বিশ্বসাহিত্যে রবার্ট ই হাওয়ার্ডের অবদান অনস্বীকার্য। কল্পনাপ্রবণ পাঠককে পাল্প ঘরানার গল্পে তিনি যেভাবে বুঁদ করে রেখেছিলেন, সেরকম উদাহরণ সত্যিই বিরল। হাওয়ার্ডের সৃষ্টি একটি অনবদ্য চরিত্র ‘কোনান’ অনেক আগেই বাংলার পাঠকমহলে অনুবাদরূপে প্রকাশ হয়েছে। এইবার সময় হল তাঁর আরেকটি অনবদ্য সৃষ্টির সঙ্গে বাংলার আপামর রোমাঞ্চপ্রেমী পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার। সেই চরিত্রের নাম হল—সলোমন কেইন। কে এই সলোমন কেইন? তিনি একজন দুঃসাহসী, আদর্শবাদী, লড়াকু যোদ্ধা। তিনি দুর্দান্ত অশ্বারোহী, তরবারিচালনায় সুদক্ষ এবং অন্যায় দেখলেই তিনি তার প্রতিবাদে যে-কোনো বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধাবোধ করেন না। সরু ফলার একখানি ফ্রেঞ্চ তরবারি, গুপ্ত ছোরা আর রাজা সলোমনের একখানি লাঠি—তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। মাঝে মাঝেই তাঁকে ফ্লিন্টলক পিস্তল ছুড়তেও দেখা যায়। দীর্ঘদেহী, শান্ত মানুষটির চোখ দুটি যেমন উজ্জ্বল, ঠিক তেমনি তাঁর দার্শনিক চিন্তাধারাও স্বকীয়তায় দ্যুতিময়। ইউরোপ থেকে আফ্রিকার জঙ্গল—সলোমনের রোমাঞ্চকর অভিযানের পথরেখা সুদীর্ঘ। এমন আকর্ষণীয় চরিত্রকে ঘিরে যে বিচিত্র সব গল্প-কাহিনি গজিয়ে উঠবে—সে ব্যাপারে আর সন্দেহ কী? তাঁর প্রতিটি অভিযানের আখ্যান রোমাঞ্চপিপাসু পাঠকের হৃদয়কে জিতে নেবে, সেই আশাতেই কল্পবিশ্বর তরফ থেকে সলোমন কেইনের সব ক-টি স্বরচিত ‘আসল’ গল্প ও কবিতা একত্রিত করে প্রকাশিত হল এই গ্রন্থটি। শুভমস্তু!
Robert Ervin Howard was an American pulp writer of fantasy, horror, historical adventure, boxing, western, and detective fiction. Howard wrote "over three-hundred stories and seven-hundred poems of raw power and unbridled emotion" and is especially noted for his memorable depictions of "a sombre universe of swashbuckling adventure and darkling horror."
He is well known for having created—in the pages of the legendary Depression-era pulp magazine Weird Tales—the character Conan the Cimmerian, a.k.a. Conan the Barbarian, a literary icon whose pop-culture imprint can only be compared to such icons as Tarzan of the Apes, Count Dracula, Sherlock Holmes, and James Bond.
—Wikipedia
Librarian Note: There is more than one author in the Goodreads database with this name.
জঁর ফিকশন বা জনপ্রিয় সাহিত্য নিয়ে 'পণ্ডিত' মানুষজনের এমনিতেই একটা অবজ্ঞার ভাব থাকে। তার উপর হাওয়ার্ডের মতো যাঁরা পাল্প বা সস্তায় ছাপা পত্রিকায় লিখতেন, তাঁরা তো আরওই হেলাফেলার লোক (প্রকাশনা সস্তার বলে লেখাগুলোও ফালতু, কোনো অজ্ঞাত কারণে এমন বিচিত্র কার্যকারণ তত্ত্বে এই পণ্ডিতেরা বিশ্বাসী)।
----"সলোমন কেইন সম্পর্কে দু-চার কথা", অভিরূপ মাশ্চরক।
উপরের কথাগুলো হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম জানেন, যখন স্কুল ছেড়ে কলেজের চৌহদ্দিতে পা রেখেছিলাম। বাংলা মাধ্যমে পড়ে ইংরেজি সাহিত্য শেখার দুঃসাহস দেখিয়েছিলাম বলে কলেজের প্রথম দিন থেকেই বেশ ভয়ে ভয়ে ছিলাম। কিন্তু জঁর ফিকশনকে ফেলনা হিসাবে দেখা হয়, সেটা বুঝেছিলাম যখন একজন অত্যন্ত পণ্ডিত মানুষ তাঁর ক্লাসে আমাকে বলেছিলেন, তদবধি আমার পড়া সমস্ত ইংরেজি "সাহিত্য", সে টলকিন হোক কী রাওলিং হোক কী লিউইস, সেগুলো সবই "চিপ" ফিকশন, সস্তা/জোলো জিনিস। বর্তমানে জানি যে প্রফেসর টলকিনকে যে "চিপ" বলে, তাঁর সাহিত্যের প্রতি মানসিকতা বেশ সংকীর্ণ ধরনের। কিন্তু ওই বয়সে, যখন ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস আর তত্ত্ব সম্বন্ধে সামান্যতম জ্ঞান ছিল না, সেই পণ্ডিতের কথা শুনে মনে ভয় ধরে গিয়েছিল। মনে সন্দেহ জেগেছিল, তাহলে ততদিন পর্যন্ত যা যা ইংরেজিতে পড়েছি, সবই কি "সিরিয়াস" সাহিত্য নয়?
তাহলে ফ্যান্টাসি কি জঁর হিসাবে সম্মানজনক হতে পারে না?
বর্তমানে এইসব আগডুম বাগডুম কথা ভেবে সময় নষ্ট না করার চেষ্টা করি, বিশেষ করে উরসুলা ল্য গুইন, টি এইচ হোয়াইট, সুজানা ক্লার্ক, মার্ভিন পিক প্রমুখদের লেখা পড়ার পর। এখন জঁর ফিকশন পড়ি, সেটা নিয়ে আলোচনা করি, আর নিজের মত লেখার চেষ্টা করি। টলকিন-বিদ্বেষী পণ্ডিতের কথা মনে পড়লে অ্যাকাডেমিয়া সার্কেলের সংকীর্ণতা নিয়ে বিরক্তি ধরে বটে, কিন্তু তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমি সেই জগৎ থেকে এখন অনেকটা দূরে চলে এসেছি এবং তারাও আমাকে ভুলে গেছে।
পাল্পের প্রতি ভালবাসাটা জন্মিয়েছে ধীরে ধীরে। বিশেষ করে স্নাতকোত্তর ক্লাসরুমে বসে লাভক্রাফটের গল্পগুলো লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ার সময়। উইয়ার্ড ফিকশনের স্বাদ লেগে গেছিল, মশাই, সেই নেশা ছাড়তে পারিনি এখনও।
এই বছরই সিরিয়াস সাহিত্যের মাঝে পাল্পি গল্প চুটিয়ে পড়ছি। একদিকে পরিমল ভট্টাচার্যের সুবিশাল উপন্যাস "সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা", তো অন্যদিকে কন্টিনেন্টাল অপের নুয়া গপ্পো, ব্লাফটের তামিল পাল্প আর কল্পবিশ্ব প্রকাশিত "সলোমন কেইন অমনিবাস"।
সত্যি বলতে এই বইটির আগে রবার্ট ই হাওয়ার্ডের কোনও লেখা আমার পড়া হয়নি। কোনানের সিনেমা দেখেছি, একটা দুটো কমিক্সও পড়েছি, কিন্তু সেই হাইবোরিয়ান যুগের অভিযান ছাপা অবস্থায় পড়ে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আর সলোমন কেইন? সলোমন কেইনকে চিনতাম স্টার মুভিজে একটা অত্যন্ত জোলো সিনেমা দেখার জন্য। কিন্তু সেই কেইনের সাথে বইয়ের কেইনের আকাশপাতাল তফাৎ।
তা, কে এই বইয়ের সলোমন কেইন? একদম সোজা করে বলতে গেলে, কেইন হল লোন-অ্যাডভেঞ্চারার চরিত্রের একখান আর্কেটাইপ। দোহারা চেহারার মানুষটা সর্বদা কালো পোশাকে নিজেকে মুড়ে রাখে, মাথা ঢেকে রাখে পিউরিটানদের টুপি দিয়ে। হাতে কখনও রেপিয়ার, কখনও ফ্লিন্টলক, আবার কখনও বাস্তেতের মাথা খোদাই করা একটা দণ্ড। এই সলোমন কেইন প্রায়শই উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায় ইউরোপ থেকে আফ্রিকায়, আর সুযোগ পেলে দুষ্টের দমন করে। সেই দুষ্টের রূপ কখনও ফরাসি দস্যু ল্য ল্যু, কখনও জীবন্মৃত জম্বি, কখনও ভ্যাম্পায়ার, কখনও কুয়াশারূপী প্রেত, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এইটুকু পড়ে অনেকেই বলবেন, "আরে, আরে, এইরকম আর্কেটাইপ নিয়ে তো ওমুক গল্প পড়লাম, তমুক সিনেমা দেখলাম।" ফর্দ বেরিয়ে আসবে সাথে সাথে: রোলান্ড ডেসচেইন, জেরাল্ট অফ রিভিয়েরা, ভ্যান হেলসিং (সিনেমা-ওয়ালা), কেনশিরো, গাটস, এমনকি হেলব্লেজারের জন কনস্ট্যানটিনও। আর আমিও হাত কচলাতে কচলাতে বলব, "জনাব, খুব সম্ভবত এরা সবাই এসেছে সলোমন কেইনের ছায়া থেকেই। সূতপুত্র, ইত্যাদি..."
মাত্র ত্রিশ বছর বয়স এই ধরাধামে কাটানোর সময় রবার্ট ই হাওয়ার্ড কত যে বিচিত্র রকমের লেখা লিখে গেছেন, তা শুধু এই একটা চরিত্রের গল্পগুলো পড়ে বুঝেছি। অমনিবাসের গল্পগুলোর প্রেক্ষাপট আর কনসেপ্ট এতটাই আলাদা আলাদা, যে এক নিঃশ্বাসে সবকটা গল্প পড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। এই যেমন "Rattle of Bones" (অস্থি-মর্মর) ভুতুড়ে বাড়ির গল্প। অন্যদিকে "The Footfalls Within" (পৈশাচিক পদধ্বনি) অনেকটাই লাভক্রাফটিয় গল্প (হাওয়ার্ড তাঁর জীবনের শেষ ছয় বছর পত্রমিতালির মাধ্যমে লাভক্রাফটের বন্ধু ছিলেন)। আবার "The Blue Flame of Vengeance" (প্রতিশোধ) একেবারে ১০০% swashbuckling গল্প। এ'হেন বৈচিত্র্যময় গল্পগুলোর মাঝে কেইন নিজেই সর্বদা অপরিবর্তনহীন। সে গগনমাঝে হার্পির সাথে যুদ্ধই হোক কী ধু ধু প্রান্তরে প্রেতের সাথে মল্লযুদ্ধ, কেইন নিজের নীতি ও ধর্মের সাথে কখনও সমঝোতা করেনি। এমন দ্বিমাত্রিক চরিত্র হয়েও সে যে পাঠকদের ঘোরের মধ্যে রাখতে পারে, সেটা অবশ্যই রবার্ট ই হাওয়ার্ডের লেখনীর জন্য।
লেখনীর কথা যখন উঠলই, এবার অভিরূপ মাশ্চরকের অনুবাদ নিয়ে কয়েকটা কথা বলি। ওনার অনুবাদে মাধুর্য রয়েছে। প্রথম গল্পেই (Red Shadows - রক্তপাথার) আফ্রিকার দেবতার বিবরণ:
"I am everlasting (Kane thought the Black God said); I drink, no matter who rules; chiefs, slayers, wizards, they pass like the ghosts of dead men through the gray jungle; I stand, I rule; I am the soul of the jungle (said the Black God)."
তিনি অনুবাদ করেছেন:
'কেইনের মনে হল, সেই মূর্তি যেন বলছে, "আমি অনন্ত, আমি অবিনশ্বর। শাসক যে-ই হোক, আমি পূজা পাব। কত রাজা, কত সেনানী, কত পুরুত এসেছে, ও কালের অমোঘ নিয়মে পঞ্চভূতে লীন হয়ে গেছে. কিন্তু রয়ে গেছি, রয়ে যাব আমি- এই বনের আসল রাজা, আত্মা, সত্তা..."'
হাওয়ার্ডের লেখনীকে সুন্দরভাবে বঙ্গীয়রূপ প্রদান করেছেন অভিরূপবাবু, বয়ে এনেছেন ছোটবেলায় পড়া রূপকথা আর হেমেন্দ্রকুমারের লেখনীর স্বাদ। তবে কয়েকটা গল্পের টাইটেল আমার পছন্দ হয় নি। "The Blue Flame of Vengeance" নামটাই যতটা গাম্ভীর্য আর নাটকীয়তা রয়েছে, অনূদিত নাম "প্রতিশোধ"-এ তার সিকিভাগও নেই। তেমনি " Skulls in the Stars" এর পরিবর্তিত রূপ "চাঁদনি রাতের বিভীষিকা" মূল নামের কাব্যিক দিকটাকে যেন মুছে দিয়েছে।
যাই হোক, দু-দিনে গিলে খেয়েছি বইটা। মাঝে একবারও অন্য বইয়ে মন বসেনি। মাঝে মাঝে এমন লেখা পড়ে মনের ভার হালকা করে নিতে ভাল লাগে-- এই "জাস্ট ফর ফান"-এর অসংখ্য গল্পগুলো।