মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে লেখা এই উপন্যাস বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের শেষ অমর কীর্তি। যাঁর জন্ম-মৃত্যু দুই-ই মিথিলায়, নিজেকে যিনি বলতেন মিথিলার সন্তান, নিজের ধাত্রীমাতার প্রতি সেই বিভূতিভূষণের এ-এক অসামান্য শ্রদ্ধার্ঘ্য। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে উজ্জ্বল পুণ্য পুরাণভূমি মিথিলাকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন তিনি এই স্মরণীয় সৃষ্টিতে। যাঁকে মনে রেখে এই উপন্যাস, ‘কুশীপ্রাঙ্গণের চিঠি’তে রয়েছে তাঁর উল্লেখ। কুশী নদীর ভয়াবহ বন্যার পরেও ভিটে আঁকড়ে পড়েছিলেন সেই প্রৌঢ় মৈথিল পণ্ডিত, প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সরকারী অনুদান। বংশমর্যাদায় বেধেছিল তাঁর। মানুষটি স্থায়ী দাগ রেখে গিয়েছিলেন লেখক-হৃদয়ে। বন্যার বেশ কয়েক বছর পরে ওই গ্রামে ফের যান বিভূতিভূষণ। পণ্ডিতজীর সম্পত্তির হাতবদল হয়ে গেছে তখন। আত্মসচেতন পণ্ডিতজীর বংশে ইতিবৃত্ত উদ্ধারে ব্রতী হলেন লেখক। কিংবদন্তী, তথ্য, পুরনো পুঁথি ঘেঁটে আবিষ্কার করলেন মিথিলার প্রবাদপুরুষ অযাচী মিশ্র ও তাঁর পুত্র শঙ্কর মিশ্রের নাম। সেই আবিষ্কারই বিভূতিভূষণের মরমী লেখনীতে মৃত্যুঞ্জয় সৃষ্টি—‘অযাচী সন্ধানে’।
Bibhutibhushan Mukhopadhyay was a renowned Bengali author. Bibhutibhushan's early days were spent in Darbhanga, Bihar, India. His college life was spent in Kolkata. He as a schoolteacher and journalist.
Child psychology and middle class Bangali lives were focused in his writing. His first book, ‘Ranur Prothom Vagh’ was published in 1934.
He was honored with Ananda Puraskar in 1958, Rabindra Puraskar in 1972 and Sharatchandra Puraskar in 1978, Jagattarini Puraskar from Calcutta University, D.Litt from the University of Burdwan and Desikottama from the Visva-Bharati University of Shantiniketan.
না পড়লেও চলতো। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের সম্পূর্ণ কোনো বই এই প্রথম পড়লাম। অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর হোলো না। লেখকের শেষ উপন্যাস, কিছু জায়গায় অসংলগ্ন, প্রায়ই বাক্যের মাঝখানে শব্দ খুঁজে পাওয়া যায়নি। "হয়তো শেষে ভালো হবে" আশা নিয়ে পড়ছিলাম।কিন্তু শেষটা হতাশা আরো বাড়িয়ে দিলো।
মিথিলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়টা শুরু হয় অযাচীর যুগকে কেন্দ্র করে। মিথিলার ভূমিটা ছিল উর্বর, শৌর্যবীর্যে রাজা জনক, জ্ঞানগরিমায় মহর্ষি যাজ্ঞ্যবল্ক্য। এরপর সেই পবিত্র ভূমিতে এলেন-- মহীয়সী রমনী, সীতা। তার প্রদীপ্ত জীবনকে কেন্দ্র করে মিথিলা সারা ভারতে প্রসারিত হয়েছে। শৌর্যে-বীর্যে ত্যাগে- তিতিক্ষায়, আর একনিষ্ঠ দাম্পত্য জীবনের মূর্ত বিকাশে-- রামচন্দ্র, জনকদুহিতা সীতা...
এর পর পুরাণ-ইতিহাসের একটা সুদীর্ঘ যুগ কেটে গেল যাতে মিথিলাকে আর বেশ স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। মৈথিলি সংস্কৃতি মূলত ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি, শ্রতি-স্মৃতি-পূরাণ-কাব্যাদির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটা নদী বিধ্বস্ত অঞ্চল, কিন্তু তার ধ্বংসলীলার চেয়ে সৃষ্টি-সম্ভারই বেশী। এখানে জন্ম নিল মৈথেলি সংস্কৃতির এক নতুন ধারা। জন্ম নিলেন মন্ডল মিশ্র, বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস। তন্ত্রসাধন আর মহাপুরুষ। এঁদেরই একজন প্রতিনিধি হলেন সার্বভোম মহামহোপাধ্যায় অযাচী মিশ্র।
মিথিলার কৌশিকী নদীর প্লাবনের ফলে প্রতি বছর বন্যা হয়। এই বন্যায় এলাকা প্লাবিত হয় এবং ত্রাণ বিতরণের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিজে গিয়ে জরিপ করে আসেন। লেখকের ছোট ভাই মনি ছিলেন সাহারসার ম্যাজিস্ট্রেট। ভাইয়ের সাথে লেখক যান বন্যা কবলিত এলাকায় , সেখানে বিচ্ছিন্ন এক পরিবার পান যারা ত্রাণ নিতে অস্বীকার করেন শুধু মাত্র পূর্ব পুরুষদের সংস্কারের কারণে। তাদের কখনও কেউ অন্যের দান গ্রহণ করেন না। অনেক বুঝিয়ে লেখকের ভাই মনি অবশেষে ত্রাণের জিনিস দিতে সক্ষম হন, আর কৌশলে ছোট ছেলের হাতে কিছু টাকা দিয়ে আসেন যদি বিপদে তা কাজে লাগে।
তার কয়েক বছর পর লেখক যখন অযাচী মিশ্র সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন তখন তাঁর সেই বন্যার সময় ত্রাণ দেওয়ার ঘটনা মনে পড়ে এবং তিনি সেখানে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি কিছুই জানতে পারেন না। বিভিন্ন জাগায় গিয়ে তিনি ব্যর্থ হয়ে এক সময় হাল ছেড়ে দেওয়ার মনোভাব চলে আসে, এর পর হঠাৎ একদিন নিজে গিয়ে হাজির হন হেডমাস্টার। তারপর বাকিটাই আসল ইতিহাস।
"অযাচী সন্ধানে " লেখক বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় এর শেষ কেখা। উনার মৃত্যুর দেড় মাস পর তাঁর ই ভ্রাতুষ্পুত্র পান্ডুলিপি টি শ্রীদূর্গাপ্রসাদ চক্রবর্তীর হাতে তুলে দেন। এটা এমন একটা সময়ের লেখা যখন তিনি বয়সের কারনে চিঠি পত্র লেখাতেন অন্য কে দিয়ে, সেখানে পুরো পান্ডুলিপি টা তিনি নিজের হাতে লিখেছিলেন। ডায়েরি তে এই উপন্যাস লেখার কথাটা উল্লেখ আছে। তবে তিনি এটা সংশোধন করতে পারেন নাই, তাই উনার লেখাটা কোন সংশোধন ছাড়াই প্রকাশিত হয়েছে।
মৈথিলি সমাজের বিশিষ্ট এক পন্ডিত অযাচী মিশ্র কে নিয়ে লেখা উপন্যাস " অযাচী সন্ধানে "। অসংখ্য তথ্য ও ঘটনার বিশ্লেষণের সাথে লেখকের বর্ণনা গুলো ছিলো চমৎকার। ঘটনার সাথে জড়িয়ে থাকা সেই সময়ের কিছু মিথও লোকমুখে পাওয়া গেছে তা তুলে এনেছেন। কিছু মৈথিলি ভাষার ব্যবহার করেছেন তবে পাশে বাংলাটা জুড়ে দিয়েছেন। বইটার কথা অনেক শুনলেও বিষয়বস্তু ছিলো সম্পর্ক অজানা তাছাড়া অযাচী মিশ্র নামে এমন একজন পন্ডিত আছেন তা এই বইটা না পড়লে পুরোটাই ধোঁয়াশায় রয়ে যেত। বইটা পড়ে একটা তৃপ্তি বোধ হচ্ছে।
অযাচী সন্ধানে । বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় । আনন্দ । ২০২০র ৯৯তম বই । বইয়ের ফ্ল্যাপ অনুযায়ী এই রচনাটি লেখকের "মৃত্যুঞ্জয়ী সৃষ্টি"। আত্মসচেতন অথচ বিস্মৃত এক বংশ-পরম্পরার ইতিবৃত্ত অনুসন্ধানের আখ্যান। কিংবদন্তি, কিছু তথ্য, আর ক্ষয়িষ্ণু-জরাজীর্ণ-পুঁথি ঘেঁটে আবিষ্কৃত করা মিথিলার প্রবাদপুরুষ "অযাচী মিশ্র" ও তাঁর পরিবারের কাহিনী। ১৫ অধ্যায়ে বিভাজিত ১২২ পৃষ্ঠায় ব্যাপ্ত লেখকের সন্ধান শুরু হয় মিথিলার নদী কৌশিকীর প্লাবিত তীর বেয়ে। সঙ্গে তাঁর ছোটভাই মণি-সাহাস্রার ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁরা কুশির(কৌশিকীর) বন্যাবিধ্বস্ত একটি ছোট্ট গঞ্জ নিরমালিতে জায়গা পরিদর্শন করতে গিয়ে এক পণ্ডিত পরিবারের সাক্ষাত পেলেন, যারা "রিলিফ" নিতে পরাঙ্মুখ। । এরপর দশম অধ্যায় অব্দি লেখকের কলম, পাঠককে কয়েকবছর ব্যপ্ত মহাকালের সাথে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে অজানা জায়গায় - দ্বারভাঙ্গা, কলকাতা, সৌরাঠ, মধুবণী, পান্ডুল; পরিচয় করাবে জীবনপঙ্কে নিমজ্জিত গুটিচারেক চরিত্রের সাথে, যাঁদের দৈনন্দিন জীবনসুখ আপাত ব্রাহ্মণদের আরামপ্রদান ও আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে আপেক্ষিকভাবে নিভৃত। মুখনিঃসৃত করাবে বাঙ্গালির একসময়ের খুব কাছের "ব্রজবুলির" খান কুড়ি সংলাপের। এতশত পার করে দশম অধ্যায় পর্যন্ত যদি আপনি ধৈর্য ধরে রাখতে পারেন পাঠক, তবে সেই সবুরেই আপনি আপনার আসল মেওয়াটি পাবেন। । হ্যাঁ, সুধু শেষের পাঁচ অধ্যায়েই, ৪০ পৃষ্ঠায় চিত্রিত দেখতে পাবেন আগের বিস্তৃত দশ অধ্যায়ব্যাপী অনুসন্ধানের লিপিবদ্ধ তপস্যার ফসল। অযাচী মিশ্র ও তাঁর পুত্র শঙ্কর মিশ্রর সংশ্লিষ্ট কাহিনী। কিন্তু মহানুভবতা বাদে, তাঁর বাকি কৃত ও উদ্ভাবিত কোন কালোত্তীর্ণ মৈথিলী রচনার উল্লেখ নেই এই উপন্যাসে, এমনকি তাঁর আসল নাম "ভাবনাথ মিশ্র"-ও এই লেখায় অধরা। । আমার পাঠ-অনুভূতিও তাই এই মহান সংস্কৃতপণ্ডিতের পদবীর মতনই - মিক্সড(মিশ্র)। BookieCart-কে বই সরবরাহের জন্যে ধন্যবাদ।
অযাচী মিশ্র এবং তার ছেলে শংকর মিশ্রর গল্প পাওয়া যায় একদম শেষে। সেজন্য পড়ার মাঝে কয়েকবার থেমে গিয়েছিলাম। তারপর আবার গল্পে তাকে খুঁজতে চলে আসা। পাবার পরেও আসলে খুব বেশি জানা হয়না বলে একটু খেদ থেকেই যায়। তবে এটুকু জানা গেছে সেই বা কম কি! বাড়তি পাওয়া ঐ অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ সম্পর্কে জানতে পারা। অনেকটাই বাংলাদেশের বন্যাপ্লাবিত এলাকার মত।
লেখায় অযাচী মিশ্রর ইতিহাসের থেকে বেশি জায়গা পেয়েছে লেখক কিভাবে অযাচী মিশ্রর তথ্য খুঁজে বের করলেন সেই কাহিনী। কারণ প্রচারবিমুখ এই মহাপুরুষ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না। জড়াজীর্ণ পুঁথি, কিংবদন্তী আর এখান সেখান থেকে পাওয়া কিছু তথ্য নিয়েই মিথিলার মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত অযাচী মিশ্রকে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছিলেন লেখক। প্রচার বিমুখ পন্ডিতের ইতিহাস খুঁজে বেড়ানোর সেই গল্প থেকেই নাম করেছেন ‘অযাচী সন্ধানে’। তথ্য খুঁজে পাওয়া যে কত মুশকিল হতে পারে কিংবা সব তথ্য একসাথে জোড়া দিতেও কত কৌশলীর পরিচয় দিতে হয়।
জানা গেল, মৃত্যুর আগে এটিই লেখকের শেষ লেখা। সেজন্যও একটা শ্রদ্ধাবোধ রয়ে গেল লেখকের প্রতি।