ইসলামপূর্ব আরবের অবস্থা, আখেরি নবির আগমনের পর আরবের চিত্র, ইসলাম প্রচার শুরুর পর মক্কার জীবন, মদিনার জীবন, মক্কা বিজয়ের পর নবিজির প্রভাব এবং তাঁর ওফাত-পরবর্তী ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব - সবকিছুই লিখেছেন বেঞ্জামিন ওয়াকার। আর, তার বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাদউল্লাহ এবং প্রকাশক সময় প্রকাশন।
আখেরি নবিকে নিয়ে দুই ধরনের লেখা পাওয়া যায়। এক. ভক্তিগুণসমৃদ্ধ লেখা। যেখানে তাঁকে নিয়ে কোনো চুলচেরা বিশ্লেষণের সুযোগ থাকে না। নবিজির মানবীয় গুণাবলি ও মানব হিসেবে অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যগুলো সেখানে চাপা পড়ে যায় তাঁর মোজেজা ও সামরিক অভিযানের কাছে। যেমন: আর রাহিকুল মাখতুম।
দুই. দুসরা শ্রেণির নবিজীবনীর নিয়ত গান্দা। তাঁকে নানাভাবে হীন করে দেখানো, বিতর্কিত করার চেষ্টা করা এবং ইসলামের মূল নির্যাসকে হেয় করার নিয়তেই এই ধরনের নবিজীবনী লেখা হয়। সাধারণত বেশির ভাগ অমুসলিম এমন নিন্দনীয় কাজে জড়িত থাকেন। তারা মূলত বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে লিখতে বসেন। তাই আখেরি নবির অনুপম ব্যক্তিগত গুণাবলি তাদেরকে স্পর্শ করে না। নবিজির মহানুভবতা, দয়ার্দ্র মানসিকতার থোড়াই তারা পরোয়া করেন। যে কোনো ঘটনার সবচেয়ে নিকৃষ্ট বয়ানকে তারা প্রাধান্য দেন। যেন ব্যক্তিটিকে খলনায়ক হিসেবে তুলে ধরা যায়। বেঞ্জামিন ওয়াকার সেই শ্রেণির মানুষ। তিনি পুরো বই জুড়ে চেষ্টা করেছেন নবিজিকে বিতর্কিত করতে। ইসলামের মূল নির্যাসগুলোকে সব সময় চ্যালেঞ্জ করেছেন। আর, তার তথ্যসূত্রের জন্য অনেকটাই নির্ভর করেছেন ইসলামবিদ্বেষী লেখকদের ওপর। ওয়াকার ক্ষুব্ধ হয়েছেন কারেন আর্মস্ট্রংসহ অন্যান্য জীবনীলেখকদের ওপর। কারণ ওয়াকারের মতে, তাঁরা ইসলাম ও নবিজির প্রতি 'খামোখা' সহানুভূতিশীল।
ওয়াকার দেখানোর চেষ্টা করেছেন, প্যাগানিজমের বিরোধিতা করে ইসলামের উদ্ভব। অথচ সেখানে প্যাগান আরবদের নানা ধর্মীয় অনুষঙ্গ থেকে গেছে। যেমন: কাবা শরিফের কালো পাথরকে চুম্বন।
ওয়াকারের মতে, ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মকে বাতিল করে দিতেই ইসলামের আবির্ভাব। অথচ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের একাধিক ধর্মীয় চর্চা ভিন্ন মোড়কে ইসলাম গ্রহণ করেছে। যেমন: রোজা, জাকাত ইত্যাদি।
এগুলো ব্যতিক্রমী আলাপ। নতুন চিন্তার সুযোগ দেয়। আবার এ-ও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, যিনি এসব বলছেন তিনি স্রেফ বিদ্বেষ থেকে বললেন। পাঠককে চিন্তার খোরাক দিতে নয়।
বেঞ্জামিন ওয়াকারের বইয়ের ভাষার কথা বলতে পারব না। তবে, বাংলায় সাদউল্লাহ সাহেব বেশ ভালো অনুবাদ করেছেন। তরতরিয়ে পড়া যায়।
বইয়ের পুরোটাই আমার অপছন্দ তা নয়। ইসলামপূর্ব আরবের সংস্কৃতি নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ এককথায়, মার্ভেলাস। ইসলামি সংস্কৃতি বুঝতে হলে আরবের সংস্কৃতি বুঝতেই হবে। আর, তা ওয়াকারের বর্ণনা থেকে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বইটি ২০০৬ সালে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। এখন হলে সম্ভবত প্রকাশ করা যেতো না। কারণ সুস্পষ্ট। তৌহিদি জনতা রুখে দিতো। কোনো বই নিষিদ্ধের পক্ষে নই। এই বইতে আখেরি নবিকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তার প্রত্যুত্তরে আরও দশখান বই লেখা হোক। কেতাবের জবাব দেওয়া হোক কেতাব দিয়ে। যেমন: আখেরি নবি মানবীয় গুণাবলি ও তাঁর অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে গোলাম মোস্তফা লিখেছেন 'বিশ্বনবী', অমুসলিম মার্টিন লিংকস, কারেন আর্মস্ট্রং ও লেজলে হ্যাজেলটন বড়ো দরদ দিয়ে লিখেছেন নবিজির জীবনকথা। প্রতিতুলনায় বেঞ্জামিন ওয়াকারদের 'ছাইপাঁশ' সম্পর্কে বলা যায়,
'কে বলে শারদ শশী সে মুখের তুলা তারিই পদ নখে পড়ে আছে তার কতগুলা! '
পড়ুন, ঋদ্ধ হোন, নবিজিকে নিয়ে আলোচনা করুন। তাঁর মানবীয় গুণে সমৃদ্ধ হয়ে উঠুন।