On gender discrimination among children and imparting the notion of femininity to female child in contemporary Indian society observation by a woman activist
মল্লিকা সেনগুপ্ত-র জন্ম ২৭ মার্চ ১৯৬০, কলকাতায়। পেশায় সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক। ডক্টরেট, গবেষণার বিষয় ছিল বাংলা উপন্যাসে বিবাহবিচ্ছিন্না নারীদের উপস্থাপনার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। ১৯৮৫তে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। মহারাণী কাশীশ্বরী কলেজে। কবিতা লেখার শুরু ১৯৮২ সাল থেকে তখন এম এ ক্লাসের ছাত্রী। কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন তিনটি উপন্যাস ও তিনটি নারীচেতনার প্রবন্ধগ্রন্থ। পেয়েছেন সুকান্ত পুরস্কার, কেন্দ্রীয় সরকারের জুনিয়র রাইটারস ফেলোশিপ, অনীতা-সুনীল বসু পুরস্কার, আলপনা আচার্য স্মৃতি পুরস্কার ইত্যাদি। কবিতাপাঠ ও আলোচনায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছেন সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, ইউ এস এ, চেক রিপাবলিক ও ঢাকায়। উইকিপিডিয়া, ইনডিয়া পোয়েট্রি ইনটারন্যাশনাল, দি আনসেভারড টাঙ, ইনডিয়া টুগেদার ইত্যাদি নানা ওয়েবসাইটে তাঁর কবিতা ও জীবনতথ্য পাওয়া যায়। ১৯৮৯ থেকে আমৃত্যু ‘ভাষানগর’-এর সম্পাদক, কবি সুবোধ সরকারের সঙ্গে। প্রয়াণ ২৮ মে ২০১১।
আমার নিজের জীবনের সাথে পুরোপুরি রিলেট করতে পেরেছি এমন একটা বই হল মল্লিকা সেনগুপ্তের "স্ত্রীলিঙ্গ নির্মান"।
ফেমিনিজম অর্থাৎ নারীবাদ নিয়ে আমাদের তথাকথিত বাঙালী সমাজের মধ্যে যে বিদ্বেষ বা মেয়ে তো নষ্ট হয়ে গেল এরকম স্টেরিওটাইপ মনোভাব কাজ করে তা তো আর একদিনে হয় নি। যদিও মূলধারার নারীবাদের চর্চা এখানে হয় না। যা হয় তা হল শহরকেন্দ্রিক এলিটিজমের চর্চা।
মল্লিকা সেনগুপ্ত নারীবাদের দারুন এক সংজ্ঞা দিয়েছেন, "নারীবাদ মানেই ডিভোর্স নয়, নারীবাদ মানেই দশটা ছেলের সঙ্গে শোয়া নয়, নারীবাদ মানে লেসবিয়ানিজমও নয়, নারীবাদ মানে কখনই সন্তানের অবহেলা নয়, সমাজ ছারখার করা অনাসৃষ্টি নয়। নারীবাদ মানে প্রশ্ন তোলা, অবিরাম, অনিঃশেষ প্রশ্ন।"
এই প্রশ্ন তোলা নিজের অধিকার নিয়ে, এই প্রশ্ন তোলা নিজের সাথে হওয়া বৈষম্য নিয়ে, এই প্রশ্ন তোমার সাথে করে আসা সমাজ ও পরিবারের অন্যায় নিয়ে।
কিন্তু সমস্যা যদি প্রশ্ন করা নিয়ে হত তাও মানা যেত। সমস্যা হল আমাদের সমাজের নারীরা তাদের কি যে অধিকার, কি যে তাদের প্রাপ্য, কি তাদের ভূমিকা কিংবা তাদের অন্তর্নিহিত শক্তি কোনোটার সম্পর্কে নূন্যতম ধারনা রাখেন না। না, এর জন্য গবেষনালব্ধ কোনো ডেটার প্রয়োজন নেই একটু তাকান নিজের চারপাশ, নিজের পরিবার কিংবা কখনো কখনো নিজের দিকেই।
বইটাতে একটা মেয়ের জীবনের খুব সূক্ষ্ম জায়গাগুলোতে আলোকপাত করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে একটা পরিবার গঠনে নারী ও পুরুষের ভূমিকা ঠিক কতখানি হলে সেটা সুস্থ পরিবার। না, আমি বলছি না যে একটা সুস্থ পরিবার গঠন করা আপনাকে বই পড়ে শিখতে হবে কিন্তু আপনি নিজেও জানেন না অবচেতন মনে করা আপনার কাজের দ্বারাই কোনো না কোনো নারী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
এ বইয়ের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মাতৃত্ব। জুলিয়েট মিচেল বলেন, " 'কম শক্তি' নয়, অর্থনীতি থেকে মেয়েদের পিছিয়ে আসার প্রথম কারন অবিরত মাতৃত্ব এবং আনুষঙ্গিক কারনে পুরুষের তুলনায় কম হিংস্রতা।"
এর অর্থ বোঝেন নিশ্চয়ই? একজন নারী মাতৃত্বজনিত কারনে সমবয়সী পুরুষের তুলনায় ক্যারিয়ার থেকে পিছিয়ে পড়া, গৃহকাজ শুধুমাত্র নারীর এবং তার সাথে আছে নারীকে শুধুমাত্র যৌনতার প্রতীক হিসেবে দেখা এইসব বাধা ডিঙানোর ক্ষমতা আমাদের সমাজে খুব মেয়েই রাখেন। মাতৃত্বের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার একজন নারীর নিজস্ব, এই ব্যাপারে অন্যকারো হস্তক্ষেপ করা মানেই হল নারীর মাতৃত্বকে অসম্মান করা।
যে কাজগুলো একজন নারী করে তাতে পুরুষের কাজের চেয়ে কম শক্তি লাগে বলা যায় কি? তাহলে এই অর্থনৈতিক শ্রমবিভাজন কেনো তৈরি হচ্ছে? কেনো আপনার বোনকে, আপনার মাকে, আপনার স্ত্রীকে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে রাখছেন? তাতে কি আপনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায় পুরুষ? এ কাপুরুষতারই চিহ্ন। বা তাদের সাথে গৃহকাজে হাত লাগিয়েছেন কখনো? কেনো একজন পুরুষ এবং একজন নারীর কাজ শুধু লিঙ্গ দ্বারা নির্ধারিত হবে?
এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর আছে আপনার কাছে??
যদি না থাকে তবে আপনার নারীকে মানুষ হিসেবে সম্মান করার কোনো বাস্তবিক রুপও নেই।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হল আমরা এখনো সেই সমাজেই বাস করি যেখানে একজন পুরুষ পুরুষতান্ত্রিকতার বীজ নারীর মধ্যেও ঢুকিয়ে দেয়। একটা প্রচলিত কথা আছে - মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু। এ কথাটার খুব সুন্দর ব্যাখ্যা আছে বইটাতে। পরিবারের পুরুষ সদস্যের তুলনায় একটা মেয়েকে সবসময় ছোটো করে আসা একজন মা কখনো তার মেয়েকে ওই পরিমান সুযোগ দেন না যা সে তার ছেলে সন্তানকে দেয়। না আমি মিনা রাজুর গল্প বলছি না। আমি নিজেই এই বৈষম্যের শিকার। আমার চারপাশে আরো অনেক…. । " একটি উচ্চাকাঙ্খী মেয়ে, একটি স্বপ্ন দেখা মেয়ে পদে পদে পরিবারের মেয়েদের কাছ থেকেই বাঁধা পাচ্ছে তার লক্ষপূরনের পথে, ছেলেদের থেকে তো বটেই।"
এখানেই শেষ না। সাহিত্যে, শিল্পে এমনকি পাঠ্যপুস্তকেও নারীকে যে রুপে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে পুরুষ শাসিত সমাজ ও লিঙ্গবৈষম্যের ছাপ স্পষ্ট। বইটিতে এর দারুন কিছু উদাহরন আপনি পেয়ে যাবেন। এমনকি মল্লিকা সেনগুপ্ত নিজের বরের কবিতাকেও কটাক্ষ করতে ছাড়েন নি। তিনি নিজের প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেছেন যা প্রতিটি মেয়ে ফেস করে। এ থেকে উত্তরনের উপায়ও বলেছেন তিনি। না, কঠিন কিছু নয়। যে কাজটা একা নারীর বলে চাপিয়ে দিয়ে আসছেন এতকাল ধরে, পুরুষের পৃথিবীতে নারীর অনুপ্রবেশ নামক যে সংস্কার লালন করে আসছেন সেগুলো মুছে ফেলে একবার তার সহযোদ্ধা হয়ে উঠুন। আমাদের আপত্তি তো দায় নিতে নয়, আপত্তি একলা নিতে।
১৯৯৪ সালে লেখা এই বইয়ের কথাগুলো আজ ২০২১ এ এসেও এত প্রবলভাবে অনুভব করি কেন আমি? এ দায় কার?
ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, অ্যাড্রিয়েন রিচ, ভার্জিনিয়া উলফ, অ্যালিস ওয়াকার, বেগম রোকেয়া যে লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন সেই সংগ্রামকে নতুন রুপ দিই আসুন।
এই রাষ্ট্র, এই সমাজ, এই পরিবার আপনার সাথে বিট্রে করে আপনাকে অবদমিত রাখার যে কৌশল ব্যবহার করে তা বুঝতে শিখুক এই নতুন শতাব্দীর নারীরা।
আমার পূর্ববর্তীদের মত আমারও সংগ্রাম এই সমাজকে নতুন নারীর জন্য যোগ্য করে তোলা।
পুরুষের বাবা, ভাই অথবা প্রেমিক হয়ে উঠার চেয়েও একজন নারীর সহযোদ্ধা হয়ে উঠা বেশি জরুরী। নয়তো আপনাকে স্মরন করিয়ে দিতে বাধ্য হই "নগরে আগুন লাগলে দেবালয় কি এড়ায়?"