রেলকে ঘিরে সাধারণ সব প্রশ্ন ও কৌতূহলকে নিয়ে এ বইটি লেখা। প্রাকৌশলিক জটিলতায় না গিয়ে অল্প কথায় জনমানুষের বোধগম্য করে লেখা হয়েছে সেসবের উত্তর। রেলওয়ে শুধু একটা পরিবহন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, রেলওয়ের সঙ্গে এ অঞ্চলের আধুনিক সভ্যতার বিকাশ জড়িয়ে আছে। রেলকে ঘিরে গত দেড়শ বছরের অধিক সময় সে সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশ হয়েছে তার কিছু আলোকচ্ছটা এখানে তুল ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ট্রেনকে যারা কেবল একটা লোহ-লক্কড়ের যন্ত্র ভাবেন না, রেলকে ঘিরে যাদের আবেগ কাজ করে, তাদের জন্য এটি সংগ্রহ করে রাখার মতো বই। রেলওয়ের প্রতিটি বিষয় এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
"জাজ এ বুক বাই ইটস কাভার" থিউরিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সুন্দর প্রচ্ছদের বইটা বাতিঘর থেকে বগলদাবা করে নিয়ে আসি। সামনে পুজোয় ছুটিতে যাচ্ছি এবং ছুটি শুরু হচ্ছে তূর্ণা-নিশীতা, তিস্তা আর অগ্নিবীণা র মতো সুন্দর নামওয়ালা তিনটি ট্রেইনে। টিকেট কনফার্ম করবার পড় মনে হল, বইটা তো রেলকে ঘিরেই লেখা, যাই একটু দেখে আসি কি আছে ওতে। কয়েক পাতা উল্টে দেখতে গিয়ে সাড়ে ৪০০ পৃষ্ঠার বই দুই দিনে শেষ করে ফেললাম। কি আছে এতে? রেলকে ঘিরে যা কিছু জানা উচিত বা জানা সম্ভব বলে আমার ধারণা, তার সবটাই পাবেন। সুপ্রাচীন সূচনা থেকে রেলের ইতিহাসের প্রতিটা বাঁক এখানে সুন্দর সাবলীল সহজ গদ্যে আলোচনা করেছেন লেখক। উপমহাদেশ তথা বাংলায় রেল আগমন ও বিকাশের ইতিকথা ও ইতিকথার গভীরে গিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ঘটনা বিশ্লেষণ ও কার্যকারণ উদঘাটন করেছেন এখানে লেখক। সাথে ফ্রীতে পাচ্ছেন রেলকে ঘিরে লেখা বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক দের লেখনী। সব মিলিয়ে অনবদ্য। আপনি নন ফিকশন পড়ায় অভ্যস্ত হলে এটি আপনার জন্য সরেস, আপনি রেলকে নিয়ে স্মৃতিকাতর বা রোমান্টিসাইজড হলেও বইটি আপনার সুখপাঠ্য হবে।
পুনশ্চ: তূর্ণা-নিশীতা কে এখন তূর্ণা এক্সপ্রেস ডাকা হয় পোশাকিভাবে। ছোটবেলায় তূর্ণা-নিশীতা শোনার পর আর অন্য নামে ডাকতে ইচ্ছে হয় নি। আমাদের ট্রেনগুলির নাম কতোটা সুন্দর, তাই না???
ট্রেন বা রেলগাড়ি নিয়ে আমার ফ্যান্টাসি সেই ছোট্টবেলার স্কুলজীবন থেকে। কত্ত শখ ছিল একদিন সাপের মত আঁকাবাকা বয়ে চলা রেলগাড়িতে উঠবো। সেই শখ পূরণ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনাকালে। এরপর থেকে রেলগাড়িই আমার সবচেয়ে প্রিয় বাহন। বাস, লঞ্চ, প্লেন, এইসব ছাপিয়ে ট্রেনই আমার প্রিয় বাহন( বাইসাইকেলের ব্যাপারটা আলাদা)। রেলের সেই শোভন কামরা আরো বেশী প্রিয়। কত্ত রকমের মানুষ রেলগাড়ির এই শোভন কামরায় ওঠে!! কেউ গান গায়, কেউ ভিক্ষে করে, কেউ ফেরি করে। ইচ্ছে মত খাওয়া যায় ট্রেনে। আর রেলগাড়ী ছুটে চলে যেন দিগন্ত ছাড়িয়ে। অচেনা, অজানা কত গ্রাম, বন, জঙ্গল, মাঠ, নদী সব পেরিয়ে ছুটে চলে। রেলের জানলার পাশে বসে বই পড়তে পড়তে, কিংবা জন ডেনভারের সেই "কান্ট্রি রোড" অথবা জোয়ান বায়েজের "ফাইভ হানড্রেড মাইলস" শুনতে শুনতে বার বারই মনে হয়, এই পথ শেষ না হোক। চলুক অসীমকাল পর্যন্ত। আমার শৈশবের সেই ফ্যান্টাসি প্রিয় রেলপথ বা রেল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি বই বেরুচ্ছে, প্রথম যখন শুনেছি এই কথা তখন থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম। বাতিঘর থেকে প্রথম দিনেই কিনেছি বইটা। পড়েছি একটু একটু করে। রেলকে ঘিরে মানুষের নানা কৌতুহলের উত্তর মিলবে বইটিতে। আর বাড়তি পাওনা হিসেবে আছে রেল নিয়ে সাহিত্য, শিল্প, সিনেমাসহ নানা বিষয়। লেখক জয়দীপ দে শাপলু কে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ এত পরিশ্রম করে রেলকে ঘিরে একটি বই বের করার জন্য।