সুধীজন জানেন, পুরাণ তথা পুরাকথার মধ্যে রূপকের ছলে প্রোথিত হয় নানা অতিকথন। সত্য সেখানে আবৃত থাকে বাহ্যিক এবং প্রায়শ মনোমোহক নানা অলৌকিকত্বে। কিন্তু তাদের সরিয়ে, যুক্তির প্রখর আলোকে সেইসব কাহিনিকে দেখা হলে কি তাদের মানবিকতা ক্ষুণ্ণ হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েই লেখা হয়েছে আলোচ্য বইয়ের আটটি কাহিনি। পুরাণে ও মহাকাব্যে, প্রায়শ মূল আলোকবৃত্তের বাইরে থেকে যাওয়া কিছু চরিত্র ও উপকাহিনিকে নিজের মতো করে দেখতে চেয়েছেন লেখক। তারা হল~ ১. বিবর্ণ বাঁশরী; ২. মনসিজ; ৩. তপস্বিনী; ৪. রক্তরোপন; ৫. মিলন বিয়োগ; ৬. ধ্বংসযন্ত্র; ৭. নিভৃতচারিণী; ৮. বিনোদিনী তুমি পরজনমে হইও কানহা। এতে মূল পৌরাণিক আখ্যানদের অবিকৃত রেখেও যুক্তি ও মানবিকতার সহজ সুর বেঁধে দিয়েছেন লেখক। শুধু দু'টি লেখা হয়ে উঠেছে একেবারে অন্যরকম, রীতিমতো বায়ো-পলিটিক্যাল থ্রিলার। তারা হল~ (ক) তপস্বিনী: এই কাহিনির বিষয় ভগীরথের জন্ম এবং গঙ্গা আনয়ন; (খ) রক্তরোপণ: এর উপজীব্য হল রক্তবীজ তথা তাকে পরাভূত করার প্রয়াস। বইটির ছাপা চমৎকার। সৌম্য আঢ্য-কৃত প্রচ্ছদ ও অলংকরণ অত্যন্ত সহজ, অথচ শৈল্পিক। তবে এতে বিস্তর মুদ্রণ-প্রমাদ আছে, যা পাঠের অভিজ্ঞতাকে রীতিমতো পীড়াদায়ক করে তুলেছিল। আশা রাখি যে পরবর্তী সংস্করণে এ-সব ত্রুটি সংশোধিত হয়ে বইটি সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে উঠবে। যাঁরা পৌরাণিক কাহিনিকে নবরূপে দেখতে চান, তাঁদের অবশ্যই অনুরোধ করব এই বইটি পড়তে। লেখক ও প্রকাশনার উদ্দেশে শুভেচ্ছা রইল।
◻️ "...দেবতার চন্দনের সুবাসের আড়ালে ঢেকে যাবে মানুষের রক্ত আর ঘর্মের গন্ধ। লোকে তার সঙ্গ চাইবে, প্রার্থনা করবে তার আশীষ। কিন্তু তার মনের হদিশ কেউই জানতে চাইবেনা কোনোদিন।"
◻️ শুনেছি পুরাণ ও জ্যোতিষবিদ্যায় আট সংখ্যাটির প্রভাব ও গুরুত্ব বেশ অনেকটাই। এই কথার অবতারণা কারণ আজকের আলোচ্য বই 'অষ্টক' আসলে আটটি পুরাণ কাহিনীর কাল্পনিক বিনির্মাণের সমাহার। রাধা থেকে শুরু হয়ে সেই গল্পের বিষয় পূর্ণবৃত্ত অতিক্রম করে কৃষ্ণে এসে শেষ হয়েছে। মাঝে এসেছেন নারদ, ভগীরথের দুই মা, কৌশিকী, ইরাবাণ, শূর্পণখা , সিংহিকা। এসেছে স্বাধীনচেতনা, দায়িত্ববোধ, প্রেম, বুদ্ধিবৃত্তি, প্রতিশোধ এবং মাতৃত্ব। আর সবকিছুকে জড়িয়ে বেঁধে রেখেছে প্রেম। সে প্রেম কখনও সমর্পণ, কখনও মুক্তির উপায়, কখনও তপস্যা, আবার কখনও মরতে মরতে একবার বেঁচে নেওয়া। এই প্রেমই এই বইটির মূল জোর।
◻️আমরা অনেকেই পুরাণ, মহাকাব্যের কাহিনী বেশির ভাগ সময়ে এড়িয়ে যাই, হয়তো ভাষার কাঠিন্যের ভয়ে; কখনও বা উড়িয়ে দিই গাল-গল্প বলে। আসলে তাঁরা মনে করেন যে এগুলোর কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই, থাকতে পারে না। অথচ যদি যুক্তি আর বিচারের আতস কাচের তলায় এই সমস্ত গল্পকে আমরা ফেলি, তাহলে শুধুমাত্র দার্শনিক দিক নয় হয়তো বাস্তবের খোঁজও পেতে পারি। সেই উদ্দেশ্যেই সেই চিরচেনা অথচ চিরনতুন কাহিনীগুলির যুক্তি নির্ভর বাস্তব রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এই বইয়ের আটটি কল্প-কাহিনির মাধ্যমে।
◻️আমার সবচেয়ে পছন্দের দুই কাহিনীর মধ্যে 'ধ্বংসযন্ত্র' অন্যতম। এক পরিকল্পিত প্রতিশোধের উপাখ্যান যার মাধ্যমে এক সামান্যা পার্শ্বচরিত্রা নারী প্রভাবিত করে ফেলেন এক আদি মহাকাব্যের জন্মলগ্নকে। দ্বিতীয়টি অবশ্যই 'রক্তরোপন'। এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়ে সেখান থেকে শত শত অসুর জন্ম নেওয়া কি সম্ভব? নাকি এর পিছনে লুকিয়ে আছে অন্য কিছুর আভাস? এমন কিছু যা একবিংশ শতকে যুক্তিপূর্ণ। এক আশ্চর্য সূত্রে বাঁধা পড়েছে বইয়ের প্রথম ও শেষ গল্পদুটি।
◻️'মোহিনী মন্থন'-এর পরে সৌরভদার আরেকটি বই আমার Favourite List-এ যুক্ত হলো। পুরাণ এবং ডিকনস্ট্রাকশানের গল্প পড়তে যারা ভালোবাসেন, অবশ্যই প্রাপ্তমনস্ক সেই পাঠকেরা এই বই পড়ে দেখতে পারেন।