⚈ স্পয়লার-ফ্রি রিভিউ⚊ ❛এক হাজার সূর্যের নিচে❜
‘সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ’-এর একটি ট্যাগ যথারীতি এই বই নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে দিয়ে দিতে চাই। যদি আপনি পাঠক হিসেবে ‘সর্বভুক’ হয়ে থাকেন; তবেই বইটি পড়ার অনুরোধ রইল। অপ্রাপ্ত বয়স্করা দূরে থাকা ভালো।
কল্পবিজ্ঞান অথবা সায়েন্স ফিকশন নিয়ে জানাশোনার কোনো অন্ত নেই। বাস্তব অবাস্তবে মেশানো বা কল্পনার সাহায্যে সত্যসন্ধান করাকে আমরা কল্পবিজ্ঞান হিসেবে জানি। ১৮৫১ সালে ‘লিটিল আর্নেস্ট বুক আপন অ্যা গ্রেট ওউন সাবজেক্ট’ বইয়ের লেখক উইলিয়াম উইলসন প্রথম ‘কল্পবিজ্ঞান’ শব্দটির ব্যবহার করেন। যদিও এই নিয়ে সামান্য মতবিরোধ রয়েছে। কুন্তল চট্টোপাধ্যায় ওনার ‘সাহিত্যের রূপরীতি’ গ্রন্থে প্রথম ‘সায়েন্স ফিকশন’ শব্দটি ব্যবহার করার ক্রেডিট দিয়েছিলেন—‘অ্যামেজিং স্টোরিজ’ পত্রিকার সম্পাদক হুগো গার্নেস ব্যাক-কে। যাহোক, কল্পবিজ্ঞান নিয়ে সংজ্ঞা এবং বিকাশ সম্পর্কে ইন্টারনেটে অনেক আর্টিকেল রয়েছে। বিস্তারিত জানতে হলে সেখানে যে-কোনো সময় ঢুঁ মারতে পারেন।
সভ্যতার আবির্ভাব থেকে এই কল্পবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু। নানান জল্পনাকল্পনা তখনও যেমন ছিল, ঠিক এখনও তেমনই রয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এই দিকটি নিয়ে লেখালিখি অনেকে শুরু করলেও, আক্ষরিক অর্থে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প লেখেন বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু। অনেকের মতে তিনি-ই বাংলা সাহিত্যে—কল্পবিজ্ঞানের জনক। এর পরে একে একে অনেক রথী-মহারথী এসে বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের ধারাকে শাণিত করে। সত্যজিৎ রায়-এর কথা তো না বললেই নয়। যিনি বাংলা কল্পবিজ্ঞানে শক্তিশালী সব গল্প নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে ছেড়ে আমাদের দেশের কথা বললে, দীপেন ভট্টাচার্য, মুহম্মদ জাফর ইকবাল-সহ অনেকের নাম সেই তালিকায় যুক্ত হবে।
সেইসব ইতিহাস আপাতত একপাশে তোলা থাক। বর্তমানে মূলধারায় কল্পবিজ্ঞানের কাজ খুব কম লেখক-ই করে থাকেন। বিশাল কলেবরের কাজ তো খুবই নগন্য। উপ্ন্যাসিকার আধিক্য যতটুকু দেখা যায়; উপন্যাসে তেমন না। তবে লেখকরা এই ঘরনা কেন্দ্র করে যে শ্রম দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন; সে-জন্য সাধুবাদ অবশ্যই জানাতে হয়।
❛এক হাজার সূর্যের নিচে❜ তেমনই সাধুবাদ পাওয়ার মতোই একটি উপন্যাস। লেখকের প্রথম কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস হলেও, পড়ার পর এই ধারণা একেবারেই বদলে যাবে। সাবলীল ও নিজস্ব এক লিখনপদ্ধতি নির্ভর করে লেখক কল্পবিজ্ঞানের সাথে হরর আবহ; একটু খোলাসা করে বললে ‘লাভক্রফটিয়ান হরর’-এর মেলবন্ধন ঘটিয়ে দারুণ একটি প্লটের সূচনা করেছেন। ওনার পূর্বে প্রকাশিত ‘রেড ডোর’ এবং ‘অসমাপ্ত ক্যানভাস’ যারা পড়েছেন—তাদের জন্য প্রচুর ‘ইস্টার এগ’ এই উপন্যাসে রয়েছে। ‘রেড ডোর’ বইয়ের কয়েকটি চরিত্রের দেখা উক্ত উপন্যাসে পাবেন। যদিও আমার ‘অসমাপ্ত ক্যানভাস’ বইটি পড়া হয়নি—তবুও টাইমলাইন বুঝতে তেমন অসুবিধায় পড়িনি।
প্রকাশিত অন্যান্য বইয়ের মতো এই বইয়ে লেখক প্রচুর পপ কালচার রেফারেন্স, বৈজ্ঞানিক টার্মিনোলোজি এবং ইস্টার এগের দক্ষতা অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে প্রদর্শিত করেছেন। এই নিয়ে সামান্য পরিচিতি দিতে গেলেও, রিভিউ দীর্ঘায়িত হবে। সে-দিকে আপাতত যাচ্ছি না।
◆ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
❛এক হাজার সূর্যের নিচে❜ উপন্যাসের নামকরণ নিয়ে লেখক যখন প্রচারণা চালায়, আমার চোখ তখন কপালে! এক সূর্যের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে যেখানে অবস্থা বেগতিক হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে এক হাজার সূর্যের নিয়ে দাঁড়ানো তো প্রায় অসম্ভব; এমনকি কল্পনারও অতীত। বইটি যখন হাতে আসে, তখন আর সাতপাঁচ না ভেবেই পড়া শুরু করি। জানতে হবে এই এক হাজার সূর্যের নিচে রহস্য কি! এবং যখনই পড়া শেষ করলাম, কিছুক্ষণ না অনেকক্ষণ নীরব হয়ে বসে রইলাম। মাথায় তখন কাহিনির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টুকরোগুলো, স্ফুলিঙ্গের মতো ফুটতে শুরু করে। মেলাতে থাকি অনেক কিছু, কিন্তু মিলে না কিছু! কী বেদনাবহ বলুন তো...
বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, যখন লেখক গল্পের এক পর্যায়ে এসে পাঠকের জন্য চারটি পথের একটি বেছে নিতে বলেন। কোন পথ নির্বাচিত করবেন সেই দায়িত্ব গল্পের এক চরিত্রের হলেও, সিদ্ধান্ত নিতে হবে পাঠককে! মাইন্ড গেম হিসেবে, যা আকর্ষণীয় বটে। আমি সর্বশেষ অর্থাৎ চতুর্থ পথ বা সিদ্ধান্তটি বেছে নিয়েছি, এবং তারপর... কী হয়েছে তা আর বলছি না। চতুর্থ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া পর্ব পড়ে শেষ করার পর, একে একে বাকি তিনটি সিদ্ধান্ত যখন পড়ে শেষ করি; মনে তখন মিশ্র সব অনুভূতি খেলা করতে শুরু করে। যুক্তি আর আবেগের এক অদ্ভুত খেলা লেখক খেলেছেন এই উপন্যাসের শেষে এসে। কষ্টদায়ক, হতাশাজনক, ভয়ংকর সেইসব অনুভূতি। কল্পনা আর অতীত মিলে যখন বাস্তবতাকে পরাস্ত করে তখনই সেই অনুভূতিরা জাগ্রত হতে থাকে।
❛এক হাজার সূর্যের নিচে❜ উপন্যাসের প্লট চমকপ্রদ। এই প্লটে ভবিষ্যতের পৃথিবীকে দেখানো হয়েছে। যেখানে একশ শতাংশের মধ্যে মাত্র পাঁচ শতাংশ জনসংখ্যা জীবিত রয়েছে। এমন এক বিপর্যয় পৃথিবীতে নেমে আসে—যে কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীর পঁচানব্বই শতাংশ মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যায়! কী এমন হয়েছে; তা নাহয় রহস্য হিসেবে থাকুক।
পুরো উপন্যাসে আগ্রহ জাগানিয়া এমন অনেক কিছু রয়েছে, যা রহস্যের পাশাপাশি রোমাঞ্চিত করে। শুরুতে সতর্কীকরণ দেওয়ার কারণ হচ্ছে বরাবরের মতো লেখকের গল্পে ‘অ্যাডাল্ট’ কথোপকথন এবং কয়েকটি ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা উঠে এসেছে কাহিনির স্বার্থে। যা অপ্রয়োজনীয় একেবারেই মনে হয়নি। পোডোফাইল এবং সমকামিতার দিকটিও উপন্যাসে বিদ্যমান; তবে সেটা অনেকটা অনুমানের ওপর দাঁড়া করানো। সরাসরি কিছু নেই। পাঠককে ভেবে নেওয়ার সময় দিয়েছেন এখানে। গল্পের চরিত্রদের আবেগ এবং বিবেকের টানাপোড়েনে দিকটি—বাস্তবিক আঙ্গিকে প্রস্ফুটিত হয়েছে। জোর করে কোনো কিছু ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো কাজ চোখে পড়েনি।
কল্পবিজ্ঞান ভিত্তি করে যেহেতু কাহিনি সৃষ্টি করেছেন লেখক, সেই অনুয়ায়ী বৈজ্ঞানিক অনেক তথ্য-উপাত্ত যেমন: আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজ, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স, টেলেপোর্টেশন, মোবিয়াস স্ট্রিপ, প্যারাডক্স-গ��র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স, টাইম ট্রাভেল, টাইম লুপ, প্যারালাল ইউনিভার্স, ক্যার-ব্ল্যাক হোল ইত্যাদির কাজ বা ব্যাখা উপন্যাসে উপযুক্ত কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। যখন এগুলোর ব্যবহার বা এই নিয়ে কথোপকথন হয়; তা খুব সহজ সংলাপ ও বর্ণনার মাধ্যমে পাঠকের মনে ছেপে দেওয়ার প্রয়াস লেখক যথাযথভাবে করতে পেরেছেন। পুরো কাহিনি এক বসাতে পড়ে শেষ করা গেলেও, আমি মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে পড়েছি।
লেখক কাহিনিকে তিনটি ‘ভাগ’ (Phase) এবং চারটি ‘সিদ্ধান্ত’ দিয়ে গল্পের সমাপ্তি টেনেছেন। প্রথম ভাগ গল্পের শুরুর কাহিনি এবং চরিত্র বিল্ডাপে দারুণ ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় ভাগে ঘটনাপ্রবাহ কিছু ধীর আর ইল্যুশন ক্রিয়েট এবং লুপে আটকে পড়ার করার কাহিনি থাকে। গল্পের শেষ ভাগে—সমাপ্তি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে দারুণ এক খেলার আয়োজন তো আছে-ই। সব মিলিয়ে লেখকের এই প্রচেষ্টাকে সফল বলে আখ্যাত অবশ্যই করব।
যেসব পাঠক কল্পবিজ্ঞান পছন্দ করেন, সাথে আবার লাভক্রফটিয়ান হররের অনুভূতি অধিকন্তু বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার উষ্ণ অভ্যর্থনা অনুভব করতে ভালোবাসেন—তাদের জন্য বইটি মাস্ট রিড। আরও আছে, যদি ভবিষ্যৎ পৃথিবী কেমন হবে, কীভাবে তা পরিচালিত হবে, কী কী সমস্যা ও সংগ্রাম তখনও বজায় থাকবে—এমন সব রোমাঞ্চকর ঘটনার মুখোমুখি হতে চাইলে এই বই নির্দ্বিধায় হাতে তুলে নিতে পারেন।
● গল্পের শুরু এবং কিছু প্রশ্ন—
কাহিনি শুরু হয় অ্যাপোক্যালিপ্সের ১৫ বছর পর থেকে। জায়গাটি মরুভূমি, সিসিলিয়া। ডিসেম্বর ৫, ২০৪৭ সাল। নিহা নামের এক কিশোরী প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে ডাকাতদের ধাওয়া থেকে। অজানা কোনো এক আতঙ্ক—তার সর্বাঙ্গে ঘিরে ধরেছে। হঠাৎ-ই নিহার সামনে উপস্থিত হয় একজন ভদ্রমহিলা এবং এক কিশোর বয়সি ছেলে। প্রাণে বাঁচায় তাকে। নিহা যেন নতুন জীবন লাভ করে। কিন্তু কী হয়েছিল নিহার পরিবারের সাথে? ডাকাত’রা কেন তাকে এইভাবে ধাওয়া করছে? রহস্য কী? আর ভদ্রমহিলা বা কে? কিশোর ছেলেটি কী হয় সে মহিলার? কেন তারা এইভাবে নিহাকে বাঁচিয়েছে?
আরও কিছু বছর কেটে যায় মূল গল্প শুরু হতে। কাহিনিতে পরিচ্য় ঘটে একে একে সবগুলো প্রধান চরিত্রের। নিহা, জিহান, বার্ড, এস্ট্রিড, আজুরা; ওরা সবাই একটি পরিবার। মিলেমিশে থাকে সবাই। এখানে কেউ মা হারিয়েছে, কেউ বাবা আর কেউ পুরো পরিবার। কিন্তু কী হয়েছে তাদের সাথে?
মরুভূমির মাঝে একটি ডোমের মধ্যে তাদের বাসস্থান। অ্যাপোক্যালিপ্সের পর মানুষজন বিশালাকার ডোম বানিয়ে থাকতে শুরু করে। চারিদিকে কাচ দিয়ে ঘেরা। ডোমের নিচের অংশ মধ্যবিত্ত আর ওপরে ভাসমান শহর ‘হাইলক’-এ থাকে প্রভাবশালীরা। ডোমের বাইরে কোনো ডাকাত বা তাদের আস্তানা ধ্বংসের কাজ করে স্কাউট সদস্যরা আর ভেতরে আইনের কাজ দেখে মিলিটারি সংস্থা। জিহান একজন স্কাউটের সদস্য। প্রতি রাতে তার ডিউটি। ডোমের মানুষদের সুরক্ষা প্রদান করা তার কাজ। রাতে মরুভূমিতে ঘুরেবেড়িয়ে বিভিন্ন পরিত্যক্ত জিনিস দিয়ে নিজস্ব হ্যান্ড ক্যানন বানানোর প্রচেষ্টায় থাকে সে। মেকানিক্যাল জিনিসপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করে অবসর সময়ে।
ডাকাত অথবা পিপা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষদের ডোমে ঢুকতে দেওয়া হয় না। পূর্বে থেকে যারা ডোমে অবস্থান করে; তারা ব্যতীত বাকিরা মরুভূমিতে কলোনি তৈরি করে সেখানে দিনাতিপাত করে। ডোমে ঢোকার সংগ্রাম করে। প্রায় মানুষ ভাবে পিপা ভাইরাসের কারণে এই অ্যাপোক্যালিপ্সি হয়েছে; কিন্তু ঘটনা এইখানে আরও ভয়াবহ। সেই ভয়বহতার টের পায় জিহান এবং ত্রিনা! ত্রিনা হাইলকের একজন পর্নস্টার। কিছু সমস্যার কারণে তাকে ভাসমান শহর থেকে স্কাউটে কাজ করার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই থেকে জিহান এবং ত্রিনার সখ্যতা।
পৃথিবী থেকে এতগুলো মানুষ বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল? তা জানতে হলে ❛এক হাজার সূর্যের নিচে❜ উপন্যাসের অন্তরালে ডুব যেতে হবে। অজ্ঞেয় সেই সত্য উন্মোচন করতে জিহান, ত্রিনা, নিহা, বার্ড-এর সাথে সন্ধি স্থাপনা করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ কাহিনি এখনও অনেক বাকি...
⚊
শুরু থেকে কাহিনি দারুণ উত্তেজনায় পূর্ণ। প্রারম্ভ অংশে হালকা অ্যাকশন সিকোয়েন্স থেকে মূল গল্পে ঢুকতে অযথা কোনো সময় লেখককে নষ্ট করতে দেখিনি। শুরু থেকে চরিত্রায়নে দারুণ মনোযোগী ছিলেন তিনি। একইসাথে কল্পবিজ্ঞানের সহায়তায় যে জগৎ তিনি নির্মাণ করেছেন; তা নিয়ে ধীরে ধীরে বর্ণনা দিয়ে যেতে থাকেন। রহস্য নিয়ে জল ঘোলা না করেই, উন্মোচন কীভাবে করবেন; এই নিয়ে তৎপরতা শুরু থেকে চালিয়ে যেতে থাকেন।
এখানে লেখকের কল্পনাশক্তির প্রশংসা অবশ্যই করতে হয়। যেহেতু উক্ত বইটি ওনার ‘ফ্যান্টম সাগা’ সিরিজের বই; পূর্বের প্রকাশিত বইগুলোর সাথে সদ্ভাবের জন্য যে পদক্ষেপ নিতে দেখা গিয়েছে তা এক কথায়—প্রশংসনীয়। জগৎ নির্মাণে নতুনত্বের ছাপ থাকলেও কোথাও যেন ‘অ্যাটাক অন টাইটান’ অ্যানিমির সাথে সামান্য কিছু জায়গায় মিল পেয়েছি। এই যেমন স্কাউটের কাজ, ডোমের ভেতর উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত নীরব দ্বন্দ্ব-সহ আরও কিছু জায়গায়। এ-ছাড়া ‘বায়োশক ইনফিনিট’ গেম এবং ‘এরগো প্রক্সি’ অ্যানিমি থেকে লেখক সামান্য অনুপ্রাণিত হয়ে উপন্যাসটি সাজিয়েছেন। যাহোক, লেখক সেগুলো নিজ দায়িত্বে সামলে নিয়েছেন।
● গল্প বুনট » লিখনপদ্ধতি » বর্ণনা শৈলী—
লেখকের গল্প বুননের দক্ষতা দারুণ। পুরোটাই সাজানো-গোছানো। কোথায় কখন কোন পদক্ষেপ বা কেমন সিকোয়েন্স নির্মাণ করতে হবে, এই বিষয়ে লেখক সিদ্ধহস্ত। লেখকের লিখনপদ্ধতির নিজস্ব স্টাইল আছে। যেখানে কোনো সাহিত্যিক শব্দ বা বাক্যের আলোড়ন নেই। সোজা-সাপটা লেখনশৈলী। সংলাপগুলো একটু ভিন্ন ধরনের।
অবশ্যই সহজ-সাবলীল; তবে উপন্যাসে ঠিক যেভাবে সংলাপ উপস্থাপন করে তার থেকে কিছুটা ভিন্ন। বাস্তবে হাই-ক্লাস সোসাইটিতে যেমন কথোপকথন হয়ে থাকে অনেকটা তেমনই। আমার অন্তত তাই মনে হয়েছে। এ-দিকটি ইতিবাচক হলেও অনেকের ভালো লাগবে, আবার লাগবে না। লেখকের আধিপত্য এই জায়গায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। যেন লেখক নিজেই চরিত্রদের হয়ে সংলাপ দিয়ে যাচ্ছেন। সব সময় না হলেও, প্রায় সংলাপে তা লক্ষণীয়।
এ-ছাড়া বর্ণনা শৈলী সাবলীল। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়েছে পূর্বের বইগুলোর ধারা অনুসরণ করে যাচ্ছেন তিনি। হয়তো সিরিজের বই বলে। আগামীতে এই দিকগুলোতে ভিন্নতা আশা না করলেও সংলাপে কিছুটা হলে আশা করছি। এখন যে খুব সমস্যা হচ্ছে একেবারেই না। বরং গল্প অনুযায়ী এই লিখনপদ্ধতি ভালো খাপ খেয়ে যায়।
যাহোক, সব মিলিয়ে কল্পবিজ্ঞান আর লাভক্রফটিয়ানের বিষয়গুলো, অ্যাকশান সিকোয়েন্স, চরিত্রদের শঙ্কা, আবেগের জায়গা সবকিছু যথার্থ লেগেছে। বিন্দু মাত্র একঘেয়েমি লাগেনি; শুধু দ্বিতীয় ভাগের ঘটনা কিছুটা ধীরগতির মনে হয়েছে। তবে সেটা গল্পে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি।
সংলাপের দিকটি নিয়ে আরেকটু বলি, যে্হেতু ভবিষ্যৎ পৃথিবী তাও সিভিলায়ার মতো জায়গায়। সেখানে ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। ডোমের মানুষজনের আচরণ খ্রিষ্ট ধর্মীয় অনুযায়ী হলেও, বাবা-মাকে ‘আব্বু/আম্মু’ বলে সম্বোধন নামে করা আবার উৎসবে শুধু দুর্গাপূজা দেখানো; এগুলোর মিশেল কিছুটা উদ্ভট লেগেছে। বলছি না, এক ডোমের ভেতর সব ধর্মের মানুষজন বসবাস করতে পারবে না; কিন্তু জিহান, নিহা, বার্ড তাদের কথোপকথন ঠিক থাকলেও আচরণে একটু ভ্যারাইটি ভাব লক্ষ করা গিয়েছে। এর চেয়েও ভালো হতো নতুন কিছু এখানে দেখানো গেলে। এটা একান্ত আমার মন্তব্য, অন্যদের এই বিষয়ে হয়তো কোনো সমস্যা না-ও থাকতে পারে।
● যেমন ছিল গল্পের চরিত্ররা—
গল্পে প্রত্যকটি চ��িত্র নিজ নিজ জায়গায় স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করেছে। বড়ো থেকে ছোটো সব কয়টি চরিত্র পূর্ণ অ্যাটেনশন ধরে রাখে পুরো উপন্যাস জুড়ে। গল্পের শেষ দিকে কয়েকটি চরিত্রের দেখা পাওয়া গেলে, তাদের জন্য যতটুকু সময় বরাদ্দ ছিল—সেই অনুযায়ী ভালোই কাজ দেখিয়েছে।
অনেকগুলো পছন্দের চরিত্র থাকার কারণে নির্দিষ্ট করে কারও নাম নিতে চাচ্ছি না। চরিত্রদের মধ্যে স্বকীয়তা ছিল দেখার মতো। যেখানে কমতি নেই আত্মবিশ্বাস, ভালোবাসা, বিশ্বাসের। সবাই একে অপরের জন্য যেন নিবেদিত প্রাণ। তাদের মধ্যকার রসায়ন পুলকিত করেছে অনেক। টিনএজ বয়সিরা এই উপন্যাসের সাথে ভালোভাবে খাপ খাওয়াতে পারবে। সবাই পারবে, তারা একটু বেশি-ই পারবে এ-ই।
চরিত্রদের মধ্যে টানাপোড়েন—ভালোই পরিমাণে ছিল। এমন কিছু সিকোয়েন্স লেখক ক্রিয়েট করেছেন, যেখানে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে; এই নিয়ে হালকা আতঙ্ক বিরাজমান ছিল।
● শেষের গল্প বলা প্রয়োজন—
এই উপন্যাসের সমাপ্তি বেশ অদ্ভুত। শুরুতে এই নিয়ে আলোকপাত করেছি। চারটি সিদ্ধান্তের একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এই কাহিনির সমাপ্তি মেনে নিতে হবে। আমি চার নম্বর সিদ্ধান্ত বেছে নিয়ে, গল্পের শেষটা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। বাকি তিনটি সিদ্ধান্তে ভিন্ন তিনটি সমাপ্তি দেখানো হলেও নিজ সিদ্ধান্তে অটুট ছিলাম। এই বইয়ের অন্যান্য ভালো লাগার দিকের সাথে এটি একটি।
যাহোক, লেখকের কাছে এই নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন জমা হয়েছে। লেখক তেমনই অবস্থার সৃষ্টি করেছেন বলে। এখন মনে হচ্ছে, চারটি সমাপ্তির দেওয়ার পর এই ‘সাগা’র ভবিষ্যৎ কী হবে? আরও কোনো বই আসবে ‘স্কাউট’-কে নিয়ে? অন্য কোনো ইউনিভার্স অথবা প্যারালাল ইউনিভার্সে? তাহলে চার নম্বর সমাপ্তির পর তো... আচ্ছা বাদ দিলাম। যেহেতু এই গল্পটি একজন স্কাউটের, আশা করছি এইখানে গল্পের সমাপ্তি হয়েছে।
স্ট্যান্ড অ্যালোন হিসেবে বইটি নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। পূর্বে প্রকাশিত ‘ফ্যান্টম সাগা’-এর বই পড়া থাকলে ভালো, না থাকলেও সমস্যা নেই।
● খুচরা আলাপ—
উক্ত উপন্যাসে লেখক ‘পিপা ভাইরাস’ নামকরণের পেছনে যে বর্তমানে চলতে থাকা ‘করোনা ভাইরাস’-কে ট্রিবিউট দিয়েছেন তা সহজে বোঝা যায়। বর্তমানে এই ভাইরাসে মানুষ মারা গেলেও, উপন্যাসে পিপা ভাইরাসের আক্রান্ত মানুষের অন্য রূপ প্রদর্শন করানো হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মানুষ’রা কখনও সূর্য দেখেনি। ঘটনাক্রমে সেখানে সমুদ্রের জল আকাশ উঠে গিয়ে পুরো আকাশ ঢেকে ফেলে। ফলে, সূর্যের আলো বা মুখ কখনও কেউ দেখতে পায়নি। কেন এমনটা হয়েছে তার উত্তর বইয়ে রয়েছে। এমনটা হওয়ার ফলে মানুষের মধ্যে সূর্যের আলো গায়ে মাখানোর আকাঙ্খা তৈরি হয়। কিন্তু চাইলে তো আর সব সম্ভব হয় না। ভবিষ্যতে কি এমন কিছু হতে পারে? এই কনসেপ্ট ভালো লেগেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতি কাহিনিতে বেশ ভালোই প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতির সাথে অনেক বিষয়বস্তু উক্ত উপন্যাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে সায়েন্স ফিকশনের সাথে লাভক্রফটিয়ান মিশেলের কারণে বাস্তবতায় কিছুটা চিড় ধরেছে মনে হলো। মূল গল্পে সেটা ধরেনি। কল্পবিজ্ঞান হিসেবে যদি পুরো উপন্যাস লেখা হতো তাহলে সত্যতা নিয়ে মনে বাসা বেঁধে রাখতে সক্ষম হতাম; লাভক্রফটিয়ানের কারণে তা কিছুটা ফিকে মনে হলেও আনন্দ পেয়েছি অনেক।
ভবিষ্যতে ডাকাতদের নিকট ইন্টারনেটের অ্যাক্সেস না থাকার কারণে তাদের অবসর কাটে বই পড়ে। কিন্তু সভ্য মানুষরা ডুবে থাকে ইন্টারনেটে। চিন্তা করার মতো একটি দিক তুলে ধরেছেন লেখক। যেখানে ডাকাতদের নিজস্ব লাইব্রেরি রয়েছে; অথচ এত উন্নত হয়ে সেই ডোমের ভেতরে বই পড়ার কোনো সুবিধা রাখা হয়নি! তাহলে কি এইভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে হার্ড কাভারে হাতে নিয়ে বই পড়ার যুগ?
এ-ছাড়া অস্ত্র নিয়ে লেখক যে শিল্পবিদ্যা জাহির করেছেন; তা দুর্দান্ত লেগেছে। গল্পের সমাপ্তিতে একটি অস্ত্রের প্রোটোটাইপের কেরামতি ভালোই প্রভাব ফেলেছে বটে। নতুন কিছু উন্মোচনের বিষয়টি অ্যাপ্রিশিয়েট করার মতো।
আরও অনেক কিছু লেখক এই উপন্যাসের আনাচেকানাচে ঢুকিয়ে রেখেছেন যা নিয়ে লিখে শেষ করা সম্ভব না। তাই বলব, অন্য রকম এক যাত্রার সাথে নিজেকে পরিচিত করাতে চাইলে, ❛এক হাজার সূর্যের নিচে❜ উপন্যাসের জগৎ থেকে ঘুরে আসুন। জানাশোনা যেমন বাড়বে তেমনই লেখকের মুনশিয়ানার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হবে।
◆ লেখক নিয়ে কিছু কথা—
যেহেতু লেখকের ‘রেড ডোর’ ইতোমধ্যে পড়া সেই অনুযায়ী ❛এক হাজার সূর্যের নিচে❜ উপন্যাসের সাথে যদি তুলনা করতে হয়; তবে নির্দ্বিধায় আমি এই বইটিকে এগিয়ে রাখব। সম্ভবত লেখকের ওয়ান অব দি বেস্ট। প্রচুর রেফারেন্স আর বৈজ্ঞানিক তথ্যের মিশেলে এই বইয়ের প্রতিটা পাতা পূর্ণ। কতটুকু খেটেছেন তা নিয়ে বলার অবকাশ তিনি রাখেননি।
কল্পবিজ্ঞানের সাথে লাভক্রফটিয়ানের মিশেল নতুন এক স্বাদ পাঠক হিসেবে আমাকে তৃপ্ত করেছে। সত্য বা বিশ্বাসের যাচাই-বাছাইয়ের দিকে আমি পদার্পণ করছি না। আমি ভাবতে ভালোবাসি, কল্পনায় ছবি আঁকতে পছন্দ করি। লেখকও ঠিক একই কাজ করেছেন। ওনার কষ্ট সফল।
বাংলায় এমন কাজ আরও আশা করছি। আগামীতে ওনার তৈরি করা ‘ফ্যান্টম সাগা’ সিরিজ আরও জনপ্রিয়তা লাভ করুক এমনটাই আশাবাদী।
● বানান ও সম্পাদনা—
উপন্যাসে সামান্য কিছু বানানে গড়মিল থাকলেও টাইপো এবং প্রায় বাক্যে ‘একই শব্দ’ দু’বার করে লেখার কারণে অনেকটা ভ্রুকুঞ্চনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন—
৩৬ পৃ: ...মনে হচ্ছে খুবই শক্তিধ্র কিছু একটা কিছু আঘাত হেনেছে সেখানে... (একই বাক্যে দু’বার করে ‘কিছু’ রয়েছে।)
সম্পাদনার ত্রুটির কারণে এমন অনেক বাক্য এবং কয়েক বার চরিত্রের নামের অদলবদল থেকে গেছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের বিল্ডাপ নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত লেখার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করি। নতুন চরিত্রের আগমন নিয়ে ব্যাকস্টোরি রাখার দরকার ছিল।
● প্রচ্ছদ—
কালার কম্বিনেশন ছাড়া প্রচ্ছদ ও নামলিপি সাদামাটা লেগেছে। কাস্টম ফন্ট ব্যবহার বাদ দিয়ে টাইপোগ্রাফির মাধ্যেম দারুণ নামলিপি তৈরি করা যেত উক্ত বইয়ের ক্ষেত্রে। প্রচ্ছদের ক্ষেত্রেও একই কথা বলব।
তবে যারা বইয়ের কনটেন্টে বিশ্বাসী। তাদের জন্য প্রচ্ছদ তেমন ম্যাটার করে না।
● মলাট » বাঁধাই » পৃষ্ঠা—
অন্বে্ষা প্রকাশনার প্রোডাকশন কোয়ালিটি দারুণ। বাঁধাই থেকে পেজ সেটাপ সবকিছু। দাম যেমন, মানেও তেমন। এমন বই পড়ে শান্তি পাওয়া যায়; আর পেয়েছিও।
≣∣≣ বই : এক হাজার সূর্যের নিচে • জুনায়েদ ইসলাম
≣∣≣ জনরা : সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার
≣∣≣ প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০২২
≣∣≣ প্রচ্ছদ : জুনায়েদ ইসলাম
≣∣≣ প্রকাশনা : অন্বেষা প্রকাশন
≣∣≣ মুদ্রিত মূল্য : ৫৬০ টাকা মাত্র
≣∣≣ পৃষ্ঠা : ৩৫৮