Kaberi Dutta Chatterjee's Blog: Life and Laughter, page 10

March 4, 2019

ক্ষমতার অপব্যাবহার না করে একটু বোকা হও ভারতীয় মিডিয়া

“কর চলে হম্‌ ফিদা জানে-তন সাথিয়োঁ…


অব্‌ হমারে হওালে ওতন সাথিয়োঁ…”


[image error]


এই দুটো পন্থি আমূলের উপযুক্ত শ্রদ্ধার্ঘ আমাদের বীর সেনাদের প্রতি। ৩৭ সিয়ারপিএফ সেনা তাঁদের ছুটি কাটিয়ে আবার দেশের সেবা করার উদ্দেশে রওনা দিচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁরা তাঁদের তন, অর্থাৎ, শরীর দান করে দিলেন দেশের জন্য। এবার আর তাঁরা নেই। এবার আমাদের হাতে আমাদের দেশ। কি করবে, দেশবাসী?


যুদ্ধ, না আবার কথার প্যাঁচ? না কি, ব্যাপারটা আবার থিতিয়ে যাবে প্রত্যেকবারের মতোন?


কাশ্মীরে ২০১৭ সালে সার্জিক্যাল হামলার পর বুকে বল এসেছিল। মনে হয়েছিল এই বার ঠিক হয়েছে। এই বার এই আতঙ্কবাদীরা শিক্ষা পেয়েছে। দেশে শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদীদের লজ্জা নেই। আবার ভারতের ল্যাজে পা দিয়েছে। আর যে যাই বলুক, নির্বাচন সামনে, বিরোধী দল সাথে, আমার এই লেখাটা যতদিনে ওয়েবসাইটে উঠবে, ততদিনে একটা মহা কান্ড না ঘঠিয়ে বসে ভারত সরকার। আমার এই লেখাটা চলাকালীন পুলওয়ামার হামলার মাস্টারমাইন্ড, গাজী আব্দুল রশীদ, সহ দুই জইশ-ই-মোহাম্মদ সন্ত্রাসীদের ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর এক মুখোমুখি সংঘর্ষে হত্যা করেন। কিন্তু আমাদের এক মেজর সহ চার সেনার বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছে। মানে, যুদ্ধ ঘোষণা হোক না হোক, লড়াই এখন সপ্তমে দেশ সীমান্তে। শুনছি ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স তাদের ওয়েবসাইট হ্যাক করেছে।


এদিকে ক্যানাডায় টিভিতে বসে পাকিস্তান সংবাদমাধ্যমদের দেখে মনেই হচ্ছেনা তাদের কিছু এসে যাচ্ছে। “ওই যে ওদিকে কে একটা যেনো যাচ্ছে?” গোছের ভাব। কিরকম মস্তানের মতোন, “হুঃ, যত দোষ নন্দ ঘোষ, না?” বলে ভারতের দিকে পিছন ফিরে তড়িঘড়ি আরবের প্রিন্স সলমনকে অভ্যর্থনায় ব্যাস্ত তারা। একঘরে হবার কোন ভয়ই দেখছিনা। উল্টে, কতো মিলিওন ডলার প্রাপ্তি হবে সেই নিয়েই ওদের মিডিয়া সরব।


ক্যানাডায় ভারতীয়রা অনেকেই পাকিস্তান দোকান থেকে জিনিষ কেনায় নিষেধাজ্ঞা জাহির করলেও আমার মনে হয়না সেটা ধোপে খুব একটা টিকবে। এখানে ভারতীয়-পাকিস্তানী ভাই-ভাই। কারুর মধ্যে প্রকোট হিংসা নেই। চাপা দ্বেষ হয়তো আছে, কিন্তু চাপানউতোর নেই। বরফ কেটে, জীবন-সংগ্রামে সকলে ব্যাস্ত, কেউ ঝামেলা চায়না।


তবে দেশের সরকার যাই ঘটাক, আমরা সাথে। দূরে থাকি, কাছে থাকি, আমরা অনাবাসী ভারতীয়রাও মনে, প্রাণে দেশে, আমাদের বীর সেনাদের সাথে। দরকার পড়লে প্লেন ধরে পাড়ি দেব দেশে। “জয় হিন্দ” আমাদের রক্তেও।


আরব দেশের প্রিন্স সলমন তো করাচীতে গিয়ে ইমরানের গলা জড়িয়ে ধরল, পরের দিন দিল্লী । আবার বিজিংও যাচ্ছে। সাপের মুখে, ব্যাঙ্গের মুখে, ব্যাঙ্গমার মুখে, সর্বত্রই চুমু খাচ্ছে। কি আর করবে? সকলেরই ব্যাবসা। দেশ ব্যাবসা।


সীমান্তে আক্রমনে দেশজুড়ে হইচই। স্যোশ্যাল মিডিয়া সরগরম। সারা দেশে তো রাতদিন ১.৩ কোটি মানুষ লাফাচ্ছে । ভোর থেকে উঠে স্যোশাল মিডিয়ায় দাপাচ্ছে আর ভূ-ভারতকে তাতাচ্ছে। সীমান্তে গিয়ে লড়তে বলো, তখন হাজারও ব্যাস্ততা। “ওই যে ওদিকে কে একটা যেনো যাচ্ছে?” গোছের অজুহাত।


সংবাদমহল তো যেভাবে তাদের কথায় রোজ রোজ অঙ্ক কষছে, এবং সরকারকে এতো রকম রাস্তা দেখাচ্ছে, তাতে যাদের সেটা জানার কথা না, তারাও পাঁচিলের ওপাড়ে বসে মজা দেখছে আর হাসছে। “ও আচ্ছা, ওই জানলা দিয়ে ঢুকবে? ওখানে আরডিএক্স বসা।” “আচ্ছা, এই দরজা দিয়ে আসবে, এখানে এই শেল লাগা।” সরকারও বেকুব। যে রাস্তার কথাই ভাববে বলে ভাবছেন, তাদের ভাবার আগেই কোন না কোন সাংবাদিক বা চ্যানেল সেটা নিয়ে বিশ্লেষন করে, বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে, এক্কেবারে খই ভেজে হাতে করে মোয়া বানিয়ে দিচ্ছে শত্রুকে।


আমরা জানি তোমাদের চ্যানেল সবচেয়ে চালাক, কিন্তু এই সময় একটু বোকা হলে হয়না? একটি শান্ত হলে হয়না? এই সরকারই তো সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হেনেছিল। আমাদের যোদ্ধারাই তো মোক্ষম জবাব দিয়েছিল। তাদের ওপর একটু ভার দিলে হয়না? আর কোন কোন গোপন রাস্তা আছে গো শত্রুদের শেষ করার? সেগুলোও বলে ফেলো প্রকাশ্য সংবাদমাধ্যমে।


তবে গত সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পর অন্তত এটা ভরসা হয়েছে যে দেশ আমার কাপুরুষ নয়। “যাঃ, তোর সাথে ক্রিকেট খেলবোনা!” “যাঃ তোদের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করবনা”, “এই! বারণ করেছিলাম না আমার দিকে আসবিনা? আবার এলি? যাঃ আব্বুলিশ!” বা “ইমরানের সব ছবি নামাও!” এই জাতিও ধমকানিতে অভস্থ্য ছিলাম ছোটবেলা থেকে। হঠাৎ সত্যি সত্যি হানা দিয়ে ফেলে বেশ গর্ব এনে দিয়েছিল মনে। ভাবলাম, বাঃ, এই তো আমার দেশ! আমেরিকা কি ছেড়ে দিয়েছিল বিন লাদেনকে? না ছেড়েছিল সাদ্দামকে? ক্যানাডাও গত মাসে কিউবেক মসজিদে হানা আনা আলেকজান্ডার বিসোনেটকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। আমরাও পারবো। ধরতে আফজল গুরুকে, দাউদ কে। দেবো শাস্তি। বিজয় মালায়া কি পালাতে পারল? না পেরেছিল আজমল কসভ?


কিন্তু মিডিয়াকে শান্ত হতে হবে। একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে সব রাস্তা যদি সর্বপ্রকাশে সবাইকে দেখিয়ে দেয়, তো আমাদের জওয়ানদের এবং সরকারের পক্ষে কোনো কার্যকরি এবং শীঘ্র পদক্ষেপ আনা খুব মুশকিল হবে।


আমেরিকা কি বিন-লাদেনকে ধরতে পারতো যদি সর্বত্র তা আগের থেকে ঘোষণা করা হত?


ভারতের মিডিয়াতেই আমি সারা জীবন ছিলাম, এবং জানি কি হয়। কি ভাবে বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্যও একে অপরের সাথে পাল্লা দিতে হয়। আমার মনে আছে ২০০৪ সালে ধনঞ্জয় চ্যাটার্জির ফাঁসির সময় খবরের কাগজ এবং চ্যানেল তার পরিবার এবং তার কার্যকলাপ নিয়ে যেভাবে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছিল, তাতে অনেক সময় মিডিয়ার ক্ষমতার অপব্যাবহার নিয়ে প্রশ্ন জেগেছিল। একটা ছবি আমার এখনও মনে আছে, দেখে শিউরে উঠেছিলাম। ধনঞ্জয়রে বাবা ছিলেন পূজারী। তার ফাঁসির দিন যত এগিয়ে আসছিল, ততই বিভ্রান্ত হয়ে উনি মা-কালির মন্দিরে পড়ে ছিলেন। এদিকে চারিপাশে ফোটগ্রাফার। বিভ্রান্ত অবস্থায় একবার তার নিম্নাঙ্গের বস্ত্র খুলে পড়ে যায়। আমাদেরই কাগজের এক ফোটগ্রাফার তার এই অবস্থায় ছবি তোলে এবং সেটা কাগজে ছাপা হয়। আমি তখন অন্য নিউজ ডেস্কে। ছবিটা দেখে জিজ্ঞ্যেস করেছিলাম, “এটা নিবি?” উত্তর এসেছিল, “হ্যাঁ। অফ কর্স!” সেদিন আমার লজ্জার মাথা কাটা গিয়েছিল। এই মিডিয়ার একটা অঙ্গ আমি?


আসলে সবটাই ব্যাবসা। তাই কোথায় যে দাগ কাটতে হয়, সেটা বোঝার জন্য যে মানবিকতার প্রয়োজন তা অনেকটাই ধুলিস্যাৎ হয়ে যায় বিজ্ঞাপন পাওয়ার প্রতিযোগিতায়। ‘বেস্ট’ হওয়ার প্রতিযোগিতায়।


২০০৮ এর মুম্বাই হামলার সময় আমার চারিপাশে খালি মৃতর গল্প। আমি তখন আন্তর্জাতিক ডেস্কে। তিন দিন ধরে ভারতীয় সেনা কি ভাবে উদ্ধার করল সেটা তঁরাই জানেন, কেননা সমস্থ চ্যানেলে বিভিন্ন আঙ্গেল থেকে তাদের অপরেশন দেখানো হচ্ছিল, এবং বিস্তারিত ধারা-বিবরণী চলছিল।  এতো অপপ্রচারের মধ্যে যে তাঁরা কি ভাবে হামলাবাদীদের কাবু করেছিল তা আর নতুন করে বলার কিছু নেই।


আমি ক্যানাডিয়ান মিডিয়াতেও কাজ করেছি। বলা বাহুল্য, এখানে তেমন উত্তাপ নেই। কেন? কারণ, মিডিয়ার ক্ষমতা সীমিত। যেটুকু প্রেস রিলিজ হয়, সেটুকুই সব কাগজ জানে। সেটা ভাল না খারাপ জানিনা। তবে আলাদা করে সিঁধ কেটে, জাল করে, কোনো চ্যানেল বা কাগজ স্কুপ জোগার করেনা, করলেও কেউ পাত্তা দেয়না। সেরকম মিডিয়ার চালাকি থাকলে কি পারতো ওবামা লাদেনের ওপর অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার চালাতে? যদি আমেরিকান মিডিয়া ঘন্টায় ঘন্টায় ধারাবিবরণী দিত, মাত্র ২৫ জন সীল সেনা মধ্যরাতে পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদকে অন্য আর এক দেশে গিয়ে হত্যা করতে পারতো?


তাই ক্ষমতার অপব্যাবহার না করে একটু বোকা হও ভারতীয় মিডিয়া। একটু লোকজনের মন অন্যদিকে ঘুরিয়ে দাও, সত্যি সত্যি কিছু পরিনতি চাইলে।  ভারত সরকার শুনছি বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানকে আলাদা করার প্রচেষ্টা করছে, সকল কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ ২৫টি দেশের সঙ্গে ভারত পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদি দেশ হিসাবে চিহ্নিত করার উদ্দেশে সন্মিলিত হয়, এবং সকলেই, আমার বিশ্বাস, মাথা নাড়ে এক তালে। একটা জায়গায় পড়লাম ভারত নাকি সিন্ধু নদের জল আটকে দেবে। এত্তো ওয়েবসাইটে এত্তো মতামত যে কোনটা আসল আর কোনটা মনগড়া তা বোঝা দুষ্কর।


এই এতো সরগরমের মাঝে একটাই ভয়, আমরা কি কাশ্মীরকে হারাবো?


খুবই অপ্রিয় শোনালেও এটা সত্যি। যখন দুই মাতা একটা বাচ্ছাকে নিয়ে “আমার বাচ্ছা, আমার বাচ্ছা” বলে টানাটানি করে, তখন যে মা তাকে বেশি ভালোবাসে সে হাত ছেড়ে দেয়, বাচ্ছাটার কষ্ট হচ্ছে দেখে। কাশ্মীরিদের কষ্ট আমাদের আর সহ্য হচ্ছেনা। ভারতমাতা কি তাই তার এই সন্তানকে ছেড়ে দেবে?


আমার এই লেখাটা আপলোড হওয়ার মধ্যে না জানি আরো কি ঘটবে!


(Written just after India’s air strike in Balakot, on Feb 26, 2019)




Advertisements
 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on March 04, 2019 09:42

February 11, 2019

দেশের তপ্ত কড়ায় ক্যানাডাকে একটু সেঁকে নি বরং

আমাদের আই ই বাংলা পোর্টালে একটা খবর চোখে পড়ল। তাতে লেখা হয়েছে, “কিছু বছর আগে বইমেলা কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতার অভিযোগ তুলে, বাংলা স্টলে ইংরেজি নাম লেখা হচ্ছে বলে যাঁরা মারমুখী হয়ে ঘুরে বেড়াতেন, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সুমধুর…


আমাদের আই ই বাংলা পোর্টালে একটা খবর চোখে পড়ল। তাতে লেখা হয়েছে,


“কিছু বছর আগে বইমেলা কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতার অভিযোগ তুলে, বাংলা স্টলে ইংরেজি নাম লেখা হচ্ছে বলে যাঁরা মারমুখী হয়ে ঘুরে বেড়াতেন, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সুমধুর সম্পর্কের সুবাদে তাঁরা মঞ্চালোকে।”


পড়েই খুক-খুক করে হাসি পেল। যে বাংলায় এতো সংকোচমুক্ত, বৃহৎ মনের মানুষের জন্ম হয়ে গেছে, সেই বাংলা আজ ছাপোষাতে ভরে গিয়েছে, আর সে ছাপোষারা কথায় কথায় ‘গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল’ হয়ে ঝান্ডা নিয়ে সারাক্ষণ সাধারণ মানুষকে চমকে বেড়াচ্ছে। কলসির তলায় কয়েক ছিটে জ্ঞানের গন্ধ নিয়ে ভাবছে গোটা বাংলা সাহিত্যের ভার তাদের কাঁধে। ওরে মুর্খ! কী এসে যায় বাংলা স্টলে দুটো কথা ইংরেজিতে লিখলে? তাতে কি বাংলা সাহিত্যের মান কমে যায়? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, স্বয়ং বিভূতিভূষন তাঁদের সাহিত্যে প্রচুর ইংরেজি শব্দ ব্যাবহার করেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তর প্রথম লেখা ইংরেজিতে ছিল, যদিও পরবর্তী কালে বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে প্রচুর কাব্য-গ্রন্থ রচনা করেছেন। “হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন…” তাঁরই লেখা। কেউ বাংলাকে অবহেলা করতে পারবেনা। বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার এতই গভীর যে তার তল খুঁজতে গেলে কয়েক জন্ম লেগে যায়। যারা বুঝেছে, তারা বুঝেছে। বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে। যারা বোঝেনা, তারা মুর্খ, তাদের বোঝানোর ভার নাহি তোমাদের ঘাড়ে, ওরে ভীরুর দল! তোরা থাম!


কলকাতায় বই-মেলা শুরু হয়ে গেছে, বোধহয় শেষের দিকে। এদিকে বিতর্কপুর্ণ বাজেট, মমতার ধর্না আর তপ্ত নির্বাচনের হাওয়া! এই গরম তাওয়ায় এখন মনে হচ্ছে ক্যানাডাকে একটু সেঁকে নিলে কাজ দিত। এদিকে তো ভেতো বাঙালীগুলো যে শৈত্যবীর-বীরাঙ্গনা হয়ে উঠছে নিত্য শৈত্যপ্রবাহের সাথে লড়াই করতে করতে। মাইনাস ৪২ সেলসিয়াস থেকে মাইনাস ১০ এর মধ্যে আসন্ন হিমযুগ লোফালুফি করছে মাছে-ভাতে বঙ্গবাসীদের! দেশের কি কারুর মনে কোন দয়া নেই?


এটা বলতে দ্বিধা নেই যে হিমযুগের হাওয়া ক্রমেই ক্যানাডাকে গ্রাস করে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। পোলার ভোর্টেক্স একদিকে ওন্টারিওকে ভাসিয়ে দিচ্ছে সাদা বরফে, অন্যদিকে ভ্যাঙ্ক্যুভারে সবুজ মাটিতে ফুল ফুটছে। সত্যি! তাপমাত্রা সেখানে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জানুয়ারিতে বসন্তের হাওয়া। অন্য আর এক দিকে রেজিনা এবং ক্যালগ্যারিতে হিমবাহর উৎপাতে তাপমাত্রা মাইনাস ৪২; ওপরের তাপমাত্রা মাইনাস ২৫ এর বেশি ঊঠছেনা। রেজিনাতে খোলা ত্বক কয়েক মুহুর্তের মধ্যে নিথর হয়ে যেতে পারে, যাকে বলে ‘ফ্রস্টবাইট’।  বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, ক্যানাডার এই চরম আবহাওয়া কোন ব্যাতিক্রম নয়, নতুন নিয়ম হতে পারে, সরকারের প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। এবার কি করা যায়? দেশে গরমে টিকতে পারছেনা, এখানে ঠান্ডায়। যাবেটা কোথায় বাঙালী?


আর্ক্টিক গলতে শুরু করার ফলে সারা বিশ্ব প্লাবিত হবে চরম গরমে। ক্যানাডায় তা শুরু হয়ে গেছে। পোলার ভোর্টেক্সের দরুন একটা “ওয়েভিনেসস” তৈরি হচ্ছে যাতে ঠান্ডা ক্রমশ আরও দক্ষিণ ও মধ্য ক্যানাডার দিকে যেতে পারে এবং উপকূল বরাবর উত্তরে উষ্ণ বাতাস চলতে পারে।


একমাত্র ভরসা ঘরের মধ্যে, গাড়ির মধ্যে, শপিং মলের মধ্যে, অফিস-কাছারিতে, সর্বত্র যে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত, যার জন্য এখনও লোকে ক্যানাডায় থাকতে পারছে । তা না হলে, এখানে কয়েক সেকন্ডের মধ্যে ত্বক ফ্রিজ করে যায়। যেখানে ক্যানাডার বা আমেরিকার মতন উন্নত দেশে মানুষ বাইরে ঠান্ডায় জমে মারা যায়, সেখানে তো ছ’মাস তুষারযুগে প্রবেশ করে থাকা মানে তো সারাক্ষন বুক দুর-দুর করা। একমাত্র বিদ্যুৎ ই আশা-ভরসা। ছ-মাস তো সার্ভাইভাল মোডে। একটা পায়রা আমার বারান্দায় বছর কয়েক আগে ফ্রিজ করে মারা গেছিল। ভয়ঙ্কর মর্মাহত হয়েও সেই আমাকেই তার মৃতদেহর সৎকার করতে হয়েছিল। আর কে করবে? সেই যে ‘ঠক’ করে আওয়াজ হয়েছিল দেহটা জঞ্জালের বাক্সে পরার সময়, সেই আওয়াজটা এখন আমার কানে বাজে। ঠান্ডায় ফ্রিজ করে শুধু পাখিরা মরছেনা, মানুষও মারা গেছে প্রচুর। আমেরিকা-ক্যানাডা মিলে প্রায় ২০ জন মানুষ মারা গেছে এই এক শীতে। এতো উন্নত দেশে, এতো যেখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত, এতো যেখানে কড়াকড়ি, সেখানে মানুষ ফ্রিজ করে মারা যাচ্ছে, এটা কি করে মেনে নেব?


কেনই বা নেবনা? দেশে থাকতে কি শীতে বা অত্যাধিক গরমে মানুষ মারা যেতে দেখিনি, বা শুনিনি? এখন এই গরম দেশে আরো প্রবল হচ্ছে। ঠান্ডা আরো প্রবল হচ্ছে। ভৌগলিক উষ্ণতার গহ্বরে আমরা কিন্তু আক্ষরিক অর্থে প্রবেশ করে গেছি। গ্লোবাল ওয়ারমিং আসছে না, এসে গেছে। প্রতিদিন, প্রতি বছর একটু একটু করে আমাদের গ্রাস করছে।


শয়ে শয়ে। কিছু মানুষ মরছে, সুনামি, ভুমিকম্প, আগ্নেয়গিরির জেরে কিছু কিছু প্রাদেশ ধ্বংস হচ্ছে। আবার সব সয়ে যাচ্ছে। এইভাবেই পৃথিবী তার ভারসাম্য বজায় রাখছে। আমাদের কিছু করার নেই। কবিগুরুর গানটা মনে পড়ে? “তোমার হাতে নাই ভুবনের ভার, ওরে ভীরু! হালের কাছে মাঝি আছে, করবে তরী পার, ওরে ভীরু!” হালের কাছে মানে, কালের কাছে। কালের কাছে মাঝি আছে, আমরা বেঁটে বেঁটে হাত দিয়ে ছটফট করে নৌ বাইবার চেষ্টা করলে কি আর খুব একটা কিছু হবে? যা ধ্বংস করার তো করে ফেলেছি। এখন শুধু কালের ফলাফলের প্রতীক্ষা!


যা আজ তুমি ভাবছো, কবিগুরু তা ভেবে গেছেন শত বর্ষ আগে। সুতরাং, ভাবনা ছেড়ে বরং পুবের ওই লাল আকাশের রঙ দেখো চেয়ে। আমাদের প্রিয় ট্রাম্প ঠিকই বলেছেন — গ্লোবাল ওয়ারমিং নেই-ই! সব ভাঁওতা। ফেক্‌ নিউজ। সত্যকে অস্বীকার করার মতন আরাম আর কিছুতে নেই। শান্তিশিষ্ঠে অফিস থেকে বেড়িয়ে প্রচন্ড তুষারপ্রাতের মধ্যে বরফে ঢাকা পিচ্ছিল হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরেই স্যাঁতস্যাঁতে শরীর-মন গরম হয়ে ওঠে। কারণ? দেশের কড়াইয়ে তেল সব সময় ফুটছে! ভারতীয় খবরের চ্যানেল চালালেই হল। মোদী কি করল! আবার মমতা ধর্না দিল! এই যাঃ! রাহুল আবার কি সব বলেছে!


এই রে! দেশে মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙ্গে গেল!


এই কোথায় ট্রেন উলটে যাচ্ছে, এই বাগরী মার্কেটে আগুন!


এই ক্রিকেট!


ও মা! বিজয় মালিয়াকে ধরল শেষবেশ! এবার দাউদ?


সর্বক্ষণ গরম হাওয়া। হোয়াটসঅ্যাপে সঙ্গে সঙ্গে খবর চালাচালি। মধ্যরাত অবধি কথাবার্তা।


ক্যানাডার খবর তো প্রায় নেই-ই, যেটুকুন আছে, তাতে বাঙালীর মন গরম হয় না।


একে তো মাঝরাতে “গুড মর্নিং”এর এত্ত এত্ত মেসেজ, ছবি, তত্ত্বকথা আসে আমাদের ওয়াটসায়াপে, তার ওপর দেশের খবরের হাওয়া ক্রমেই গরম হতে থাকে যত বেলা বাড়ে। মেসেজেরও শেষ নেই। শেষকালে, নাঃ, কাল আবার ভোরে ওঠা, ওই বরফে গাড়ির থেকে বরফ ঝেরে, চেঁচে ফেলা, আবার ওই হড়হড়ে হাইওয়ে দিয়ে অফিস যাওয়া। নাঃ, ঘুমোতে যাই, বলে ক্যানাডিয়ান ভারতীয়রা তাদের টিভি বন্ধ করে শুতে যান। কিন্তু দেশের এই উত্তাপ আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। অবশ্যম্ভাবী সত্যকে ভুলিয়ে রাখে। স্যাঁতস্যাঁতে মন সেঁকে নি দেশের আঁচে। ভারতের উষ্ণতায় আমরা উষ্ণিত হই রোজ রোজ!


Published in IE Bangla, Feb 10, 2019

 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on February 11, 2019 13:21

February 1, 2019

হ্যারি পটারের পেন্সিভ ডিশ আসুক মানবজীবনে

অতি সম্প্রতি আমার এক সহকর্মীকে হঠাৎ হারালাম। হতাশায় বেকুব বনেছিলাম। তার মৃত্যু আমাকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।

[image error]


হ্যারি পটারের শেষ অঙ্কে স্নেপের মৃত্যু-মুহূর্তে স্নেপ হ্যারিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলে, “টেক ইট… টেক ইট…”।


হ্যারি একটা টেস্ট-টিউবে করে স্নেপের চোখের জল খানিকটা নিয়ে নেয়। তারপর সেটা পেন্সিভ ডিশে ফেলে হ্যারি দেখতে পায় স্নেপের সম্পূর্ণ জীবন কাহিনি। তার ব্যথা, বেদনা, তার ভালোবাসা, তার বুদ্ধি, তার ন্যায়বোধ, নীতি, সব কিছু। যাঁরা হ্যারি পটার নিয়ে চর্চা করেন, তাঁরা জানেন উপন্যাসটা প্রযুক্তিগতভাবে কতটা এগিয়ে। যা কল্পনা, প্রযুক্তি তার ধারে-কাছে পৌঁছোতে পারবে কিনা আগামী কয়েক শতকে তা বিচারাধীন।


ব্রেন-ম্যাপিং বলে একটা বিষয় আছে। মানুষের মস্তিস্কের ম্যাপিং এর শাস্ত্রীয় এবং তাত্ত্বিক গবেষণা । সাইকোলজির নানান দিক আছে মানুষের মনের গবেষণা করার জন্য। কিন্তু তা মানুষ বেঁচে থাকতে থাকতে। কোন প্রযুক্তি আজ অবধি ঘোষণা করা হয়নি যা দিয়ে মানুষের মনের কথা একটা পেন-ড্রাইভে তুলে নেওয়া যায়, হার্ড-ডিস্কে রেখে দেওয়া যায়, মানুষ মারা যাওয়ার অনেক, অনেক বছর পর পর্যন্ত।


অতি সম্প্রতি আমার এক সহকর্মীকে হঠাৎ হারালাম। হতাশায় বেকুব বনেছিলাম। তার মৃত্যু আমাকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। মানুষ কোথায় যায় মারা গেলে? তার সাংবাদিকতার এবং লেখার এই বিশাল জীবন, এতো বিদ্যা, সারা জীবনের এতো জ্ঞান, এতো অভিজ্ঞতা, এতো বিচার, বিবেচনা, তত্ত্বকথা, মতামত, সব কি ধুলিসাৎ হয়ে গেল এক নিমেষে? সব শেষ? তার অভিজ্ঞ মস্তিষ্কের এবং সর্বদা হাসির কিছুটা অংশ রেখে দিলে পরের প্রজন্মের অনেক অনেক কাজে লাগতো। কিন্তু আমরা তা করতে পারলাম কই?


কী করে শেষ হয় এরকম চাবুকের মতন প্রাণ? ফেসবুকে এমন প্রশ্ন রাখাতে সবাই আমাকে বোঝালো এনার্জি, অর্থাৎ, মানুষের তেজ মিলিয়ে যায় পাঁচ স্তরে। তার পর রিসার্চ করে জানলাম, প্রথমে প্রাণবায়ু (Prana Vayu) বেরিয়ে যায়, যেটা ডাক্তাররা বলেন, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস। হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। তার পরে সমানবায়ু (Samana Vayu) নির্গত হয়। সমানবায়ু মানুষের শরীরের সমানতা, অর্থাৎ তাপমাত্রা ও তেজের ভারসাম্য বজায় রাখে। মাথা থেকে পা অবধি। সেটা নির্গত হতে শুরু করলে মানুষের শরীর ক্রমে ঠান্ডা হতে থাকে। এরপর আপনবায়ু (Apana Vayu), অর্থাৎ জ্ঞানেন্দ্রি়য়, তারপর উদানবায়ু (Udana Vayu) যার দ্বারা কুন্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়, এবং Vyana বায়ু (যেটার বাংলা অর্থ কোথাও পেলাম না), যেটা স্নায়ুতন্ত্রের রক্ত ​​এবং সচেতনতা সঞ্চালন নির্দেশ করে। ক্রমেই এই পাঁচ বায়ু নির্গত হয় দেহ থেকে। মানুষ মারা যায়।


উফ! এটা রিসার্চ করতে এবং লিখতে গিয়ে আমার প্রাণবায়ু নির্গত হবার উপক্রম!


কিন্তু, সবই তো বুঝলাম। এটা তো বিজ্ঞান, বা পুরাণের কথা। কিন্তু বিজ্ঞান তো হৃদপিণ্ডর কথা বলছে। হৃদয়ের কথা কই? তার মনের কথা কোথায় যায়? তার সারা জীবনের স্মৃতি, দুঃখ, কান্না, বেদনা, অভিমান, ভালবাসা, গোপন কথা কোথায় যায়? আত্মা তো জানি অবিনশ্বর। এক শরীর থেকে আর এক শরীরে প্রবেশ করে। শাহরুখ খানের “ওম শান্তি ওম” এর মতোন একজন মরলো আর সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মা পাশের বেডের বাচ্চার শরীরে হাতের উল্কি-টুল্কি নিয়ে প্রবেশ করল, এমন হয়তো নয়, কিন্তু অনেক তর্ক-বিতর্ক এবং অনেক জাতিস্মর ভিডিও দেখার পর আমার ধারণা হয়েছে যে মানুষের পুনর্জন্ম আছে। কে জানে? বিজ্ঞান তো স্বীকার করে না। কিন্তু বিজ্ঞান তো একসময় পৃথিবী ‘গোল’ তাই মানতোনা। বিজ্ঞান আজও বিধাতাকে মানেনা। প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্টিফেন হকিং তো বলেই গেলেন মারা যাওয়ার আগে যে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হওয়ার পিছনে কোন মহা-শক্তির হাত নেই। এমনি এমনিই হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁরা যা প্রমাণ করতে পারেননা, তা মানেন না।


আর পরজন্ম প্রমাণ করা হইনি এখনো অবধি। তাই আমরাও জানিনা। জেনেই বা কী লাভ। সবাই তো আর জাতিস্মর  হয়না। “নায়ক” ছবিতে উত্তম কুমার যেমন বলেছিলেন, “আমি যে আমিই হচ্ছি পরজন্মে, সেটা জানবো কি করে?” তাই যাগ্‌গে। এসব ভেবে লাভ নেই। “আনন্দ” এ রাজেশ খান্নার মতন ভাবি বরং, “মেঁয় হি নহিন রহুঙ্গা তো মুঝে ক্যায়া ফরক্‌ পড়েগা?”


কিন্তু তাও ভীষণ রাগ হয়। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ওপর রাগ হয়। মান্না দে-র গান টা ভাবি। “হৃদয়ে লিখো নাম সে নাম রয়ে যাবে…” ধুস! হৃদয়ে লিখে কী হবে? হৃদপিণ্ড তো শরীরের সাথে পুড়ে যাবে, বা মিশে যাবে মাটির সঙ্গে। কে মনে রাখবে? বরং পাথরে লেখ নাম, কাগজে, অর্থাৎ ইন্টারনেটে কোথাও লিখে রাখো সে নাম, বা মনের কথা, সে নাম রয়ে যাবে।


কে জানে, একদিন হয়তো এমন প্রজন্ম আসবে যারা আমার এই লেখা পড়ে বলবে, “সে কী? ২০১৮ সালেও মানুষ পরজন্মে যাতায়াত করতে পারেনি?”, “হৃদয়ের কথা দান করে যেতে পারতো না?” বা, “ধ্যাৎ, কী অশিক্ষিত ছিল লোকজন! ঈশ্বর যে আছে কি না তা নিয়ে তর্ক করছে।” যেমন আমরা বলি এখন, গ্যালিলিওর সমাজ কতটা বোকা ছিল, যে উনি পৃথিবীটা ‘গোল’ বলছেন সেটা মানতেই পারছিলনা।


আমি জানি আমি কী করছি। আমি মহাশূন্যের বুকে এই লেখাটা লিখে রাখছি, যা হয়তো থেকে যাবে। আমি থাকবনা, সেটা নিশ্চিত।


মানুষ সবার থেকে নশ্বর। সব কিছু থেকে। আমাদের ডিজাইনার জামাকাপড়ের থেকেও নশ্বর, আমাদের লেটেস্ট আইফোনের থেকেও নশ্বর, আমাদের গেজেট-গয়নার থেকেও ক্ষয়শীল, মায় আমার যে স্টিলের বাসনগুলো আছে তারাও থেকে যাবে, আমি থাকবোনা। আমাদের ফ্রিজে ১০ বছরের গ্যারান্টি আছে, জীবনে নেই। মৃত্যু এলে কোন ডাক্তার-মোক্তারের বাবার ক্ষমতা নেই তাকে রোকার। যতই ট্রেডমিলে দৌড়ও, যতই ফোঁসফাঁস করে প্রাণায়াম কর, যতই অর্গ্যানিক খাও, মৃত্যু এলে তাকে ঠেকাতে পারবেনা।


কি ফ্রাস্ট্রেটিং!


অর্থাৎ, যা লোন নিয়েছ তুমি প্রকৃতি থেকে, তোমার শরীর, মন, তেজ, সব কিছু, তা তুমি চাও বা না চাও, প্রকৃতিকেই ফেরত দিতে হবে তোমার সময় যখন ফুরিয়ে যাবে। কি ভয়ঙ্কর! আমাদের জীবন আমাদের নয়, প্রকৃতির। অথবা, যারা ভগবান বিশ্বাস করেন, ভগবানের।


তাহলে মানুষের কি কিছুই করার নেই? এতো প্রযুক্তির ফলে যে জ্যান্ত মানুষ মঙ্গলগ্রহে নামাতে চলেছে, তার ক্ষমতা নেই মানুষ জ্যান্ত থাকতে-থাকতে তার এতো বিচার, জ্ঞান, এতো বুদ্ধি, এতো ভালোবাসা, এতো বিদ্যা, এতো সম্পর্ক, তার আত্মকথা, এতো স্মৃতি, দুঃখ, জ্বালাযন্ত্রণা, মান, আভিমান, আশা-ভরসা, অর্থাৎ যা বিজ্ঞান চোখে দেখতে পায়না, সেটা পারেনা একটা কম্প্যুটারে ভরে রাখতে? বা দান করে যেতে? যেটা পরের প্রজন্ম যখন খুশি ফ্লাশব্যাক মতন চালাবে আর সিনেমার মতন দেখতে পাবে?


ফেসবুকে ছোট্ট করে তার খানিক প্রচেষ্টা আছে, সেটা এখন মানতে বাধ্য হচ্ছি। তবে হয়তো ফেসবুক নিজেই জানেনা তার মাহাত্যটা মানবজাতীর ওপর। মার্ক জুকারবার্গ তো খালি তার মুনাফা দেখে। আর হ্যাকাররা বসে থাকে কখন কাকে ধরে তার ব্যাঙ্ক থেকে পয়সা লুটবে বলে। আরে, হ্যাকারগণ! তোরা থাকবিনা, তোদের কাল-কর্ম থেকে যাবে। লক্ষ মানুষের অভিশাপ থেকে যাবে, কি বোকা তোরা!


আমরা ফেসবুক-কে, ইন্সটাগ্রাম-কে, গুগল ড্রাইভ-কে নিজের পার্সোন্যাল ডাইরির মতোন ব্যাবহার করি। এটা কিন্তু এক দিক থেকে একটা অভুতপূর্ব অবদান এই নশ্বর মানবজাতির প্রতি। আমাদের সব চিন্তা, ভাবনা, বিচার, বিবেচনা, ছবি, ভিডিও সব কিন্তু আমরা ব্যোমে, অর্থাৎ ঈথারে অন্তর্গত করে যাচ্ছি আমাদের নিজেদের অজ্ঞাতে। পরের প্রজন্মের সার্থে । আমরা থাকবনা, ঈথারে আমাদের নাম রয়ে যাবে। তবে এতো বিরাট জীবন, এতো অভিজ্ঞতা; কেউ যদি লিখতে না চায়, কেউ যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু না পোস্ট করে, তো সব শেষ?


এ তো মানা যাচ্ছেনা। আমার লেখা জানিনা কোন প্রযুক্তি-বৈজ্ঞানিকের নজরে পড়বে কি না, তবে আমরা হ্যারি পটারের সেই পেন্সিভ চাই, যাতে আমাদের সমগ্র স্মৃতি, সব জ্ঞান, সব অনুভূতি কয়েদ করে রাখতে চাই। একটা চিপ লাগিয়ে সারা জীবনের সব স্মৃতি ধরে রাখতে চাই কোন একটা হার্ড ডিস্কে। সিনেমার মতন, যেমন ভাবে আমাদের মনের পটছায়ায় দেখতে পাই যখন চাই, সেরকম ভাবে দেখব, যখন ইচ্ছে। দান করে যাবো যাকে ইচ্ছে। এটা আমার বায়না। আমি থাকবনা একদিন, আমার বায়না রেখে গেলাম মহাশূন্যে।


পুনশ্চঃ এই লেখাটি আমার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু, ভাই এবং সহকর্মী, জাপান কনস্যুলেট জেনারেলের রাজনৈতিক বিষয়ক কর্মকর্তা, হিন্দুস্থান টাইমস এবং স্টেটস্‌ম্যানের অত্যন্ত খ্যাতনামা সাংবাদিক, সাম্প্রতিককালে বাংলানাটক ডট কমের সাথে জড়িত, ভাস্কর নারায়ণ গুপ্তর উদ্দেশে উৎসর্গ করলাম। গত শনিবার, জানুয়ারি ১৩, ২০১৯, মাত্র ৪৮ বছর বয়েসে তার আকস্মিক এবং অকালপ্রয়াণে সাংবাদিক মহল গভীরভাবে শোকার্ত এবং মুহ্যমান।


Published in IE Bangla, Jan 20, 2019




Advertisements
 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on February 01, 2019 18:03

January 7, 2019

একটা দেওয়াল মানুষকে মচ্ছর বানিয়ে দিচ্ছে

গুগ‌লে “ইডিওট” লিখলে একজনেরই নাম ও ছবি এসে যাচ্ছে। ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ যে কথাটা বুঝে ফেলছে, ‘ন্যাচরাল ইন্টেলিজেন্সের’ সেটা বুঝতে আর কতদিন লাগাবে?

বহু বছর আগে নানা পাটেকারের (না, না, নানা তখন ‘ভালো’ ছিলেন) একটা ডায়লগ মনে আছে, “এক মচ্ছর আদমি কো হিজরা বনা দেতা হ্যায়।”  এখন  কথাটা একটু সংশোধন করে বলা যায়, “এক দিওয়ার আদমিকো মচ্ছর বনা দেতা হ্যায়।”


মচ্ছর, অর্থাৎ মশা, ভনভন করে মানুষের শান্তি বিগ্রহ করে, অযথা জ্বালিয়ে খায়, কামড়ে রক্ত বের করে আর মানুষের শরীরে রোগজীবাণু ঢুকিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত এনে দেয়। ঠিক তেমনই হচ্ছে একটা দেওয়াল ঘিরে। এখনও অবধি দুটো শিশুর মৃত্যু হল, আর তাতেও মানুষকে জ্বালানো শেষ হলনা, দেশের সরকারই বন্ধর ঘোষণা হল। আংশিকভাবে ‘শাট ডাউন’ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। সরকারি কাজকর্ম লাটে উঠল। সবই ওই এক দেওয়ালের জন্য। একটা দেওয়াল কয়েকজন মানুষকে মশা বানিয়ে দিচ্ছে আর সাধারণ মানুষকে তারা জ্বালিয়ে খাচ্ছে।


হ্যাঁ, একটা দেওয়াল। তার জন্যও দুটো বাচ্চার মর্মান্তিক মৃত্যু।


আর ২৮ বছর আগেকার হঠাৎ আকার নেওয়া সেই ভয়ঙ্কর সুনামি…


ক্রিসমাসের মুখে এমন ঘটনাই কাঁপাচ্ছিল পৃথিবীকে। হঠাৎ্‌ নীরবে হোয়াটসঅ্যাপ বেয়ে কাঁপিয়ে দিল একটা মেয়ের “অতি সাধারণ” বিয়ের কাহিনি। “সাধারণ”, কেন না, তার বাবা তার বিয়েতে তাঁর জমানো পুঁজির মাত্র ১% খরচা করেছেন । আবার গরিবদের ৫ দিন ধরে তিনবেলা খাইয়েছেন। ৪৮ টা চার্টার্ড প্লেনে করিয়ে উড়িয়ে এনেছেন তাবড়-তাবড় মহারথীদের। হ্যাঁ এই সেই আম্বানি। মুকেশ আম্বানি। যার “মনের দৌলত”, নিশাকে অন্য পরিবারে দান করলেন গম্ভীর কণ্ঠস্বরে মহানায়ক আমিতাভ বচ্চন। শুধু তাই নয়, সমস্ত অতিথিদের প্রত্যেককে আলাদা পাথরের খোদাই করা টেবিলে, রূপোর থালা, বাটি, গ্লাসে, খাইয়েছেন মুকেশ আম্বানি, এবং বলিউডের তারকারা তাদের পরিবেশন করেছেন।


এসব দেখে দেশবাসী সকলের মতন বিদেশে আমাদের মত মধ্যবিত্ত এন আর আইদের চোখও কপালে। সারা বছর আমরা ধ্যান করে গুগ‌ল ঘাঁটতে থাকি কোথায় প্লেনের ভাড়া সবচেয়ে সস্তা, দেশে যাবো বলে। আমাদের মেয়ের বিয়ের সময়ে লোন নিয়ে, বাড়ি ভাড়া করে, দেনায় ডুবে, নিজেকে বিক্রি করে দিই সামান্য কয়েকজন লোক খাওবো বলে। সেখানে দেশের সবচেয়ে ধনী মানুষ কিনা তার জমানো পুঁজির মাত্র ১ % খরচা করলেন তার মেয়ের বিয়ের জন্য, যেটা দাঁড়ায় ‘মাত্র’ ১০০ মিলিওন ডলার (৩,৩৫,০০০ কোটি টাকা)! এটা শুনে শুধু “আচ্ছা” বলা ছাড়া আমাদের আর কোন প্রতিক্রিয়া সাজেনা। কী বলব? হাসবো, না কাঁদবো? দুঃখ পাবো যে মাত্র এই’কটা টাকা খরচা করলেন ভদ্রলোক তার একমাত্র মেয়ের বিয়ের জন্য, না গর্ব করব, যে দ্যাখ, লোকটা কত মহান, কত কম খরচা করলেন! দেখে শেখ! …না কি বেশি খরচা করলেন…না কি কম… কে জানে?


আর, এক্সকিউজ মি! আমরা ঠিক কতটা গরিব? আমার ছেলের বিয়েতে যদি আমার ‘দৌলতের’ ১% খরচা করতে হয় তাহলে ডলারস্টোরের টফি খাইয়েই তো অথিতি সেবন করতে হবে। আমাদের মতন গরিবদের পৃথিবীর অর্থব্যাবস্থায় কোনো স্থান আদৌ আছে কি?


আমার তবে একটা প্রশ্ন আছে — এ বিয়ের নিমন্ত্রিত কারা? যাদের পরিবেশন করলেন স্বয়ং আমিতাভ বচ্চন এবং শাহরুখ খান, তারা কারা? তাদের একবার চাক্ষুস দেখলেও চোখ-মন জুড়ে যায়।


ক্যানাডায় হাড়-কাঁপানো শীতে এইরকম খবর শুনলে শরীর গরম হয়ে যায়। আর এলোন মাস্কের বোরিং টানেল ছাড়াও এই দুনিয়ায় এখনো কিছু ঘটনা আছে যা এখনো আমাদের মুখ হাঁ করিয়ে দেয়।  (কলেজ-লাইফে বলতাম, “বেশি হাঁ করে হাসিসনা, মশা ঢুকে যাবে।” কোন প্রসঙ্গ নেই কথাটা বলার, হঠাৎ মনে পড়ল।)


শুধু কি নিশা আম্বানির বিয়ে? গোটা ভারতবর্ষ দুলছে বিয়ের ধুমে। বলিউডের টপ তিনজন হিরোইনই বিয়ে করে ফেললেন – অনুষ্কা, দীপিকা আর প্রিয়াঙ্কা। এক বছরের মধ্যেই। প্রত্যেকটা বিয়েই চাঞ্চল্যকর আর প্রত্যেকবারই আমাদের মনে করিয়ে দিল আমরা কত গরিব।


কিন্তু সব ছাপিয়ে মনকে নাড়া দিয়ে গেল দুটো বাচ্চার মৃত্যু। যেমন নাড়া দিয়েছিল সেই লাল-জামা পড়া, সমুদ্রের ধারে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা সেই প্রাণহীন সিরিয়ান শিশুর ছবিটা, যেটা সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল গত ২০১৫ সালে। ওই ছবির জেরে সারা পৃথিবীর মানুষ একত্র হয়েছিল সিরিয়ান শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিপ্রায়। ক্যানাডা সেই বছর থেকে প্রায় ২৫০০০ শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল, যারা অনেকেই ইতিমধ্যেই ক্যানাডার সিটিজেন হওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছেন। তারা বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু ক্যানাডার প্রতিবেশী দেশের ইতিহাস তেমন বুক-বাজিয়ে কিছু বলার পাবেনা। তারা তো সর্ব দিকে দেওয়াল তুলতেই ব্যস্ত! খুব “সোনার দেশ” “সোনার দেশ” বলছিলে? দেখো সে দেশের হাল।


ভারতের অবশ্য তুলনা নেই সেই দিক থেকে। নিজে খেতে পাক না পাক, অন্য কেউ বিপদে পড়লে ভারত আগে ভাগে এগিয়ে আসে। এমনিতেই ভারতে লাখ-লাখ শরণার্থী। বিভিন্ন দেশ থেকে। নেহাত সিরিয়া থেকে সন্ত্রাসবাদীতে থিক-থিক ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান পেরিয়ে ভারত যাওয়া ভৌগোলিক ভাবে কার্যত অসম্ভব, তা না হলে থরে-থরে সিরিয়ান ঢূকে দেশে একটা ‘সিরিয়া’ বলে রাজ্যই বানিয়ে ফেলতো এতোদিনে। চোখ রাঙ্গাতো কথায় কথায়। র‍্যাশন কার্ড করে, আধার কার্ড করে এতদিনে “হেনো চাই-তেনো-চাই” বলে হরতাল-মিছিলও বোধহয় করে ফেলতো। ক্যানাডা কিন্তু অতো সহজে ওদের প্রবেশ দেয়নি। মাসের পর মাস ইন্টারভিউ, মেডিক্যাল আর কাগজপত্রের লাটাইয়ে লাট খাইয়েছেন ট্রুডো সরকার। তারপর এখানে এনেছেন। তাই সিরিয়ানরা এখানে ভীষন কৃতজ্ঞ । জাস্টিন ট্রুডোর নামে নাম রাখে সন্তানের।


থাক ভারত আর ক্যানাডার কথা। দুটো দেশেরই মন খুব ভালো। ভারতে আইসিস যে পরিমাণ হানা আনার চেষ্টা করছে আর যেভাবে গত বুধবার এনআইএ চুপচাপ এক আইসিস-অনুপ্রাণিত সন্ত্রাসী মডিউলকে আটক করেছে, এবং ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে, এটা অত্যন্ত প্রশংসাজনক। আমি “হ্যাট্‌স্‌ অফ্‌” বলছি সেই কর্মকর্তাদের! ভারতের ‘ইন্টেলিজেন্স’ ঠেকাতে পারেনা কাকে!


আর এদিকে দেখো! পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী দেশ থর-থর করে ভয়ে কাঁপছে অসহায়, বুড়ো, বাচ্চা শরণার্থীদের দেখে! সারা দেশে দেওয়াল তুলছে। এত্ত বড় বড়, বিশাল দেহী পাহারাদাররা ছোট্ট-ছোট্ট বাচ্চাদের মেরে ফেলছে বর্ডারে। বীরত্বের কী নমুনা !


যেটা প্রয়োজন বলার সেটা হচ্ছে, এখনো কি যথেষ্ট হয়নি? গুগ‌লে “ইডিওট” লিখলে একজনেরই নাম ও ছবি এসে যাচ্ছে। ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ যে কথাটা বুঝে ফেলছে, ‘ন্যাচরাল ইন্টেলিজেন্সের’ সেটা বুঝতে আর কতদিন লাগাবে? ‘ইডিওট’ অনেক থাকতে পারে পৃথিবীতে। তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে। কিন্তু একটা মস্ত দেশের প্রধান হওয়ার অধিকার নেই। আর কী কী লাগবে একটা ইম্পিচপেন্টের জন্য? আর কত রোগজীবাণু ঢোকাবে মানবজাতির শরীরে? এই ইম্পিচপেন্টের খবর শুনলে ঘটা করে পুজো দেব! পয়সা দিয়ে চ্যানেল কিনে দেখবো। জয় স্যান্টা! আমার নতূন বছরের এই ইচ্ছাটা পূরণ করো।


অবশ্য, এই কথাটা অনেকেরই অপ্রিয় লাগবে। চোরা-ট্রাম্প-পেট্‌ যারা, তাদের। কিন্তু যে দুটো বাচ্চার মৃত্যু হল বর্ডার পেরিয়ে আসতে গিয়ে — একটা শিশুর ক্রিসমাসের দিনে; আর একজন ইয়েমেনি মাকে তার মরণাপন্ন সন্তানকে দেখেতে যেতে দিতে যা করল যুক্তরাষ্ট্র, তাতে অনেকের দোরেই দেওয়াল নির্মাণ হয়ে গেল। এবং একটা দেওয়াল মানুষকে মচ্ছর বানিয়ে দিল।


নতূন বছরে আর কি কি চাওয়া যায়? আসলে নতুন বছর তো আর জানেনা তার জন্মদিন। আমরা জানি। সুর্যকে প্রদক্ষিণ যে হয়ে গেলো তা তো আর পৃথিবী জানেনা। বৈজ্ঞানিকরা জানে আর জ্যোতিষীরা জানে। তাদের রমরমা ব্যাবসা। ক্যালেন্ডার বিক্রেতাদের ভালো সময়। আর টপাস করে আজ ৩১শে ডিসেম্বর থেকে কাল ১লা জানুয়ারী হয়ে গেলো তা পৃথিবী জানবে কি করে? সুর্য জানবে কি করে? গাছ-পালা-জন্তু-পাখি জানবে কি করে? রাত পেড়িয়ে এটা যে একটা নতুন দিন তা বোঝানোর জন্য গলা ফাটিয়ে চিৎকার, “হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার!” বলা আর নানান দেশে বিভিন্ন সময় আলোর ভেল্কি ছাড়া সত্যি আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে নতুন কিছু ফারাক হয়না। সেই থোড়-বড়ি-খাড়া থেকে খাড়া-বড়ি-থোড়। মাঝখান থেকে বেশ কিছু বেকুব তাদের ক্রেডিট কার্ডের ব্যালেন্স আর একটু বাড়িয়ে নেয়। ব্যাঙ্ক নীরব হাসি হাসে।


তাই, কি চাইব ভেবে পাচ্ছিনা। প্রত্যেক বছর মুখিয়ে থাকি যাক পুরাতন বছর, আগামী বছরে নিশ্চয়ই কিছু ভালো হবে। কিন্তু হয় কি? ভালো হওয়ানোটা তো আসলে নিজের হাতে। আর যা হচ্ছে, তা ভালোর জন্যই হচ্ছে। যা হচ্ছেনা, তা ভালোর জন্যই হচ্ছেনা, এটা ভেবে নিলেই অনেক শান্তি। নতূন বছরের আমরা করি নতুন প্রতিজ্ঞা, নতুন প্রতীক্ষা। জানুয়ারী পেরোতে না পেরোতেই সব ভুলে ভণ্ডুল। যে ভালো করতে চায় নিজের জীবনে, সে নতূন বছরের অপেক্ষায় থাকবে কেনো? আমার তো মনে হয় জীবনের কাজ আমাদের ভেস্তানো, আমাদের কাজ কি ভাবে ভেস্তে যাওয়া টুকরোগুলো তুলে আবার চলা । এই জীবন। এটাই স্বর্গ। এটাই সত্য। এই সত্য, এই স্বর্গীয়, নির্দয় পৃথিবীর মাঝে যতটা পারা যায় সত্যকে জাপটে ধরে চলতে হবে আরও একটা বছর।


আমার বাবা বলেন, “নো নিউজ মানে গুড নিউজ”। তাই হোক। ২০১৯ যেন “নো নিউজ” বছর হয়।


(Published in Indian Express Bangla, Jan 7, 2019)




Advertisements
 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on January 07, 2019 09:47

December 12, 2018

আমায় আবার বিয়ে করতে বোলো না

মাঝে মাঝেই আমাকে লোকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। সোশ্যাল মিডিয়ায়। এখন আমার বয়স ৫০ এর ওপর, বিবাহিত, এক বলিষ্ঠ পুত্রের জননী, খুব যে দেখতে আহামরি তাও নয়, হাঁটুতে বাত, কোমরে ব্যথা। এই দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভাবি আহা! এরকম যদি সত্যি হত? সত্যিই প্রেম নিবেদন করতো সুদূর সাত-সমুদ্র-তেরো-নদীর ওপার থেকে! কত কত উত্তম-সুচিত্রা প্রেম-কাহিনীও ধরাশায়ী হয়ে যেত আমার প্রেম-কাহিনীর সামনে।


আসলে ঘটনাটা তা নয়। ক্যানাডার বাসিন্দা হতে গেলে একটা ছোট্ট উপায় আছে। সেটা হচ্ছে, যদি তুমি কোন ক্যানাডিয়ান পাসপোর্ট-হোল্ডারকে বিয়ে করো, তাহলে তুমি সহজেই ক্যানাডায় প্রবেশ করতে পারবে। এ কথাটা আমি প্রথমে বুঝি নি। অনেক পরে আমার এক ছোট্ট বন্ধু মনে করিয়ে দিল, “আন্টি, ও তোমাকে প্রপোজ করছে না, ক্যানাডিয়ান পাসপোর্ট-হোল্ডারকে প্রপোজ করছে।” জেনে খুব হতাশ হলাম, মনে এখনও ভীষণ দুঃখ।


ক্যানাডায় আসার জন্য মরিয়া হয়ে অনেকেই এটা অবৈধভাবে করে, এবং ক্যানাডিয়ান পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি (পি আর) পেয়েই ডিভোর্স দিয়ে দেয়। অল্প-বয়েসের ক্যানাডিয়ান ছেলেমেয়েরা এর জন্য বেআইনিভাবে অনেক টাকাও রোজগার করে। অল্প বয়েসের কেন? অনেক প্রাপ্তবয়স্ক-প্রাপ্তবয়স্কারাও এটা করেন। এটা বোধহয় ক্যানাডার ইমিগ্রেশনের সবচেয়ে বড় ছিদ্র।


আরও পড়ুন, প্রবাসিনীর চিঠি: অনেক হয়েছে, এবার চললাম টরন্টো থেকে কলকাতা, ট্রেনে করে


যাঃ! ছিদ্রটা ধরিয়ে দিলাম নাকি যারা আসার চেষ্টা করছে তাদের? কিন্তু তাদের বলি, বিয়ে করার চেয়ে সহজতর উপায় আছে। সেটা হচ্ছে নিজের যোগ্যতায় ইমিগ্রেশনের জন্য দরখাস্ত পাঠানো। জানি এখন ইমিগ্রেশনে অনেক কড়াকড়ি হয়ে গেছে, কিন্তু এটাই একমাত্র উপায়। অবৈধভাবে বিয়ে করে আসার অনেক ঝুঁকি। ধরা পড়লে পাঁচ বছরের জন্য ক্যানাডা থেকে বহিষ্কার, আর ইমিগ্রেশন ফাইলে কীর্তিকাহিনী নথিভুক্ত হয়ে যাওয়া আজীবন। ইমিগ্রেশন কর্তারা বিশেষভাবে পারদর্শী হন জাল বিয়ে শনাক্ত করায়। সুতরাং যারা এখনো পাত্রী-পাত্র খুঁজছে ক্যানাডিয়ান হওয়ার জন্য, তাদের বলি, কাউকে প্রেম নিবেদন করে বিয়ে করে ঝুঁকি নিয়ে ‘স্পাউস-ভিসায়’ যদি ইমিগ্রেশন-অফিসিয়ালদের চোখে ধুলো দিয়ে আসেও ক্যানাডায়, নাগরিকত্ব পেতে সেই ১,০৭৫ দিন থাকতে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে, ইত্যাদি। আর ডিভোর্স পেতে দু’বছর।


তবে আমায় ছেড়ে দাও বাবা। একটি নিয়েই গলদ্ঘর্ম…আমি আর জাল বিয়ে করতে পারব না!


আর যাদের একটু যোগ্যতা আছে, তারা সরাসরি ক্যানাডিয়ান ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইটে দরখাস্ত পাঠাতে পারে, যেভাবে আমি এসেছিলাম বেশ কিছু বছর আগে, একা, ছোট একটা ছেলেকে নিয়ে। আমার কর্তা পরে এসেছিলেন। তখন অবশ্য ওয়েবসাইটও ছিল না। হাতে লেখা এক চিঠির উত্তর দিয়েছিল ক্যানাডিয়ান হাই কমিশন। তখন আমার র‍্যাশন কার্ডও ছিল না, না ছিল কোনো পরিচয়পত্র। আমাদের দেশে তখনও পরিচয়পত্র চালু হয়নি। তখনকার ইলেকশন কমিশনার টি এন শেষন তার অনেক পরে এলেন, আর আমি আসার আগে-আগে ভোটার কার্ড প্রবর্তন করা হল। সে ভোটার কার্ড হাতে পাওয়ার আগেই চলে এসেছিলাম।


না পরিচয়পত্র, না পাসপোর্ট। আমি নেই, ছিলামই না। সেখান থেকে পাড়ার কাউন্সিলরের দ্বারস্থ হয়ে র‍্যাশন কার্ডের জন্য দরখাস্ত। র‍্যাশন কার্ড নিয়ে পাসপোর্টের দরখাস্ত, মাঝে জুতোর শুকতলা ক্ষইয়ে ইউনিভার্সিটির চক্কর, সার্টিফিকেট তোলার জন্য। অ্যাত্ত মোটা ফাইল জমা করার চেষ্টা, প্রথমে ট্রেনে করে দিল্লী গিয়ে তারপর পায়ে হেঁটে হাই কমিশনের অফিসে জমা করার চেষ্টা। সেখানে ধাক্কা খেলাম, ফর্মগুলোই নাকি ভুল ছিল। তারপর কলকাতায় এক এজেন্সির দ্বারস্থ হয়ে বছর চারেক চক্কর কেটে আমি দরখাস্ত জমা করি। আমেরিকায় ৯/à§§à§§ হামলার জন্য সমস্ত ফাইল আটকে থাকে, এবং তার সঙ্গে আমার ফাইলও আটকে পড়ে। তাই তার পাঁচ বছর পর আমার পিআর ভিসা হাতে আসে।


এখন তো অনেক সুবিধে হয়ে গেছে। কাগজপত্র স্ক্যান করো আর ওয়েবসাইটে আপলোড করো। ব্যাঙ্কের নথিপত্র অনলাইন আপলোড করো। কয়েক মাসের মধ্যেই ইমিগ্রেশন হয়ে যাবে। তখনকার দিনে পায়ে হেঁটে পাড়ার দোকানে কাগজপত্রের কপি করিয়ে, এজেন্সি বা পোস্ট-অফিসে গিয়ে রেজিস্টার্ড পোস্ট করতে হতো। বাসে করে টাইপিস্টের কাছে গিয়ে বসে থেকে অ্যাপ্লিকেশন টাইপ করাতে হত। না ছিল কম্প্যুটার, না স্ক্যানার। এখন ভাবা যায়?


কেষ্ট পেতে গেলে কষ্টকে কি বাদ দেওয়া যায়? তা না পারলে দেশেই থাকা ভাল। আমি যখন এসেছিলাম তখন দেশের অবস্থা ভাল ছিল না। আমার ছেলে নিতান্ত সাধারণ ছাত্র। দেশে সাধারণ ছেলেমেয়েদের কোন স্থান ছিল না। সবাইকে হতে হবে এক্সেলেন্ট! তাই পালিয়ে এসেছিলাম। একটু সাধারণত্বর খোঁজে, একটু শান্তির আশায়, সবসময় ধরপাকড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে, একটু নির্বিঘ্নে বাকি জীবনটা কাটাবো বলে। এখন তো দেশের অবস্থা অনেক ভাল। পড়াশোনার অনেক পছন্দমতন বিকল্প। এখন যে ছেলেমেয়েরা কেন দেশ ছাড়তে চায়, কে জানে।


আরও পড়ুন, প্রবাসিনীর চিঠি: কানাডায় ইউথেনেসিয়া


যাই হোক, তার জন্য যে বিধিসম্মতভাবে, দুটো দেশকেই সম্মান করে, এক দেশ থেকে এসে আর এক দেশে বসবাস করার চেষ্টা করছি, তার মানে এই নয় যে আমি ভারতীয় কোন অংশে কম। ‘জন-গণ-মন’ তে যেমন আমি উঠে দাঁড়াই, ‘ওহ ক্যানাডা’ তেও তেমন দাঁড়াই। আমি এখন দুই মায়ের সন্তান।


ক্যানাডায় এসো, তবে বুঝে এসো। হাঁ-হাঁ করে ডলার বানাতে এসো না। টাকা রোজগার করা যতটা শক্ত, ডলার বানানোও ঠিক ততটাই শক্ত। তার ওপর এখানে বুঁচির মা নেই, মন্টু নেই, ইস্ত্রিওয়ালা নেই, ড্রাইভার নেই, পাড়ার চায়ের দোকান নেই, আড্ডা নেই, অটো নেই, রিকশা নেই, রোলের দোকান নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা, ফুচকা নেই! কেরিয়ার, শিক্ষা সব ফেলে রেখে আসতে হবে। কিছুই কাজে লাগবে না প্রথম প্রথম। রেস্তোরাঁয় ঝাড়ু দিতে হবে, গ্যাস-স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ করতে হবে, পুজোর ছুটি নেই, মা-মাসিরা নেই, সব নিজেকে করতে হবে – জুতো সেলাই থেকে রান্না করা থেকে গাড়ি ধোওয়া, জামা ইস্তিরি, বরফ কাটা, বাচ্চা সামলানো। সব কিছু। পিঠে ব্যথা, মাথায় ব্যথা, জ্বর, কোন কিছুতেই ছাড় দেবে না জীবন। কাজ করতেই হবে।


অনেকেই শুধু ডলার বানাতে আসে। আর আসা থেকেই যেন নিজেদের অতীত ভোলার চেষ্টায় থাকে। হয় দেশে তেমন কামড় দিতে পারেনি, তার জন্য, না কী, এখানে এসে তেমন কামড় দিতে পারছে না, তার জন্য, অনেকেই নানা হীনমন্যতায় ভোগে। যার ফলে কথায় কথায় বাড়ি-গাড়ি আর যেটুকু সম্পত্তি এখানে করেছে, ফলাও করে সে কথা জাহির করতে থাকে। তাদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে কথা বলা মুশকিল। দেখা হলেই শুরু করে কবে ক্যানাডায় এসে সে প্রথম বাড়ি কিনেছিল, কবে দ্বিতীয় বাড়ি, কবে তৃতীয়। এখন তার বাড়িতে কটা বেডরুম, কার ছ’টা, কার ন’টা, কার ক’টা গাড়ি গ্যারেজে। গ্যারেজে জায়গা হচ্ছে না, রাস্তায় গাড়ি রাখতে হচ্ছে, এত গাড়ি! বরফ কাটতে হচ্ছে, অবশ্য এখন বরফ গলার নানা কেমিক্যাল ছড়িয়ে দেওয়া যায়… যত কথা ঘোরানোর চেষ্টা করি, সেই ঘুরেফিরে একই প্রসঙ্গ।


মহা বিপদ! ভাবলাম বাঙালিদের মধ্যে বোধহয় তেমন কোন ব্যাধি নেই। তাদের ভাণ্ডারের তল তো অনেক গভীরে। সাহিত্য থেকে রাজনীতি, সিনেমা-গান থেকে ফুটপাথের খাবার, কলকাতার কড়চা থেকে লেকে প্রথম প্রেম, রবীন্দ্রনাথ থেকে কলেজ স্ট্রীট বইপাড়া, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কফি-হাউস, তোলপাড় করা তো বাঙালির ঐতিহ্য এবং কথা বলার প্রসঙ্গ। সেখানে নিশ্চয়ই গন্ডগোল হবে না। ও বাবা! প্রথম বাঙালি বাড়ির নেমন্তন্নে গিয়ে সাত রকমের স্টার্টার আর বাসন-কোসনের বহর দেখে চক্ষু ছানাবড়া! আর কথা সেই সম্পত্তি প্রসঙ্গেই। কে কত সম্পত্তির মালিক এখানে। শুধুই সম্পত্তি। শুধুই গাড়ি। শুধুই গ্যারেজ। শুধুই কার ছেলে কত মহান পড়াশোনায়। ছোটবেলা থেকে শুনেছিলাম নিজেকে জাহির করতে নেই। “লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়”। নিজের যা আছে অত বলতে নেই। লোকের নজর লেগে যায়। এখানে দেখি উল্টো, নজর কাড়ার প্রচেষ্টায় বাঙালিরা নিত্য নিজেদের ভুঁড়ি বাজায়।


ভারতে নিশ্চই গিজগিজ করে এমন চাল মারা লোকজন, কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি মানুষ মধ্যবিত্ত মানসিকতার। বিনয়ী। অনেক পয়সা আছে, কিন্তু সাধারণ জীবনযাপন করে। ধরাছোঁয়ার মধ্যে। বিদেশে আসতে গেলে বোধহয় বড়লোক মানসিকতা হওয়ার শর্তটা অপরিহার্য্য। সেটা আছে কিনা ভেবে নিও। বিদেশে কত সু্যোগ, সেটার সদ্ব্যবহার করে কিছু করে দেখানোর মানসিকতাটাই আজব।


এসব দেখি আর ভাবি, এরকম পরিবেশে কি ওই আজব মানসিকতার কাউকে পাবো? একই জন্মে দুটো দেশের নাগরিক, কী বিরাট সুযোগ, সেটার সদ্ব্যবহার করে দু-দেশের কাজে যদি কোনভাবে লাগা যায়, এটা কি কেউ ভাবে না? অনেক পেয়েছির ভারে ধরাশায়ী ঋণী আমি ওই আজব মানসিকতা নিয়ে কিন্তু প্রতিনিয়ত দুই পৃথিবীর মাঝে সাঁকো বাঁধার চেষ্টা করি।


Published in Indian Express, Bangla, Dec 9, 2018




Advertisements
 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on December 12, 2018 10:39

September 17, 2018

টরন্টোর রাস্তায় ঢাক, কাঁসর, কাশফুল

সত্যি বলতে কি, দশ বছর বাংলা, তথা, ভারতবর্ষের বাইরে থাকার ফলে দুর্গাপুজোর মহিমাটাই শরীর-মন-অন্তরাত্মা থেকে  আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে। পুজোর গন্ধ, শরতের মেঘ, কাশফুল, পুজো আসছে-পুজো আসছে কলরব, প্যান্ডেল, বাঁশ ফেলার আওয়াজ, গড়িয়াহাটের ‘সেল’, চোখ-ধাঁধানো আলোর রোশনাই, ‘মাইকাতঙ্ক’, কিছুই নেই। কলকাতা আছে কলকাতাতেই, কিন্তু আমরা স্বেচছায় উৎখাত হয়ে যাওয়া বাঙালিরা নেই কলকাতায়। এখানে নেই সেই হঠাৎ করে জ্বলে ওঠা ঝলমলে সোনা রোদ্দুর, ঝিলমিল করে ওঠা নারকেল গাছের পাতা। এমনিতে ক্যানাডার আকাশ নৈসর্গপূর্ণ  থাকে প্রায় অর্ধেক বছরই। কিন্তু কবিগুরুর ‘শেষের কবিতা’র অমিতের ভাষায়, “ভালো জিনিষ যত কম হয় ততই ভালো”, তাই কলকাতার  রোদে-পোড়া ছাই আকাশ হঠাৎ ঠিক পুজোর আগে নীলাম্বরী সেজে সাদা মেঘের ভেলা ভাসিয়ে মনকে যেরকম আলাদা ভাবে উতলা করে, তা ঠিক বাংলার বাইরে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না। নেশা জাগানো সেই স্বর্গীয় মহালয়ার মুহূর্তখানি মনের মধ্যে আলাদা করে যা আলোড়ন তোলে, তাতেই পুজো আসার আগে প্রেক্ষাঘর ‘হাউস্ফুল’ হয়ে যায় , সোজা হয়ে দাঁড়ানোই দায়। বাঙালী ভেসে যায় আবেগে।


বিদেশের আকাশ যতই চেষ্টা করুক, সেই অদ্বিতীয় আবেগ উদ্ভূত করতে পারেনা বাঙালির মনে। তাই এখানে যখন দুর্গাপুজোর প্রচেষ্টা দেখি, ফাইবার-গ্লাসের ঠাকুর, বছরের পর বছর একই মুর্তি, রেকর্ড করা ঢাকের বাজনা, ইউটিউবে মহালয়া, উইকেন্ডে উৎকট সজ্জায় বাঙ্গালিকে দেখি, তাদের জেন-ওয়াই ভারতীয় পোষাক পরে বলিউডের গানে নাচছে দেখি, সবই কেমন যেনো মেকি লাগে। না আছে ফুল, না বেলপাতা। স্মোক-অ্যালার্মের জ্বালায় না ধূপ, না ধুনো। এক আঁজলা প্রণাম করেই শাড়ির আঁচল সামলিয়ে, গহনা সামলিয়ে তারা চলে যান খিচুরি-ভোগের লাইনে। দেশ থেকে আনা বিভিন্ন শাড়ি ও গহনার পসার সাজিয়ে বসেন অনেকে, আর থাকে খাবার স্থানে দেওয়াল জুড়ে বিজ্ঞাপন। বলছি না কলকাতায় এর থেকে বিশেষ কিছু অন্যরকম হয়, কিন্তু ওটা কলকাতা। ওখানে সাত-খুন মাপ!


আরও পড়ুন, প্রবাসিনীর চিঠি: হা কৃষ্ণ


এতোবছর এরকম-ই দেখে মন নিভে গেছিল। দুর্গাপুজোয় সেজে-গুজে বেড়োনোর ইচ্ছেটাই চলে গেছিল। কিন্তু এবছর এক মন-ধাঁধানো ঘটনা দেখে তো আমি উৎফুল্ল! টরন্টোর রাস্তায় এবছর নেমেছে ঢাক। কাঁসর-বাদ্যি বাজিয়ে, ভারতের পতাকা বয়ে, ‘আমারপুজো টরন্টো’ নামক এক পুজোসমিতি করল দুর্গাপুজোর ঘোষণা। তাদের পড়নে কাছা ধুতি, পাঞ্জাবি। মহিলাদের অঙ্গে শাড়ি, হাতে শাঁখ । প্যানোরামা ইন্ডিয়া পারেডে অংশগ্রহণ করে পশ্চিমবঙ্গের প্রতীক হয়ে তারা ঢাকের সাথে নাচল টরন্টোর মস্ত-অকুস্থলে – ন্যাথান ফিলিপ স্কোয়ারে।


টরন্টোর রাস্তায় ঢাক, কাঁসর (ফোটো সৌজন্য- লেখক)

শুধু তাই নয়, ‘আমারপুজো’র শুভদীপ মিত্র বললেন, তারা নাকি পুজোর প্রাঙ্গণে প্যান্ডেলও করছেন কয়েক বছর ধরে। কোনো বছর দক্ষিণেশ্বরের মন্দির, কোনো বছর রথ, আবার একবছর হয়েছিল প্যাগোডা। কলকাতার মহা-শিল্প প্যান্ডেলের কাছে যদিও এ যৎসামান্য, তবুও মনে হয়, যাক্‌, কিছুটা মন তো ভরল।


‘বঙ্গপরিবার’ নামক আর এক পুজোসমিতি অবাক করা এক কথা বলল । প্রেসিডেন্ট অমিতাভ চক্রবর্তী বললেন, প্রত্যেক বছর তাঁরা ১০৮টা পদ্মফুল আনান মালেশিয়া থেকে। সত্যিকারের ফুল! প্লাস্তিকের নয়। সেই ১০৮টা পদ্মফুল দিয়েই দেবীর বোধন হয়। উড়োজাহাজে আসে সে পদ্মফুল। এক বছর পুজো করেই তা ফেলে দেওয়া হয়। যেমন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ক্ষীরের পুতুল”এর ছোটোরানী পটিয়সীর জন্য যে শাড়িটি রাজা সাত-সমুদ্র-তেরো-নদী পেরিয়ে এনেছিলেন, সেই আকাশের মতন নীল, বাতাসের মতোন ফুরফুরে শাড়িটি এক দেশের রাজকন্যা একটিবার পরে মহাদেব নীলকন্ঠের পুজো করে, ঘরে এসে শাড়িটি ছেড়ে, দাসীদের দিয়ে দেন — কেমন যেনো মনে পড়ে গেল এটা শুনে।


বঙ্গপরিবারের এক সদস্য এক বছর দেশ থেকে বেড়িয়ে ফিরল গলায় একটা আস্ত ঢাক ঝুলিয়ে। ইউটিউবে ঢাক অনেক শোনা হয়েছে, এবার থেকে বাজবে সত্যিকারের ঢাক! নাচবে ধুনুচি নাচ। অবশ্য আগুন ছাড়া।


বাঙালি পোশাকে, কাঁসর হাতে , শুধু দেশটাই যা আলাদা (ফোটো সৌজন্য়- লেখক)

তবে দুর্গোপুজোর সারমর্ম বজায় রেখেছেন কিন্তু সকলে — এটা সর্বধর্ম সন্মিলনের একটি পারিবারিক উৎসব, হিন্দু ধর্মের শুধুমাত্র একটা ‘পুজো’ নয়। যে কারণে নানান ধর্মের নানান পরিবার এতে অংশগ্রহণ করতে কোনো বাধাই দেখেনা। মুসলিম, ক্রিসচান, শিখ, এমন কি, ভারতবর্ষ ছাড়াও অন্য দেশের মানুষ এই উৎসবে উৎসাহ পান। অর্থাৎ, এবার শুধু  জাস্টিন ট্রুডো বাঙালির ঢাকের তালে ধুতি পরে যদি একবার নাচতে রাজী হন তো দুর্গাপুজো অক্লেশে এক আন্তর্জাতিক উৎসব হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। পুজোসমিতিরা কি এই চিন্তাটা নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন নাকি?


সেজন্যই এবছর নিমন্ত্রিতদের মধ্যে আছে কনজারভেটিভ এমপি লিসা রাইট, কুস্তিগির টাইগার জিত সিং, টাইগার আলি সিং এবং আরো অনেক বিদেশি।


অবশ্যই দুর্গাপুজো মানেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিলবিল করা “যাদের খুশির অন্ত নেই” তারা একটা অত্যন্ত বাধ্যতামূলক “আমাদের সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে”র সাথে নাচ নাচবে, এবং তার সাথে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সমবেত গান জরুরী। তাছাড়া, এখানকার কিশোরকণ্ঠী, লতাকন্ঠী, আশাকন্ঠী ছাড়াও বিদেশ থেকে (মানে ভারতবর্ষ থেকে) সদ্য সা-রে-গা-মা য় বিজয়ী বা ইন্ডিয়ান আইডল এর বিজয়ী কে আনতে পারলে তো বাজিমাত! অন্তত ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ডলার অবধি বাজেট থাকে প্রত্যেক পুজোর! মানে বাইশ থেকে তিরিশ লাখ ভারতীয় টাকা ব্যয়!


‘বঙ্গপরিবারে’র যে প্রতিমাটা পুজো করা হয়, সেটি বছর তিনেক আগে কলকাতা থেকে আনানো হয়েছিল। কালো প্রতিমা। কলকাতার প্রখ্যাত চিত্রকর, শুভমিতা ডিন্ডা, তার প্রথম দুর্গাপ্রতিমা বানিয়েছিলেন বঙ্গপরিবারের জন্য। প্রেসিডেন্ট অভিজিত বললেন ওটা বোধহয় ইতিহাসের প্রথম কালো দুর্গাপ্রতিমা।


কলকাতায় শুনলাম নাকি এবার থেকে অনবদ্য কিছু প্রতিমা ভাসান দেওয়া হবেনা, রেখে দেওয়া হবে? সত্যি নাকি? শিল্পকর্মকে সন্মান দেওয়ার এর থেকে বড় আর কিছু নেই। হোক না একই মুর্তি পুজো দু-তিন বছর ধরে, কিন্তু ওই সব অতুলনীয় প্রতিমা প্রত্যেক বছর জলে ফেলে দিতে বড়ই কষ্ট হয়।


শুভমিতা ডিন্ডার তৈরি কালো দুর্গাপ্রতিমা 

সেদিক থেকে ক্যানাডার মাথাব্যাথা নেই। সরকারের কড়া আইন অনুযায়ী জলে ফেলার কোন প্রশ্নই নেই। তাই রেখে দিয়ে নতুন করে সাজিয়ে পুজো হয় প্রত্যেক বছর।


তবে এইবার কি কিছু রাস্তার ধারে আলাদা করে আলো লাগাবে? হই-চই করবে কি সারা ক্যানাডার মানুষ?  দিওয়ালি আর চাইনিজ নিউ ইয়ারের মতন দুর্গাপুজোও কি উৎসবের তালিকায় পড়বে? না কি কলকাতার ছট্‌-পুজোর মতন রাস্তার ধার দিয়ে আমরা ঢাক বাজাতে বাজাতে যাবো, আর সবাই হাঁ করে দেখবে। বলবে “ও! ইন্ডিয়ান ফেস্টিভ্যাল”।  ক্যানাডা বহুসংস্কৃতির দেশ বটে, কিন্তু জোর করে আমাদের উৎসব সবার ঘাড়ে চাপানোটাও ঠিক নয়।


তবে চল্লিশ-পঞ্চাশ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে শাড়ি পরে সেজে-গুজে শুধু ফ্যাসফ্যাসে খিচুড়ি-ভোগ খেয়ে মন হতাশ করে ফিরেও আসতে আর ইচ্ছে করেনা যে। একটু আলো, একটু উচ্ছলতার জন্য বাধ্যতামূলক চাঁদা দিতে হলে কি সবাই আপত্তি করবেন? সরকার কি খুব রাগ করবেন?


প্রত্যেক বছর বাঙালির মন ভেসে যায় কলকাতায় মায়ের ত্রিনয়নের টানে। তবে বিদেশে বসে বাঙালি কলকাতাকেই দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে নিয়ে আসছে সাত-সমুদ্দর-তেরো নদী পেরিয়ে। তবে, আর দুঃখ কী?


আহা! এবার শুধু চাই রাস্তার ধারে ধারে কাশফুল!






টরন্টোর হাইওয়ের ধারে কাশফুল

একটা কথা বললে অবাক হবেন, এই পুজোর সময় কিন্তু ক্যানাডার রাস্তার ধারে সত্যি কাশফুলের মতন একরাশ ফুল ফোটে – খাগড়া। সাদা নয়, খয়েরি রঙের। বৈজ্ঞানিক নাম, ‘ফ্রাগমাইট অস্ট্রালিস’। একদম কাশ ফুলের মতন দেখতে। জন্ম বলে ইউরোপে। ছবিও দিলাম। এখানে হাওয়ায়-হাওয়ায় এসেছে। ওন্টারিও সরকারকেও বেশ বিপাকে ফেলেছে এই উদ্ভিদের আক্রমণাত্মক চরিত্র। সব হাইওয়ের পাশেই থাকে-থাকে হাওয়ায় দোলে এই গাছ। ঠিক দুর্গাপুজোর আগে এই প্রজাতির জন্ম হয় এবং এটিকে উদ্ভিদ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। পুজো শেষ হয় আর এগুলো ঝরে যায়। কি অদ্ভুত! গায়ে কাঁটা দেয় ভাবলে! তাহলে কি মায়ের জাদু সত্যি সত্যিই সারা বিশ্বের আকাশে-বাতাসে-ভূমিতে বিরাজমান? সর্বধর্ম, সর্বজাতি নির্বিশেষে বিদ্যমান? বাংলাদেশে, তথা শুধু ভারতবর্ষেই আবদ্ধ নয়? না কি, এটা পরাগকরণের সময়! এই সময়কার তাপমাত্রায় এইরকম আগাছা জন্মায় সব দেশে।


কে জানে?


Published in IE Bangla, September 15, 2018




Advertisements
 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on September 17, 2018 10:34

August 22, 2018

ত্রাসগ্রস্ত টরন্টো

কানাডা তার ধৈর্য, সহ্য, ভদ্রতা, শ্লীলতার জন্যই প্রসিদ্ধ। পৃথিবীর শেষ শান্তিটুকু যদি কোথাও অবশিষ্ট থাকে, তা হয়তো এখানেই।


(দীর্ঘ দিন ধরে শান্তিপ্রবণ কানাডায় বাস করছেন। সেখানকার মানুষজনকে দেখছেন। সম্প্রতি ঘটা বেশ কয়েকটি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে কি বদলে যাচ্ছে সে দেশ? লিখলেন কাবেরী দত্ত চট্টোপাধ্যায়)


ত্রাস এবার ঘুরে ফিরে এলো পৃথিবীর অন্যতম শান্তিপ্রিয় দেশ, কানাডায়। “আমেরিকায় হয়,” লোকে বলে। কানাডায় তো হত না? কানাডা পৃথিবীর প্রথম দশটি শান্তিপ্রিয় দেশের মধ্যে পড়ে। এখানে শান্তিতে বসবাস করার ইচ্ছায় চলে আসেন অনেক মানুষ। সেই কানাডা আজ ত্রাসগ্রস্ত। একবার নয়, দু বার নয়, বার বার বিভিন্ন আকার নিয়ে ত্রাস দাপাচ্ছে টরন্টোর মতন মহানগরে। ২০১৮ সালে এই নিয়ে তিনবার হানা দিল – ‘সন্ত্রাসবাদ’ কিনা অবশ্য বলা যাচ্ছেনা।


শুরু হয়েছিল বলা যায় জানুয়ারি ২৯, ২০১৭, কিউবেক মসজিদ আক্রান্ত হওয়ার খবরে। সেই প্রথমবার কানাডাবাসী কেঁপে উঠেছিলন। এ কী! কানাডার শুভ্র ভূমিতে রক্তের দাগ? অপরাধী, আলেক্সান্ড্রেস বিসননেট, সন্ধ্যার নামাজের সময় মসজিদের ভিতরে ঢুকে গুলি চালায়। ছযজন নিহত হন এবং ১৯ জন আহত হন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং কিউবেকের প্রিমিয়ার ফিলিপ কুইলার্ড একে সন্ত্রাসবাদী হামলা বলে অভিহিত করেন, যদিও বিসোনেটেকে ক্রিমিনাল কোডে সন্ত্রাসবিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় নি।


[image error]

পরের মারাত্মক হামলা হয় এ বছর, এপ্রিল ২৩। সেদিনটা আমার খুব মনে আছে। আট মাসের হাড়-কাঁপুনি ঠান্ডার পর বরফের দিন্‌গুলি সবে গুটি-গুটি পায়ে বিদায় জানাছে আর রাস্তা-ঘাট একটু একটু করে রঙিন হয়ে উঠছে। এখানে এপ্রিল পর্যন্ত বরফের দাপট থাকে; বসন্তের একটু আধটু গন্ধ পেলেও আমি গাছগুলোকে দেখি – তারা যদি সবুজ বেশ না পরে, তাহলে বোঝা উচিত এখনো আর একবার বরফের ঝাপটা আসবে।

তাই এসেওছিলো। পয়লা বৈশাখের দিন, দিগন্ত সাদা করে এলো বরফঝড়! তার ঠিক পরেই দ্রুত বিদায় জানাচ্ছিলো শীত, আর সকলে — হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান-সাদা-কালো-খয়েরি নির্বিশেষে ওই পোড়াচ্ছাই কালো জ্যাকেটের খোল থেকে উন্মুক্ত হয়ে, রঙিন জামাকাপড় পরে, খোলা চুলে হই-হই করে বেরিয়ে পড়েছিলেন একটু উষ্ণতার খোঁজে।

সেদিনই হুড়মুড়িয়ে এলো ওই ভ্যানটা। অ্যালেক মিনাসিয়ান নামক এক ২৫ বছরের যুবক তাঁর ভাড়া-করা ভ্যান নিয়ে নর্থ-ইয়র্ক সিটি সেন্টারের গায়ে, ইচ্ছাকৃতভাবে পথচারীদের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিল, পিষে মারল দশজনকে, এবং গুরুতরভাবে আহত করল ১৬জনকে। ঘটনাটি কানাডিয়ান ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম হামলা। মিনাসিয়ান মানসিক রোগী ছিল, এবং হয়তো নিজেকে ‘ইনসেল’ (অনিচ্ছাকৃত সেলিবেট) ভাবত। ঘটনার একটি সাক্ষী বলেন, চালক আক্রমণের সময় সরাসরি পথচারীদের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখছিল এবং যেন “ভিডিও গেম খেলছে, সেভাবেই যতগুলো সম্ভব মানুষ হত্যা করার চেষ্টা করছিল”। এই ঘটনাতেও কোনো সন্ত্রাসবাদের গন্ধ পাওয়া যায়নি। মানসিক-অবসাদগ্রস্ত এক যুবকের কাণ্ড; একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে করা হচ্ছে।

এরপর ঘটল গ্রীকটাউন হামলা। বাইশে জুলাই, ২০১৮, এক গ্রীষ্মের রাতে টরন্টোর গ্রীকটাউন অঞ্চলে ড্যানফর্থ এভিনিউতে ফয়সাল হোসেন নামক এক ব্যাক্তি এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে দু’জনকে হত্যা করে এবং তাতে ১৩ জনকে আহত হয়। টরন্টো পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে গুলিবিনিময়ের পর আত্মহত্যা করে সে। যদিও আইসিস এই জঘন্য অপরাধের দায়িত্ব নিয়েছে, টরন্টো পুলিশ কিন্তু কোনো সন্ত্রাসগোষ্ঠীর এতে জড়িত থাকার এখনো প্রমাণ পায়নি। হোসেনের পরিবার বলেছে যে হোসেন নাকি “গুরুতরভাবে মানসিক অবসাদগ্রস্ত ছিল এবং তার ছিল বিষণ্ণতা ও মানসিক রোগের সাথে জীবনযাত্রা”।

কানাডা তার ধৈর্য, সহ্য, ভদ্রতা, শ্লীলতার জন্যই প্রসিদ্ধ। পৃথিবীর শেষ শান্তিটুকু যদি কোথাও অবশিষ্ট থাকে, তা হয়তো এখানেই। সারা বিশ্বের নানান ভাষার, নানা সম্প্রদায়ের, নানা দেশের অধিবাসী বিভিন্ন কারণে কানাডায় এসে নিরাপদে তাদের বাসস্থান গড়ে তুলেছেন। এঁদের মধ্যে অধিকাংশই শান্তিপ্রিয়। শোনা যায় যে কিছু আন্তর্জাতিক অপরাধীরাও এদের মধ্যে শামিল। নিঃশব্দে জীবন যাপন করছে তারা। এদের মধ্যে অবশ্যই আছে সন্ত্রাসবাদীদের হাত থেকে পালিয়ে আসা প্রচুর শরণার্থী — ইরাক, আফগানিস্থান, সোমালিয়া, সিরিয়া এবং আরো অনেক দেশ থেকে।

জাস্টিন ট্রুড্যো তাঁর শরণার্থী-আমন্ত্রণের অভিপ্রায়ে কিছু গলতি করেননি বলে আমি মনে করি। প্রায় ১০,০০০ এর বেশী সিরিয়ার শরণার্থী আজ নির্ভাবনায় কানাডায়। কিন্তু আজ এই ধীর, স্থীর কানাডাবাসীর ললাটেও ভ্রুকুটী। যদিও কোন বিশেষ সরলরেখা টানা যাচ্ছেনা এই একটার পর একটা ঘটনাগুলোর মধ্যে, এবং টরন্টো পুলিশ কিছুতেই ঝপ্‌ করে কোন সন্ত্রাসবাদী বা কোন বিশেষ সম্প্রদায়কে এর কৃতিত্ব দেওয়ার পক্ষপাতী নয়, তবুও কোথায় যেনো একটা খটকা লাগছে। সিরিয়ার শরণার্থীর প্রবেশদ্বার খুলে দেওয়ার পর থেকেই এই নির্মল দেশটির ঘন, নীল আকাশে যেনো কালো মেঘের ঘনঘটা। সবই কি কাকতালীয়?

আমেরিকা যেমন সব কিছুতেই আইসিসকে, মুসলিমদের দোষ দিয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে নেয়, কানাডা কিন্তু অতো সহজে ব্যাপারটাগুলোর নিষ্পত্তি করতে বোধহয় চাইছে না। মাঝে আবার মে মাসে টরন্টোর মিসিসাগায় এক ভারতীয় রেস্তোঁরায় বোমাবাজি হয়েছিল। ‘বম্বে ভেল’ নামক রেস্তোঁরায় দু’জন লোক ঢুকে একটি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। ভিতরে একটা জন্মদিনের পার্টি চলছিল। সেখানে উপস্থিত ৪০ জনের মধ্যে ১৫ জন আহত হলেও, গুরুতর আঘাত পাননি কেউই। কারণ এখনও অজানা, তবে পুলিশের অনুমান, এটি কোনো সন্ত্রাসবাদী হামলা নয়, নিছক ‘বিজনেস রাইভালরি’।

তাই আপাতত প্রত্যেকটা ঘটনারই আলাদা বিশ্লেষন। তবে একটা চাপান-উতোর শুরু হয়ে গেছে মানুষের মধ্যে। সেটি কিন্তু ঠিক ঘৃণা-প্রশ্রয়কারী আবেগ নয়। বরঞ্চ, অবাক হয়ে যাই, যে মানুষের মধ্যে অনেকটাই ঘৃণা নিষ্কাশনের প্রচেষ্টা তৈরি হচ্ছে। সকলে যেনো জানে যে, বাবা, অনেক ঘৃণা দেখেছি, আর নয়। তাঁরা যেন ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ডরান। এমনকি, সংবাদমাধ্যমও অনেক সংযমী, দায়িত্বপূর্ণ। কোন খবরে আগুন ছড়াবে সে ব্যাপারে তারা ভীষণ সচেতন। আমাদের ভারতের মতন নয়, যে ধোঁয়া দেখেই আগুনের ঘোষণা করে দিল চ্যানেলে চ্যানেলে, আসামী ঠিক করে তার ফাঁসি পর্যন্ত দিয়ে দিল সংবাদমাধ্যম!

গত রবিবার এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে। কিছু মানুষ টরন্টোর ড্যানফর্থে ইসলাম-বিরোধী এক বিক্ষোভকারীকে ধাক্কা দিয়ে ফোয়ারার জলে ফেলে দেয়। তারা কিন্তু শুধুই মানুষ ছিল – সাদা, কালো, খয়েরি, হলুদ, নানান রঙের। সবাই এক সঙ্গে একসুরে বলতে থাকে, “শেম! শেম!”

আগুনের কাজ জ্বলা। মানুষের কাজ সেটা নেভানো, উস্কানো নয়। এই সামান্য কাজটাই কীরকম গৌরবান্বিত করা হচ্ছে, তাই না? কিন্তু এটাই স্বাভাবিক। যদিও কিছু গোঁড়া মানুষ সবসময়েই সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেই, তবুও যে সমাজে এই ধরনের যৌথ প্রতিবাদ, যেখানে স্ফুলিঙ্গ আগুনের আকার নেওয়ার আগেই নিভিয়ে দেওয়া হয়, সেই সমাজে আমার মনে হয় শান্তিরই জয় অবশ্যম্ভাবী! শান্তিই সর্বোত্তম – সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।


Published in Indian Express, Bangla on August 5, 2018 




Advertisements
 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on August 22, 2018 11:53

কানাডায় ইউথেনেসিয়া

কিছু মরিয়া রোগী খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে দেশজুড়ে, যাতে তাদের মৃত্যু দ্রুতগতিতে হয়। অন্যরা আত্মঘাতী এবং প্রায়ই সহিংস প্রক্রিয়ার গোপনে মৃত্যু-বরণ করছে।


(দীর্ঘদীনের কানাডা প্রবাসী কাবেরী দত্ত চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, সে দেশে নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে সম্প্রতি যে হইচই শুরু হয়েছে, তার কথা। লেখায় প্রকাশিত মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।)


ভীষ্ম-কাল এসে গেলো নাকি!


মহাভারতের যত কাণ্ড-কাহিনি – তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল কিনা, বা তা সত্যি-সত্যি প্রযুক্তির শীর্ষে পৌঁছনোর কাহিনি ছিল, না কি সবটাই মানুষের কল্পনা, তা জানিনা। কিন্তু ধীরে ধীরে মানবজাতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে সেই সব কল্পনার শিখর ছুঁতে চলেছে, এটা মনে হচ্ছে। ইচ্ছামৃত্যুতে কানাডায় গত তিন বছরে প্রায় ৪০০০ মানুষ হত হয়েছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডাক্তার ও নার্স তাদের ‘খুন’ করতে বাধ্য হয়েছেন!


[image error]


ভীষ্মই বোধহয় আমাদের প্রথম এবং শেষ পরিচিতি ইচ্ছামৃত্যুর সাথে। মহাভারতে ভীষ্ম ইচ্ছামৃত্যুর বরে অর্জুনের শত-বাণে জর্জরিত হয়েও শরশয্যায় বেঁচে ছিলেন কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধ শেষ হওয়া অবধি। এরপর যুধিষ্ঠিরকে প্রচুর উপদেশ দিয়ে, ৫৮ রাত্রির পর, এক সু’দিন দেখে দেহত্যাগ করেন। সে প্রায় ৫০০০ বছর আগেকার ঘটনা, যদিও আদৌ তা ঘটেছে কিনা তা তর্কসাপেক্ষ।


কিন্তু আজকের যুগে, ক্যানাডার মতন দেশে ইচ্ছামৃত্যু ২০১৬ সালে বৈধ হওয়ার পর এটা অত্যন্ত আশ্চর্য এবং গভীর দুঃখের বিষয় যে এতো মানুষ জীবন-অপেক্ষা মৃত্যুকে বেছে নিচ্ছে। তিন বছরে ৩৭১৪ ‘খুন’!  যদিও তাঁদের সাহসকে কুর্ণিশ করি, তথাপি মন ভার হয়ে যায় ভাবলে যে এত মানুষের শারীরিক যন্ত্রণা এতই প্রবল ছিল এবং বেঁচে থাকাটা তাঁদের কাছে এতটাই যন্ত্রণাদায়ক ছিল, যে কোনও চিকিৎসা বিজ্ঞানই তাঁদের কোন আশা-ভরসা দিতে পারেনি!


আমরা হৃতিক রোশনের একটা সিনেমায় দেখেছিলাম ইচ্ছামৃত্যুর প্রসঙ্গ। ‘গুজারিশ’। সঞ্জয় লীলা বনসালীর নির্দেশনা, ২০১০। সিনেমাটা হিট করেনি। কিন্তু প্রসঙ্গটা আজ প্রযোজ্য।  ভারতে ইচ্ছামৃত্যু এখনো আক্ষরিকভাবে বাস্তবায়ন না করা হলেও, বহুদিন যাবৎ ভেন্টিলেটর প্রত্যাহারের চল আছে। ২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রোগীদের ভেন্টিলেটর প্রত্যাহারের মাধ্যমে প্যাসিভ ইউথেনেসিয়া বৈধকরণ করেন। তবে সে ক্ষেত্রে রোগী ‘ব্রেন ডেড’ অথবা ‘পার্সিসটেন্ট ভেজিটেটিভ’ অবস্থানে হতে হবে এবং সবচেয়ে কাছের আত্মীয় তাতে রাজী থাকতে হবে। ‘অ্যাকটিভ ইউথেনেসিয়া’ বা একটি ‘লিদাল’ ইঞ্জেকশনের দ্বারা ‘হত্যা’ এখনো ভারতে অবৈধ, যেটা ক্যানাডায় এখন বৈধ!


মানুষ হওয়ার মর্যাদা যেরকম বেঁচে থাকতে দেয় ক্যানাডা, মৃত্যুর সাথেও সেই মর্যাদা আশা করে ক্যানাডিয়ানরা। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মোটামুটি মানুষেরই প্রবল চাপেই সৃষ্টি হল। মানুষের বক্তব্য প্রত্যেকেরই তাদের মৃত্যুকে বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। অর্থাৎ, ইচ্ছামৃত্যু। আইন কিন্তু কয়েকটা শর্ত রাখলো। এই ইচ্ছায় ক্যানাডিয়ানরা সদিচ্ছায় মৃত্যবরণ করতে পারেন, তখনই যখন তাদের রোগটা চিকিৎসার অসাধ্য এবং তাঁর মৃত্যুটা অবশ্যম্ভাবী। আরো অনেকগুলো শর্ত দিয়ে মোটামুটি আইনটিকে বেঁধে দিয়েছে সরকার, যাতে কেউ এটার অপব্যাবহার না করতে পারে।


এই প্রসঙ্গ নিয়ে ক্যানাডায় ঝড় উঠেছে। কিন্তু এদিকে তর্কের ঝড় চলছে, আর ওদিকে গত তিন বছরে নিঃশব্দে প্রায় ৪০০০ ক্যানাডিয়ান দেশ জুড়ে ইচ্ছামরণ করে ফেলেছেন। সেটা কি জানে, যারা তর্ক করতে ব্যাস্ত, তারা? ব্যাপারটা এমনই যে এখন আর মানুষ কোনরকম যন্ত্রণাদায়ক অসুস্থতা সহ্য করতে চাইছেনা।  মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করাটা মৌলিকভাবে মানবিকতার প্রতি অত্যন্ত নির্দয়তা। কিন্তু সেটাই মানুষ সহ্য করে এসেছেন অনন্তকাল থেকে। বিছানায় পড়ে থেকে দিনের পর দিন মৃত্যর জন্য অপেক্ষা করেছেন। “মরণ হয় না আমার,” “কবে  ঈশ্বর তুলবেন,” এরকম নানান রকম হাহুতাশ ঘরে ঘরে ছিল। তার প্রিয়জনরা তিতিবিরক্ত হয়েছে, জলের মতোন টাকা খরচা হয়েছে, বেড-সোর হয়ে, আয়ার হাতে, শেষে হেলায়-ফেলায় মারা গেছেন মানুষ। এটাই মানুষের ইতিহাস। তার অন্যথা যে হতে পারে, তা কেউ ভাবেইনি। মানুষ হিসেবে কোন মর্যাদাই আশা করেন না মানুষ। এটাই সবথেকে অবাক করে।


একটা কথা আছে, “মানুষ একা বাঁচতে পারে, কিন্তু একা মরতে পারেনা”। আজ সেই কথাটাই চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে।


একা মৃত্যুকে বরণ করা মানুষের জন্মগত অধিকার। আমাদের জন্ম আমাদের হাতে নেই, বার্ধক্য আমরা আটকাতে পারিনা, অসুখ হওয়া আমাদের হাতে নেই, অমরত্ব হাতে নেই, কিন্তু মৃত্যুকে তো জয় করাই যায়? অসুখে ভুগে, চরম কষ্ট পেয়ে, মৃত্যু কবে আসবে, সে অপেক্ষা করার চেয়ে, দু’পা এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুকে আক্ষরিক অর্থে যদি বরণ করা যায় তো ক্ষতি কী? সুইজারল্যান্ডে ইউথ্যানেসিয়া বহুবছর ধরে প্রযোজ্য, সেই ১৯৪২ থেকে, এখন ক্যানাডাও এটি বৈধ করেছে। সুইজারল্যান্ড একমাত্র দেশ যেটি বিদেশিদের ইউথেনেসিয়ার অনুমতি দেয়। ‘সুইসাইড ট্যুরিজম’ বলে একটা চলতি কথা আছে সেখানে, যাতে প্রচুর বিদেশি ইচ্ছামৃত্যু বরণ করেছেন গত কয়েক বছর ধরে,  আশ্চর্যজনকভাবে তার মধ্যে ৬০% জার্মান।


ক্যানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার রবীন মোরো নামে এক ৬৮-বছর বয়সী মহিলা গত বছর মার্চ মাস থেকে ভুগছিলেন পার্কিন্সন্স্‌ ডিজিজে । মোরো তীব্র যন্ত্রণায় ভুগতে থাকেন, কিন্তু তার ডাক্তার, এলেন উইবে, তাঁর মৃত্যুর সহায়তার জন্য রাজি হচ্ছিলেন না, কেননা মোরো ‘মৃত্যুপথযাত্রী’ নন, অতএব তিনি মৃত্যুর ‘যোগ্য’ (qualified to die)  নন! মোরো এই শর্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন কোর্টে। মামলাটি সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, যা একটি উদাহরণ হিসাবে পেশ করা হয়। মানুষ যে মৃত্যুর জন্য “যোগ্য” হতে হবে এমন ধোঁয়াটে আইনের গন্ডিরেখা মুছে দেন জজ পল পেরেল, এবং অবশেষে অন্য আর এক ডাক্তারের সাহায্যে উইবে মোরোকে লিদাল ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে তাঁর অমানুষিক কষ্ট থেকে মুক্তি দেন গত বছর অগস্ট মাসে।


আরও পড়ুন, প্রবাসিনীর চিঠি: ত্রাসগ্রস্ত টরন্টো


এতো গেলো একটা উদাহরণ। এরকম অনেক নিদর্শন আছে। সরকার ইউথেনেসিয়া আইনটির প্রয়োগে ধীর পায়ে এগোনোর ফলে এবং ডাক্তারদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করার হেতু, কিছু মরিয়া রোগী খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে দেশজুড়ে, যাতে তাদের মৃত্যু দ্রুতগতিতে হয়। অন্যরা আত্মঘাতী এবং প্রায়ই সহিংস প্রক্রিয়ার গোপনে মৃত্যু-বরণ করছে। কিছু রোগী অর্থব্যয় করে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছে মৃত্যুর অভিপ্রায়ে। এক কথায় ক্যানাডিয়ানরা ইচ্ছামৃত্যু নিয়ে এতটাই বিহ্বল, যে শোনা গেছে সম্প্রতি পূর্ব ক্যানাডায় এক ডাক্তার এক মায়ের কাছে তার মানসিক-ভারসাম্যহীন সন্তানের ইউথেনেসিয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।


এক দিক থেকে দেখতে গেলে, এটা নিশ্চই মানুষের তার প্রাপ্য অধিকার সাব্যস্ত করা হয়, আবার অন্য দিক থেকে দেখতে গেলে অবাক হতে হয় মানবজাতির নৈতিক মূল্যায়নের পতন দেখে! একজন মা তার শিশুকে পেটের ভিতর ন’মাস বয়ে, কী প্রচন্ড কষ্ট পেয়ে তাকে জন্ম দেয়। মানুষ করে বছরের পর বছর, হাঁটি-হাঁটি পা-পা, একটা-দুটো করে কথা বলতে শেখানো, অক্ষর শেখানো – একটা ভ্রূণ থেকে পূর্ণাঙ্গ একজন মানুষ করে তোলে। অবিশ্রান্ত খেটে শিশুটির অভিভাবকরা তার বাসস্থান, খাওয়া-দাওয়া যাবতীয় জোগান দেন যতদিন না সে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। সেই সন্তানের মন কি একটুও কাঁদেনা তার মা অথবা বাবার এমন অসহায় অবস্থা দেখে? সবই কি সে ভুলে যায় নিজেদের জীবন-যাপনের তাড়নায়? তাদের কাজ মিটে গেলেই তারা কি মা-বাবার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে? বিকলাঙ্গ শিশুকে মা হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটে?


এ সবই তর্কের বিষয়। কিন্তু যতক্ষন না এই বচসার মীমাংসা হচ্ছে ততক্ষণ আমার মনে হয় যে রোগভুক্ত, তাকেই তার জীবনের অধিকার দেওয়া উচিত। সন্তানের মুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকবেন কি না সেটা তারই সংকল্প হওয়া উচিত। অবশ্য, এ যুগে আর “অন্য আর একজনের জন্যও বেঁচে থাকা” টা ঠিক কারণ হিসেবে মানা যায়না। সে সত্য যুগ আমরা অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি।


আচ্ছা, ইচ্ছামৃত্যু তো হল, ইচ্ছা-অমরত্ব তবে কত দূর?

Published on Aug 19, 2018 in IE Bangla

 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on August 22, 2018 11:43

April 6, 2018

January 27, 2018

Finally, a Free India

[image error]

Swachch Bharat


I’m a little scared to say that I actually landed in a finally free India on November 2017. Scared, because there are still pockets of people who are always up and against the government. Scared, because I am skeptical that this is an one-government mirage. Scared, because now I stutter when people ask me, “Why did you leave the country in the first place?”


I am also proud that I stutter when they ask me “Why did you leave India in the first place?” I’m happy that they all forgot the dense cloud smoke of pollution, corruption and muscle-power that ruled the air those days. The wreckage of health-care, the sea of bribery, the ominous cheers of those who bullied the weak that resonated in the air. I have seen that India. I had left that India.


Today’s India has forgotten all that. Perhaps forgiven them too. Today’s India has battery-operated cars, autos, rickshaws. Today’s Indian street-lights mostly run on solar-power. Today’s Indian village electricity runs on wind-power. Today’s India barely has any power outage. Today’s Indians have a biometric identity. They have CCTV cameras installed in the smallest of shops. Today’s India has gone all out online: in banking systems, in housing, in traffic management, in refuse management, in law. Law is approachable and the ominous saying that, “Police-e chhule atharo gha” (Once you touch the police, the police will never leave you) doesn’t ring true any more. Cops are more approachable and you can actually discuss a situation with them.


You would be amazed to see how people of India, who never blinked an eye before chucking an empty packet from their car, now look around for dustbins! The ‘Swachch Bharat’ alarm has been beeping in Indians minds so much that every street food vendor now has a trash bin where he asks his customers to throw the paper plates and cups. The other day I saw a coconut-water seller literally snatch off the finished coconut from my hands and dump it in a large basket beside him, lest I threw it on the road.


I barely saw any VIP car motorcade passing by, obstructing the four-way traffic like they used to do during peak hours. It seems all VIP beacons have been taken off (phew!). Ministers and VIPs now accost the traffic jams just like ordinary people.


Every street crossing now has cameras which take photos of cars that break the signal, and drivers are now petrified that fine notices get silently delivered to their homes. Just that these fines need to become higher, so that people begin to understand the responsibilities of breaking traffic rules.


Even though, I see an innate tandem to the traffic chaos that my motherland has boasted. It seems each driver knows the other drivers’ moves, and no signalling is actually necessary. There’s immense camaraderie among drivers, and each live (read, drive) in their own given space, with or without traffic lanes.


It’s gotta be some task bringing this 1.324 billion people to marching to the same tune. Most importantly the citizens are from different religions, states, colors, languages and of very, very strong opinions. It required a real manipulative Pied Piper, and India hasone now. What I thought would take 200 years to achieve, has been achieved in flat seven years.


Of course, a lot needs to change. Health-care needs to become more available to the poor, and both rich and poor be treated alike. Education system needs a complete overhaul, and maybe like Mr Modi’s ‘one-night stand’ with demonetization, Indian education system may abolish exams altogether one fine 8 pm, and start project-based assignments involving questions from students and just not giving them the parrot-like answers. I hope tomorrow’s generation will feel proud of staying back in their own country and building it with their exclusive vision, and not running off to enrich some other country. I hope no mother like me has to flee with an average child.


The moment I squeezed myself out of the 22-hour flight plane, landed onto Indian soil, and did not smell pollution, I realized I had just landed in a ‘finally-free India’. A free-country getting Finally Free from all its demons after 70 years of its freedom. India is called a “Developing country”. I think it is, and it should be. At the rate it is “Developing”, give India another 10 years and this country may sweep the rest of the world off its feet.




Advertisements
 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on January 27, 2018 22:57