। লেখক, হাতটা দিন। করমর্দন করি। গান করি আপনার নামে। সেই টয় স্টোরির মতন। ইউ হ্যাভ গট এ ফ্রেন্ড... সরি, ফ্যান ইন মি! এই আমি। আপনার এক নব্যলব্ধ গুণমুগ্ধ ভক্ত। আপনি আমায় নাড়িয়ে দিয়েছেন একেবারে। আপনি আমায় চমকে দিয়ে, উস্কে দিয়েছেন (গল্প)বিজ্ঞান পাঠের সার্বিক আনন্দ।
বইতে গল্প সংখ্যা মোট মিলিয়ে পনেরো। দুটো লেখা নভেলা সম। বাকিগুলো ভিন্ন দৈর্ঘ্যের। এদের মধ্যে সবকটা সায়েন্স ফিকশন নয়। কয়েকটি কাহিনী একান্তই ফ্যান্টাসি-ধর্মী। কোথাও আবার স্পেকুলেশনের বারান্দায় অলৌকিকের ছাট। এই চেনা অ্যাড্রেসের লেখাগুলোতে কতকটা 'সেফ' খেলেন লেখক। ভুল-ত্রুটি নিয়েই এদের পড়তে ভালো লাগে। ফিল-গুড আবহে, ইচ্ছাপূরণের ম্যাপ। শেষপাতে ছোট ছোট টুইস্ট। অনেকটা লেড ব্যাক উনি। ওনার গদ্যও ভারী সুন্দর।
এমন কম্বিনেশন বিরল। লেখকের গল্পকথন স্রেফ তথ্যের খাতিরে তথ্যবহুল নয়। আছে ব্যালেন্স ও সাহিত্যবোধের সুচারু গার্নিশ। বিজ্ঞানবোধের পাশাপাশি, শব্দচয়নের মুন্সিয়ানা। সাথে চমৎকার ইতিহাস চেতনা, সামগ্রিক ভৌগোলিক জ্ঞান ও প্রশংসনীয় চরিত্রচিত্রণ। প্রথামাফিক, জর-ফিকশনের চেনা সমুদ্দুরে স্রেফ কাগজসম মানব নৌকো ভাসিয়ে পালিয়ে বাচেননি লেখক। বরং নিজ উদ্যোগে, একগুচ্ছ রক্তমাংসের মানুষদের এগিয়ে দিয়েছেন কলমের খোঁচায়। চেষ্টা করেছেন যাতে বইয়ের পাতার সমস্ত রক্তক্ষরণ গিয়ে সোজা দাঁত ফোঁটায় পাঠকের বুকে।
আমি বিজ্ঞানের মানুষ নই। তাত্ত্বিক নামাবলী বুঝি না কিছুই। বই পড়ে, ঠিক ভুল বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু তবুও, আমার এই কাঁচা, নভিস, ফালতু চোখদুটো দিয়েই বলতে পারি যে বইয়ের তথাকথিত 'হার্ড' সাই-ফাই-গুলোর ক্ষেত্রে লেখকের বিজ্ঞান-প্রয়োগ, এক কথায়, তুখোড়। প্রাথমিক নজরে খটমট হলেও, এ স্রেফ হনু/হিরো-মাফিক জার্গন ডাম্পিং নয়। দিস ইজ এ ম্যান হু নোস হোয়াট হি ইজ ডুইং। তাও আবার অসম্ভব সহজ, ঝড়ো ভাষায়। সোজা টেম্পলেট মেনে। সিনেমার ডায়নামিকে।
'মেডুলিনা'-র ভার্চুয়াল পৃথিবী। 'এনসেলাডাস'-এর ইন্টারগ্যালাক্টিক কোয়েস্ট। 'কিল হিম'-এর অল্টারনেট সময়রেখা। 'টেম্পোরাল'-এর ভয়াল টাইম লুপ। 'পারফেক্ট স্টোরি'-র ভয়ংকরী এ.আই অপশক্তি। 'অ্যানোমালি'-র অপার্থিব ধ্রুবসত্য। নক্ষত্রের হাট। এ বলে আমায় দ্যাখ তো ও বলে আমায়। কাকে ছেড়ে কাকে দেখাই? পড়ে, গুম মেরে বসে থাকি আমি। মাথা চুলকোই। কোনো অ্যাংলিসাইসড ব্রিটিশ বাঁদরের ন্যায় স্বপ্নীল ঘোরে চেঁচিয়ে বলি, জিসাস ক্রাইস্ট! যেন এইমাত্র দেখে উঠলাম একের পর এক দুরন্ত শর্ট ফিল্ম।
এছাড়াও আছে এমন দুটো নভেলা যা খোদ ঘনাদাকেও ঘোল খাইয়ে দেবে। 'তরঙ্গ' তুলনামূলক উচ্চাকাঙ্খী। বিজ্ঞান, ইতিহাস ও মিথলজির মিশেলে টানটান গ্লোবাল অ্যাডভেঞ্চার। লেখাটি, এক্সিকিউশনে দশে দশ পাবে না। ন্যারেটিভে ঝুল। সামান্য অতিকথন। গতি হারায় বেশ কয়েকবার। তবুও এর শেষপাতে লালিত সম্ভাবনার বীজ, শিহরণের পাশে জাগায় শুভবোধের বিস্ময়। অপরপ্রান্তে, নাম-নভেলা, 'হিমযুগ', বইয়ের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক লেখা। যা অ্যাকশনধর্মী গল্পকথন, প্রারম্ভিক ধূসরতা ও ভয়ৎপাদক পরিণতির ভরসায় বলে এক ক্ষুরধার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্নিভ পদস্খলন। অসাধারণ!
ওদিকে 'হোয়াট ইফ' গল্পটির বুদ্ধিদীপ্ত স্বাতন্ত্র্য অবাক করে। অল্টারনেট ইতিহাসের নিদর্শন বইতে 'কিল হিম'-এর মতো গল্পে পেলেও, 'দি এক্স ফাইলস্' এর প্রতি জমজমাট ট্রিবিউট, এই গল্পটির সেলিং পয়েন্ট এর মরমী হৃদয় ও আদ্যোপান্ত ভারতীয় মেজাজ। আসিফ ও তার 'এজেন্সি ফর অ্যাবনর্মাল কেস স্টাডিজ' কি আবার ফিরে আসবে না মিস্টার পাল? না এলে, অন্যায় হবে। ভীষন অন্যায়।
অগত্যা, বাংলা কল্পফ্যান্টাসি জগতে, এক দমকা টাটকা তাজা বাতাস হাতে কিছু স্মার্ট, সাবলীল ও আদ্যোপান্ত মানবিক গল্প পড়তে চাইলে এই বইটিকে সত্ত্বর জোগাড় করুন। হ্যা, এবারতের অমন ম্যাদামারা পরিবেশনাকে উপেক্ষা করেই নিয়ে আসুন নিজের কাছে। ইগনোর করুন, দিলীপ দাসের প্রাগৈতিহাসিক রেখাচিত্র ও উজ্জ্বল ধরের অস্পষ্ট অলঙ্করণগুলো। এই বই স্রেফ ব্যাহিক আবরণে বাজিয়ে দেখার জিনিস নয়। এই বই, ভীষণ স্পেশাল। এর উভগামি গ্লাস-সিলিং, মহাকাশ সম। যা বাস্তবের মাটিতে পা দিয়ে বিচরণ করে কোন এক আলোকবর্ষী মহাবিশ্বে।
থ্যাংক ইউ, সিদ্ধার্থ পাল। আরো লিখুন। ঠিক এভাবেই। (এক কেবল, 'স্কেচবুক' বাদে। ওটা দাঁড়ায়নি একেবারে।)
সগর্বে যে বইয়ের 'ভূমিকা' লিখেছি, আলাদাভাবে তার রিভিউ দেওয়া— অন্তত আমার ক্ষেত্রে— বাহুল্যমাত্র। তবে কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি-বিষয়ক যে-সব বইয়েরা নিত্য নিজেদের উপস্থিতি জাহির করতে চায়, তাদের থেকে একেবারেই স্বতন্ত্র এই বইটি। এতে অবশ্যই আছে পাঠকের নিবিড় পাঠ ও মেধার স্বাক্ষর। অবশ্যই আছে এই দেশ ও কালের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত, অথচ সম্ভাব্যতার নিরিখে যুক্তিগ্রাহ্য এক বিশ্বের ইশারা। তবে সবচেয়ে বেশি করে আছে সহজ, নির্ভার গদ্যে, বিশ্বাসযোগ্য চরিত্রদের কেন্দ্রে রেখে কয়েকটি ঝকঝকে নতুন গল্প বলার চেষ্টা। যদি নতুন, মৌলিক কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসির অনুরাগী হন, তাহলে এই বইটিকে উপেক্ষা করবেন না প্লিজ।
বেশিভাগ গল্প অসাধারন, বাংলা কল্পবিজ্ঞান লেখার জগতে এমন ধারনা আগে আমি পড়ি নি। কল্পবিজ্ঞান গল্পের গুণমুগ্ধ ভক্ত হওয়ার দরুন আমি ভাবতাম বাংলা সাহিত্যে Remembrance of the earth’s past এর মত রচনা কি সম্ভব না? আজকাল বাংলায় অনেকে যারা লেখেন তারা অনেকেই কর্মক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বা প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত, মনে একটাই প্রশ্ন উঠতো তাহলে বাংলায় আমরা কেনো কোনো ভালো পরিণত কল্পবিজ্ঞান গল্প পাচ্ছি না। লেখক সিদ্ধার্থ পাল কে সাধুবাদ জানাই আমার এই আক্ষেপ দূর করার জন্য। রক্তিম দা যেনার Bookishly Yours YouTube চ্যানেল আছে ওনাকে ধন্যবাদ জানাই এই বইটার রিভিউ করে এই বইটা কে প্রমোট আর সাজেস্ট করার জন্য। বাংলায় এমন একটা হার্ড সাইন্স ফিক্শন পড়ে খুব ভালো লাগলো।