১৯৭১ সালে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করেন তাঁর জীবনের শেষ উপন্যাস ‘একটি কালো মেয়ের কথা’।
কাহিনির শুরু সীমান্তে গুপ্তচর সন্দেহে আটক এক যুবককে ঘিরে। পুলিশের জেরার মুখে সে উন্মোচন করে ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইটের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি। সেই ধ্বংসস্তূপ আর লাশের মিছিলে দাঁড়িয়েই পাঠকের সামনে উঠে আসে নাজমা নামের এক নারীর সঙ্গে তার জড়িয়ে পড়ার করুণ আখ্যান।
মাত্র সতেরোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই নাতিদীর্ঘ উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে একাত্তরের উত্তাল সময় এবং বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি কথাশিল্পীর শেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭১-এর নভেম্বরে, যা লেখক দেখে যেতে পারেননি।
Tarashankar Bandyopadhyay (Bangla: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়) was born at his ancestral home at Labhpur village in Birbhum district, Bengal Province, British India (now West Bengal, India). He wrote 65 novels, 53 story-books, 12 plays, 4 essay-books, 4 autobiographies and 2 travel stories. For his novel Arogyaniketan, he received the Rabindra Puraskar in 1955 and the Sahitya Akademi Award in 1956. In 1966, he received the Jnanpith Award for his novel গণদেবতা. He was honoured with the Padma Shri in 1962 and the Padma Bhushan in 1969.
Tarasankar is one of those writers of the third decades of the twentieth centuries who broke the poetic tradition in novels but took to writing prose with the world around them adding romance to human relationship breaking the indifference of the so called conservative people of the society who dare to call a spade a spade. Tarasankar’s novels, so to say, do not look back to the realism in rejection, but accepted it in a new way allowing the reader to breathe the truth of human relationship restricted so far by the conservative and hypocrisy of the then society.
He learned to see the world from various angles. He seldom rose above the matter soil and his Birbhum exists only in time and place. He had never been a worshipper of eternity. Tarasankar’s chief contribution to Bengal literature is that he dared writing unbiased. He wrote what he believed. He wrote what he observed.
His novels are rich in material and potentials. He preferred sensation to thought. He was ceaselessly productive and his novels are long, seemed unending and characters belonged to the various classes of people from zaminder down to pauper. Tarasankar experimented in his novels with the relationships, even so called illegal, of either sexes. He proved that sexual relation between man and women sometimes dominate to such an extent that it can take an upperhand over the prevailing laws and instructions of society. His novel ‘Radha’ can be set for an example in this context.
His historical novel ‘Ganna Begum’ is an attempt worth mentioning for its traditional values. Tarasankar ventured into all walks of Bengali life and it’s experience with the happenings of socio-political milieu. Tarasankar will be remembered for his potential to work with the vast panorama of life where life is observed with care and the judgment is offered to the reader. and long ones, then any other author. He is a region novelist, his country being the same Birbhum. He mainly flourished during the war years, having produced in that period a large number of novels and short stories.
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখিত প্রথম উপন্যাস এটি উপন্যাসে পট উন্মোচিত হয়েছে নাজমা নামের একটি মেয়েকে নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম কালে ‘স্পাই’ হিসেবে ধরা পড়া ডেভিড আর্মস্ট্রং এর ভারতীয় পুলিশ-অফিসারের সামনে জবানবন্দি উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে। জবানবন্দিতে ডেভিড বলেছে :
‘..... এরই মধ্যে এই দেশটাকে এমন করে ভালবেসে ফেললাম যে এই আমার সব থেকে ভোলো দেশ, এর থেকে ভালো দেশ আর নেই। আর এই দেশই আমার দেশ।’
সংগীত শিল্পী ও ট্রানজিস্টার-মেকানিক ডেভিড ভিক্ষাজীবী পিতার কন্যা নাজমার সঙ্গে সঙ্গীত-প্রতিভায় বিমুগ্ধ ছিল। এই নাজমাই পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর তাঁবেদার এক পাঞ্জাবির বলাৎকারের শিকার হয়। নির্যাতিতা ও সন্তানহারা কালো মেয়ে নাজমা ১৯৭১-এর বাংলাদেশের প্রতিরূপক হয়ে উঠেছে উপন্যাসে। তবে, উপন্যাসটিতে ব্যক্তিগত কথকতা ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে পূর্ব বাংলার সমাজ-রাজনীতি, গণহত্যা ও বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধ।
তারাশঙ্করবাবুর লেখার স্পেশাল টাচ হচ্ছে তার সাবলীলতা। সহজ বাক্যে সহজ করে বর্ণনা। এই বইতেও তার কামতি ছিল না। বইটির প্রেক্ষাপট ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভয়াবহতা সহজ ভাষায় বর্ণনা করলেও পাঠকের কলিজায় নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধের অনেক বই নিয়ে অনেক কথা হলেও কেন জানি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাসটি কিছুটা অবহেলিত রয়ে গিয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা প্রথম উপন্যাস তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের "একটি কালো মেয়ের কথা।" অনেকে আবার বলে থাকেন মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা প্রথম উপন্যাস আনোয়ার পাশার "রাইফেল, রোটি, আওরাত"।
তবে প্রকাশকালের দিক থেকে নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস একটি কালো মেয়ের কথা। উপন্যাসটি ১৯৭১ সালের কলকাতার একটি পত্রিকা উল্টোরথের পূজাসংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে রাইফেল, রোটি, আওরাত প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে।
মুক্তিযুদ্ধের মত একটি অপরিহার্য বিষয় লেখা প্রথম উপন্যাস কোন এক অজানা কারণে যেন কিছুটা অবহেলিত। এই উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা প্রায় চোখেই পড়ে না।
অনেকে বলে থাকে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাহাড়সম সাহিত্যসৃষ্টির আড়ালে তুলনামূলক কম মানসম্পন্ন এই উপন্যাসটি ঢাকা পড়ে গেছে। কিন্তু সেটা যদি হলেও শুধু পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের এমন মনে হওয়া উচিৎ, আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের উত্তরসূরি তাদের কাছে এমন মনোভাব আসা উচিৎ কি?
উপন্যাসটি মূলত উত্তম পুরুষের নেয়া হয়েছে। কথকের নাম ডেভিড আর্মস্ট্রং ওরফে মনসুর আলী। পশ্চিমবঙ্গের সীমানা পাড়ি দেবার সময় ডেভিড গুপ্তচর সন্দেহে ধরা পড়ে। তার সাথে ছিল একটি কালো মেয়ে, নাজমা। একটি পুলিশ অফিসার তাকে গুপ্তচর সন্দেহে জেরা শুরু করে। আর অফিসার আর ডেভিডের এই জেরার কথোপকথন নিয়েই মূলত পুরো উপন্যাসটির ব্যাপ্তি।
২৫ শে মার্চের যে নৃশংসতা ডেভিভের মুখের কথায় আমরা জানতে পারি সেটাই ছিল ঐ কালোর রাতের প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস আকারে বর্ণণা। এই রাতের থেকে মূল প্রেক্ষাপট শুরু হয় উপন্যাসটির। শিরশির করে ওঠে প্রতিটা লাইন পড়লে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে। লাইন দিয়ে দাঁড়ানো অল্প বয়সী উলঙ্গ তরুণী, সারি দিয়ে খানসেনার ধর্ষণ, ধর্ষণ শেষে গুলি করে কিংবা তরুণীদের হত্যা। কি বীভৎস!!
যে পাঠকদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ন্যূনতম আগ্রহ আছে তারা অবশ্যই পড়বেন বইটি। শত হলেও এই উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রচনা করা হয়েছে।
'একটি কালো মেয়ের কথা'- মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা প্রথম উপন্যাস। চলিত ভাষায়, অত্যন্ত সহজ সরল ভঙ্গিমায় লেখা এই বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকের বিশেষ করে ২৫ মার্চের কাল রাত্রির ভয়াবহতা বেশ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন লেখক । বইটির নামকরণের একটি আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। ভালো লেগেছে বেশ ।
"আমি আমার ঈশ্বরকে ডাকলাম-ক্রায়েস্টকে ডাকলাম,আল্লাহতায়ালাকে ডাকলাম, পয়গম্বর রসুলকে ডাকলাম, হিন্দুর ঈশ্বরকেও ডাকলাম। নাজমাকে বাঁচাও। জীবনের মধ্যে একটি ভিখিরীর মেয়ে, কালো মেয়ে একটি মজুর আদমীর স্ত্রী আমাকে বড়ভাই বলে আমাকে সজ্জন জেনে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে আত্মরক্ষারজন্য। আমি দুর্বল আমি অসহায় তােমরা বাঁচাও তাকে। তােমরা বাঁচাও।" "......... নাজমা কয়েকবার মানুষকে ডেকে ঈশ্বরকে ডেকে আর চিৎকার করেনি।চিৎকার করেনি নয়, চিৎকার করতে পারেনি।ও অজ্ঞান হয়ে গেছে।"
আহহহ...কি নির্মম!
প্রকাশকালের দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের "একটি কালো মেয়ের কথা"।১৯৭১ সালে এটি প্রকাশ পায়।
গল্পের নায়ক ডেভিড আর্মস্ট্রং।ভারতের সীমান্ত পার হয়ে ঢোকার সময় স্পাই সন্দেহে ভারতীয় অফিসারের কাছে ধৃত ডেভিডের জবানবন্দি নিয়েই এই উপন্যাসটা রচিত।কেন পাকিস্তানি খ্রিস্টান হয়েও সীমান্ত পারি দিলো কিংবা কেন তার সাথে ওই কালো মেয়েটি, কী তাদের সম্পর্ক ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তরে ষাটের দশকের পূর্ব বাংলার সামাজিক রাজনৈতিক চিত্র আমরা দেখতে পাবো পুরো উপন্যাস থেকে।
এই উপন্যাসের ঘটনাকাল একাত্তরের মার্চ-এপ্রিল,ঘটনাস্থল পূর্ব বাংলা। বংশ পরিচয়ে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান হয়েও পারিবারিক সমস্যায়,বিভিন্ন কাজের সুবাদে ঘটনাচক্রে পূর্ব বাংলায় এসে পড়ে ডেভিড!তার কাছে এটি ছিল পুনর্জন্মের মতো একটি ব্যাপার। ডেভিডের জবানিতে ব্যাপারটি এমন, " I may say I was reborn.Yes, it was rebirth." এদেশের প্রকৃতি,ভাটিয়ালি গানের সুরে মুগ্ধ ডেভিড বিয়ে করে মায়াকে,গড়ে তোলে "বাসা" ইংরেজিতে " The Nest" নামক একটি বাড়িতে তাদের সংসার। আবার হঠাৎ করে মায়াকে হারিয়ে সন্ন্যাসীর মতোও হয়ে পড়ে ডেভিড।তার ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশের আড়ালে মূর্ত হয়ে উঠতে থাকে সেই সময়কার ভয়ানক অবস্থা।তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসে তুলে ধরেন ২৫শে মার্চের সেই দীর্ঘ ভয়ানক রাতের কথা,দিয়েছেন সেই রাতের নৃশংসতার বিবরণ, যেটা পড়তে পড়তে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সারিবদ্ধ উলঙ্গ নারীদের রাস্তায় ফেলে ধর্ষণ,ধর্ষণের পর গুলি করে হত্যা,পেট কেটে ফেলে রাখা,নগ্ন শরীরে আকাশের দিকে মুখ করে পড়ে থাকা মৃতদেহের দৃশ্য। সে রাতের পর পালাতে গিয়ে ডেভিডের দেখা হয় পূর্ব পরিচিত নাজমার সাথে।মোড় নেয় ডেভিডের পরিকল্পনা। না��মাকে বাঁচাতে ছুটতে থাকে নাজমাকে নিয়ে। নাজমাকে একটা নতুন জীবন দেয়ার অঙ্গীকারে সে ছুটে চলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত নাজমা নামের এই আশ্চর্য কালো মেয়েটি হয়ে ওঠে ১৯৭১ এর পূর্ব বাংলার নির্যাতিত, নিপীড়িত, সম্ভ্রম দানকারী মা,বোনেদের প্রতীক। পড়তে পড়তে যখন উপন্যাসের শেষে এসে ডেভিড বলতে থাকে "আমি স্পাই নই,স্পাই শব্দটাকে আমি ঘৃণা করি।আমি নাজমাকে নিয়ে এসেছি।ও একটি আশ্চর্য কালো মেয়ে - ওকে আমি ভালোবাসি। ওকে আমি আবার ওদেশে ফিরে নিয়ে যাবো..।" তখন স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়।
ভীষ্মদেব চৌধুরী স্যারের ভাষায় " তবে ওই সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি কথাকোবিদ তারাশঙ্কর। শিল্পীর সংবেদনাকে শিল্পরূপ সৃজনের অভীপ্সায় রূপান্তরিত করেছিলেন তিনি। তাঁর হাতেই রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে লেখা প্রথম উপন্যাস : একটি কালো মেয়ের কথা। "
This entire review has been hidden because of spoilers.
"কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে, কালো মেঘের কালো হরিণ-চোখ। ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে, মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।"
জীবনের শেষ সময়ে এসে, লেখকের দায়বোধ থেকে রোগশয্যাতে জর্জরিত অশান্ত ও উদ্বিগ্ন তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় নাজমা নামক এক কালো মেয়েকে হাজারো নির্যাতিতা নারীর প্রতীকরূপে উপস্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর পর্বের পাক হানাদারদের বিভৎসতাকে চিত্রিত করেছেন। তিনি বলেছেন এক গল্প, এক কালো মেয়ের গল্প।
🍁 নাজমার কথা:
নাজমা মায়া জড়ানো একটি অদ্ভুত ধরনের কালো বর্ণের মেয়ে। সে এক প্রায় অন্ধ ভিখিরির ঘরের সন্তান, যার কাজ ছিল বাবার হাত ধরে রাস্তায় গান গেয়ে গেয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করা। তাঁরা উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ডেভিড আর্মস্ট্রং এর বাড়িতে আশ্রিত ছিল। এভাবেই ডেভিডের সাথে নাজমার পরিচয়। যদিও যৌবন বয়সে নাজমা তাঁর প্রেমিকের হাত ধরে চলে যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নাজমার স্বামী গুলি খেয়ে মারা যায়, নাজমার কোলে রেখে যায় একটি দুধের শিশু সন্তানকে। কাকতালীয়ভাবে কিছু দিন পর নাজমার সাথে পুনরায় দেখা হয় ডেভিডের। ডেভিডের উপরই বর্তায় নাজমা ও তাঁর শিশু সন্তানকে রক্ষার ভার।
নাজমাকে নিয়ে পালাতে গিয়ে ডেভিড ধরা পড়ে যায় ইমিগ্ৰেশনে। অফিসারের জেরার মুখে পড়ে তাঁরা। নাজমাকে বাঁচাতে পারবে তো ডেভিড শেষমেশ? তাঁরা তো ছিল ছদ্মবেশে। সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়।
🍁ডেভিড আর্মস্ট্রং এর কথা:
ডেভিড আর্মস্ট্রং একজন এঙ্গলো ইন্ডিয়ান যার বাবা ছিলেন এঙ্গলো ইন্ডিয়ান এবং মা বাঙালি খ্রিষ্টান। স্বপ্নবিলাসী বাবা ছিল ইয়ার্ড অফিসার আর মা হাসপাতালের নার্স। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর তাঁরা করাচি চলে যায় কিন্তু কিছু দিন পর মা মারা যায়।
ডেভিড শৈশব থেকেই বাবা-মায়ের স্নেহ আদর থেকে বঞ্চিত এক শিশু। মিশনারি স্কুলে ছিল অনেক কড়াকড়ি নিয়ম এবং রীতিমতো ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানে যোগ দেওয়া ছিল বাধ্যবাধকতা। কিন্তু ডেভিডের ধর্মীয় আচারাদি ভালো লাগত না, ধর্মের প্রতি তাঁর তেমন জোরালো বিশ্বাসও ছিল না, ভক্তিও ছিল না। এজন্য ধর্মীয় কাজে ছিল তাঁর প্রচণ্ড অনীহা। পক্ষান্তরে, লেখাপড়াতেও ছিল অমনোযোগী। মা-বাবার আদর-সোহাগবঞ্চিত শিশুরা এ-রকম অমনোযোগী হবে তা স্বাভাবিক। লেখক চরিত্রটিকে এভাবেই বিশ্বস্ত ও বাস্তবধর্মী করে নির্মাণ করেছেন।
টাকার অভাব, খাবার কেনার টাকা পর্যন্ত নেই এমন দুরবস্থায় বিপর্যস্ত কিশোর ডেভিড চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। বাল্ব চুরি করে ক্ষমা পেয়েছিল সে। কিন্তু তারপর আরও দুইবার চুরি এবং বিছানার নিচে আজেবাজে কাগজপত্র পাওয়াতে তাঁকে হোস্টেল থেকে বের করে দেওয়া হয়। সে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ছিল, গান করতে পারত, গজল গাইতে পারত, গান রেকর্ডও করতে পারত। ঘটনাচক্রে এক বৃদ্ধ দম্পতির সঙ্গে দেখা হয় এবং সেখানেই থেকে যায় সে। ওদের মনসুর নামে একটি ছেলে যে মারা যাওয়ার পর স্বভাবতই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল এবং ডেভিডকে আপত্য স্নেহে ঘরে স্থান দেয় এবং মৃত ছেলে মনসুরের নামটি তাঁকে দেওয়া হয়।
ওরা মনসুর নামে তাঁকে ডাকত। ওদের সঙ্গে কিছুদিন থাকার পর এক সময় ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে চাকরি হয়। ঘটনাচক্রে, এই অফিসে অফিসার জাফরুল্লাহর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। গজল গাওয়ার গুণের কারণে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। এক পর্যায়ে ষাটের দশকের শুরুর দিকে জাফরুল্লাহ তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসার জন্য প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তখন না এলেও পরে ডেভিড পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে।
🍁জাফরুল্লাহর কথা:
এই আখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র জাফরুল্লাহ। সে লাহোরের এক খান্দানি পরিবারের লোক। ডেভিডের কোম্পানির অফিসার ছিল, আমোদফুর্তি করেই সময় কাটাত। ক্রিকেট, গানবাজনা, শিকার, বেড়ানোই ছিল তাঁর নেশা। লাহোর-করাচী ও রাওয়ালপিন্ডিতে ঘুরে বেড়াত মনের আনন্দে। জাফরুল্লাহ ১৯৬২ সালের দিকে পূর্ব পাকিস্তানে নিজে কোম্পানি করার জন্য চলে আসে। জাফরুল্লাহ চরিত্রের মাধ্যমে লেখক তৎকালীণ পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের দাপট ও নব্য সামন্ত-মানসিকতা এবং অর্থনৈতিক শোষণের কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
🍁পাঠ প্রতিক্রিয়া:
বাংলা কথাসাহিত্যে তারাশঙ্করকে বাদ দিয়ে সাহিত্যালোচনা ফিকে হয়ে যাবে। তাঁর সৃষ্টিসম্ভার শুধু বিপুল নয়, ধ্রুপদী ধারার সাহিত্য সৃষ্টি করেও তিনি বাংলাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি ভারতীয় লেখক। তবে কেবল ভারতের বাংলাভাষাভাষী সাহিত্যানুরাগীদের কাছে নন, বাংলাদেশেও তিনি সমান জনপ্রিয় এবং সাহিত্যিক-মর্যাদা লাভ করেছেন। তাঁর এক অমূল্য সাহিত্যকর্ম এই বইটির বিষয়।
এই উপন্যাসের নির্মাণ ভিন্ন ধারার, চরিত্রগুলো বিচিত্র ভাষা সরল ও সহজবোধ্য হলেও বাংলা ইংরেজি ও উর্দুর মিশ্রণ রয়েছে ডেভিডের সংলাপে যা বেমানান মনে হয়নি। বরং ডেভিডের চরিত্রকে আরও জীবন্ত ও বিশ্বস্ত করে তোলা হয়েছে। সর্বোপরি, বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম গ্রন্থকারে প্রকাশিত উপন্যাস হিসেবে এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের গবেষণায় এটি অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। তারাশঙ্করের অন্যান্য উপন্যাসের ভাষানির্মিতি এবং বর্ণনার সঙ্গে অনেক পাঠকের কাছে এই উপন্যাসের কিছুটা খামতি মনে হতে পারে।
কিন্তু এর ভিন্ন নির্মাণ কাঠামো, প্রধান চরিত্র ডেভিডের সংলাপের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ উপন্যাস রচিত হওয়ায় এর আবেদন ও মেজাজ পাঠককে পূর্ণ সন্তুষ্টি দিতে সক্ষম। সর্বোপরি বলা যায়, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও লক্ষ লক্ষ মানুষের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের পরিপূর্ণ উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া গেলেও পাঠককুল এই উপন্যাসে যুদ্ধের পটভূমি ও ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারবেন।
২৫ শে মার্চের যে নৃশংসতা ডেভিভের মুখের কথায় আমরা জানতে পারি সেটাই ছিল ঐ কালোর রাতের প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস আকারে বর্ণনা। এই রাতের থেকে মূল প্রেক্ষাপট শুরু হয় উপন্যাসটির। শিরশির করে ওঠে প্রতিটা লাইন পড়লে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে। লাইন দিয়ে দাঁড়ানো অল্প বয়সী বিবস্ত্র তরুণী, সারি দিয়ে খানসেনার ধ র্ষণ, ধ র্ষণ শেষে গু লি করে কিংবা তরুণীদের হ ত্যা। কি বীভৎস!!
কিছু বই আছে যেগুলো পড়লে মেয়ে হিসেবে ভয়ে-কষ্টে-লজ্জায় গা শিউরে ওঠে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের “একটি কালো মেয়ের কথা” তেমনি একটি বই। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখিত প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র নাজমা মায়া জড়ানো একটি অদ্ভুত ধরনের কালো বর্ণের মেয়ে। সে এক প্রায় অন্ধ ভিখিরির ঘরের সন্তান, যার কাজ ছিল বাবার হাত ধরে রাস্তায় গান গেয়ে গেয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করা। তারা উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ডেভিড আর্মস্ট্রং এর বাড়িতে আশ্রিত ছিল। এভাবেই ডেভিডের সাথে নাজমার পরিচয়। যদিও যৌবন বয়সে নাজমা তার প্রিয়তমের হাত ধরে চলে যায়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নাজমার স্বামী গুলি খেয়ে মারা যায়, নাজমার কোলে রেখে যায় একটি দুধের শিশু সন্তানকে। কাকতালীয়ভাবে কিছু দিন পর নাজমার সাথে পুনরায় দেখা হয় ডেভিডের। ডেভিডের উপরই বর্তায় নাজমা ও তার শিশু সন্তানকে রক্ষার ভার। কিন্তু ১৯৭১ মানে ❝gates of hell have been thrown open and devils are out❞ অর্থাৎ, বাংলাদেশের চারিদিকে তখন পাকিস্তানি নরপিশাচদের ও দেশী কালসাপ রাজাকারদের সম্মিলিত তান্ডব চলছে কারণ, ❝দুনিয়াতে মানুষ যখন জানোয়ার হয়ে হাতিয়ারের দাঁত-নখ নিয়ে খুনখারাপী খেলায় মাতে তখন কোন কানুনের ধার সে ধারে না❞। এমতাবস্থায় নাজমাদের সুরক্ষিত রাখার প্রয়াসে ডেভিড ওপার বাংলায় পাড়ি দিতে যেয়ে ভাগ্যের চরম পরিহাসে শেষমেশ পাক-বাহিনীর হাতে ধরা পড়েই যায়। পাকিরা এদেশের কালো মেয়েদের ভোগপণ্য হিসেবে খুব পছন্দ করতো যা বোঝা যায় পাকি সেনাবাহিনীতে ডেভিডের পূর্বপরিচিত জাফরউল্লাহ নামের লোকের বয়ান থেকে, ❝I like bengali girls―black bengali girls. আমি এখানে আজ ক'বছর হলো এসেছি।এখানে আমার এক আশ্চর্য হারেম আছে। কালো গরীব মেয়েদের নিয়ে আমার সে হারেম। এদের হারেমে রাখি কেন জানো? যখন ওদের দিকে তাকাই তখন মনে হয় আমি ওদের যুদ্ধ করে জয় করে এনেছি।❞ সেই পাঞ্জাবি ব্যক্তির নজরে পড়ে যায় নাজমা, যে সকলের সামনে নাজমার শুধু উপর্যুপরি বিকৃতভাবে সম্ভ্রমহানিই করেনি, নির্মমভাবে হত্যা করে তার শিশু সন্তানকেও। সন্তানশোক-বিহ্বলা কালো মেয়ে নাজমা ১৯৭১-এর বাংলাদেশের প্রতিরূপক হয়ে উঠেছে এই উপন্যাসে। #একটি_কালো_মেয়ের_কথা #তারাশঙ্কর_বন্দ্যোপাধ্যায়
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস। ঘটনাপ্রবাহ সামান্য কিন্তু ভয়ংকর। বীভৎস।
ডেভিড আর্মস্ট্রং অথবা মনসুর আলীকে পশ্চিমবঙ্গের রিফিউজি ক্যাম্পে দেখা গেল। তার সুরত আলাপ করেই উপন্যাস শুরু। এর কারণও আছে। দেখতে সে বঙ্গের লোক নয়। অথচ তার সাথে একটি মেয়ে আছে— নাম, নাজমা। পাকিস্তানির নির্যাতনে জর্জরিত।
পুলিশ সন্দেহ করে সে একজন স্পাই। ডেভিস মাথা নাড়ে, বলে, না! সে স্পাই না।
সে শুরু করে তার কাহিনী। এই মেয়েটির সাথে কী সম্পর্ক? বলতে থাকে।
প্রথমে ঘটনা সামান্য বললেও ঘটনা সামান্য হয় না। এর ব্যাপকতা থাকে। বিস্তৃতি থাকে।
ডেভিড তেমনি একজন। রিফিউজি ক্যাম্পে জিজ্ঞাসাবাদের আগপর্যন্ত ছিল এক চমকপ্রদ ইতিহাস। কীভাবে সে বাংলাদেশে আসল। থাকল। মেয়েটার সাথে পরিচয় হলো! সবকিছুই চমকপ্রদ।
তবে, এই চমকপ্রদের মাঝেও আছে এক অপ্রত্যাশিত জুলুমের ঘটনা। ২৫শে মার্চ থেকে সেই নারকীয়তা শুরু হয়ে চলেছিল নয় মাস। সেই বর্ণনা আছে এখানে। বিশেষত ২৫শে মার্চ, ২৬শে মার্চের বর্ণনা রয়েছে বেশি।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখিত প্রথম উপন্যাস ‘একটি কালো মেয়ের কথা’ বিলো এভারেজ একটা উপন্যাস। প্রপাগান্ডামূলক, অতিরঞ্জিত। তবে চেষ্টাটা ভালো ছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতীয় প্রপাগান্ডা এবং ন্যারেটিভের প্রথম চেষ্টা হিসাবে যথেষ্ঠ ভালো।
এটি একজন পাকিস্তানি খ্রিস্টান যুবকের স্মৃতিচারনমূলক উপন্যাস যার পরিচয়টিও অদ্ভুত। ইংরেজ বাবা, ভারতীয় বাঙালী মায়ের একজন পাকিস্তানি সন্তান হয়ে তার বাংলাদেশি বাঙালী হয়ে যাওয়ার গল্প এ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। তার এ স্মৃতিচারণের কারণ মূলত গোয়েন্দা সন্দেহে গ্রেফতার হয়ে এক ভারতীয় পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দি। কিভাবে ভালোবাসার মাধ্যমে নিজের পরিচয় পরিবর্তন করে ফেলা যায় আবার সে ভালোবাসা হারিয়ে ভবঘুরে হয়ে এই বাংলাদেশের সৌন্দর্য অবলোকন করে বেড়ানোর পর আগের জায়গায় ফেরত যাওয়া, মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও এক অনাথ মেয়ের প্রতি মায়ায় পড়ে তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করা- এসবই সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ উপন্যাসে। এখানে ২৫-ই মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অকল্পনীয় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বর্ননা ফুটে উঠেছে। চারিদিকে চিৎকার, গুলির শব্দ, লাঞ্চনা-ধর্ষনের কারণে মা-বোনেদের আর্তনাদ এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। নাজমা নামের মেয়েটির ধর্ষণ করে তার বাচ্চা ছেলেকে মেরে ফেলার পরও তার বেচে থাকার তীব্র আকাঙ্খা, নতুনভাবে জীবন গড়ার ইচ্ছা উপন্যাসের শেষের দিকে করুণ দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। "ডেভিড আর্মস্ট্রং ওরফে মনসুর আলির" জবানেই উপন্যাসের মূল প্রবাহ টেনে নেওয়া হয়েছে। উপন্যাসটি দৈর্ঘ্যে তুলনামূলকভাবে ছোটো হলেও পাঠকের মনে এর গভীর ছাপ রেখে যেতে সক্ষম।