হরর-প্রেমী। লুৎফুল কায়সারের যাবতীয় কাজ নিয়ে তুমুল আগ্রহ। ওদিকে তর্জমা সাহিত্যে খুব একটা অভিরুচি নেই। তাহলে উপায়? 'বইবন্ধু' নবীন প্রকাশনী। তাদের উদ্যোগে এই সংকলনটি আমাকে বাঁচিয়েছে। বইতে গল্প সংখ্যা ২৩টি। সঙ্গে একটি সুপাঠ্য প্রবন্ধ। গল্পগুলো বেশিরভাগই কসমিক হরর-ধর্মী; মহাজাগতিক, লাভক্রাফ্টিয়ান ঘরানার। এপার বাংলার ম্যাগাজিনে নানান সময়ে প্রকাশিত।
নির্মেদ শব্দটি রিভিউ বাজারে অতি-ব্যবহারে জীর্ণ। তবুও এই গল্পগুলোর ক্ষেত্রে দিব্যি প্রযোজ্য। প্রায় প্রতিটি লেখাই সংলাপ ভিত্তিক, গতিশীল, অবান্তর বর্ণনার ধারেকাছে যাননি লেখক। স্বল্প কথায় কয়েকটি গল্প বলেই সন্তুষ্ট থেকেছেন। লেখার ভালো-মন্দের বিচার রেখেছেন পরের জন্য। ব্যাপারটা প্রশংসনীয়।
আমি অবশ্য বইটা পড়েছি আজ অনেকদিন হলো। পরীক্ষা ও শারীরিক অসুস্থতা হেতু প্রতিটি গল্প নিয়ে বিষদে আলোচনার অবকাশ হলো না। তবুও কিছু না লেখাটা অন্যায়। কারণ এহেন লেখাগুলো আর কিছু না হলেও ভীষণ রিফ্রেশিং। হরর-সাহিত্যে এক দমকা ঠান্ডা বাতাস স্বরূপ। আধুনিক পাঠকের কাছে এর আবেদন পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। তন্ত্রের যাবতীয় জটিলতা বা শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা হিমেল স্রোতের বাইরেও যে ভয়ের এক সুবিশাল জগৎ রয়েছে, এই গল্পগুলি সেই ভিন্নতার প্রতীক।
অবশ্য, মাঠে নেমেই সেঞ্চুরি, এমনটা নয়। লেখক বিষয়ভিত্তিক সামঞ্জস্যের ফাঁপরে পড়েছেন বেশ কয়েকবার। একসিষ্টেন্সিয়াল জাতের গল্প বলতে গিয়ে কোথাও এসেছে ভাবনার পুনরাবৃত্তি। কোথাও গিয়ে কিছু গল্পের ফিনিশিং-এ রয়ে গেছে দুর্বলতার প্রলেপ। সব গল্পে খোলা মনে পাঁচ তারা দেওয়া গেলো না সেই কারণেই।
তবে, এসব মাঝেও বেশ কিছু অন্যধারার গল্প লিখেছেন লেখক। ইন্টারনেট-জাত ক্রিপিপাস্তাস্ এবং দেশী-বিদেশি আর্বান লেজেন্ডসের মিশেলে, বেশকিছু গা-ছমছমে, ডিস্টার্বিং গল্প। যা আদতেই দারুন। ভবিষ্যতে কোনোদিন বইটার কাছে আবার ফিরে আসলে, আসবো এদের টানেই। এছাড়াও বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে, 'বইবন্ধু'-র প্রোডাকশন কোয়ালিটি। সুঠাম হার্ড-কভার বাইন্ডিং, ভালো পৃষ্ঠা ও ছাপার মান। পেপারব্যাক হররের যুগে এমন প্রচেষ্টা আরো হোক।
অনুবাদক হিসেবে লুৎফুল কায়সারের নাম ইতিমধ্যেই এপার-ওপার বাংলায় প্রায় সর্বজনবিদিত। কিন্তু মৌলিক কাহিনির রচয়িতা হিসেবে তিনি কতটা দক্ষ? সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে আলোচ্য সংকলনের তেইশটি গল্প এবং একটি প্রবন্ধ। সেগুলো হল~ (ক) গল্প ১. সমাধি; ২. ইসাদোরা; ৩. ওগো সুবর্ণা, জান কি তুমি, জান কি? ৪. ট্রু ইটার; ৫. অসংজ্ঞায়িত; ৬. অ্যাপোক্যালিপ্স; ৭. আঁধার আর ঈশ্বর; ৮. আকাশ; ৯. ওয়ান্ডারল্যান্ড; ১০. ছায়া-কায়া; ১১. নাত্তু; ১২. পহেলা বৈশাখ; ১৩. পালনকর্তা; ১৪. প্রভাব; ১৫. বাতিঘর; ১৬. বৃক্ষোভ; ১৭. ভ্রান্তি; ১৮. মায়া; ১৯. মোহ; ২০. রক্ষক; ২১. লেখকের মৃত্যু; ২২. শিস; ২৩. দরজা খুলবে না। (খ) প্রবন্ধ ২৪. সাইরেন হেড: ইন্টারনেট থেকে বাস্তবে। গল্পগুলোর মধ্যে প্রায় অর্ধেক লাভক্র্যাফটিয়ান বা কসমিক হরর-ধর্মী। কিছু গল্পে ভয়ের উৎস ভবিষ্যতের বিজ্ঞান বা তার প্রয়োগ নিয়ে ভাবনা। আর কিছু গল্প সনাতন অলৌকিক কাহিনির কাঠামোর মধ্যেও ভারি অদ্ভুত তথা নতুন রসের সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছে। আর কোথাও ঝলসে উঠেছে ডার্ক হিউমার। এই বইয়ের ভালো দিক কী-কী? প্রথমত, গল্পগুলো স্রেফ দুর্ধর্ষ। সত্যি বলতে কি, এই সময়ের অধিকাংশ নব্য লেখক যখন লিখতে বসলে বর্ণনার ফেনায় চরিত্র, গতি, মায় প্লট অবধি ডুবিয়ে দেন, তখন এত পরিমিত অথচ সার্থক লেখা পড়তে পাওয়াই ভাগ্যের কথা। দ্বিতীয়ত, ভয়াল রসের উদ্রেকের জন্য লেখক মাধ্যম হিসেবে একেবারে সমকালীন বাস্তবতা এবং নবীন প্রজন্মের চিন্তা-ভাবনা (মায় ইন্টারনেটের নানা ভয়াল জিনিসপত্রের প্রতি তাদের অনুরাগ)-কে ব্যবহার করেছেন। এর বিপরীতে যদি অধিকাংশ তথাকথিত ভয়ের গল্পের কথা ভাবেন— যারা ভয় জাগানোর জন্য প্রাচীন অভিশাপ আর প্রেতের প্রতিহিংসার মধ্যেই আটকে থাকে, তাহলে এদের আধুনিকতার ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। তৃতীয়ত, বইটির প্রোডাকশন ফাটাফাটি লেভেলের। ভয়ের গল্পের বই করার ক্ষেত্রে এতটা যত্ন সচরাচর দেখার সৌভাগ্য হয় না। এই বইয়ের খারাপ দিক কী-কী? এটি পড়ার পর কাপালিকের কাটামুন্ডু বা শ্মশানে শবের সঙ্গে আসবপান টাইপের জিনিসপত্র পড়ে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, জিনিসগুলো আর পাঠযোগ্যই ঠেকবে না। অর্থাৎ এক ঝটকায় এখনকার বাংলা হররের প্রায় ষাট শতাংশ অপাঠ্য হয়ে যাবে! কী ভয়ানক ব্যাপার, ভাবতে পারছেন? আগামী দিনে লেখকের আরও মৌলিক রচনা এবং অনূদিত ছোটোগল্প এভাবেই আমাদের কাছে আসুক— প্রকাশকের কাছে এই দাবি জানালাম। আর লেখকের উদ্দেশে রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, যাতে তাঁর কল্পনা ও লেখনী এমন করেই আমাদের শিহরিত করে চলে।