বাংলা কল্পবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগ্য কী জানেন? ওই ধারায় অধিকাংশ উঁচুদরের রচয়িতার লেখা দীর্ঘদিন ধরে পাঠকের নজরের আড়ালে চলে গিয়েছিল। ফলে নবীন, এমনকি প্রবীণ পাঠকদের ধারণা হয়েছিল, বাংলায় কল্পবিজ্ঞান বোধহয় 'হাঁটি-হাঁটি, পা-পা' স্তরেই আছে। পরিস্থিতিটা বদলেছে গত কয়েকবছরে। ছয় ও সাতের দশকে 'ফ্যানটাসটিক' ও 'বিস্ময়'-এর মাধ্যমে বাঙালিকে মৌলিক কল্পবিজ্ঞানের সন্ধান দেওয়া বেশ কিছু লেখক আবার আমাদের কাছে ফিরে এসেছেন রচনাসংগ্রহের মাধ্যমে। এ আমাদের সৌভাগ্য যে তেমনই এক লেখকের যাবতীয় কল্পকাহিনি আলোচ্য বইয়ের দুই মলাটের মাঝে অবশেষে ধরা পড়ল। আলোচ্য বইটিতে একটি নাতিদীর্ঘ ভূমিকা-র পর মোট বাইশটি গল্প আছে— যাদের কালানুক্রমিক কাঠামোয় সাজানো হয়েছে এতে। গল্পগুলোর নাম সুবিধার্থে তুলে দিলাম হেথায়~ ১. হাত; ২. চোখ; ৩. নেশা; ৪. রৌদ্রদাহ; ৫. নক্ষত্রের আয়ু; ৬. তাপ; ৭. খাদ্য; ৮. সেই চটি জোড়া; ৯. ভয়; ১০. ডারউইন ও বনলতা; ১১. কমল কোনারের বিচিত্র অবস্থা; ১২. হলুদ গাছ; ১৩. তাতিয়ানার মোবাইল; ১৪. নয়নবাবুর আয়না; ১৫. ভানুবাবুর মিনিট সেকেন্ড; ১৬. জীবরত্নর ডায়েরি; ১৭. সিঁড়ি; ১৮. তেলেভাজার একদিন; ১৯. কৌটো; ২০. পোকা; ২১. সময়ের তালা; ২২. নিধুবাবুর টপ্পা। এদের মধ্যে অনেক গল্পে আছে বিজ্ঞানের গূঢ়তম তত্ত্ব ও সত্য এবং নিতান্ত সহজ কথায় তার প্রয়োগের সম্ভাবনা তথা সম্ভাব্য ফলাফল। অনেক গল্পে আছে গণিত এবং চোখে দেখা জগতের নিজস্ব ছন্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্পর্কটির অনুসন্ধান। কোথাও আবার আছে স্পেকুলেটিভ ফিকশন তথা ফ্যান্টাসির মৃদু ঘেরাটোপের মধ্যে বাস্তবানুগ চরিত্রদের চলন ও কথাবার্তা। কিন্তু প্রত্যেকটি গল্প— আজ্ঞে হ্যাঁ, আই রিপিট, প্রত্যেকটি গল্প— পাঠযোগ্য ও অনেকাংশে স্মরণীয় হয়ে উঠেছে তিনটি কারণে। তারা হল~ প্রথমত, লেখকের রসবোধ অসামান্য। শুধুমাত্র 'হাসির খোরাক' জোগানোর জন্যই নয়, বরং জীবনের নানা ক্ষেত্রকে সহনীয় করে তোলার জন্য আমরা ঠিক যেমন ধরনের হালকা হাসির অবতারণা করি, তেমন স্নিগ্ধ রসিকতা এই গল্পগুলোর সর্বাঙ্গে ধুনোর গন্ধের মতো জড়িয়ে আছে। দ্বিতীয়ত, এই গল্পের চরিত্ররা— সে 'নক্ষত্রের আয়ু'-র মতো ভূরাজনৈতিক থ্রিলারই হোক বা 'ডারউইন ও বনলতা'-র মতো চিন্তা-উদ্রেককারী আখ্যান— আদ্যন্ত বাস্তবানুগ। স্পষ্টতই মনে হয়, লেখক নিজের চারপাশে দেখা মানুষদেরই ধরে রেখেছেন এই গল্পগুলোতে; শুধু তাঁদের কার্যকলাপ হয়ে গেছে রোমাঞ্চকর এবং একেবারে অনন্য। তৃতীয়ত, স্পেকুলেটিভ ফিকশন তখনই মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে, যখন তা আদতে জীবনের গল্প বলে। আমাদের এই পদ্মপাতায় জলের মতো জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-হতাশা, গ্লানি আর বিস্ময় লেখক যেভাবে এই গল্পগুলোতে চরিত্রদের ছোট্ট-ছোট্ট কথায় আর ভাবনায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তা দেখে তাঁকে আভূমি সেলাম করতে হয়। বইটার সব ভালো। শুধু দুটো আক্ষেপ রয়ে গেল। ১) গল্পগুলোর সঙ্গে এক-একটা ছোট্ট হেডপিস দিতে হলে হয়তো প্রচুর মূল্যবৃদ্ধি ঘটত। কিন্তু একটা করে মোটিফ-জাতীয় ছবি থাকলেও ভারি ভালো হত। ২) গল্পগুলোর লে-আউট করার সময় কিছু-কিছু কাহিনিতে যদি পুরোনো আমলের মস্ত-মস্ত অনুচ্ছেদকে আধুনিক ধরনের মতো ছোটো-ছোটো আকারে বিন্যস্ত করা যেত, তাহলে বইটা আরও উপভোগ্য হত। এই দুটো অনুযোগ থাকা সত্বেও আমি বইটাকে পাঁচে পাঁচ দেব সহজ লেখনী, বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র, যুক্তিগ্রাহ্য সংলাপ, আর লেখকের রসস্নিগ্ধ জীবনবোধের জন্য। এই পোড়া পরিবেশে এমন সরস প্রজ্ঞার সান্নিধ্যলাভ ভয়ানক দুর্লভ হয়ে উঠেছে। গল্পের মাধ্যমে হলেও তেমন একজনের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেলাম তো! প্রকাশক এই দুরন্ত কাজটি করার জন্য আমার কাছ থেকে নতুন করে ধন্যবাদার্হ হলেন। আগামী দিনে তাঁরা এমনই আরও নানা হারানো জ্যোতিষ্ককে আমাদের সামনে তুলে ধরবেন— এই আশা নিয়েই বক্তব্য শেষ করলাম।
দোলের ছুটিতে কল্পবিজ্ঞান বিষয়ের উপর লেখা ২২টি গল্প সংকলন 'কল্পবিজ্ঞান রচনা সংগ্রহ' পড়লাম।আগে কখনো এই লেখকের কোন লেখা পড়িনি। শুরুতে ভূমিকা পড়ে বুঝতে পারলাম যে বাংলায় কল্পবিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় অনেক বছর ধরেই হয়েছে। হয়তো বিভিন্ন রকম সমস্যার জন্য সেই সব পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায় অথবা প্রচার কম। লেখক একটা সময় নিয়মিত কল্পবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান বিষয়ক গল্প লিখেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। সেই সমস্ত মৌলিক লেখালেখি দুই মলাটে বই আকারে প্রকাশ করেছে কল্পবিশ্ব।
শুধুমাত্র সায়েন্স ফিকশন গল্প নয় বইতে রয়েছে একাধিক বিজ্ঞান বিষয়ক গল্প। কোনো নতুন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ও আবিষ্কার মানুষ ও সামাজিক জীবনে ভালো খারাপ কি ধরনের প্রভাব বিস্তার করে সেই ধরনের গল্প রয়েছে এই বইতে। বিজ্ঞানকে কেন্দ্র করে কিছু হালকা হাসির মজার গল্প রয়েছে। বিবর্তন, স্পেস টাইম , এলিয়েন, টাইম ট্রাভেল নিয়ে রোমাঞ্চকর কাহিনি, অংক ও বিজ্ঞানের কিছু সূত্র ও তথ্য কিছু গল্পে রয়েছে। তবে কিছু গল্প বড্ড ছোট মনে হয়েছে। তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে অথবা ওপেন এন্ডেড মনে হয়েছে ।আরো একটু বড়ো হলে বেশি ভাল লাগতো। এছাড়াও এই ধরনের গল্পের ক্ষেত্রে ছবি অথবা অলংকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।কিছু অলংকরণ থাকলে দারুন হতো। কয়েকটি মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়েছে।তবে প্রচ্ছদ ,কভার সুন্দর। ফন্ট সাইজ বড়ো।পড়তে সুবিধা হয়েছে।
সায়েন্স ফিকশন, সায়েন্স ফ্যান্টাসি উভয় বিষয়ের উপর গল্প এই সংকলনে রয়েছে। বেশীরভাগ গল্পে চরিত্রগুলি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন থেকেই উঠে এসেছে তাই গল্পের মধ্যে লেখা চরিত্রর অনুভূতিগুলি সহজে রিলেট করা যায়।লেখনী সাবলীল ও সহজ।ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ হয়েছে 'হাত','নেশা', 'সিঁড়ি','রৌদ্রদাহ','তাপ', 'খাদ্য', 'তেলেভাজার একদিন','কৌটো','সেই চটি জোড়া' ও 'কমল কোনারের বিচিত্র অবস্থা' গল্পগুলি। সবথেকে ভালো লেগেছে 'চোখ','নক্ষত্রের রাত' ,'ডারউইন ও বনলতা','পোকা' ও 'নিধুবাবুর টপ্পা' এই লেখাগুলি কল্পবিজ্ঞান প্রেমী পাঠকদের চিন্তাভাবনার খোরাক যোগাবে বলেই মনে হয়। 'জীবরত্নর ডায়েরি' এই গল্পটি ভালো তবে আমার এটা অলৌকিক বিষয়ক মনে হয়েছে। মোটের উপর এই সংকলন ভালোই লাগলো। যারা বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞান বিষয়ক ফিকশন পড়তে পছন্দ করেন তারা এই বইটি পড়তে পারেন।