ভৌতিক অমনিবাস (১): এক চিরকালীন ভয়ের নস্ট্যালজিয়া মানবেন্দ্র পাল | দেব সাহিত্য কুটির | মূল্য: ₹২৮০
এই বইয়ের কোনো “রিভিউ” হয় না। একে কেবল অনুভব করা যায়। এই বই আসলে এক ফিরে-যাওয়া—আমার ছেলেবেলার সেই নীমতলাঘাট স্ট্রিটের ঘরে, যেখানে সন্ধ্যাবেলা এক কুয়াশামাখা হলুদ বাল্বের আলোয় আমি প্রথম পড়েছিলাম “গভীর রাতের ভয়ঙ্কর”। বয়স তখন ক্লাস টু। বাবা শারদীয়া শুকতারা কিনে এনেছিলেন। সেই প্রথম পরিচয় মানবেন্দ্র পালের ভয়ের জাদুকরী জগতের সঙ্গে। তখনও বুঝিনি, সেই ভয় একদিন স্মৃতির সমার্থক হয়ে উঠবে।
গল্পটা ছিল—জনার্দন ও তার পরিবার একটি নির্জন বাগানবাড়িতে বেড়াতে গেছেন। এক বর্ষার রাতে সেখানে আশ্রয় নেয় এক অচেনা আগন্তুক। কী লুকোচ্ছে জনার্দন? কে রতিকান্ত? প্রশ্নগুলো তখন যেমন কাঁপিয়ে দিয়েছিল, আজও তেমনি কাঁপায়। ভয়টা কিন্তু কখনো “জাম্প স্কেয়ার” টাইপ নয়, বরং ধোঁয়াশার, ক্লু-গোছানো এক ধরণের আতঙ্ক—যা শীতল হাওয়ার মতো ঘাড় বরাবর বয়ে যায়।
আর ছিল সেই বিখ্যাত “অলৌকিক জল্লাদ” ও “জীবন্ত কঙ্কাল”—মানসিক আতঙ্কে ভরা, প্রতিশোধস্পৃহায় ঝলসানো গল্প, যা পড়লে মনে হতো যেন Stephen King-এর Pet Sematary বাংলা হয়ে উঠেছে। এই গল্পগুলোর মধ্যে যেমন রয়েছে ভয়ের শিল্প, তেমনই রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, যার সঙ্গে তুলনা চলে কেবল হুমায়ূন আহমেদের “কুটু মিয়া” কিংবা M.R. James-এর গথিক ক্লাসিকসের।
মানবেন্দ্র পালের ভয়ের গদ্য কখনোই শুধু ভূতের উপর নির্ভর করেনি। বরং অলৌকিক আবহ, বিশ্বাসযোগ্য প্লট আর একদম কৌশলে ছড়ানো ভয়—এই তিন উপাদানকে লেখক কাব্যিক দক্ষতায় মিশিয়েছেন। বিশেষ করে যখন “অলৌকিক আতঙ্ক” উপন্যাসটি পড়ি (যেটা দ্বিতীয় খণ্ডে আছে), তখন শরীরের জ্বর, হাত-পায়ের ব্যথা ভুলে রাতভর বই পড়ে ফেলেছিলাম। লেখার মধ্যে এমন টান! এমন টান যে গল্পে ঢুকেই যাই।
আর একটি বিষয়, যা মানবেন্দ্র পালের লেখাকে আমার কাছে অনন্য করেছে, তা হলো—তাঁর ইতিহাসচর্চা। “সুলতানের কবর” পড়েই প্রথমবার হাবসী শাসন আর ফিরোজ মিনারের কথা জেনেছিলাম। সেই থেকে মালদায় ঘুরে আসার বাতিক চেপে বসেছিল। “ওরা চলেছে নিঃশব্দে” পড়ে প্রথম চিনলাম চেঙ্গিস খানকে—তা-ও আবার ভূতের গল্প পড়তে পড়তে!
আমাদের স্কুলজীবনে শুকতারার শারদ সংখ্যার মানেই ছিল মানবেন্দ্র পালের গল্প নিয়ে কাড়াকাড়ি। দীপঙ্কর বিশ্বাসের “মেজদা” সিরিজ যেমন জনপ্রিয়, তেমনই পালবাবুর গল্প মানেই শীতল আতঙ্কে এক অনির্বচনীয় আনন্দ। দেব সাহিত্য কুটির যে তাঁর লেখাগুলো সংকলন করে প্রকাশ করেছে—সেটা পাঠকদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
এটা আমার জন্য শুধু একটা বই নয়। এটা ফিরে পাওয়ার অনুভূতি। হারিয়ে যাওয়া কৈশোরে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে লুকিয়ে পড়ে ফেলা একটা গল্পের অভিজ্ঞতা। এটা সেই লেখা, যা আপনি বার পঁচিশ পড়েও ক্লান্ত হবেন না, বরং বার বার তার কাছে ফিরে যেতে চাইবেন। এটা সেই ভয়, যা আপনাকে কাঁপিয়ে দেবে, আর তারপর গায়ে কাঁটা দিয়ে বলে উঠবে—"ভয় পেতে ভালোই তো লাগে!"
আর হ্যাঁ, যারা ভূতের বই খুঁজছেন, তাদের বলছি—চোখ বুজে কিনে ফেলুন। লালমোহন বাবুর ভাষায় বললে, একেবারে “unputdownable”!
Absolutely brilliant collection of ghost stories from one of the most per-eminent psychologists, containing several gems that had given me sleepless nights in my childhood. Highly Recommended.