কোনোদিন তিনি অস্বীকার করেননি, বারাঙ্গনার ঘরে তাঁর জন্ম। কিন্তু মর্যাদাহীন জীবনকে সম্মানের শিখরে নেবার সাধনা তিনি করেছিলেন তাঁর সারস্বত সম্পদের নৈবেদ্য সাজিয়ে। লিখেছিলেন দুটি বই 'আমার কথা', 'আমার অভিনেত্রী জীবন'। যদিও দ্বিতীয়টি তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। 'আমার কথা-য়' তিনি বিবৃত করেছেন তত্কালীন বাঙালী সমাজের কথা বাংলা থিয়েটারের কথা। তাঁর এই আত্মজীবনীমূলক লেখা এক ঐতিহাসিক দলিল- যার ভাষাও ছিল অত্যন্ত সহজ, সাবলীল কিন্তু ভাষাশৈলী ও মাধুর্যে পরিপূর্ণ। তিনি একাধারে কবিও ছিলেন। তাঁর রচিত দুটি কবিতার বই--'বাসনা' ও 'কনক নলিনী'
Binodini Dasi (1862–1941), also known as Notee Binodini, was a Calcutta-based, Bengali-speaking renowned actress and thespian. She started acting at the age of 12 and ended by the time she was 23, as she later recounted in her noted autobiography, Amar Katha (The Story of My Life) published in 1913.
আত্মজীবনী পড়তে আমার খুব একটা ভালো লাগে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো ’ পড়ে প্রথমবারের মতন বিনোদিনী দাসীর সঙ্গে পরিচয়। তখন থেকেই এই প্রতিভাধর চরিত্রটিকে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছিলো। বইটি সম্পর্কে জানতে পারলাম অনেক দিন পর।যে মেয়ে একদিন লিখেছিল, ‘‘মনের কথা জানাইবার লোক জগতে নাই,’’ আজ দেখা যাচ্ছে তার কথা শুনে শুনে লোকের আর মন ভরছে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন এক নারীর এতো সহজ সুন্দর প্রাণবন্ত লেখনী পড়ে সত্যিই অবাক হতে হয়।
এক আশ্চর্য প্রতিভার নাম নটী বিনোদিনী। নিজেকে বলতেন পতিতা, বলতেন পাপীয়সী, বারাঙ্গনা। যে যুগে নারীদের আলাদা কোনো অস্তিত্ব স্বীকার করতনা পরিবার সমাজ এমনকি দেশের শাসককুলও, সে সময়ে দাঁড়িয়ে নিজের অভিনয় প্রতিভার জোরে বিনোদিনী নিজেকে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শুধু অভিনয় জগতে নয় সংস্কৃতমনস্ক অভিজাত লোকেদের সভাতেও যেখানে আলোচিত হত বাংলা, ইংরেজী সাহিত্য। সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেসব আলোচনায় যোগ দিতেন এই অসামান্যা প্রতিভাময়ী সুন্দরী নারী, যদিও তাঁর প্রথাগত শিক্ষা ছিল সামান্যই । অতি স্বল্প শিক্ষিতা হয়েও এই অবিসংবাদিত নায়িকা লিখেছেন আত্মজীবনীসহ কবিতার বই।
১৮৭৪-এর ১২ ডিসেম্বর মাত্র এগারো বছর বয়সে ‘শত্রুসংহার’ নাটকে দ্রৌপদীর সখীর ভূমিকায় তার প্রথম অভিনয়। জন্ম হল বাংলা থিয়েটারের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিনোদিনীদাসীর। গিরিশ ঘোষের দলে আসার পর তাঁর অভিনয় প্রতিভা স্বীকৃতি পায় বাংলার সর্বত্র ও নাটক ও সংস্কৃতিবান রুচিশীল মহলে। হয়ে উঠলেন তিনি নাট্যসম্রাজ্ঞী। সীতা প্রমীলা, কৈকেয়ী, কপালকুণ্ডলা, মতিবিবি এবং এরকম আরো অনেক নারীপ্রধান চরিত্রগুলি তাঁর অভিনয় গুণে হয়ে ওঠে বাস্তব। 'মৃণালিনী' নাটকে 'মনোরমা' চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখে স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, "আমি মনোরমার চিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম, কখনো যে প্রত্যক্ষ দেখিব এমন আশা করি নাই। আজ বিনোদের অভিনয় দেখিয়া সে ভ্রম ঘুচিল ।"এই বক্তব্য প্রমাণ করে লেখকের কল্পনার নারীকে কিভাবে তিনি বাস্তবায়িত করেছেন। অতীব প্রখর মননশক্তি না থাকলে এরকম অভিনয় করা যায়না। মাত্র চোদ্দ বছর! কি অসাধারণ প্রতিভাময়ী ছিলেন এই নারী-- ভাবলেও বিস্মিত হতে হয়। ১৮৮৪-র ২রা আগস্ট প্রথম অভিনীত হয় চৈতন্যলীলা। সর্বাপেক্ষা আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই নাটক। চৈতন্যের ভূমিকায় বিনোদের অভিনয় দেখে ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেছিলেন "আসল নকল এক দেখলাম "। নিমাই চরিত্রের ভাবতন্ময়তা বিনোদকে আচ্ছন্ন করে রাখত। এর ভিতর দিয়েই পাঁক থেকে পদ্ম হয়ে উঠলেন নটী বারাঙ্গনা বিনোদিনী। শ্রী রামকৃষ্ণের স্পর্শে গ্লানিহীন, কলুষমুক্ত হলেন বারাঙ্গনা, সঙ্গে বাংলার রঙ্গালয়ও অশুচিমুক্ত হল।
বিনোদিনীকে রক্ষিতা হিসেবে পাওয়ার সর্তে পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগালেন গুর্মুখ রায় মুসাদি নামে এক মাড়োয়ারী যুবক। ১৮৮৩ সালে ৬৮ বিডন স্ট্রিটে নির্মিত হল থিয়েটার ভবন।কথা ছিল, বিনোদিনীর নাম অনুসারে তার নাম হবে ‘বি থিয়েটার’। সমস্ত উদ্যোগ স্বয়ং বিনোদের। কিন্তু দৈবের খেলা যাকে বলে তাই হল। থিয়েটারের নাম 'বি-থিয়েটার' হলনা হল 'ষ্টার থিয়েটার'। বারাঙ্গনার দেহ ব্যবহার করা যায় নিজের জৈব চাহিদা মেটাতে কিন্তু তার অধীনে কাজ --নৈব নৈব চ! হোকনা তিনি অসামান্যা-- শুধু রূপে অভিনয়ে নয় , বিচার বুদ্ধিতেও।
বিনোদিনীই ভারতীয় বা দেশজ সাজসজ্জার সঙ্গে ইউরোপীয় সাজ (make up) সজ্জার সংমিশ্রণ করেন, যদিও তাঁর সামনে কোন রোল-মডেল ছিলনা। Moon of The Star, Flower of the Native Stage এইসব বিশেষণে তিনি ভূষিতা হয়েছিলেন। মাত্র চোদ্দ বছর বাংলা রঙ্গালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মাত্র ২৩ বছর বয়সে অভিনয় জীবনের মধ্যগগনে পৌঁছে তাঁকে ছাড়তে হল তাঁর ভালবাসার পেশা ও জীবন। থিয়েটারের রাজনীতি ও দলাদলিতে বিরক্ত হয়ে বিনোদিনী অভিনয়-জীবন শেষ করেন ১৮৮৭-র ১ জানুয়ারি। অসামান্যা প্রতিভাময়ী হয়েও আজন্ম বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার হয়ে জীবন কাটান তিনি। শোকের আঘাতে জীবনের সব খেদ, আক্ষেপ যেন দলা পাকিয়ে উঠে এল কলমে – ‘‘ইহা কেবল অভাগিনীর হৃদয়-জ্বালার ছায়া! এ পৃথিবীতে আমার কিছুই নাই, শুধুই অনন্ত নিরাশা, শুধুই দুঃখময় প্রাণের কাতরতা।’’৭৯ বছর বয়সে মৃত্যু তাঁকে শান্তি দিল। ১৯৪১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুর পর এক লাইনও লেখেনি কোনও কাগজ। তাঁর জন্মের দেড়শ বছর বাদে ষ্টার থিয়েটারের নাম হয়েছে, 'বিনোদিনী থিয়েটার' --তবুও ভাল।
কিন্তু যাঁর এটার প্রয়োজন ছিল-- সে তো জীবিত অবস্থায় সে সম্মান পেলনা।
Had to read for school. But it was highly enriching and such a page turner despite its slight repetitiveness. Learned so much about the theatre history in Bengal aside from the bittersweet life of the famous Nati Binodini
আমার বেশ একটু অপ্রথাগত বইপত্র ঘাটার ঝোঁক আছে। বছর কয় আগে "আমার কথা" নামে বিনোদিনী দাসীর এক আত্মজীবনীর হদিস পাই। অবশ্য বইটা স্টক আউট মেলা দিন ধরেই। যারা সুনীলের প্রথম আলো মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন বিনোদিনীকে তাদের না চেনার কারণ নাই। বাংলা থিয়েটারের প্রথম সারির অভিনেত্রী। বাতিঘরে বই উলটাতে গিয়ে হঠাৎ দেখি অবিদ্যার অন্তঃপুরে বইটিতে সংকলিত চারটে লেখার একটি বিনোদিনীর আত্মজীবনী।
উনবিংশ শতকে পাশ্চাত্য প্রভাবপুষ্ট বেঙ্গল রেনেসাঁ বাঙালি মনোজগতে একই সাথে সু ও কু প্রভাব বয়ে আনে। বাঙালির সুকুমারবৃত্তি যেমন প্রভাসিত হয় থিয়েটারে, তেমনি বারঙ্গনা রাখা হয়ে ওঠে সেসময়ে সামাজিক স্ট্যাটাসের প্রতীক। এই বারঙ্গনারাই ছিলেন বাংলা থিয়েটারের প্রথম দিককার নায়িকা।
গিরিশচন্দ্র ঘোষই খুব সম্ভবত এখনো পর্যন্ত বাংলা থিয়েটারের সবচেয়ে বড় নাম। বিনোদিনী অবশ্য গিরিশচন্দ্রের আবিষ্কার নন। তবে গিরিশচন্দ্রের হাত ধরেই তার শীর্ষে ওঠা। প্রতাপচন্দ্র জহুরির বেঙ্গল থিয়েটারে তাদের কেমিস্ট্রির শুরু হয়ে স্টার থিয়েটারে তার পূর্ণবিকাশ। বিশেষত স্টার থিয়েটারের দক্ষযজ্ঞ আর চৈতন্যলীলাতে গিরিশ-বিনোদিনী যুগলবন্দী সেসময়কার পত্রিকা ও সাধারণ দর্শকদের অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছিল। সাহিত্যিক দিক দিয়ে বিনোদিনী দাসীর "আমার কথা" খুব উচ্চমার্গীয় কিছু না। বইটিও ১৮৯৩ সালের সেসময়কার ভাষা এখন বেশ অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। আত্মজীবনীটি আকারে বেশ ছোট। বিনোদিনী দাসীর শৈশব বা মঞ্চে সুঅভিনেত্রী হয়ে ওঠার আগেকার কথা খুব একটা নেই। যারা ছিলেন তাঁর শয্যাসঙ্গী তারা সমাজের নামজাদা মুখ হওয়ায় সেসব কথাও খুব ঢেকেঢুকে লেখা। কিছু মঞ্চের টুকিটাকি অভিজ্ঞতা আর বারংবার জীবনের কাছে হেরে যাওয়া আলেখ্য "আমার কথা"। এর সিংহভাগ অংশই আসলে প্রথম আলোতে ব্যবহার করে ফেলেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পুরো লেখাটা যেন বিষাদ আর না পাওয়ার ভারে ভারাক্রান্ত। দগ্ধ হয়ে শেষ হয়ে যাওয়া সিগেরেটের মতোই।
কিন্তু তাও কেন এই বই পড়া? কারণ কিছু জিনিস চিরকালের চিরনতুন। এই যেমন "নারীর নিস্তার নাই টলিলে চরণ" কথাটা এসময়েও মিথ্যা হয়ে যায় নি। মঞ্চের সামনে দর্শকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা আর মঞ্চের আলো নিভলেই নিকষ কালো অন্ধকারের আবর্তে হারিয়ে গত শতাব্দীর এক নারী জন্মের বিষাদমাখা হ��হাকার কিভাবে এড়িয়ে যাই বলুন?
Although the genre of "Autobiography" always irked me, and make me question the integrity of a somewhat unreliable author, this tale however had a very lively narrative and the context really makes you intrigued.