নিঃশব্দে বোনা বিস্ময়: বৃশ্চিক ৪ — রহস্য ও রোমাঞ্চের চতুর্থ অধ্যায়
‘বৃশ্চিক’ নামটি এখন আর কেবল একটি বার্ষিক সংকলনের পরিচয় নয়—পাঠকসমাজে এটি আজ রহস্য, রোমাঞ্চ ও গূঢ়তার এক নির্ভরযোগ্য আলয়।
২০২১ সালে কোভিডের মধ্যে যখন আমার ঘরই ছিল গোটা জগৎ, তখন হাতে এসেছিল ‘বৃশ্চিক ৪’। পাতা ওল্টাতেই টের পেলাম—এবারেও ঋজু গাঙ্গুলী সম্পাদিত এই সংকলন সেই পূর্বাপর অভিজ্ঞান বহন করছে, যেখানে রহস্যগাথা শুধু দুর্বোধ্য ধাঁধা নয়, বরং এক মনোজাগতিক অভিযাত্রা।
এই খণ্ডে স্থান পেয়েছে ষোলোটি গল্প, যার প্রতিটিই আলাদা আলাদা স্বরে বাজে। তবে সবগুলি গল্প ধরে আলোচনার অবকাশ না থাকায়, কেবল মনে গেঁথে থাকা ক'টি রচনার কথা বলাই শ্রেয়।
অদিতি সরকারের ‘ক্ষুধা’ পাঠে মনে হল, গল্প কাকে বলে!! নিঃশব্দে গা ছমছম করা—তাঁর লেখনী যেন শব্দে শব্দে চিত্রকল্প আঁকে, এবং আতঙ্কের টানটান অনুভূতিকে মেপে মেপে বিন্যাস করে। তিনি যেমন ‘পূর্ণিমা’য় নিপুণ ছিলেন, এখানেও তাঁর গল্প বলার মুন্সিয়ানা প্রশংসনীয়।
অনিরুদ্ধ সাউ-এর ‘ফাঁদ’ নিঃসন্দেহে সংকলনের মুকুটমণি। অপ্রচলিত থিম, সমাজ বাস্তবতা এবং একটি নার্ভ-চেপে ধরা পরিণতি—সব মিলিয়ে এক অনবদ্য সৃষ্টি। একাধারে মানবিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সমাজ-সমালোচনামূলক এই গল্পটি final টুইস্টে এনে দেয় মৃদু ব্যথা ও গভীর বিস্ময়।
কৌশিক রায়-এর ‘আজ নীল রঙে মিশে গেছে লাল’ গল্পটি যদিও কাঠামোগত দিক থেকে প্রেডিক্টেবল ঠেকতে পারে, কিন্তু লেখার ছন্দ, ভাষার রাশ, এবং রক্ত-জমে-যাওয়া টেনশনের চিত্রণ পাঠককে আটকে রাখে। সিরিয়াল কিলিংকে কেন্দ্র করে গল্পের যে বাঁক—তা নিঃসন্দেহে অভিনব এবং অনস্বীকার্য।
পিয়া সরকারের ‘সস্তার ঘর’ এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করে। রহস্যের পাশাপাশি ভৌতিকতার শীতল পরশ এসে গায়ে লাগে। লেখিকা যেন আতঙ্ককে ছুঁয়ে ফেলেছেন নিঃশব্দে, পাঠক বুঝে ওঠার আগেই।
ঋজু গাঙ্গুলীর অনূদিত ‘বেহুলা’ (মূল: ‘Widow’s Point’) কোনও সাধারণ অনুবাদ নয়—এ যেন নিজের জাত চেনানো এক ভাষান্তর। রহস্য ও ভয়ের পরত জুড়ে বোনা এই রচনায় সম্পাদকের অনুবাদ ক্ষমতা অনস্বীকার্যভাবে স্পষ্ট। ঋজুদার প্রচুর অনুবাদ পড়েছি আমি -- কিন্তু এই rendition সবদিক দিয়ে অনন্য।
ত্রিদিবেন্দ্র নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ফান’ যথার্থই নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এগোয়—পরিচ্ছন্ন, বাস্তবসম্মত অথচ সুপরিকল্পিত রহস্যের বুনন। যদিও ঋদ্ধিমা নামটি অতিরিক্ত ব্যবহারে খানিক ভারী হয়ে উঠেছে, বাকি নির্মাণ যথাযথ।
ভালো লেগেছে বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দীর ‘জন্মাষ্টমী’, অদ্রিজা ব্যানার্জীর ‘প্রতিবিম্ব’ এবং কৌশিক সামন্তের ‘চাবি’। ‘চাবি’ গল্পটি বিশেষভাবে মনে থেকে যায়—এতটুকু বিনিময়ে এমন এক ‘সুখ’ পাওয়া, এবং তার প্রায় দুঃস্বপ্নময় পরিণতি—গল্পটির মৌলিকতা অতুলনীয়।
যথাযথ প্রশংসার দাবিদার আরও কিছু গল্প: পল্লবী সেনগুপ্তের ‘তিন সত্যি’, ইপ্সিতা মজুমদারের ‘রূপালি রক্ত’, মোহনা দেবরায়ের ‘যদিও স্বপ্ন’ এবং দোলা দাসের ‘আসমান জমিন’। এই সমস্ত রচনার বৈশিষ্ট্য—তারা থ্রিলারের সাধারণ গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়ে প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, স্মৃতি ও মানসিক জটিলতাকে অনায়াসে ছুঁয়ে যায়।
প্রচ্ছদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া—অর্ক পৈতণ্ডীর অলংকরণ যথারীতি চমৎকার হলেও, এবারকার প্রচ্ছদটি যেন আগের সেই ন্যূনতম অথচ হিমশীতল শৈলীর অনুপস্থিতিতে খানিক দুর্বল। তবে ছাপা ও বিন্যাস প্রশংসনীয়—নির্ভুল বানান ও পাঠবান্ধব ফর্ম্যাট বইটিকে পাঠের দিক থেকে আরামদায়ক করে তুলেছে।
সবমিলিয়ে ‘বৃশ্চিক ৪’ নিছক একটি সংকলন নয়—এ এক গন্ধবিচারী পাঠকের জন্য রহস্যের রন্ধনশালায় প্রবেশ। এই সংকলন কেবল রোমাঞ্চপ্রিয় পাঠকদের জন্যই নয়, বরং সাহিত্যে অভিনব প্লট এবং শব্দের খেলায় মগ্ন পাঠকেরও সম্পদ।
পড়ে ফেলুন। যদি পড়ে থাকেন, তবে আরেকবার পড়ুন। কারণ ‘বৃশ্চিক’ শুধুমাত্র বিষধর নয়—এ এক ঘোরতর আসক্তি।
রহস্য রোমাঞ্চ জঁরের ভক্ত সমস্ত পাঠকের কাছেই ‘বৃশ্চিক’ বার্ষিক সংকলনটি বিশেষভাবে আদৃত। আমিও প্রথম সংখ্যা থেকেই এটির বিশেষ ভক্ত।
বৃশ্চিক-৪ হস্তগত হয়েছিল বেশ কিছুকাল আগে। পড়েও ফেলেছি এক এক করে, সেও বেশ কিছুকাল হয়ে গেল। কাজের চাপে পাঠ-অভিজ্ঞতার কথা লেখা হয়নি আগে।
বইটিতে মোট ষোলোটি গল্প আছে। প্রতি গল্প ধরে ধরে বিশদে যেতে পারব না, সে সময় নেই। সংক্ষেপে যে গল্পগুলি মনে দাগ কেটেছে সেগুলোর কথা বলি বরং।
অদিতি সরকারের “ক্ষুধা” – অদিতি অত্যন্ত পরিণত লেখক তা ওঁর “পূর্ণিমা” গল্পটি পড়লেই বোঝা যায়। এই গল্পটিতেও সুলেখনীতে একদম মাপা রহস্য, আতঙ্ক ও উত্তেজনা ভরে দিয়েছেন লেখক। খুব ভালো লেগেছে।
অনিরুদ্ধ সাউ-এর “ফাঁদ” – আমার মতে এ সংকলনের সেরা গল্প। যেমন চমৎকার রহস্য নির্মাণ, যেমন চমৎকার জটিলতার মোচড়, তেমনই তরতরে ভাষায় বলিষ্ঠ চলন।
কৌশিক রায়-এর ‘আজ নীল রঙে মিশে গেছে লাল’ – খুব প্রেডিক্টেবল প্লট হলেও লেখার গুণে গল্পটি মন কেড়েছে।
পিয়া সরকারের ‘সস্তার ঘর’ – জটিল,মনস্তাত্ত্বিক, ভৌতিক – সব মিলিয়ে বেশ মনোযোগ দাবি করে প্লট। পিয়ার লেখার হাতটি সুন্দর।
ঋজু গাঙ্গুলীর অনুবাদে “বেহুলা” – মূল গল্প যে কী হাড় হিম করা, তা নিখুঁত ধরা পড়েছে অনুবাদে। রহস্য ও রোমাঞ্চের সঙ্গে এই একটি গল্পে ছড়ি ঘুরিয়েছে ভয়, নিখাদ ভয়।
দোলা দাসের “আসমান জমিন” – খুব ইন্টারেস্টিং প্লট। দেশভাগ ও ভৌতিক আবহে ব্যালান্স করে দুর্দান্ত এগোচ্ছিল গল্প। শেষে এসে একটু যেন দুর্বল হয়ে গেল – না হলে হয়তো এইটিকেই সেরা বলতুম!
এছাড়া তমোঘ্ন নস্করের ‘ধাঁধা’, মোহনা দেবরায়ের ‘যদিও স্বপ্ন’, কৌশিক সামন্তের ‘চাবি’ এবং যূথিকা আচার্য্যের “বাঁশি’ যথাযথ।
(ও হ্যাঁ, অনুষ্টুপ শেঠ নামে এক লেখকের ‘প্রতিশোধ’ নামে একটা গল্পও আছে এ বইতে, সে আর আমি পড়িনি। আপনারা কেউ পড়লে বলবেন তো কেমন!)
সব মিলিয়ে রীতিমতো উপভোগ্য এক সংকলন। বইটির মুদ্রণ ও বিন্যাস ভারি সুন্দর, চোখের পক্ষে খুবই আরামদায়ক। প্রতিবারের মতো এবারেও অর্ক পৈতণ্ডীর অলংকরণ এ বইয়ের সম্পদ। তবে এবারের প্রচ্ছদ আমার আগের মতো ভালো লাগেনি, সেই মিনিমালিস্ট ধাঁচে গায়ে কাঁটা দেওয়ানো অনন্য ব্যাপারটা একেবারেই পেলুম না।
হাতে পেলে, অবশ্যই পড়ে ফেলুন। এর আগের তিন খণ্ডও সুযোগ পেলে পড়বেন।
---
বই – বৃশ্চিক-৪ (একটি রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি সংকলন) সম্পাদক – ঋজু গাঙ্গুলী প্রকাশক – অরণ্যমন মুদ্রিত মূল্য – ৩২৫/-