অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন মুদ্রণ, বানান এবং বর্ণ-সংস্থাপনে সজ্জিত এই হার্ডকভার বইটিতে আছে নিম্নলিখিত ক'টি লেখা~ (ক) শান্তিদাদু-বিষয়ক: ১) শান্তিদাদু; ২) শান্তিদাদুর খেলা; ৩) কুণ্ডলিনী; ৪) ঘূর্ণি; ৫) পরিষেবা; ৬) ভগ্নাংশ। (খ) স্বতন্ত্র, স্বয়ংসম্পূর্ণ অলৌকিক আখ্যান: ৭. মায়াবী; ৮. খোক্কস; ৯. সমাহর্তা; ১০. তপুষী; ১১. পরিষ্কন্দ; ১২. খরগোশ; ১৩. মহালয়া; ১৪. ধূপকাঠি; ১৫. পরিধান। এই লেখাগুলোর কোনো ভূমিকা নেই। পড়তে শুরু করলে যে কেউ ভাববে, এরা হয় প্রথাগত ভূত-প্রেতের গল্প, নয়তো বাজারচলতি তান্ত্রিক হররের নিদর্শন। কিন্তু একটার পর একটা গল্প যখন শেষ হয়, তখন একটু-একটু করে একটা বিরাট, কল্পনাতীত রকমের বড়ো ছবি চোখের সামনে ফুটে উঠতে শুরু করে। বোঝা যায়, ভারতের একান্ত নিজস্ব কিছু আত্মিক ও মহাজাগতিক ভাবনার সমন্বয়ে এক স্বতন্ত্র বিশ্ব নির্মাণ করেছেন লেখক। তা এতই বিশাল, আবার এতই ক্ষুদ্র, যে সেখানে একাকী মানবের বিস্মিত হয়ে পথ চলা ছাড়া অন্য কিছু করার উপায়ই নেই। এই জগত নির্মম, কারণ এর নিয়মকানুন সম্বন্ধে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। সেজন্যই, যখন আমাদের এই পার্থিব ধুলোখেলায় এদের ছায়াপাত ঘটে, আমাদের পক্ষে তা বড়োই কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। তবে... তবে শান্তিদাদু'র মতো কেউ সঙ্গে থাকলে সেইসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও বেঁচে থাকাটা, জ্ঞানে ও অজ্ঞানে, কিছুটা সহজ হয়। কেন জানেন? কারণ এইরকম ক'জন মানুষ সাধনার মাধ্যমে নিয়মগুলো জেনেছেন। এই ব্যাপারটা বোঝার পরেই পরিষ্কার হয়, কীভাবে এই বই তার আপাতভাবে বিচ্ছিন্ন গল্পগুলোকেও জুড়ে দিয়েছে শান্তিদাদুর পৃথিবীতে। তারই কোনোটাতে কথকের সঙ্গে ঘটছে কিছু, আবার কোথাও কথক নিজেই ঘটাচ্ছেন কিছু— শুধু তিনি তা জানতেই পারছেন না! সেই গল্পগুলোর মধ্যে কোথাও আছে লৌকিক ভয়, কোথাও আছে মনস্তত্ত্বের ক্রূর ছোবল। কিন্তু তারা নিষ্ঠুর এবং ক্ষমাহীন। অকপটে লিখি, এই গল্পগুলোকে আমাদের প্রথাগত ধারণার মধ্যে আত্মীকরণ মোটেই সহজ কাজ নয়। একদিকে এদের মধ্যে ভীষণভাবে রয়েছে ঔপনিষদিক চিন্তন— যা আমাদের নশ্বর দেহ ও অবিনশ্বর আত্মার নানা বিচিত্র পরিণতির সম্বন্ধে বলে। অন্যদিকে এদের দ্বারা নির্মিত বিশ্বকে বুঝতে গেলে প্রায় 'দেবযান' পাঠের অনুভূতি হয়— শুধু তার দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় তামসিক। ভালো-মন্দ ছাপিয়ে আমার অভিমত~ এইরকম অলৌকিক কাহিনির সংকলন বাংলায় আমি পড়িনি। এরা গভীরভাবে অস্বস্তিকর, সহজ হয়েও দুর্বোধ্য, আর আতঙ্কজনক— কারণ এইরকম কিছু কাল আমার, বা আপনার সঙ্গেও ঘটতে পারে। চমৎকার লেখনী আর এই অভিনব প্লটের জন্য আমি বইটিকে পূর্ণমান দেব। জানি না এই লেখা পাঠকপ্রিয় হবে কি না। তবে একটি অতিলৌকিক কাহিনির সংকলন থেকে যে-ধরনের অস্বস্তি ও চিন্তনের উপজীব্য আমি পেতে চাই, অন্তত আমার ক্ষেত্রে এই বই তা পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ করেছে। শান্তিদাদু'র প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রইলাম।
প্রথমেই আসি বইয়ের পরিচয়ে, যেহেতু এটি একটি সমগ্র, তো বোঝা যায় এটি অনেকগুলো গল্প নিয়ে তৈরি। সব মিলিয়ে মোট ১৫টি গল্প রয়েছে, যার মধ্যে শান্তিদাদু আছেন 6টিতে আর বাকি গুলো স্বতন্ত্র গল্প। এই গল্পগুলির একটা মজার ব্যাপার হলো এগুলোর কোনো ভূমিকা নেই, হঠাৎ শুরু হয়েই হঠাৎ শেষ, যেমন প্রথাগত অলৌকিক গল্প হয় সেরকমই। কিন্তু গল্পগুলো যখন এগোতে থাকে তখন বোঝা যায় এর ব্যাপ্তি কতটা বড়ো, ঠিক কতটা দূরদর্শী চিন্তা থাকলে পরপর গল্পগুলো জুড়ে দেওয়া যায় সেটা পড়লেই বোঝা যাবে। তবে কে এই শান্তিদাদু? তিনি কি তান্ত্রিক না ম্যাজিশিয়ান নাকি অন্য কেউ? আর তান্ত্রিক বলতে আমরা যা বুঝি সেটা কি আদেও পুরোপুরি সত্যি নাকি আমাদের বোঝার মধ্যেও ফাঁক থেকে গেছে, তার উত্তর দিয়েছেন লেখক। তবে একটা জিনিস বোঝা যায় শান্তিদাদুর মতো একজন গাইড থাকলে এইসব বিষয় আর দুর্বোধ্য লাগে না।
খুব সুন্দর ভাবে স্বতন্ত্র গল্পগুলোকে শান্তিদাদুর সাথে জুড়ে দিয়েছেন লেখক, সেই সাথে আছে বিজ্ঞানমনস্কতা আর বাস্তব জীবনের উদাহরণ। মাল্টিভার্স নিয়ে এরকম লেখা আগে হয়তো এভাবে দেখা যায়নি। খুব সোজা ভাবে গল্পগুলো বলা হলেও সেগুলোকে বুঝে নেওয়া অতটাও সহজ নয় কারণ এর সাথে মিশে রয়েছে দার্শনিক চিন্তা। বইটি পড়ে দেবযানের কথা মনে পড়ে যায়। অভিনব প্লট আর দারুন লেখনী ক্ষমতা বইয়ের কিছু কিছু অতিরঞ্জিত ঘটনাকে ছাপিয়ে গেছে।
শান্তি দাদুর গল্প শেষ হয়নি... পরের পার্টের অপেক্ষায় থাকলাম।