আমাদের এখানকার বাজারে অনূদিত গল্প সংকলন বা উপন্যাস সেভাবে আসেই না। সম্ভবত এখানকার পাঠকেরা "অনুবাদ" ট্যাগ লাগানো থাকলেই আগেভাগেই সেটাকে তাদের পড়ার লিস্টের বাইরে রেখে দেয়। এর ফলে বেশিরভাগ প্রকাশকরাও অনূদিত গল্প বা উপন্যাস কোনো কিছুই আর ছাপতে আগ্রহী হচ্ছে না। নতুন লেখকরাও সব্বাই নিজেদের গল্প বলতে ও শোনাতে ব্যস্ত.. তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে দেশ বিদেশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মণিমুক্তা গুলোকে কে বা কারা আমাদের সামনে আনবে? আমরা তো মৌলিকের সাথে সাথে অনুবাদকেও যথেষ্ট সমাদর করি। তাহলে আমাদের মতো পাঠকদের ক্ষুধা নিবারণ করার দায় কী কেউ-ই নেবে না? ঠিক এখান থেকেই উঠে আসে লেখক ঋজু গাঙ্গুলীর নাম। কেননা বেশ কয়েক বছর ধরেই এই ভদ্রলোক আলোচ্য মণিমুক্তাদের খোঁজ আমাদের দিয়ে যাচ্ছেন। আপনারা গুডরিডসে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই তাদের নাম খুব সহজেই জানতে পারবেন। আলোচনা দীর্ঘ না করে তাই সরাসরি এবার ঢুকে পড়ি "রহস্যের দশ অধ্যায়" বইটির প্রসঙ্গে। গল্পগুলো পড়ে আমার কেমন লাগলো তা একদম ছোট্ট করেই জানাব আপনাদের। ১. বৃত্ত : কর্মফল কনসেপ্ট টাকেই বহু মানুষ হেসে উড়িয়ে দেয়.. তারা ভাবে ধুসস ওসব আবার হয় নাকি? আমি সিরিয়াসলি মনে করি.. হয়। এই গল্পটিও শেষে গিয়ে সেটাই দেখায়। ২. অন্তর্ধান : এই গল্পটা আগের গল্পটার থেকেও বেশ ডার্ক। এমনকি একটা পর্যায়ে গিয়ে বোঝা যায় না যে এটা লকড রুম ধাঁচের কোনো রহস্য গল্প নাকি এমন এক জগতের গল্প যার কথা ভাবলেই ভয় হয়.. পরিবেশটাও এমন ভাবেই ডিজাইন করা যে কিছু জায়গায় গা ছমছম করতে বাধ্য। আর তারপর শেষে গিয়ে.... উফফফ দারুণ দারুণ.. ৩. প্রিয়তমা : " একদিন চন্দ্রদেবী ইন্সপেক্টর আকাশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করলেন, "দেখুন না স্যার! ওই বজ্জাত তারাগুলো আমাকে দেখলেই সিটি মারে আর বাজে ভাবে তাকায়।” ইন্সপেক্টর আকাশ কন্সটেবল মেঘকে বললেন, "সবক'টা তারাকে তুলে আন্। ”কিন্তু তারাগুলো তার আগেই লুকিয়ে পড়েছিল। তারপর....." যে গল্পের শুরুটা এমন.. সেই গল্পে যে 'বৈচিত্র্য' থাকবেই তাতে কোনো সন্দেহই আমার ছিল না। আর সেটাই হল। যেমন ফাটাফাটি প্লট তেমনই দুর্দান্ত তার চরিত্ররা। আর তার সাথে চেরি অন দ্য কেক হিসেবে তুখোড় ওয়ান লাইনার। তবে এখানে লেখককে স্যালুট জানাতেই হচ্ছে, কারণ, মূলত এটা একটা উপন্যাস ছিল। সেটাকেই ছোটগল্পের আকারে পেশ করেছেন। কিন্তু তাতে কোথাও কোনোরকম তাড়াহুড়োর ছাপ আসেনি। একবারও মনে হয়নি গল্পটাকে ছাঁটা হয়েছে। উল্টে মনে হয়েছে যতটা দরকার ছিল ততটাই লেখা হয়েছে। না কম না বেশি। ৪. দিব্যদৃষ্টি : ভরত সুশীলার "প্রিয়তমা" গল্পটির তুলনায় "দিব্যদৃষ্টি" গল্পটি অতটা ভালো না হলেও এন্টারটেনিং। তাছাড়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভরত-ই তো মাতিয়ে রাখে। আমার চরিত্রটি -কে হেব্বি লেগেছে। ৫. ব্যবস্থা: এই গল্পটায় উল্লিখিত উইন্টার্স নামের চরিত্রটার সাথে পাঠকদের খুব একটা ফারাক নেই। পুরো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে মাইরি। তবে হ্যাঁ, ওঁর মতো অতগুলো টাকা গচ্চায়... যাউক গে.. ৬. ভদ্রতা : অ..সা..ধা..র..ণ..!! এছাড়া আর কীইবা বলার আছে এই গল্পটির সমন্ধে...। আমার মতে, এই সংকলনের সেরা গল্প । ৭. এমিলি: এই গল্পটা পড়তে পড়তে খালি মনে হচ্ছিল এটা তো একদম সোজাসাপ্টা প্লট হয়ে গেল যার শুরু থেকে শেষ সবটাই জলের মতন পরিস্কার। কিন্তু তারপরেই আসে আসল টুইস্ট.. আর আমিও 😔 থেকে 😊হয়ে উঠি। ৮. অনুসন্ধান : এই গল্পটা কয়েক বছর আগে মায়াকানন নামের একটি প্রকাশনার "তিন" নামক সংকলনে পড়েছিলাম। জমেনি। কিন্তু এখন পড়ে দেখলাম পুরো স্বাদই পাল্টে গেছে। চমৎকার লাগলো। এর থেকে বোঝা যায় ভালো গল্প ভালো অনুবাদকের হাতে পড়াটাও কতটা জরুরি। ৯. হৃদয়ঘটিত : ডার্ক কমেডি ঘরানার দারুণ এক গল্প। ছোট্ট একটি গল্পে এতগুলো ইমোশন এসে ধরা দেবে ভাবিনি। একটি বিশেষ চরিত্রের উপর কখনও আপনার রাগ হবে। কখনও মনে হবে এই মানুষটা যেন না ফেঁসে যায়। আবার কখনও এই মানুষটাই আপনার হৃদয়ও জিতে নেবে। ১০. খুনখারাপি : টিপিক্যাল জ্যাক রিচি টুইস্ট ও হিউমারের ছোট্ট গুঁতো দিয়ে শেষ। ফাটাফাটি একটি গল্প দিয়ে যবনিকা পতন। খরার বাজারে চমৎকার এই গল্প সংকলন টিকে প্রকাশ করবার জন্য আনাড়িমাইন্ডস পাবলিকেশনকে অনেক ধন্যবাদ। ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অলংকরণ গুলোও খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু প্রচ্ছদ থেকে লে-আউটের অবস্থা এতটা খারাপ কেন? এই প্রশ্নটাও আমি করতে বাধ্য হলাম। একটা ভালো প্রোডাকশন এই গল্পগুলো দাবি করে। সেটা না দেখতে পেয়ে একটু হতাশই হলাম। তবে হ্যাঁ সমস্ত পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলব, রহস্য গল্পের অনুরাগী হলে বইটা মাস্ট রিড। নমস্কার!
বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে ঋজু গাঙ্গুলী পাঠকদের কাছে এক পরিচিত নাম। অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা বা সেই সাহিত্যের প্রতি চর্চা বাঙালি পাঠকদের মধ্যে তুলনামূকভাবে একটু কমই দেখা যায়। তবুও অনুবাদক ও প্রকাশকের যৌথ প্রচেষ্টায় অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি বৃহত্তর পাঠককুলকে আকর্ষিত করতে মোট দশটি গল্পের অনুবাদ নিয়ে হাজির হয়েছে 'রহস্যের দশ অধ্যায়'। এই বইতে অনুবাদ করা লেখাগুলির মধ্যে আটটি বিদেশী ভাষায় এবং দুটি তামিল ভাষায় প্রকাশিত গল্প থেকে নেওয়া। রহস্য বা গোয়েন্দাকাহিনী জাতীয় গল্পের অনুবাদের ক্ষেত্রে অনুবাদককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হয় গল্পের পরিবেশ অটুট রাখার দিকে। লেখক বা লেখিকা গল্প লেখার সময় যে থমথমে বা ভয়ার্ত ভাব পাঠকের মধ্যে সঞ্চার করতে পেরেছিলেন, অনুবাদ করা গল্প পড়েও যদি পাঠকের মনে একইরকম শিহরণ অনুভূত হয়, তবেই অনুবাদকের সাফল্য। অনুবাদক ঋজু গাঙ্গুলী যে সেই বিষয়ে দারুণভাবে সাবলীল তা এই বইয়ে প্রকাশিত গল্পগুলি পড়লে খুব ভালোভাবে বোঝা যায়। প্রত্যেকটি গল্প এত নিখুঁতভাবে অনুবাদ করা হয়েছে যে কখনও কখনও অনুবাদের কথা মাথাতেই থাকেনা। জ্যাক রিচির লেখা ছয়টি গল্প, তামিল পাল্প-ফিকশন লেখক পোট্টুকোট্টাই প্রবাকরণের দুটি গল্প ও আরও অন্যান্য দুটি গল্প দিয়ে সাজানো 'রহস্যের দশ অধ্যায়' নিশ্চয়ই পাঠকের পছন্দের তালিকায় থাকবে ও পাঠকদের আরও বেশি করে অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে চর্চা করতে উৎসাহিত করবে।