এপার বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল 'পরিবর্তন'! তার পেছনে লুকিয়ে থাকা ঘটনা, কিংবদন্তি আর রক্তের দাগ নিয়ে পলিটিক্যাল থ্রিলার লিখতে খুব বেশি মানুষ সাহস পান না এই তথাকথিত গণতান্ত্রিক পরিবেশেও। ব্যতিক্রম হিসেবে এতদিন শুধু সম্ভ্রম আর ভালোবাসার সঙ্গে দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের নাম নেওয়া যেত। এবার থেকে অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের নামও নিতে হবে। সসম্মানে। কী লিখেছেন অরিন্দম তাঁর এই উপন্যাসে? হাওড়া স্টেশনে একটা বিস্ফোরণ ঘটল। তাতে সাসপেক্ট হিসেবে কেউ এল। কেউ এল ভিকটিম হয়ে। ইনভেস্টিগেশন হল। কিন্তু ঘাগু অফিসারের সন্দেহ হল, এর পেছনে অন্য কিছু আছে। আরও বড়ো, আরও গভীর কিছু। এই উপন্যাস সেই 'গভীরে যাও' আহ্বানে সাড়া দেওয়ার। এর প্রতি অধ্যায়ে আছে একটা করে মোচড়। এতে রেড হেরিং আর মুখোশ, শত্রু আর মিত্রের অবস্থান বিনিময়ে মাথা গুলিয়ে যায়। এতে গল্পের মাঝপথে জমে ওঠা প্রশ্নের উত্তরমালা পেতে-না-পেতেই শুরু হয়ে যায় অন্য প্রশ্নের ঢেউ। কিন্তু এই উপন্যাস তা সত্বেও, এর বেশ কিছু অসঙ্গতি এবং সরলীকরণ নিয়েও আপনাকে বাধ্য করে গল্পের শেষ অবধি ছুটতে। কেন বলুন তো? কারণ থ্রিলারের আসল যে দুটো জিনিস এপার বাংলার অধিকাংশ রহস্য উপন্যাসে আদৌ থাকে না, সেই দুটো এতে আছে প্রবল পরিমাণে। এতে আবেগের লুজ-মোশন আর চরিত্রচিত্রণের নামে অনন্ত ব্যাকস্টোরির বদলে আছে সলিড ঘটমান বর্তমান। এর চরিত্ররা নিজেদের নিয়ে একগাদা অ্যাপলজি দেয় না। তার বদলে এরা যা করার তা করে। এই চরিত্রদের ইতিহাস গল্পের ভূগোলকে চালিত করে, উলটোটা নয়। এবং এতে আছে গতি! একেবারে নির্দয়, নির্মম সে গতি পাঠককে বই শেষ হওয়ার আগে থামতে দেয় না। কিন্তু... প্রথমত, এই বই একটা দাবাখেলার প্রথমার্ধের কশমাকশ মাত্র। এর এন্ডগেমের আভাসটুকু দিয়েই শেষ হয়েছে এই কাহিনি। "অন্তরে অতৃপ্তি রবে" টাইপের অনুভূতি আমরা বাংলা উপন্যাসের শেষে পেতে অভ্যস্ত নই। তবে 'অরফ্যান এক্স' থেকে শুরু করে অন্য অজস্র থ্রিলারে এই জিনিস ঘটেছে। আমি আশা রাখি, আগামী দিনে এই বইয়ের পরবর্তী অধ্যায় আমরা পাব লেখকের কাছ থেকে। আজ্ঞে হ্যাঁ, যে প্রবাদপ্রতিম থ্রিলারটির নাম আমি এই প্রসঙ্গে নিলাম, লেখক যে তেমন কিছু এই বাংলাতেও একদিন লিখবেন, সেই আশাও আমার আছে। দ্বিতীয়ত, লেখক আরও বড়ো ক্যানভাসে, আরও বড়ো আকারে এই কাহিনি নির্মাণ করলে ভালো করতেন। শ্বাসরোধী গতি আনতে গিয়ে এই লেখায় যেভাবে একের পর এক দৃশ্যে জাম্প-কাট ঘটেছে, তা পাঠককে বিরক্ত ও রুষ্ট করবে। ওই একই কারণে গল্পের শেষটা অতি-সরলীকরণ, এবং মূল চরিত্রদের বেশ কিছু ব্যাখ্যাহীন আচরণে কিঞ্চিৎ হতাশাজনক হয়ে গেছে। তৃতীয়ত, বর্ণশুদ্ধির ব্যাপারে আমাদের সবার কাছে মডেল ঋষা ভট্টাচার্য(য) এই বইয়ের দায়িত্বে থাকা সত্বেও 'পড়লো', 'জানেনা', ''জানাবো' জাতীয় বানানে গোটা বই ঠাসা দেখে অবাক হলাম। একইভাবে বেশ কিছু অধ্যায়ের সূচনায় একটি নয়নাভিরাম হেডপিস থাকলেও অন্যগুলোতে তা নেই কেন, বুঝলাম না। 'অকুস্থলে অকস্মাৎ' অধ্যায়ের শুরুতে অন্য একটি অংশের ক্ষুদ্রভাগ হয়তো ভুল করেই ছাপা হয়ে গেছে, যা আমরা সচরাচর কাফে টেবিলের বইয়ে দেখি না। উদ্ধৃতিচিহ্ন আর '-' চিহ্নের ব্যবহারেও যে পরিমাণে মিশ্রণ ঘটেছে তা অপ্রত্যাশিত। সব মিলিয়ে মনে হয়, এই বইটা আরেকটু যত্ন আর সময় নিয়ে হলে আরও ভালো হত। লেখককে আবারও ধন্যবাদ জানাই এমন একটি বুদ্ধিদীপ্ত ও গতিময় থ্রিলার আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে আরও ভালো, আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখা পাবে এই শুভেচ্ছাও জানাই তাঁকে। যদি আপনি সত্যিকারের থ্রিলারের অনুরাগী হন, যেখানে বিছানায় ছানা কাটার বদলে লেখক আপনাকে বসিয়ে দেন একটি আই.ই.ডি-র ওপর, তাহলে এই বইটি আপনার পড়া উচিত বলে আমার ধারণা। পাঠ, শুভ হোক।
প্রশান্ত দত্ত তার স্ত্রী শাঁওলী এবং ছেলে রেয়ানকে নিয়ে শ্বশুড়বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। হাওড়া স্টেশনে এসে প্রশান্ত শাঁওলী এবং ছেলেকে এটিএমের সামনে দাঁড় করিয়ে একটু বাথরুমে যায়। কিন্তু অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও সে না আসলে শাঁওলী তাকে ফোন করতে থাকে। ঠিক এই সময়ই স্টেশনে আকস্মিকভাবে ঘটে যায় বোমা বিস্ফোরণ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় পুলিশ এই বিস্ফোরণের জন্য প্রশান্তকে সন্দেহ করে। কিন্তু কেন? এক ছাপোষা স্কুল মাস্টার প্রশান্তকে সন্দেহের কারণ কী? আর এই বোমা বিস্ফোরণেরই বা কারণ কী?
এরপর কাহিনী চলে যায় কুড়ি বছর আগে উড়িষ্যার চন্ডিকা গ্রামে। সেখানে ফুটে উঠেছে পশুপতি মাদিয়া, চন্দন সামালের জীবন সংগ্রাম। সাথে দেখা যায় কীভাবে রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতা দখলের জন্য নকশালবাদীদের হাত করে ক্ষমতা দখলের পর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদেরই পথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে, তাদের হত্যা করছে। মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া কিছু মানুষের মনে জ্বলতে থাকে প্রতিহিংসার আগুন। সেই প্রতিহিংসার আগুন এরপর কী রূপ নেয় তা নিয়েই কাহিনী এগোতে থাকে।
এটি একটি আদ্যোপান্ত পলিটিক্যাল থ্রিলার। খুব চেনা একটা প্লট হলেও লেখায় অভিনবত্ব আছে। কাহিনীতে রয়েছে একের পর এক টুইস্ট। একবার বইটা ধরলে পড়া শেষ না করে উঠতে ইচ্ছে করবে না। থ্রিলার বই হিসেবে এরকম টানটান উত্তেজনাময় লেখা সবসময় ভালোই লাগে। তবে এটা বলতেই হয় এই বইতে কিছু ধোঁয়াশা রয়েছে যেগুলো আমার ভালো লাগেনি, কারণ এর কোনো ব্যাখ্যা পেলাম না। ১) প্রশান্তর মোবাইলের মতো একই মোবাইল দ্বিতীয়টা রেখে যাওয়ার কারণটা বুঝলাম না। ২) আরশাদ ও আরমান ভাইয়ের চরিত্রের সঙ্গে কাহিনীর সম্পর্ক আমি ঠিক বুঝলাম না। এছাড়া আমার মনে হয়েছে নিরাময়বাবুর চরিত্রটা এখানে হয়তো না আনলেও হতো।
থ্রিলার হিসাবে পড়তে খারাপ লাগে নি। কিন্তু কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা না পাওয়ায় সেই জায়গাগুলো আমার ভালো লাগেনি। তবে ধোঁয়াশার ওই বিষয়গুলো বাদ দিলে থ্রিলার প্রেমীরা বইটি অবশ্যই একবার পড়ে দেখতে পারেন। পাঠে থাকুন।
শুধু বড় বড় কথা লেখা। এটা থেকে নিজে লেখার টপিক পাইসি কিন্তু গল্পটা পইড়া ভাল্লাগে নাই। মূলত টাইমলাইন আগে পিছে করে সফল গল্প বলা যায় কিন্তু এইটা গুলায়ে ফেলসে সেইটারে। এক্সট্রা ইনফো দিয়ে ঝামেলা করে দিসে আর ট্র্যাক রাখা যায় না। যে আসা নিয়ে পড়তে বসছিলাম তার কোনোটাই পুরাপুরি পাইনাই। লেটডাউন। P.R. : 2.2/5