ভালো-খারাপের অসম মিশেল। পাবেন চারটে ভিন্ন সাইজের গল্প ও তিনটে বড় মাপের অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস। একান্ত ব্যক্তিগত মতামত, তবে লেখক হিসেবে হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত-র সীমাবদ্ধতা প্রচুর। এটা জেনেও তার লেখা পড়ে যেতে হয় কেবলমাত্র প্লট বাছাইয়ের বৈচিত্র্য এবং প্রাচুর্যের কারণে। সহজপাচ্য কিশোর অ্যাডভেঞ্চার, বাংলা সাহিত্যের একটি মৃতপ্রায় আঙ্গিক, সেটা প্রায় নিজ-ক্ষমতায় বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। কতকটা এ কারণেই, ওনার বইগুলো বইমেলায় পেলে কিনে পড়ে ফেলি।
গল্পগুলোর মধ্যে, ভালো লাগে জাদুকর সত্যচরণ-এর দুটো অভিযান। কেবল ওই নড়বড়ে ফিনিশিংটুকু এড়িয়ে চললে, অদ্ভুতুড়ে চরিত্রটিকে ঘিরে একটা তারিণীখুড়ো মার্কা সিরিজ লিখে ফেলতেই পারেন লেখক। বইয়ের বাকি দুটো গল্পও মন্দ নয়, তবে আদতে বিশেষত্বহীন।
উপন্যাস তিনটের মাঝে দুর্বলতম জুয়ান-দীপাঞ্জন জুটির অ্যাডভেঞ্চার, 'ড্রাগনের ডিম'। চীনের ঐতিহাসিক নিষিদ্ধ নগরীর মাঝে উপস্থাপিত গল্পটি ভীষণই গতে বাধা এবং শিশুসুলভ। এছাড়াও, খারাপ লাগে না, সুদীপ্ত-হেরম্যান জুটির অভিযান, 'মৎস্যকন্যার খোঁজ'-এ। তবে এ গল্পের শুরুটা বেশ চমকপ্রদ হলেও, গল্পের ওরকম হাস্যকর কার্টুনিশ পরিণতি হতাশাজনক।
তাহলে বইটি কেনো পড়বেন? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে বইয়ের শ্রেষ্ঠতম কাহিনী 'জম্ভলা দেবতার পুরোহিত'-এ। কোনো পূর্ব প্রতিষ্ঠিত চরিত্রদের ছাড়াই, একটি স্ট্যান্ড-অ্যালোন অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী। যা আখেরে ভীষণ উপভোগ্য। কেবলমাত্র এই একটি দুর্ধর্ষ উপন্যাসের জন্যেই বইটি একবার পড়ে ফেলা যায়। বাকিটা এবার আপনাদের ওপর।
হিমাদ্রী কিশোর দাশগুপ্ত । বাংলা সাহিত্যে ঠিক যখনই অ্যাডভেঞ্চার সাহিত্যের মন্দা ভাব তখনই ইনার আগমন। একে একে কঠোর অধ্যয়ন আর তার সহজ সাধারণ গতিশীল লেখা দিয়ে আমাদেরকে উপহার দিতে থাকলেন দুর্দান্ত সব অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী। কখনো হেরম্যান আর সুদীপ্ত আবার কখনো জুয়ান আর দীপাঞ্জন । হোক সুদীপ্ত বা জুয়ান, প্রত্যেকটা লেখায় যেন অমৃতসম। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটি নিখাদ অ্যাডভেঞ্চার'র বই। হ্যাঁ। সুদীপ্ত-হেরম্যান এবং জুয়ান-দীপাঞ্জন এর দুই দুটি উপন্যাস সহ মোট সাতটি লেখা আছে এতে ।
অ্যাডভেঞ্চারের গল্প যারা ভীষণ ভালোবাসেন বইটা অবশ্যই তাদের জন্য। তবে হ্যাঁ গল্প বলে পড়ার মজা নষ্ট করতে চাই না,তাই ছোট করে হালকার উপর ঝাপসা হেয়ালি দিয়ে দিলাম ।
১. জাদুকর সত্যচরণ ও দাবার ছক: বাংলা সাহিত্যে গল্প বলিয়ে চরিত্র হিসেবে নতুন নাম সত্যচরন । অদ্ভুত মুন্সিয়ানাই ট্রেনের কামরায় বলে চলেছেন দাবার ছকের গল্প। যে দাবার ছক ও গুটি অদ্ভুত জিনিস দিয়ে তৈরী? আর এই দাবা খেললে নাকি মরা মানুষ ও বেচে ওঠে!! কেমন করে?
২. শিকারি শিকার: বড় অভিনেতা অথচ নিষ্ঠুর,খেয়ালি। শিকার শখ,বাচ্চা কুকুর বলে সেকি ভালোবাসা বোঝে না? নিশ্চয় বোঝে।
৩.শবসাধনা : শব সাধনার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে অবশেষে মেলে সুরাহা। কিন্তু তান্ত্রিক এর কথা ফলে না,রোগী বেঁচে যায়। কথা রাখতে তান্ত্রিক.......!
৪. জাদুকর সত্যচরণের মলমাস তেলের শিশি : অব্যর্থ তেল। লাগালেই ব্যথার উপশম। কিন্তু তেল তৈরীতে লাগে এক ভয়ানক উপকরণ। আর বাচ্চা ছেলে কেন অকারণ ঢিল ছোঁড়ে কাউকে!!
৫. ড্রাগনের ডিম: চীনা রাজবংশের গল্প। জুটি জুয়ান - দীপাঞ্জন। ডিম থেকে সময় মত ড্রাগন বেরোবেই।
৭. মৎস্যকন্যার খোঁজে : মৎসকন্যা কি সত্যি আছে? কিছু নাবিক নিজের চোখে যে দেখেছে। তাহলে... সুদীপ্ত আর হেরম্যানের সাথে জড়িয়ে পড়বেন রহস্যের বেড়াজালে। গল্পটি সংক্ষিপ্ত আকারে পড়েছিলাম শারদীয়া শুকতারা ২০১৯ সংখ্যায়।
তো যারা এ সিরিজের গত অ্যাডভেঞ্চার গুলো পড়েছেন তাদের কে কিছু বলা লাগবে না। যারা পড়েন নি তাদের বলব এসব সুখাদ্য বেশিদিন ফেলে রাখতে নেই।
প্রতিটি গল্প খুব ই ভালো লেগেছে , বিশেষ করে 'ড্রাগনের ডিম' গল্পটি। অসাধারণ বললে হয়তো কম বলা হয়। সব গল্প গুলিতেই আছে রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা। বইটির 'অ্যাডভেঞ্চার ভয়ংকর' নামকরণটি যথার্থ।
হিমাদ্রি কিশোরের দেওয়া সেরা পাওয়া আমার কাছে সুদীপ্ত- হেরম্যান এর জুটি। এদের অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ যে একবার পেয়েছে তার কাছে অন্যান্য অ্যাডভেঞ্চার পানসে ঠেকবে। এই বইতে সুদীপ্ত- হেরম্যান এবং জুয়ান- দীপাঞ্জন এই দুই জুটির দুটি উপন্যাস স্থান পেয়েছে বইটিতে।এছাড়াও চারটি গল্প আছে,ও আরও একটি অন্য উপন্যাস আছে, এবার নামগুলো উল্লেখ করি -
১)জাদুকর সত্যচরণ ও জাদুর ছক : (৪/৫⭐) আমরা বোধ হয় লেখকের থেকে নতুন এক গল্পবলিয়ে ক্যারেকটার পেলাম সত্যচরণ। মড়া মানুষ বাঁচিয়ে তোলার গল্প, বেশ ভালো গল্প।প্রথমদিকে ভাবছিলাম এই সত্যচরণের বুঝি বদ মতলব আছে, পরে নিজের ভুল ভাঙ্গে।
২)শিকারি শিকার : (৪/৫⭐) জিকো নামে কুকুরটার জন্য মায়া লাগছিলো খুব।যে তাকে টোপ বানাতে গিয়েছিল,তার ওপর সুন্দর প্রতিশোধ নিয়েছে জিকো।
৩) শবসাধনা : (৩/৫⭐) এই টাইপের গল্পে একটু আধটু ভয় লাগতে হয়, নাহলে ঠিক তৃপ্তি পাওয়া যায় না, গল্পটা খারাপ না, তবে গা ছমছমে ব্যাপারটা নাই ওটাই মিসিং আছে।
৪)জাদুকর সত্যচরণের মলমাস তেলের শিশি : (৫/৫⭐) দারুণণণণ.... একটা গল্প, শেষটা যে এরকম ভাবতে পারিনি। মলমাস তেল কি দিয়ে তৈরি জানতে চট করে পড়ে ফেলুন।জানলে একেবারে হতভম্ব হয়ে যাবেন।আর হ্যা সঙ্গে কাশী ভ্রমণ ফ্রি।
৫)ড্রাগনের ডিম : (৩/৫⭐) {প্রথমে জুয়ান দীপাঞ্জন এদের পরিচয় টা দিই। প্রফেসর জুয়ান - স্প্যানিশ, ইতিহাসবিদ। দীপাঞ্জন সেন - ভারতীয়, বাঙালি, কলকাতাবাসী, ভ্রমণপিপাসু।} গল্প - চীনের মিং বংশের প্রাচীন নিষিদ্ধ নগরী ভ্রমনে যায় জুয়ান দীপাঞ্জন। সেখানে গিয়ে তাদের বিপদের মুখোমুখি হতে হয়।শোনা যায় ড্রাগন নাকি তার ডিম নিতে আসবেই। ড্রাগন পূর্ণিমার রাতে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোবে। সত্যি কি ড্রাগন আছে? ডিম সত্যিই ফুটবে ?
৬) জম্ভালা দেবতার পুরোহিত : (৪/৫⭐) জম্ভালা তিব্বতিদের অর্থসম্পদের দেবতা, একইসঙ্গে ইনি অপদেবতাদের দেবতা, এর অনুচরও অপদেবতা।প্রতিবছর একটি বিশেষ দিনে জম্ভালা দেবতা ভক্তদের দেখা দেন। সত্যিই কি অপদেবতাদের দেবতা জম্ভালা দেখা দেবেন ?
৭)মৎস্যকন্যার খোঁজে : (৪/৫⭐) {পরিচয় - সুদীপ্ত > ভারতীয়, কলকাতাবাসী, বাঙালি, বেসরকারি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, ভ্রমণপিপাসু। ফ্রেডরিখ হেরম্যান > মিউনিখবাসী, প্রাণী তত্ত্ব বিদ্যা নিয়ে উচ্চ শিক্ষিত, ক্রিপ্টোজুলজিস্ট। এরা দুজনে একসাথে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়।} গল্প - রূপকথায় আমরা মার মেড বা মৎস্যকন্যার কথা পড়ে এসেছি। সত্যিই কি এই মৎস্যকন্যা বলে কিছু আছে? তারই খোঁজে এবার সুদীপ্ত-হেরম্যান পাড়ি দিয়েছে মারিয়ান দ্বীপে।
* হিমাদ্রি কিশোরের অ্যাডভেঞ্চার গল্প যে একবার পড়েছে,আশা করছি তারই অসম্ভব ভালো লেগেছে।আমার পড়া সেরা বইগুলো আমি "recommended book" নামের Tag লিস্টে অ্যাড করে রাখি, কেউ চাইলে চেক করে নিতে পারেন।
অনেকদিন পর বাংলায় অ্যাডভেঞ্চারের গল্প পড়ে ভালো লাগলো। ছোটগল্পগুলোর মধ্যে জাদুকর সত্যচরণের দুটো গল্পই ভালো লেগেছে। তিনটি বড় গল্পের মধ্যে ভালো লেগেছে 'জম্ভলা দেবতার পুরোহিত'।