মাসকয়েক আগের কথা। একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল। বিবরণ নয়, আমাকে আকৃষ্ট করেছিল ছবিটা। সদ্যোজাত এক শিশুর দিকে এগিয়ে এসেছে দু'টি রক্তমাখা নখরযুক্ত হাত। ছবিটার দিকে তাকালেই বুক কেঁপে ওঠে আশঙ্কায়।
কী হবে ওই শিশুটির?
হরর, বা ভয়ের গল্পের মূল আকর্ষণই হল এই আশঙ্কা। কখনও তা আসে নিজেকে নিয়ে, কখনও সন্তান-পরিবার-পরিজনকে নিয়ে।
কখনও তা আসে মানবজাতির কথা ভেবে।
আলোচ্য কাহিনি দুই মহাবল অলৌকিক শক্তির মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। এর উপজীব্য বড়োই জটিল। তার ওপর ন্যারেটিভ অসরলরৈখিক। ঘটমান বর্তমান জ্ঞানে যা পড়ছি তা আসলে অনেক আগে ঘটে গেছে। যে আছে বলে ভাবছি, সে যে কোথায় আছে তা বোঝা সহজ নয়। উভয় শক্তিই নৃশংস, এবং মানবতা বা নৈতিকতার ধরাবাঁধা সংজ্ঞার বাইরে। তাদের আচরণ আমাদের ধাক্কা দেয়, ভয় দেখায়, বিমূঢ় করে ভাবায়, এই যুদ্ধে ভালো বা মন্দ বলে কি আদৌ কিছু আছে?
আর এই সাংঘাতিক পাশাখেলা, বা সাপলুডোয় ঘুঁটি হয়ে যায় বোলপুরের উপাধ্যায়বাড়ি, শীতের ছুটি কাটাতে সেখানে আসা দুই বোন, আর ওই গ্রামের এক ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। তার আশেপাশেই ঘটতে থাকে নানা রহস্যজনক ঘটনা আর মৃত্যু।
ঠিক কী ঘটছে এখানে? এই ঘটনার সঙ্গে কি কোনো সম্পর্ক আছে দেবী দিক্করবাসিনীর? রৌম্য কারা? ভৈরবই বা কে?
আর সব কথার শেষ কথা, কী হতে চলেছে প্রচ্ছদে চিত্রিত ওই নবজাতকের পরিণতি?
আগেও বলেছি, আবারও বলছি। এই গল্প আনপুটডাউনেবল হলেও সহজ নয়। এও বলি, প্রথাগত তান্ত্রিক হরর পড়তে চেয়ে এই বইয়ে ডুবলে বিপদ আছে।
কেন?
(১) বাংলা সাহিত্যে, আমার জ্ঞানত, এই প্রথম তন্ত্র যে আসলে একটি পোর্টাল, সেই ধারণাটিকে কোনো কাহিনিতে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা হল। শক্তিক্ষেত্রের ভৌগোলিক অবস্থান তথা জ্যামিতিক প্রক্ষেপণকে কাজে লাগিয়ে এই বইয়ে কিছু স্থান ও কালকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তন্ত্রের এই তুলনামূলকভাবে দুর্জ্ঞেয় অংশটি এর ফলে যেভাবে ফুটে উঠেছে, তার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।
(২) এই কাহিনি পুরোপুরি প্রাপ্তমনস্ক পাঠকের জন্য। এতে যৌনতা বা শরীরের উল্লেখ ঠিক সেভাবেই ঘটেছে যা তান্ত্রিক অভিচারে প্রযোজ্য, কিন্তু যার সঙ্গে আমাদের চেনাজানা ইরোটিক বিবরণের মিল নেই। অর্থাৎ শরীর এখানে একটা মাধ্যম বা আধার মাত্র। কিন্তু যে মুহূর্তে কোনো সম্পর্ক শরীর ছাড়িয়ে দেহাতীত আকার নিয়েছে, তখনই এই কাহিনি বিস্ফোরক স্পাইরালের আকারে কেন্দ্রীয় দুটি শক্তির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পড়তে গিয়ে আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বলশালী কলমের অধিকারীদের একজন, শ্রী অভীক সরকার-এর লেখা একটা কথাই বারবার মনে হয়েছে~ "ভালোবাসাই সবচেয়ে বড়ো তন্ত্র।"
এই কাহিনির দুর্বলতা কী-কী?
প্রথমত, লেখকের লেখনী এখনও 'ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস' অবস্থায় আছে। একে তো গল্পটা রীতিমতো জটিল। তায় এতে গল্প, কিংবদন্তি, হিসেব-নিকেশের সঙ্গে মিশেছে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, ভয়, সন্দেহ, কুসংস্কার, আবার কল্পনাতীত নিষ্ঠুরতা। ভাষাটা কিঞ্চিৎ কাঠ-কাঠ থেকে যাওয়ায় পড়ার অভিজ্ঞতা সবসময় সুখদায়ক হয়নি। মাঝেমাঝেই ছন্দপতন ঘটেছে।
দ্বিতীয়ত, এটা হররের সঙ্গে ফ্যান্টাসিকে যেভাবে মিশিয়েছে তা প্রশংসনীয় হলেও গোলমেলে। এতে যে-সব রূপক ও চিত্রকল্প এসেছে তাতে উইচার থেকে শুরু করে অনেক ঘরানা ছায়াপাত ঘটিয়েছে। লেখক এই ককটেলটি সযত্নে সামলেছেন। দুর্বল কলম এই জিনিস অনুসরণ করলে অখাদ্য-কুখাদ্যে বাজার ছেয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, কাহিনি এখানে শেষ হয়নি। গল্প যেখানে ও যেভাবে থেমেছে তাতে এটা স্পষ্ট যে লেখক আমাদের সবাইকে বলছেন, "পিকচার অভি বাকি হ্যায় দোস্ত।" উপন্যাসের শেষে এমন "অন্তরে অতৃপ্তি রবে" ভাব জাগলে আমার অন্তত পিত্তি চটকে যায়।
পাঠকদের কাছে অনুরোধ, এই রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারটিকে প্রাণভরে উপভোগ করুন। আপনারা বইটা দনাদ্দন কিনে নিলে লেখক "বাকি পিকচার" প্রদর্শনে হয়তো আগ্রহী হবেন।
বইটির মুদ্রণ সর্বার্থে প্রশংসনীয়। কয়েকটি অনভিপ্রেত বানান ভুল ছাড়া খুঁত ধরার মতো কিছু পেলাম না।
লেখক যে পাঠকদের জন্য ভালোবাসার পাশাপাশি সম্মান দিয়েও লেখাটিকে গড়েছেন তার প্রমাণ বইয়ের শেষে দেওয়া গ্রন্থপঞ্জি। আগ্রহী পাঠক সেটি অনুসরণ করে নিবিড় পাঠে উদ্যোগী হবেন নিশ্চয়।
সব মিলিয়ে বলতেই হয়, যদি আপনি কল্পনার ডানায় ভর দিয়ে প্রেম-পরকীয়া-যৌনতা নামক পারম্যুটেশন-কম্বিনেশন থেকে নিজেকে বের করে আনতে চান, তাহলে 'কালসন্দর্ভা' পাঠ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।
পাঠ শুভ হোক।