বইয়ের প্রকাশকাল ১৯৮৬, তবে উপন্যাসটি লেখা হয়েছে ১৯৬৬-৬৭ সালে, ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল একটি শিশু-কিশোর পত্রিকায়। বইয়ের ভেতরে এই তথ্য দেখে রীতিমত হতবাক হয়ে গেলাম। কারণ সেই ষাটের দশকে এত চমৎকার একটা থ্রিলার উপন্যাস, তাও আবার এত চমৎকার ও আধুনিক ভাষায় লেখা হয়েছিল, ভাবাই যায় না। সৈয়দ শামসুল হক এমনিতেই আমার পছন্দের লেখক, এই বই পড়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল আরও। ছোটদের টার্গেট করে লেখা হলেও বড়রা সমানতালে মজা পাবেন... আমি অন্তত পেয়েছি। রোমাঞ্চকর ঘটনাক্রম, অনবদ্য প্রাকৃতিক বর্ণনা, সেই সঙ্গে টুইস্ট-পাল্টা টুইস্ট, সবই আছে এ-বইয়ে। এটা নিয়ে কখনও-কোথাও কোনও আলোচনা চোখে পড়েনি কেন, ভেবে পাচ্ছি না। নিঃসন্দেহে পাঁচ তারা।
সৈয়দ হক যদি ভারতবর্ষের মুসলিম সম্প্রদায়ের বীরত্ব, সাহস, স্বাধীনতাবোধের কাহিনী নিয়ে এই ধরণের আরো কিছু বই লিখতেন, তাহলে শরদিন্দু/ সুনীলের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক ঐতিহাসিক কিশোর উপন্যাসগুলোর বাইরেও শিশু কিশোরদের পড়ার মত চমৎকার কিছু বিকল্প থাকত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কাল। এক বাঙালী প্রফেসর পিএইচডি সেরে দেশে ফিরে আসছিল। এই সময় দূর মধ্য এশিয়ার এক পশতুভাষী পাঠান তাকে প্রস্তাব দিল, কিল্লা জামানের শাহজাদার গৃহশিক্ষক হওয়ার। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় পা বাড়ানো গোবেচারা বাঙালি জানতেও পারল না কী বিপদ অপেক্ষা করছে তার জন্য!
পাহাড়ি এলাকার মনোমুগ্ধকর বিবরণ, পাঠানদের জীবনযাত্রা, আর টানটান উত্তেজনায় ঠাসা। একটানে পড়ে গেছি।
বাংলাভাষায় লেখা শিশুকিশোরদের পাঠের উপযোগী ক্লাসিক ঘরানার থ্রিলার হিসেবে লেখা হলেও বইটি পড়ে বড়রাও সমানতালে আনন্দ পাবে। সেই ষাটের দশকে, যখন কিশোর উপযোগী থ্রিলার বলতে পাঠক মূলত তিনগোয়েন্দাকেই চিনতো, সেইসময় এরকম মৌলিক থ্রিলার লেখার এলেম বোধকরি সবার হয় না। সৈয়দ শামসুল হক সেই এলেম দেখিয়েছেন৷ এমনি এমনি তো আর তাকে সব্যসাচী লেখক বলা হয় না! এডভেঞ্চার, একশন, প্লট টুইস্ট- সবমিলিয়ে দারুণ সুখপাঠ্য একখানা বই। এক বসাতেই পড়ে ফেলা যায় বইটা।