রিফাত সানজিদা's Reviews > অক্ষয় মালবেরি

অক্ষয় মালবেরি by Manindra Gupta
Rate this book
Clear rating

by
14008088
's review

it was amazing

অর্ধেক জীবনএ সুনীল লিখেছিলেন যৌবন পেরিয়ে গেলে বাদামি সন্ধ্যেবেলাগুলিতে মানুষের মনে হতে থাকে এই জীবন অন্য রকম হবার কথা ছিল। উঠে আসে হতাশা এবং হাহুতাশের ঢেউ, ফেলে আসা গান, চাপা অভিমান।
কুড়ি কুড়ি বছরের পার কেটে যাওয়ার পরের যে জীবন, তার চবিতচর্বণ, কেবল বেদনাই বাড়ায়, নয়?

মধ্যবয়সে পৌঁছানোর ঢের আগেই অকালপক্ক বিষন্নতার কারণে এ জাতীয় বিষাদে ভুগেছি প্রথম যৌবনে, কৈশোরে, এমনকি খানিকটা শৈশবেও। সেইজন্যেই কী এতোটা পছন্দ হয়েছে অক্ষয় মালবেরি, মণীন্দ্র গুপ্তের খণ্ডিত আত্মজীবনী?
খণ্ডিত এই অর্থে যে শেষ হয়েছে কুল্লে ২২ বছর বয়সে এসেই, ফৌজি প্রশিক্ষণ ছেড়ে সদ্য বেকারত্ব বেছে নিয়ে, যে জীবনের প্রারম্ভ।
কিন্তু গত বাইশ বছরকার উপাখ্যান?

অপার্থিব সুন্দর গদ্য, যদি এক বাক্যে বলতে চাই কেমন লেগেছে পড়তে গিয়ে। নেশাধরানো ঝিম ধরা বর্ণনা, ছবির মতো ভাসিয়ে তুলেছে লেখকের শৈশব, মাতৃস্নেহ বঞ্চিত যদিও।

দশ মাস বয়সে মা'কে হারিয়ে মণীন্দ্র বড় হয়েছেন পিতৃ এবং মাতৃকূলের আত্মীয়দের কাছে, কখনো ঠাকুরদা- ঠাকুমা এবং দিদিমা-দাদামশাই। ভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তিন পর্বে ভাগ করে লেখা এ জীবন আলেখ্য ঠিক প্রচলিত ধারায় আত্মচরিত নয়। বরিশালের গণ্ডগ্রামে বিশাল পারিবারিক অন্দরমহল জুড়ে যে আত্মীয়তার জাল, তার চরিত্রগুলোকে চেনা যেমন চিত্তাকর্ষক তেমনি মুগ্ধকর তার চারপাশের বিবরণ।
সজল জলে ভাসা শাপলা, তেঁতুল আর নারিকেল গাছের ফাঁকেফাঁকে চনচনে রোদ্দুর, আঙুল চেটে খাওয়া নবান্ন, বসন্তকালের রক্তিম পলাশ, থোপাথোপা বেতফল আর জোনাকিমাখা ছায়াছায়া শান্ত বনপথে ভেজা মাটির সোঁদাসোঁদা গন্ধে টইটম্বুর ধূসর মন্থর নিস্তরঙ্গ গ্রামের দিন।
সেসব দিন ছাপিয়ে এক সময় গিয়ে দাঁড়ানো আসামে, মাতামহীর পরিবারে লালিত দলছুট স্নেহকাতর বালক জীবন, নিতান্ত দায়সারাভাবে এসএসসির বেড়া ডিঙিয়ে।

এরপরের গন্তব্য লাকসাম, কুলাউড়া, আখাউড়া.. আধঘুমন্ত সব স্টেশন পেরিয়ে চাঁদপুর, পিতার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারে। গন্তব্যহীন দিনযাপন, ফের ভেসে পড়া, সেখান থেকে সেনাবাহিনীতে ঢোকা, তাও ঝোঁকে, ক্ষণিকের সিদ্ধান্তবশে, ফৌজত্যাগ, তাও। যেন জীবনটা কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা যেনতেন ভাবে, স্রোতে গা ভাসিয়ে, কিন্তু পালক না ভিজিয়ে।
এই ভেসে যাওয়ার সময়ে এসেছে দাঙ্গা, পঞ্চাশের মনন্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়কার উৎকট দিনের টুকরো টুকরো ছায়া। যদিও খুব সবিস্তারে নয়।

সব ছায়াকে অস্বীকার করে জলো ম্যালেরিয়ায় পাঙাশ রূপ নেয়া বাদা অঞ্চলের অজগাঁয়ে বসে আত্মবিশ্বাসহীন, আত্মজনহীন সদ্য কৈশোর ডিঙানো সাড়ে পাঁচ ফুটের এক তরুণ নিজেকে ডুবিয়ে রাখে বইতে... শিব্রাম, কোনান ডয়েল, হেমেন্দ্রকুমার, জুল ভার্ন থেকে শুরু করে মৌচাক, রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর, বসুমতী, বিচিত্রা, ভারতবর্ষ, বিশ্বভারতী, প্রবাসী, বনফুলসমগ্র থেকে বিভূতির অনুবর্তন
গোগ্রাসে গেলে পঠনযোগ্য সমস্ত অপাঠ্য বই, যে বইকে সে ভেবে নিয়েছে পালাবার ইগলু, পালাবার ইগ্লুর এক একটা রামধনু ঠিকরানো বরফ-ইট।
এমনকি সৈন্যদলের প্রশিক্ষণ, লাহোর বাসের জীবনেও সদরবাজারের রাস্তায় মাটিতে পসরা সাজিয়ে বসা এক শিখ ফেরিওয়ালার থলি হাতড়ে সে খুঁজে নেয় যুগান্তর; ফেলে আসা কলকাতা আর শরতের ঘ্রাণ মাখা যে সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল প্রেমেন মিত্তিরের সেই বিখ্যাত গল্প, 'তেলেনাপোতা'।

বই তাকে আরো শেখায় দেখতে।
শুধু ছাপার কাগজে ছাপা ছবি নয়, নন্দলাল বা অবন ঠাকুরের তুলির সেই অমোঘ টানের পেছনের গল্প।
অবনীন্দ্রনাথের ছবির রূপের পৃথিবীতে জাগতিক কোন বাসনা তো নেই, অথচ যা আছে তা বাসনার চেয়ে মনকে অনেক বেশি ব্যথিত করে। মণীন্দ্র লিখেছেন এভাবে-
শরীর কি বস্তু, সেই যৌবনে টের পেয়েছিলাম, আর এখন বার্ধক্যে টের পাই- নদীকে মাঝিরা যেমন টের পায় জোয়ার আর ভাটায়। পরে শ্মশানে বসে হয়তো দেখব শরীর ফিরছে তার অঙ্গারে, জলে, ধাতুতে, লবণে। আর তার সূক্ষ্ম বিদেহ আভা চলে যাচ্ছে আকাশে- অালো মেঘ আর শান্তির দেশে। শরীর তো যা পেয়েছিলাম তাই ছিল, কিন্তু অস্তিত্বের ঐ বিদেহ আভা আমিই দিনে দিনে তৈরি করেছিলাম বই পড়ে, ছবি দেখে, গান শুনে।

মানুষী স্মৃতির এই ক্ষণমধুর অতীতচারণ বড্ড হতাশ করে হঠাৎ করে ফুরিয়ে গিয়ে, অপরিণামদর্শী যে বালকবেলার গল্প পাঠের আরামসুখ আর অনিবর্চণীয় গভীর বিষাদে দু'ভাগ হয়ে চিরে মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা এক দূরতম নক্ষত্রের জীবন।

IMG_0422

১০/৫, সানন্দে।
22 likes · flag

Sign into Goodreads to see if any of your friends have read অক্ষয় মালবেরি.
Sign In »

Comments Showing 1-4 of 4 (4 new)

dateDown arrow    newest »

message 1: by Tisha (new) - added it

Tisha বিরাট লোভনীয় রিভিউ আপু! বইখানা তাড়াতাড়ি সংগ্রহ করতে হবে এবং পড়ে ফেলতে হবে! :D


message 2: by Imran (new) - added it

Imran Ruhul চমৎকার রিভিউ! পড়ার ইচ্ছে রইল।


রিফাত সানজিদা Tisha wrote: "বিরাট লোভনীয় রিভিউ আপু! বইখানা তাড়াতাড়ি সংগ্রহ করতে হবে এবং পড়ে ফেলতে হবে! :D"

বাতিঘরে পাবে আশা করি। :)


রিফাত সানজিদা Imran wrote: "চমৎকার রিভিউ! পড়ার ইচ্ছে রইল।"

পড়ে ফেলুন জলদি। :)


back to top