মিডিয়া নিয়ে, মিডিয়ার নানা কাজের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে বই। স্পেসিফিকভাবে বেশকিছু প্রবন্ধের সমষ্টি। একদম এক কথায়, ভালো লেগেছে।
মিডিয়ার শক্তি কতটা সেটা বোঝা বা অনুভব করা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে খুব কঠিন না। বাঁশের কেল্লা-নয়া দিগন্তের তৈরি করা গুজবে দেশজুড়ে তাণ্ডব, কিংবা গণতন্ত্রের বুলি সামনে রেখে মতি মিয়াদের সেনাসমর্থিত সরকারকে দাঁড় করিয়ে রাখা থেকে ব্যাপারগুলো সহজেই অনুমেয়। নিজে গিয়ে যেহেতু ঘটনা উদ্ঘাটনের উপায় নেই, তাই মিডিয়াই অচেতন তো বটেই, তথাকথিত সচেতন লোকের সচেতনতারও উৎস হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া- হরেক রকম মিডিয়ার ভিড়ে আমরাই হারিয়ে যাচ্ছি। এসব মিডিয়া আমাদের বন্ধু, তারা জনতার মুখপাত্র, তাদের না বলা কথা তুলে আনছে সবার সামনে, তারা এখন রাষ্ট্রের নতুন সংস্থা হয়ে উঠেছে। কিন্তু আসলেই কী তাই? এই কর্পোরেট যুগে তারা কেন মানুষের মুখপাত্র হয়ে উঠেছে? মানুষ তাদের যা দেয়, তাতেই কি তাদের হাজার হাজার কর্মী আর মালিকের পকেট ভরে? প্রিন্ট মিডিয়া না হয় পাঠকদের কাছ থেকে কিছু টাকা নেয়, কিন্তু টেলিভিশন, রেডিও কিংবা অনলাইন মিডিয়া? তারা চলে কীভাবে? কে তাদের বাঁচিয়ে রাখে? ঠিক ধরেছেন, বিজ্ঞাপন। আর এসব বিজ্ঞাপন দেয় নানা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান।
এইসব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার অস্ত্র হিসাবে কীভাবে আবির্ভূত হয়েছে মিডিয়া, আর নিজেকে উপস্থাপন করছে নব্য দেবতা হিসেবে, যার কাজ কেবল মানুষের ভালো করা, যার কোনো পাপ বা অন্যায় থাকতে পারে না, এমন একটা রূপে। কিন্তু আলোর আড়ালে যে অন্ধকার দিক থাকে, এটারও আছে, যা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না, বরং না বুঝতেই বিশেষ অজ্ঞ হওয়া লাগে, তার বেশ ভালো একাডেমিক ব্যাখ্যা পেলাম বইটাতে।
লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মিডিয়া নিয়েই কাজকারবার। তাই তার লেখায় কিছু একাডেমিক ব্যাখ্যা-রেফারেন্স উঠে এসেছে। খুব একটা খারাপ লাগেনি সেগুলো। যে ব্যাপারটা ভালো লেগেছে সেটা হলো প্রতিদিনের পড়া, দেখা খবরগুলোকেই নতুন করে ব্যাখ্যা করা, মতি মিয়াদের কাজের উদ্দেশ্য বের করার চেষ্টা।
যেহেতু মিডিয়ার মাঝেই আমাদের জীবনযাপন, তাই মিডিয়ার রূপ নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা দরকার, বোঝা দরকার কেউই দেবতা নন, সবাই দিনশেষে নিজের স্বার্থেই কাজ করে। সেই বোধটাকে খানিকটা একাডেমিক জায়গা থেকে দেখে নিতে বইটা পড়ে দেখতে পারেন সকলে।
বইটা পড়তে গিয়ে শুরুতেই মনে হল, প্রিন্ট মিডিয়া সহ ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলোর আয়ের প্রধান উৎস হল বিজ্ঞাপন। বেসরকারি ভাবে এই যে এতগুলো মিডিয়া রয়েছে তাদের তো আয়ের একটা উৎস থাকতে হবে, এতে সমস্যাটা কোথায় ? কিছুদূর পড়েই আমি একে একে আমার উত্তর পেয়ে গেলাম।
সবথেকে সহজবোধ্য উদাহরণ বোধহয় বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্যে টিভি অনুষ্ঠানগুলোর প্রতি আমাদের বিমুখতার অভিযোগ। কিভাবে আমাদের মিডিয়াগুলো তাদের তথ্য সরবরাহ এবং বিনোদন এর সার্ভিস টাকে পণ্যকৃত করে ফেলেছে তার চমৎকার যুক্তি আর উদাহরণ সহ বেশ চোখে আঙ্গুল দিয়েই দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশের এইসব অত্যধিক টিভি চ্যানেল, রেডিও স্টেশন, পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল গুলোর " ছোটবেলার সংবাদপত্র রচনায় লিখে আসা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা" ছেড়ে "ক্যাপিটালিস্ট জার্নালিজম" এর প্রবেশ এবং তার হাল চিত্র চমৎকার ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা অনলাইন নিউজ পোর্টাল গুলোতে যখন আসল সংবাদের পরিবর্তে যৌনতা মূলক সংবাদেরই ছড়াছড়ি। বিটিভি'র সেই একটা চ্যানেলের যুগ পেরিয়ে এসে এখনকার এই একাধিক চ্যানেলের যুগে আমাদের ঘরে মায়েরা ভারতীয় চ্যানেল মুখী আর ইয়ং জেনারেশন হচ্ছে বিদেশী মুভি , সিরিজ বা এনিমে মুখী ! বিজ্ঞাপনের ফাঁকে অনুষ্ঠান দেখানোর রেওয়াজ চালু হয়েছে এবং প্রতিটা অনুষ্ঠান, খবরের নামের সাথে এখন এক বা একাধিক পণ্য বা প্রতিষ্ঠান আশ্রয়ী নাম চালু হয়েছে এখন।
এমনকি "সবার জন্যে তথ্যের অধিকার" এর ঝান্ডাবাহী পশ্চিমা মিডিয়াগুলার প্রোপাগান্ডামূলক সংবাদ পরিবেশনের স্টাইল , মিডিয়া বায়াস এসব কিছুর বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে এ বইটিতে ।
সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হওয়ায় বইয়ের আধেয়ের সাথে খানিকটা পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। বইটা আজ থেকে প্রায় এক দশক (২০১১) আগে লিখা হলেও এর সারকথা আজকেও খুব প্রাসঙ্গিক, ভবিষ্যতেও যে তা হারাবে তা বোধহয় না। মিডিয়ার পুঁজিবাদী বেসাতির নিয়ত প্রক্রিয়া নিরন্তর চলবেই। লেখক আমাদের গণমাধ্যম প্রসঙ্গে '৫০ বছরের পূর্বাভাস' প্রসঙ্গে যেসব সম্ভাবনার কথা বলেছেন তা সত্য বলেই প্রতীত হচ্ছে। মিডিয়ার রেপ্রেজেন্টেশন-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রোঁলা বার্থ-এর রেপ্রেজেন্টেশন তত্ত্ব সম্পর্কে আরেকটু পরিষ্কার করা হলে পাঠকের জন্য ভালো হতো। এই বইয়ের প্রতিটি প্রবন্ধই গণমাধ্যমের সজ্ঞান বা অজ্ঞান নির্লজ্জ কর্মকাণ্ডের হালহকিকত নিয়ে একজন গণমাধ্যমবোদ্ধার নিজস্ব কাঁটাছেড়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ফাহমিদুল হকের গণমাধ্যম বিষয়ক বেশকিছু প্রবন্ধ নিয়ে এই সংকলন। যেখানে প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হালচাল বোঝার চেষ্টা করেছেন প্রাবন্ধিক ফাহমিদুল হক।
গণমাধ্যম আমাদের তথ্যদাতার 'মহান' দায়িত্ব পালন করে। দেশের দশজন লোকে এমন কথা অস্বীকার করবে না। কিন্তু শুধু তথ্য দিয়ে গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টদের পেট তো ভরার কথা নয়। মূলত পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাকে পণ্য হিসেবে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রির মাধ্যমে গণমাধ্যম নিজের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করে। এখানে নিরপেক্ষভাবে তথ্য প্রদানের কোনো সরল দায় গণমাধ্যমের কোনো শাখার নেই। বিজ্ঞাপনদাতাদের চাহিদা মাফিক ভোক্তাশ্রেণি তৈরি করা হলো গণমাধ্যমের টিকে থাকার পূর্বশর্ত। তাই দেখা যায় যে পত্রিকা, চ্যানেল কিংবা ম্যাগাজিনের অডিয়েন্স বেশি, সে-ই পত্রিকা, চ্যানেল কিংবা ম্যাগাজিনে বেশি বিজ্ঞাপন। জনতার বিশ্বাসযোগ্যতাই হলো গণমাধ্যমের একমাত্র পুঁজি।
কবি ও সাংবাদিক আবু হাসান শাহরিয়ার লিখেছিলেন, ' আগে লোকে কুকুর পুষতো। এখন সাংবাদিক পোষে। ' কথাটা শুনতে স্বস্তি হয় না। কিন্তু এই সত্য হলো নির্মম সত্য। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদপত্র হলো প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার। দুটোর মালিক ট্রান্সকম গ্রুপ। কোকাকোলা ও কেএফসির মতো ভোগবাদী প্রতিষ্ঠানের মালিক ট্রান্সকম গ্রুপের ভোগবাদী ব্যাবসায় নিয়ে পত্রিকা দুইটি কখনো সোচ্চার হতে পারবে? তাহলে কেমন করে মুক্ত ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমের নজির হিসেবে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়াবে? ট্রান্সকম গ্রুপ একটি উদাহরণমাত্র। খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনার পছন্দসই ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যেকটি গণমাধ্যমের মালিক বড়ো বড়ো ব্যাবসায়ীক গোষ্ঠী। ব্যাবসায়ী মুন���ফা বাড়াতে প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন, মুফতে জনগণের সেবা করা ব্যাবসায়ীর ধর্ম নয়।
গণমাধ্যমের বেহাল শুধু বাংলাদেশ নয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতি-ই এমন আশঙ্কাজনক। বড়ো মাছ যেমন ছোটো মাছগুলোকে গিলে খায়, তেমনি বড়ো বড়ো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ছোটো গণমাধ্যমদের মালিকানা দখল করে, বাধ্য করে বড়োদের 'ছায়াতলে' আশ্রয় নিতে। এই মিডিয়া কনগ্লোমারেটের যুগে পুরো দুনিয়ার গণমাধ্যমব্যবস্থা শাসন করে বেশি হলে দশ থেকে পনেরটি প্রতিষ্ঠান। যেমন- I&T, Disney, Viacom, Fox, WPP, Time Warner ইত্যাদি। এই মিডিয়া দানবদের হাতে প্রতিনিয়ত শৃঙ্খলিত হচ্ছে ছোট্ট অথচ তুলনামূলক মুক্তি চিন্তার 'হলেও হতে পারতো' দিশারি গণমাধ্যমগুলো।
যুদ্ধের প্রথম শহিদ হলো সত্য। বিবিসি ও সিএনএনের মতো পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো আসলে নিজ নিজ দেশের স্বার্থরক্ষা করে। যুদ্ধকালীন সাংবাদিকতা যার গালভরা নাম এমবেডেড জার্নালিজম। রণাঙ্গনের সাংবাদিকতা হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রোপাগাণ্ডা সাংবাদিকতা। ইঙ্গ-মার্কিন জোটের ইরাক আগ্রাসনে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষণী লেখাটি অনেকের ভাবনার দেওয়ালে চিড় ধরাবে।
গণমাধ্যমকে সাদা চোখে না দেখে বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ দেবেন ফাহমিদুল হক। বুঝতে শেখাবেন গণমাধ্যম মূলত মালিকপক্ষের পয়সা বানানোর মাধ্যম এবং পুঁজিবাদের অন্যতম আধুনিক হাতিয়ার।