লোকায়ত গল্প-বয়ানের অকৃত্রিম ঢঙের সঙ্গে আধুনিক গল্প বিশ্বের আঙ্গিকগত নানা নিরীক্ষার টুকরো মিলিয়ে শাহাদুজ্জামান তৈরি করেছেন তাঁর নিজস্ব গল্পপদ। কোনো কোনো লেখাকে অবশ্য প্রচলিত অর্থে গল্প বলা দুষ্কর। সেখানে বরং গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এদের পরস্পরের দেয়াল ভেঙে মিলিত হয়েছে। এই বইয়ের মাধ্যমে নতুন পাটক যেমন শক্তিমান কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের লেখার সঙ্গে পরিচিত হবেন, তেমনি পুরোনো পাঠক পাবেন দুই মলাটের ভেতর তাঁর এযাবৎ প্রকাশিত সব কটি গল্প।
Shahaduz Zaman (Bangla: শাহাদুজ্জামান) is a Medical Anthropologist, currently working with Newcastle University, UK. He writes short stories, novels, and non-fiction. He has published 25 books, and his debut collection ‘Koyekti Bihbol Galpa’ won the Mowla Brothers Literary Award in 1996. He also won Bangla Academy Literary Award in 2016.
শাহাদুজ্জামানের কয়েকটি বিহ্বল গল্প(১৯৯৬) এবং পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহে(১৯৯৯) পূর্বেই গ্রন্থিত ২৫টি গল্প ছাড়াও অগ্রন্থিত আরো ৬টি গল্প আর ঃ তে দুঃখ(২০০৩) নামের ভিন্নধর্মী উপন্যাসটি এখানে স্থান পেয়েছে। বইটা পড়তে বেশ ভালোই লেগেছে। লেখকের গল্প চলার মাঝেই অন্য গল্প ফেঁদে বসার প্রবণতা আমার জন্য উপভোগ্যই ছিলো৷ এই সুযোগে বাংলা সাহিত্যের কিছু সুন্দর পঙ্ক্তির সাথে এবং বিশ্ব ইতিহাসের কিছু ইন্টারেস্টিং ঘটনার সাথে পরিচয় হয়ে গেলো। কমিউনিজম স্বপ্নের ভঙ্গ নিয়ে লেখা তার রচনাগুলো বিশেষভাবে মনে ধরেছে।
লেখার ভঙিমা বা স্টাইলে নতুনত্ব, চমকত্ব ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে থাকলেও সত্যি বলতে মূল বিষয়বস্তু বা থিমে তেমন নতুন কিছু পাইনি৷ সে যাগকে, চেনাজানা বিষয়কেই এভাবে নতুন ও আকর্ষণীয়রূপে উপস্থাপন করতে পারাটাও একটা বড় ব্যাপার। আমার এক জায়গাতেই খালি বেশি খটকা লাগছিলো। লেখাগুলো যে একজন পুরুষের দৃষ্টি থেকে লেখা, সেটা প্রতি লাইনে লাইনে স্পষ্ট। ভাষার আবার জেন্ডার হয় নাকি? এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দেয়ার যোগ্যতা আপাতত আমার হয়নি, কিন্তু নারীদের যেভাবে 'মেইল-গেইজ' ব্যবহার করে লেখা হয়েছে গল্পগুলোতে, আমার রুচির সাথে সেটা মোটেই খাপ খেলো না।
বই: গল্প, অগল্প, না-গল্প সংগ্রহ লেখক: শাহাদুজ্জামান প্রকাশক: পৃথ্বীশ প্রত্যয় সমাবেশ প্রথম প্রকাশ: সমাবেশ, ফেব্রুয়ারি ২০০৯ প্রচ্ছদ: সেলিম আহমেদ
শাহাদুজ্জামান বর্তমান কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। তিনি পেশা হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল অব পাবলিক হেলথ বিভাগে অধ্যাপনা করছেন।গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, চলচ্চিত্র, অনুবাদ এবং সম্পাদনা গ্রন্থ রচনা করেছেন।
এই প্রথম আমি ওনার লেখা পড়ছি। গল্পগুলোর গঠনশশৈলী বেশ দারুন। খুব সাবলীল ভাষায় লেখা। গল্পের মাঝেও লেখকের কবি মনের পরিচয় পাওয়া যায়। গল্প গুলো যেমন আনন্দদায়ক ঠিক তেমন গুরুত্ব বহন করে। প্রতিটি গল্পের মধ্যে জীবন নিয়ে গভীর ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। পাঠক অবশ্যই গল্পের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাবেন।
আমার কাছে এই বইয়ের প্রতিটি গল্পই ভালো লেগেছে। লেখকের পরিমিতি বোধ, লেখার গতি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। প্রথম গল্পটি পড়ে খুব অবাক হয়েছি। এক কাঁঠালপাতা আর মাটির ঢেলার গল্প শেষ করে মনে হচ্ছে জীবনের এক দারুণ রহস্য ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।
অগল্প গল্পটির ধরণ বেশ অন্যরকম। পড়ার শুরুতে মনে হচ্ছিল গল্প লেখার শুরুতে লেখকের মনোভাব খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন। এটাও যে গল্পের একটা অংশ হতে পারে সেটা এই গল্প পড়ে অনুধাবন করলাম।
মৌলিক গল্পটিও সুন্দর। পড়ার সময় চোখের সামনে সব যেনো ভেসে ওঠে। জাহাজের কেবিন কোলাহল নদীর জল। পড়ার সময় যেনো মনে হয় আমি ঠিক যেনো ঐ পরিবেশে চলে গিয়েছি।
ডোডো পাখির জন্য নস্টালজিয়া গল্পটি পড়ে মনে হলো আমরা সবসময় নিজের মতো করে ভাবি কিন্তু একটু অন্যের মত করে ভাবা উচিত। অন্যদের ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
হারুনের মঙ্গল হোক গল্পটি যেমন হাসির ঠিক তেমন গুরুত্বপূর্ণ। এই গল্পটি পড়লে বোঝা যায় বর্তমান সময়ে কর্পোরেট অফিসের কালচার কীভাবে মানুষকে ট্রমাটাইজ করে ফেলেছে। তার স্বাভাবিক জীবনের গতি এমনভাবে পরিবর্তন করে ফেলেছে যে মানুষের আবেগ অনুভূতি ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে।
প্রত্যকটা গল্প নিয়েই আলোচনা করা যায়। খুবই প্রাসঙ্গিক লেখা। সুন্দর সাবলীল ভাষা। সমাজ জীবন নিয়ে গভীর ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে।
পাঠক সমাবেশ রিভিউ লেখা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হওয়ায় বইটি উপহার পেয়েছিলাম। এতো সুন্দর একটা বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য পাঠক সমাবেশ কে অসংখ্য ধন্যবাদ।
“গল্প, অগল্প, না-গল্প সংগ্রহ” শাহাদুজ্জামান রচিত একটি গল্প সংকলন। বইটি তিনটি প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ও কিছু অপ্রকাশিত গল্পের সমন্বয়ে রচিত।
বাংলাদেশের মননশীল কথাসাহিত্যে বিশিষ্ট নাম শাহাদুজ্জামান৷ তাঁর রচিত “ক্রাচের কর্ণেল” ব্যাপক সাড়া জাগানো একটি উপন্যাস।
যেসব গল্পগ্রন্থের সমন্বয়ে বইটি রচিত:
১. কয়েকটি বিহ্বল গল্প: ধরে নিচ্ছি এটিই লেখকের প্রথম প্রকাশিত গল্পের বই। সে হিসেবে অত্যন্ত সফল একটি বই। অনেক চমৎকার সব গল্প আছে এতে। যেমন— একটি কাঁঠালপাতা আর মাটির ঢেলার গল্প, মৌলিক, ক্যালাইডোস্কোপ, জোৎস্নালোকের সংবাদ, স্যুট-টাই অথবা নক্ষত্রের দোষ, হারুনের মঙ্গল হোক ইত্যাদি। আসলে বলতে গেলে প্রতিটি গল্পই অনন্য ও চমকপ্রদ। খুব সাধারণ প্লটে অসাধারণ সব গল্প।
২. পশ্চিমের মেঘে সোনার হরিণ: এই বইতেও চমৎকার সব গল্পের সমাবেশ। বিশেষ করে “আন্না কারেনিনার জনৈকা পাঠিকা”। আমি যেহেতু আন্না কারেনিনা পড়ছি, এবং আন্না কারেনিনা আমার অনেক পছন্দের একটি বই, সেহেতু এই গল্পটি আমি উপভোগ করবো এটাই স্বাভাবিক। যখন গল্পটি পড়ছি বার বার মন চাচ্ছিলো এখনই আন্না কারেনিনাকে বের করে আবার পড়ি। না হয় অন্তত একবার দেখি। তাছাড়া “ইব্রাহিম বক্সের সার্কাস” ও “আয়নার ওপিঠ লাল" অতি চমৎকার দুটি গল্প।
৩. বিসর্গতে দুঃখ: এটা একটা ভিন্ন ধর্মী গল্পের বই। অ থেকে শুরু করে ঃ পর্যন্ত প্রতিটি বর্ণ দিয়ে এক একটি গল্প লিখেছেন; ঠিক যেন বাংলা বর্ণমালার বই। প্রতিটি গল্প আবার কোনো না কোনো ভাবে তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গল্পের সাথে সম্পর্ক যুক্ত। আসলে সবগুলো গল্প মিলে একটি বড় গল্প। কি চমৎকার ভাবনা!
শাহাদুজ্জামানের প্রতিটি গল্পই আমাদের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও উপাদান নিয়ে রচিত। যেসব ঘটনা এতই সাধারণ যে আমরা আমাদের conscious mind-এ এগুলো নিয়ে ভাবি না, শাহাদুজ্জামান সেসব ঘটনাই তুলে ধরেছেন একজন দক্ষ শিল্পীর মতো করে, এবং নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে।
শুরু থেকেই শাহাদুজ্জামানের লেখায় শহীদুল জহিরের প্রভাব দারূণভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছিলো। ভাষায়, বিষয় বস্তু চয়নে, দৃষ্টি ভঙ্গিতে কিংবা সমাজতন্ত্র ও সমসাময়িক রাজনীতির আলোচনায়, সব ক্ষেত্রেই শহীদুল জহিরের একটি প্রচ্ছন্ন ছায়া দেখতে পাওয়া যায়৷ আর সে কারণেই হয়তো বইটি এতো ভালো লেগেছে। সম্পূর্ণ বইটি পড়া শেষ করে যখন রিভিউ লিখার জন্য বইটি হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টে উল্টে দেখছি, তখন উৎসর্গ অংশটি চোখে পড়লো। “জাদুকর লেখক শহীদুল জহিরকে”
উক্তি: অনেক অনেক সুন্দর সুন্দর উক্তি ছিলো উল্লেখ্য করার মতো। কিন্তু পড়ার সময় সেগুলো নোট করা হয়নি৷
“জীবন এক কাপ চায়ের মতো, একটু একটু করে চুমুক দিয়ে নিতে হবে এর স্বাদ।”
বাংলা সাহিত্যে অদ্ভুত এক ধারার গ���্প। সূক্ষ্ম কথাবার্তা দিয়ে পরিবার, সমাজ, দেশের বেশ কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রচলিত যেসব গল্প পড়েছি আজ অবধি তাদের সবকিছু থেকেই এক অন্য সুরে লেখক তার কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছেন। কিছু কিছু গল্পকে অবশ্য প্রথাগত সাহিত্যকর্মের ধাঁচে মনে হয়নি। সুখপাঠ্য এক বই!