রবিশংকর বলের এই উপন্যাস নিয়ে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বলেন - ভয়াবহ ভালো লেখা। একমাত্র মেটাফর পেঁজা তুলোর মত উড়ন্ত - ভাসমান - তবু স্বাধীন নয়- নিজে উড়তে পারে না- মনে হয় নিজেই উড়ছে - আসলে নিজে উড়তে পারে না হাওয়ায় ওড়ায়।
রবিশংকর বল পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৯৬২ সালে। বিজ্ঞানে স্নাতক। ২০১১ সালে দোজখনামা উপন্যাসের জন্য বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন।
গল্পগ্রন্থ দারুনিরঞ্জন রবিশঙ্কর বল এর গল্প আর্তোর শেষ অভিনয় জীবন অন্যত্র ওই মণিময় তার কাহিনী সেরা ৫০ টি গল্প
উপন্যাস নীল দরজা লাল ঘর পোখরান ৯৮ স্মৃতি ও স্বপ্নের বন্দর পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন মিস্টার ফ্যান্টম বাসস্টপে একদিন মিলনের শ্বাসরোধী কথা নষ্টভ্রষ্ট এখানে তুষার ঝরে দোজখনামা আয়নাজীবন আঙুরবাগানে খুন জিরো আওয়ার
কবিতা ত্রস্ত নীলিমা ঊনপঞ্চাশ বায়ু
প্রবন্ধ সংলাপের মধ্যবর্তী এই নীরবতা কুষ্ঠরোগীদের গুহায় সংগীত মুখ আর মুখোশ জীবনানন্দ ও অন্যান্য
সম্পাদিত গ্রন্থ সাদাত হোসেইন মন্টো রচনাসংগ্রহ
জাহিদ সোহাগ : মানে আমি বলছি এই কারণে যে, আমাদের বাংলাদেশে রবিশংকর বলকে চেনা হচ্ছে দোজখনামা দিয়ে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখবেন? মানে এখানেও একটা ট্যাগ আছে। রবিশংকর বল : এটা বলা কঠিন, তবু যদি বলো তবে আমি বলব, আমার "মধ্যরাত্রির জীবনী" উপন্যাসটা পড়া উচিত, "বাসস্টপে একদিন" উপন্যাসটা পড়া উচিত, "এখানে তুষার ঝরে" উপন্যাসটা পড়া উচিত। "স্মৃতি ও স্বপ্নের বন্দর", "ছায়াপুতুলের খেলা" অবশ্যই। এই কটা লেখা অন্তত। আর "পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন" এই লেখাটা।
ওই মণিময়, তার কাহিনী রবিশংকর বল গুরুচণ্ডালী প্রকাশনা কলকাতা ২০১৬ **
ওই মণিময় আসলে কোন মণিময় সেটা বুঝতে পারা কঠিন নয়। বিশ্বভুবনের অখণ্ড প্রবাহের শ্বাসাঘাতের সামনে আঙুল ধরলে যে তাপ প্রাকৃতিক নিয়মেই তৈরি হয় তারই কিছুটা ওই মণিময় আর যে প্রাকৃতিক নিয়মে সেই তাপ ফের মিশে যায় অনন্ত সূর্য আর বুড়ো থুত্থুড়ে সমুদ্দুরের নোনা রক্তের সাথে সেটাই হলো তার কাহিনী। কিনারা আর কেন্দ্রের কাহিনী এ,কাছে আসা আর সরে যাওয়ার কাহিনী এ, মৃতের স্থিরতা আর জীবিতের প্রতিফলনের কাহিনী এ। এ কাহিনী হতে পারে সবার। আবার এ কাহিনী হতে পারে মহাশূণ্যের নিবিড় নিঝুম একাকিত্বের। মণিময়ের শিল্প ভাস্কর্য নির্মাণ আর অস্তিবাদের ভরকেন্দ্র যখন পেছতে পেছতে খাদের ধারে গিয়ে দাঁড়ায় তখন তার কানে আসে সমগ্র মানবস্বরের আবর্ত।জীবনানন্দের মাল্যবান উৎপলাদের কেন্দ্র করে এক শান্ত, সব মেনে নেওয়া কবিস্বর মণিময়ের স্বপনে জাগরণে তাকে শরীরচ্যুত করে ফেলে। মণিময় একদম ভিখারি হয়ে পেয়ে যায় জগত সংসারের তাবৎ ধনদৌলত। কামুর স্ট্রেঞ্জার কিম্বা নিৎসের অভিঘাতে ভর করে সে উড়তে চায় মাঝেমাঝে কিন্তু ডানা খোলার আগেই সমস্ত পালক খসে পড়ে। কেন্দ্র থেকে সে দূরে সরে যেতে পারেনা। বৃত্তের চক্রান্তে এক বিকট দেহহীন বিন্দুতে পরিণত হয় মণিময়। দেহহীন সত্ত্বা তার আত্মস্থল নিংড়ে জীবনের কিনারে নিয়ে চলে এক রহস্যময় সিঁড়ি দিয়ে। সে কিনার মৃত্যুরও। স্বপ্নভঙ্গের পরে স্থিরমতি হতে চায় মণিময়- মাল্যবানের মতই। ব্যাখালোকের হাতছানি তীব্রভাবে সরিয়ে দিয়ে মণিময় অসীম নিরন্তরতার গালে মুখে শরীরে হাত স্পর্শ করতে করতে এগিয়ে চলে। রেজিমেন্টেশনের বিরুদ্ধে মুখ ফিরিয়ে। প্রগতির ছদ্মবেশের কিংখাব উপড়ে দিতে চায় মণিময়। কে বোঝে তাকে? কে বুঝবে মণিময়কে? প্রাচীন বাস্তবের হাত ধরে আসে সাত দিনের পুত্র সন্তানের শবদেহের বস্তুপুঞ্জ। পার্ক সার্কাসের হিন্দু গোরস্তানে একেই দাফন করে মণিময় বসুমতীর কাছে একটু জমি চেয়েছিলো। ম্যাকবেথের তিন ডাইনির মতন। তিনবার। মণিময় আর সুতপার জীবনে সেই ২২ ফেব্রুয়ারি এসে যায়,আসতে থাকে, গোরের ওপরে জ্বলতে থাকা রুগ্ন মোমবাতিদের আলোর মতন। মণিময়ের শরীর মনে প্রাচীন নিষিদ্ধ যৌনতার স্মৃতি খেলে যায় সন্তানস্পৃহার সচেতনতার অন্তরালপথ বেয়ে । সুতপার মনে অহৈতুকি এক অপরাধবোধ চারিয়ে যায় সন্তানহীনা এক শরীরের সৌন্দর্যময়তার হাতুড়ি ঘায়ে। অসম্পূর্ণ অবচেতনের প্রকোপে মণিময়ের জীবন ধীরে ধীরে নিখাদ রূপকলোকে পরিণত হতে থাকে। মণিময় নিস্তার পেতে কিনারের দিকে সরে সরে যায়।বিস্মৃতির কাছে নতজানু হয় মণিময়। অসীম দ্যাখা দিয়ে যায় সাপের রূপকে। নিজেই নিজের ল্যাজ গিলে চলা এক অনন্ত সময়ের দুর্বিষহ দহে মণিময় ঘুরেই চলে।পরতে পরতে চলে যায় জীবন,যৌবন,অস্তিত্ব,মনোলোকের শান্তি এমনকি অশান্তির অনুভূতিও। কালের ঘূর্ণন দশ বছর পরে মণিময়কে এই বিশেষ যাত্রার মধ্যে নিয়ে আসে সৈকত শহর পুরীতে। সুতপা আজ তিস্তা আর উদ্দালকের জননী। হঠাৎই মণিময়ের মনে পরে আজ ২৩ ফেব্রুয়ারি। বেলাভূমে তিন বছরের উদ্দালক আর ছয় বছরের তিস্তা তখন বালি খুঁড়ে খুঁড়ে ঘর বানায়,ভাঙে; সুতপা তন্ত্রের রহস্যময় প্রতীকের মতন চিহ্ন গড়ে তোলে বালির ওপরে আঙুল দিয়ে দিয়ে। সুতপার ২২ ফেব্রুয়ারি ভুলে যাওয়ার দু:খ মণিময়কে স্নায়ুকোষ মরে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। বেদনার পেষণে বাস্তব অতিক্রান্ত এক মুহূর্তে সুতপা আর মণিময় য্যানো তরঙ্গে নাচতে দেখে এক কৃষ্ণবালককে। গভীরতর বেদনা ভুলে যাওয়ার বেদনা হা হা করে সামুদ্রিক বাতাসে মিশে যায়। খুঁড়ে চলা বালি উড়তে উড়তে পার্কসার্কাসের গোরের ঝুড়ো মাটির স্মৃতি হয়ে দানা বাঁধে। ঝিকিমিকি সমুদ্রের আলো কিছু রোগা উলঙ্গ অসহায় নিভন্ত মোমবাতির কথা মনে করিয়ে দেয়। জীবনানন্দের সেই সময়হীনতা আর সমকালীনতার দর্শনমাখা এক অসামান্য উপন্যাস - ওই মণিময় তার কাহিনী। বস্তুত মাল্যবান নিজেও তো এই বেদনাবাস্তবতারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রবিশংকর বলের এই উপন্যাস নিয়ে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বলেন - ভয়াবহ ভালো লেখা। একমাত্র মেটাফর পেঁজা তুলোর মত উড়ন্ত - ভাসমান - তবু স্বাধীন নয়- নিজে উড়তে পারে না- মনে হয় নিজেই উড়ছে - আসলে নিজে উড়তে পারে না হাওয়ায় ওড়ায়। প্রচ্ছদও বেশ ভালো লেগেছে।