প্রফুল্ল রায় একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। তিনি অবিভক্ত ভারতের পূর্ব বাংলার (অধুনা বাংলাদেশ) ঢাকা জেলায়, বিক্রমপুরের আটপাড়া গ্রামে ১১ ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহন করেন, স্বাধীনতার পর ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে চলে আসেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস 'পূর্ব পার্বতী' (১৯৫৭)। উপন্যাস রচনার জন্য তিনি সারা জীবন অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। 'সিন্ধু পারের পাখি'র জন্য ১৯৫৮ তে পেয়েছেন পুরস্কার, 'ক্রান্তিকাল' এর জন্য ২০০৪ এ আকাদেমি পুরস্কার।
প্রফুল্ল রায় এর উদ্বাস্তু জীবনকেন্দ্রিক যে সমস্ত উপন্যাসগুলি রচিত সেগুলি হল ‘কেয়াপাতার নৌকা’ (২০০৩), ‘শতধারায় বয়ে যায়’ (২০০৮), ‘উত্তাল সময়ের ইতিকথা’ (২০১৪), ‘নোনা জল মিঠে মাটি’ (বাং ১৩৬৬)। ‘কেয়াপাতার নৌকা’, ‘শতধারায় বয়ে যায়’, ‘উত্তাল সময়ের ইতিকথা’ আকারে এবং নামে আলাদা হলেও আসলে তিনটি উপন্যাস মিলেই একটি উপন্যাস, ‘কেয়াপাতার নৌকো’র পরবর্তী খণ্ড ‘শতধারায় বয়ে যায়’ এবং তারও পরবর্তী খণ্ড ‘উত্তাল সময়ের ইতিকথা’। তিনটি উপন্যাসই আকারে মহাকাব্যিক। অসামান্য ক্ষমতা সম্পন্ন এইঔপন্যাসিক সারা জীবন জুড়ে পুরস্কারও পেয়েছেন প্রচুর। 'সিন্ধু পারের পাখি'র জন্য ১৯৮৫ তে 'বঙ্কিম পুরস্কার', 'ক্রান্তিকাল' উপন্যাসের জন্য ২০০৪ এ পেয়েছেন 'সাহিত্য আকাদেমি' পুরস্কার, এছাড়াও 'রামকুমার ভুয়ালকা', পাবলিশার্স এন্ড বুক সেলার্স গিল্ড এর 'লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট', 'শরৎস্মৃতি', 'বি কে জে এ' ইত্যাদি সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তার গল্প উপন্যাস অবলম্বনে রচিত হয়েছে ৪৫টির মতো টেলিফিল্ম, টেলি-ধারাবাহিক, ফিচার-ফিল্ম। 'মোহনার দিকে' অবলম্বনে 'মোহনার দিকে' (১৯৮৪), 'আদমি আউ আউরত' (১৯৮৪), 'একান্ত আপন'(১৯৮৭), 'চরাচর'(১৯৯৪), 'টার্গেট' (১৯৯৭),'মন্দ মেয়ের উপাখ্যান' (২০০৩), 'ক্রান্তিকাল'(২০০৫) ইত্যাদি উল্ল্যেখযোগ্য। 'মন্দ মেয়ের উপাখ্যান 'Best ASEAN film Award', 'Netpac Award', ও 'Golden Lotus Award'পায়। 'ক্রান্তিকাল' পায় 'Indian compitional Special Mention' পুরস্কার।
Prafulla Roy was a Bengali author, lived in West Bengal, India. He received Bankim Puraskar and Sahitya Akademi Award for his literary contribution in Bengali.
বইয়ের নাম আর প্রচ্ছদ দেখেই অনুমান করা যায় বইয়ের বিষয়বস্তু কি হতে পারে। ঠিক তাই, মন্দ মেয়ে বা বারবনিতাদের জীবন নিয়েই রচিত হয়েছে বইটা। লেখকের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবনিতাদের নিয়ে লেখা বারোটি গল্প এবং একটা নভেলা সংকলিত হয়েছে বইটাতে। ভূমিকাতে যেমনটা বলেছেন লেখক, সামাজিক ব্যবস্থার কারনে গৃহস্থ ঘরের মেয়েরা ‘মন্দ মেয়ে' হতে বাধ্য হলেও তারাও মানুষ, তাদের মনেও প্রেম আছে, মায়া আছে, স্বপ্ন আছে, নীতিবোধ আছে। আর এই বিষযগুলোই ফুটে উঠেছে প্রতিটা গল্পে।
‘রাজপুত’ গল্পটা এক বারবনিতা ও রাজপুত যুবকের ভালোবাসার গল্প বা রাজপুত যুবকটার নিজ দ্বায়িত্ব পালন করে ‘রাজপুত’ হয়ে ওঠার গল্প। ‘ জুহু বিচের সেই মেয়েটা' গল্পটা দেখিয়েছে কিভাবে দারিদ্র্য এক মাকে বাধ্য করে শরীরকে বাজারে তুলতে। ‘নরক’ গল্পটা একটু ভিন্ন; নীতিবোধ, দ্বায়িত্বশীলতা আর ভালোবাসার দ্বারা যে ওদের পাড়াও এক স্বর্গ হয়ে উঠতে সেটা বলেছেন লেখক। এভাবে পরের গল্পগুলোতে উঠে এসেছে এক পূর্ব প্রণয়ীর রূপান্তর, এক প্রতারিত মেয়ের আখ্যান, প্রেমিকার জন্য এক প্রেমিকের অর্ঘ্যদান, ‘মন্দ মেয়ে'র কর্তব্যবোধ, এক দালাল যুবকের আত্ম-উপলব্ধি বা ভালোবাসা, এক ভীরু যুবকের ভীরুতার পরিণাম, সমাজের বারবনিতা উৎপাদনের সাধারণ সূত্র, এক স্বাপ্নিক মেয়ের আকাশ ছোঁয়ার বাসনা, ‘মন্দ মেয়ে'দের কৃতজ্ঞতা এবং নভেলাতে উঠে এসেছে দুই আগাছার থিতু হওয়ার ইচ্ছার কথা।
যদি বইটার ভালো দিকটা বলি তাহলে বলব বইটা বারবনিতা সমাজের একটা মোটামুটি চিত্র যেন চোখের সামনে তুলে ধরেছে। কিভাবে সেই নরকে তাদের স্থান হয়, কিভাবে তাদের দিন কাটে, কিভাবে বেশিরভাগের পৃথিবী এক কামরায় সংকুচিত হয়ে পড়ে, কিভাবে কিছু কিছু মেয়ে শিকল ছেড়ে বেড়িয়ে আসার স্বপ্ন দেখে সেসব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। মোটকথা বইটার মাধ্যমে বারবনিতা সমাজের একটা অংশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব বলে মনে হয়েছে।
আর যদি বইটার সীমাবদ্ধতার কথা বলি তাহলে প্রথমেই আসবে একই প্লটে বারবার গল্প লেখা। দারিদ্র কিভাবে এই পথে ঠেলে দেয় সেই প্লটেই দুইযের বেশি গল্প আছে। আর প্রতিটা গল্পে লেখক যেন তাঁর গল্পের উপাদান মেয়েটাকে একইভাবে গড়ে তুলেছেন; পাঁকের মধ্যে থাকলেও সে পরিস্কার, পাড়ায় সেই সবচেয়ে কাম্য, পড়ালেখা জানে, সকল গুণের আধার ইত্যাদি। অর্থাৎ বইটা পুরো উপাখ্যান হয়ে ওঠে নি, সমাজটার বিশেষ একাংশই যেন এতে প্রতিফলিত। আরও বেশকিছু দিক যেন বাদ পড়ে গিয়েছে বইটাতে।
মোটের উপর, সুন্দর একটা বই। বইটা সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে, বারবনিতাদের মানুষ হিসেবে দেখতে, তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করতে বলে, তাদের প্রতি সহমর্মী করে তোলে।